somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : বেলপাতার ঘ্রাণ

১৫ ই এপ্রিল, ২০১৮ রাত ৮:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জিবরান আর আমি একই ইশকুলে পড়তাম। জিবরান মানে কাহলিল জিবরান। সে অনেক কাল আগের কথা। আমার প্রথম জন্মে সমুদ্রের ধারে একটা পাহাড়ের ছায়ায় আমাদের বাড়ি ছিলো।
অংক ক্লাসে জিবরানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। সে সামনের সারিতে বসেছিলো। আর আমি পেছনে। অংক স্যার যখন আমাদের দুজনকে কানে ধরে দাঁড় করালো তখন জানতে পারলাম আমরা দুজনেই কাকতালীয়ভাবে অংকখাতায় ছবি আঁকছিলাম। আমাদের খাতাভর্তি ছিলো কয়লা ঘষে আঁকা নয়টা করে মোট আঠারোটা দাঁড়কাক।
অংক স্যার যখন আমাদের দুজনকে মেহেদি গাছের চিকন ডাল দিয়ে পিটিয়ে ক্লাস থেকে বের করে দিলো তখন আমরা ইশকুলঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলাম। আমাদের পরনের শাদা শার্ট পিঠের দিকে রক্তজবা হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের হুঁশ নাই। জিবরান বললো, ‘দেখ কীভাবে দাঁড়কাক আকাশে ওড়ে।’ বলে সে তার অংকখাতা থেকে কাঠকয়লায় আঁকা দাঁড়কাকের ছবি ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাতাসে উড়াচ্ছে, আর ছবিগুলি দাঁড়কাক হয়ে ‘কাহ্ কাহ্ কাহ্’ করতে করতে উড়ে যাচ্ছে আকাশে। আকাশে তখন নয়টা দাঁড়কাক।
জিবরান বললো, ‘ওরা কেনো কাহ্ কাহ্ করতেছে জানিস?’
‘কেনো?’
‘কাহ্ মানে হলো কাহলিল, ওরা আসলে আমার নাম জপ করছে।’
‘তোমার নাম জপ করছে কেনো?’
‘কারণ আমি কবি। কবি থেকে একদিন নবী হয়ে যাবো, তা ওরা জেনে গেছে। তাই আমার নাম জপ করছে।’
জিবরান আমার চেয়ে তিনদিনের বড়ো। সে আমাকে তুই করে বলে, আর আমি তাকে তুমি করে বলি। তখন আমি আর সে থ্রি তে পড়ি। ওর বাবার নাম ছিলো খলিল জিবরান। লোকটা ছিলো ভবঘুরে, ছন্নছাড়ার একশেষ। মায়ের কাছে অনেক কষ্টে-শিষ্টে জিবরান থাকে। জিবরানের নাম ছিলো খলিল জিববান খলিল। তো ইশকুল তার নামটা ছোটো করতে গিয়ে দেখে তার নাম আর তার বাবার নাম একই হয়ে যাচ্ছে, তাই ওর নাম ইশকুলের খাতায় লেখা হলো খলিলের জায়গায় কাহলিল। আর সে হয়ে গেলো কাহলিল জিবরান। দাঁড়কাকের মুখেও এখন তার নাম।
তো জিবরান ম্যাজিক জানতো। আর আমি কোনো ম্যাজিক জানতাম না বলে আমার আঁকা নয়টা দাঁড়কাকের জীবন দিতে পারলাম না।
একদিন আরো কয়েকবছর পর বিকেলবেলা জিবরানকে দেখলাম একটা সূর্যমন্দিরের মাটির দেয়ালে কয়লা ঘষে ঘষে একটা নারীর মুখ আঁকছে। মুখের পেছনে ছায়ার মতো একটা নেকড়ের মুখ। আমি গিয়ে তার পেছনে দাঁড়ালাম। তার নগ্ন পিঠে আমি দুই ইঞ্চি একটা জন্মদাগ দেখতে পেলাম। দাগটা এতোই সুন্দর যে আমার ছুঁতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু ছুঁলাম না। আর যেহেতু আমার পেছনে সূর্য ছিলো সেহেতু আমার একটা দীর্ঘ ছায়া তার আঁকা ছবির ওপর পড়লো। সে ঘুরে দাঁড়ালো। ততক্ষণে তার ছবি আঁকাও শেষ। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি সেই ছবির দিকে। এত মায়া আমার মা ছাড়া আর কারো মুখে দেখিনি। জিবরান আমাকে দেখে হাসলো। সে হাসি তার চোখেও ছড়ালো। আমি বললাম, ‘কার ছবি?’
জিবরান বললো, ‘আমার মা?’
‘পেছনে নেকড়ের মুখ কেনো?’
জিবরান আমার এই কথার উত্তর না দিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসলো। আমি বললাম, ‘তোমার মায়ের নাম কী?’
‘কামিলা।’
‘কামিলা মানে কী?’
‘কামিলা মানে নিখুঁত।’ বলে জিবারান আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোর মায়ের নাম কী?’
‘লায়লা।’
‘লায়লা মানে কী?’
আমি বললাম, ‘লায়লা মানে রাত্রি। আমার রাত্রি মা।’
‘তোর মা আর আমার মা দুজনের নামের শেষেই ‘লা’। ‘লা’ মানে নাই, লা ইলাহা হাহাহাহাহা...। লা লা লা লা লা..., হি হি হি হি হি...।’
‘হাসছো কেনো?’
‘তোর মা-ও নাই, আমার মা-ও নাই। মজা, না? চল যাই, সমুদ্রে যাই।’
আমি আর জিবরান হাত ধরে সমুদ্রের দিকে গেলাম। সৈকতের বালিতে আমি আমার রাত্রি মায়ের মুখ আঁকলাম। পরক্ষণেই একটা ঢেউ এসে মুছে নিয়ে গেলো। জিবরান বললো, ‘তোর মা কি সমুদ্রের সঙ্গে চলে গেছে?’
আমি মাথা নাড়লাম। জিবরান সহসা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে চুমো খেলো। তারপর ছেড়ে দিলো। সেই মুহূর্তটি অবস্মরণীয় হয়ে গেলো। আর আমি সমুদ্রের ফেনায় বেলপাতার ঘ্রাণ পেলাম। আমি বললাম, ‘বেলপাতার ঘ্রাণ সুবজ।’ আর জিবরানের চোখের হাসিতে লেগে গেলো সেই ঘ্রাণ।

(খসড়া)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ১১:০৫
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

» গাঁও গেরামের ছবি (মোবাইলগ্রাফী-৩৬)

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৩২



ঘাসের উপর প্রজাপতির ছবি তুলতে গিয়ে, পিপড়েদের কবলে পড়েছিলাম। ঠিকমত ক্লিক দিতে পারছিলাম না তাই ঠাঁয় বসে ছিলাম হঠাৎ কুট কুট কামড় টের পেয়ে তাকিয়ে দেখি পা আমার লালে লাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

রফিক ভাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৪২



আমার বাসার সামনেই ফেনী ফার্মেসী।
ফার্মেসীর মালিক রফিক ভাই। রফিক ভাই আমার বন্ধুর মতোন। তবে তার বয়স আমার চেয়ে বেশী। আমি প্রায়ই ফেনী ফার্মেসীতে আড্ডা দেই। রফিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃষ্নচ্ছায়ায় স্বপ্নের অমনিবাস (অবরোহ)

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৫২

আলোকিত আঁধার এক
ঘোর কৃষ্নচ্ছায়ায় গ্রাস করে স্বপ্নের অমনিবাস
আত্মমর্যদা বাক স্বাধীনতা
চিরন্তন মুক্তির স্বপ্ন মূখ থুবড়ে, চারিদিকে শকুনির উল্লাস!

ভেজানো পাটা’শের মতো খুলে খুলে আসে মূল্যবোধ
নীতি নৈতিকতা, পরম্পরা- হারিয়ে যায়
হাওয়াই মিঠাই স্বাদে! দুর্বৃত্তায়নের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদী অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টে কারা আক্রমণ চালায়েছে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:০৩



গত শনিবার (সেপ্টেম্বর, ১৪) সৌদী আরবের আবকিক অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টে ড্রোন-গাইডেড মিসাইল আক্রমণ চালিয়ে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে; এতে সৌদীর দৈনিক তেল উদপাদন ক্ষমতা অর্ধেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ২:০৭



ছবি: যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে টয়োটা যুদ্ধের সময়ে একটি টয়োটা পিকআপ থেকে চাদীয় সৈন্যরা

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ ছিল ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে লিবীয় ও চাদীয় বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত কয়েক দফা বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×