ট্রিনিটিতে আমার রিসার্চগ্রুপ জার্মান ডমিনেটেড। আমার সুপারভাইজার জার্মান, গ্রুপের সবাইকে মেজাজ দিয়ে তটস্থ করে রাখা জেনী জার্মান, প্রতিদিন যার বকবক শুনে মাথা ধরে যায়, সেই সেরেনাও জার্মান। এছাড়া সুবোধ বালক প্রজাতির কিছু ছেলে রয়েছে যারা কাজ ছাড়া কিছু বোঝে না। জাতে তারাও জার্মান। সুবোধ - রাগী সবাই আজ একটা বিষয়ে মেতে উঠেছিল, তা হলো জার্মানী বনাম ক্রোয়েশিয়ার খেলা।
খেলা শুরু হতে হতে স্থানীয় সময় পাঁচটা। ফলে অনেকে রাস্তায় বেশ খানিকটা খেলা মিস হবে বলে, যার যার কম্পিউটার থেকেই স্ট্রিমিং করে দেখছিল। কেউ কেউ লাইভ স্কোর দেখে সন্তুষ্ট থাকছিল। খেলার তখন ১৮ মিনিট গিয়েছে। একটা জার্মান গোল অফসাইডের ফাঁদে পড়ে বাতিল হয়েছে মাত্র। সেরেনা চেয়ার থেকে উঠে এসে রিসার্চ রুমের মাঝে দাড়িয়ে ঘোষনা দিল, "গাইজ! আই হ্যাভ টু টেক এ ফ্লাইট টুমোরো।" এক ছেলে কারন জানতে চাইলো। সেরেনা ব্যাখ্যা করে বলল, যেহেতু জার্মান খেলোয়াড়রা খেলা ভুলে গিয়েছে, অতএব ওকেই দলের হাল ধরতে হবে। আমরা হাসতে শুরু করেছি তখন। আমার সুপারভাইজার স্টিফান, যার রুম আমাদের রুমের সাথেই লাগোয়া, বের হয়ে এসে যোগ দিয়েছে ততক্ষনে আমাদের সাথে।
ঘড়িতে তখন ৫:২৪। গল্প তখনও চলছে, খেলা থেকে সাময়িক ভাবে সরে গিয়েছে সবার মন। আমি যথা সম্ভব সিরিয়াসনেস গলায় এনে সেরেনাকে বললাম, "আই থিংক, ইউ স্যুড টেক ইট রাইট নাউ"। সেরেনা আমার দিকে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। আমি বললাম, ইটস্ ওয়ান - নিল, এগেইন্স্ট জার্মানী! সেরেনা প্রথমে তিনটা লাফ দিল। তার পর জার্মান এবং ইংলিশ মিশিয়ে জাংলিশীয় যে অর্তনাদটা করলো তার থেকে ফিল্টারিং করে একটা ইংলিশ বাক্য উদ্ধার করতে পারলাম - আই উইল ফা* দেম! 'দেম' বলতে কাকে বোঝালো, জার্মানী নাকি ক্রোয়েশিয়া, মাথায় ঢুকলো না। মনে মনে বললাম, চাইলেও ওটা তুমি করতে পারবে না। অঙ্গসাংস্থনিক একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে!
সেরেনার দুঃখ বেড়েছে বই কমেনি। ৬২ মিনিটে আরেকটা গোল খেয়ে জার্মানীর ইটালী হবার দশা হয়েছিল। ভাগ্য ভালো শেষ দিকে এসে একটা গোল সোধ করতে পেরেছিল। তবে হার, হারই।
গতকাল একটা ব্লগে মন্তব্য করেছিলাম আজ জার্মানদের ধরা খাবার দিন। মন্তব্য করেছিলাম বটে, তবে এভাবে ধরা খাবে কল্পনাও করিনি। তবে কি জায়ান্টদের দিন শেষ? ইউরোপে ফুটবল জায়ান্ট বলতে প্রধানত জার্মানী, ইটালী, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডকে বোঝানো হয়। বলাইবাহুল্য এখন পর্যন্ত যতগুলো বিশ্বকাপ ইউরোপে গিয়েছে তার সবগুলোই এরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কিন্তু এবারের ইউরোর চিত্রটা বেশ ভিন্ন। ইংল্যান্ড আসতেই পারেনি মূল পর্বে। ফ্রান্স ড্র করে নড়বড়ে অবস্থায় আছে। বর্তমান বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ান ইটালীর অবস্থা যতটানা করুন তার থেকে বেশি হাস্যকর। বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ান খেতাবটাই যেন এখন ওদের জন্য প্রহসন হয়ে দাড়িয়েছে। আর আজ কাঁদলো সেরেনার জার্মানী।
মুদ্রার অপর পিঠে যে দলগুলো রয়েছে তাদের জায়ান্ট কিলারই ডাকা হতো বেশি। পর্তুগাল, হল্যান্ড বা স্পেনকে বড়জোড় ডার্ক-হর্স বলা হতো। কিন্তু বাস্তবতা মোবাইল কোম্পানীর সেই বিজ্ঞাপনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে বার বার, "সেই দিন কি আর আছে? দিন বদলাইছে না!" আসুন আমরাও নুতন দিনের সঙ্গী হই। পর্তুগাল, হল্যান্ড বা স্পেন; যেই জিতুক এবারের ইউরো, জয় যেন হয় নুতন দিনের।
১২ জুন ২০০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

