১ম পর্ব - Click This Link
নুতন বছর নুতন ভাবে শুরু হলো। সব কিছু কেমন যেন আচেনা চেনা। নিজেকে বেশ বড় বড় লাগছিল। আমরা আর দুদিন পরই বের হচ্ছি আমাদের প্রথম মিশনে। তামিদা মাঝে মাঝে এসে খোঁজ নিয়ে যেত আমার প্রিপারেশনের ব্যাপারে। একবার এসে বলে গেল উত্তরবঙ্গে এখন ভীষন শীত। গরম কাপড় যেন বেশি করে নেই। গত কিছুদিন দেখলাম ওর লাইব্রেরীতে বসে কিছু দেশী বিদেশী কেমিস্ট্রি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আমি আর বেশি ঘাটাইনি। কি দরকার। সময় হলে সবই জানতে পারবো।
তবে বুকের ভেতর একটা দুরু দুরু ভাব থেকেই যাচ্ছে। বারবার মনে একটা খুব বাজে আশঙ্কা উকি দিচ্ছিল। তামিমদা পারবেতো শেষ পর্যন্ত? পারবেতো এই অদ্ভুত কেস সল্ভ করতে?
আমার ক্লাস শুরু হতে আনেক দেরী এখনও। তামিমদারও সেমিস্টার শুরু হবে জানুয়ারীর শেষের দিকে। বেশ বড় ছুটি। রুদ্ধ শ্বাসে আপেক্ষা করছি আমাদের মিশনের জন্য। তামিমদার এবং একই সাথে আমারও জীবনের প্রথম কেস। আবার ভয়টা বুকের মধ্যে এসে হানা দিচ্ছে।
* * *
আমরা রওনা হলাম তিন তারিখ রাতে। কমলাপুর স্টেশনে আসলাম অনেক দিন পর। মনে পড়ে চার-পাঁচ বছর আগে একবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম সবাই মিলে। সেবারও তামিমদা ছিল এবারও আছে। পার্থক্য, এবার আমরা শুধু দুজন। সম্পূর্ন অজানার পথে। জানি না সামনে কি আছে। তবুও যাচ্ছি। এই যাওয়ার মাঝেই এডভেঞ্চার, আর সেখানেইতো জীবনের বেঁচে থাকার স্বার্থকতা।
কোন এক বিচিত্র কারনে ট্রেনে উঠলেই আমি ঘুমিয়ে যাই। ট্রেনের সিটে শরীরর এলিয়ে দিলেই দুচোখ ভরে আসে ঘুমে। তামিমদার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা। ট্রেনে ওর ঘুম পায় না। মাথার উপরে লাইট জ্বলছে। কতসময় এই লাইট জ্বলবে আল্লাহই জানেন। চোখের উপরে একটা কাপড় দিয়ে ঘুমোনোর ব্যাবস্থা করলাম। তামিমদার জন্য লাইটটা শাপে বর হয়েছে। সে শীর্ষেন্দুর মানবজমিন উপন্যাসটা বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। একবার দেখে মনে হলো উপন্যাস নয়, যেন কোন আপনজনের লেখা চিঠি বা এরকম কিছু পড়ছে। উপন্যাসের প্রতিটা অংশ ওকে বিমোহিত করছে। আমি মনে মনে হাসলাম। এই উপন্যাসটাই আসলে এরকম, চরিত্রগুলোকে খুব, খুব বেশি আপন মনে হয়। আমিই তামিমদাকে বলেছিলাম পড়ে দেখতে।
রাতে ট্রেন বদলাতে হলো। তা ছাড়া আর কোন সমস্যা হয়নি। সারা রাত লাইটগুলো টানা জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল। যাত্রীরা একটু রাগারাগি করেছিল। কাজ হয়নি। তামিমদা মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে।
সকালে রংপুর স্টেশনে নামতেই দেখি আশরাফ সাহেব এসে দাড়িয়ে আছেন। একটু হেসে এগিয়ে এলো। সাথে যে দুজনকে দেখলাম তাতে বুঝলাম জমিদারী গিয়েছে বহু বহু দিন আগে, কিন্তু সেই ঐতিহ্য যায়নি আজও। দুজন বেশ বড় পালোয়ান ধরনের লোক, হাতে মোটা দুটো লাঠি। এগিয়ে এসে আমাদের মালামালগুলো তুলে নিল। এর পর পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। স্টেশনের বাহিরে সবুজ রঙের একটা রাশিয়ান জিপ দাড়িয়ে ছিল। আশরাফ সাহেবকে বের হয়ে আসতে দেখে ড্রায়ভার গাড়ি এগিয়ে আনলো।
পুরানো গাড়ি। কিন্তু বেশ মজবুত এবং এখনও বেশ সার্ভিস দেয়ার ক্ষমতা রাখে। শহরের রাস্তা ছেড়ে যখন আমরা একটু গ্রাম্য পথে চলে এলাম, তখন বুঝতে পারলাম এই গাড়ি আসলে কতটা মজবুত এখনও। উঁচু নিচু পথগুলো অনায়াসে পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলছিল গাড়ি।
আশরাফ সাহেবকে প্রথম দিন দেখে মনে হয়েছিল খুব চুপচাপ। আজ মনে হয় জড়তা কাটিয়ে উঠেছেন। পুরো রাস্তায় বিভিন্ন গল্প শোনালেন আমাদের। তামিমদাও মন দিয়ে শুনছিল। হয়তো কোন একটা গল্প পরে ক্লু নিয়ে আসতে পারে।
বাড়িটা একদমই নিরব ছিল। বৃষ্টি ভাবী আসার পর সব কেমন পাল্টে গেছে”। বলল আশরাফ সাহেব।
তামিমদা বলল, ”বৃষ্টি ভাবী মানেতো ইহসান সাহেবের ছেলের বৌ?”
হ্যা। খুবই ভালো মানুষ। এতবড় ঘরের বৌ কিন্তু কোন অহঙ্কার নেই। একটু ছেলে মানুষও।
কি রকম ? তামিমদা জানতে চাইলো।
কিছুদিন আগে পুতুল নাচ দেখার বায়না ধরলো। এখন কি আর সেই দিন আছে। কে বোঝাবে তাকে। সে দেখবেই। ইহসান সাহেবও বৌমার ইচ্ছে পূরন করবেনই। শেষ পর্যন্ত আনেক দূর থেকে একটা পুতুল নাচ দেখানোর দল এসে খেলা দেখিয়ে গেলো। বড় করে স্টেজ করে সেখানে দেখালো। পুরো গ্রামের মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছিল। ইহসান সাহেবও চাচ্ছেন দূরত্ব কমাতে। তাই নাচের পর খাওয়া দাওয়াও হয়েছিল। গ্রামের মানুষও অনেক খুশি হয়েছে।
আশরাফ সাহেব কথা বলেই যেতে লাগলেন। মানুষটাকে আজকে কথায় পেয়েছে। তামিমদা একসময় বাহিরে তাকালো। এক মনে কি যেন ভাবছিল। আমিও ভাবছিলাম। এই যে যাচ্ছি, এই যাওয়ার শেষটা কেমন হবে? ফেরার সময় কি আমরা পারবো একটা সুন্দর ও সফল সমাধান দিয়ে আসতে? অনেক অনেক ভয়, আর প্রশ্ন মনের মাঝে। ইশ, তামিমদার মনটা যদি দেখতে পারতাম! ওর কি ভয় লাগে না?
* * *
আমরা ঘন্টাখানেকের মধ্যে এমন একটা জায়গায় চলে আসলাম যেটাকে দেখলে মনে হয় যেন হঠাৎ করে অন্তত পঞ্চাশ ষাট বছর পিছিয়ে চলে এসেছি। বেশ বড় একটা গ্রাম, চার দিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা পুরোটা। সেই প্রাচীরের ভেতর গেটের কাছেই একটা বড় বাড়ি। বুঝতে বাকি থাকে না কেন একে ফটক বাড়ি বলা হয়।
গাড়ি ফটক বাড়ির ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই একটা ভিড় নজরে এলো। মানুষ গম গম করছে।
তামিমদা আশরাফ সাহেবকে বলল, “কোন কাপড় বা এরকম কিছু বিতরনের ব্যাপার নাকি ?”
আমতা আমতা করের আশরাফ সাহেব বলল, “না, না। সেরকম কিছুর পরিকল্পনাতো ছিল না। থাকলে আমি জানতাম।”
তা হলে এত ভীড় কেন?
ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। সকালে আমি যখন আপনাদের আনতে যাই তখনতো সব কিছু চুপ চাপই ছিল। সবাই ঘুমাচ্ছিল তখন।
গাড়ি যখন গাড়িবারান্দায় ঢুকলো তখনই দেখতে পেলাম দুজন পুলিশ কনস্টেবল দাড়িয়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠলো। আবার কি চুরি হলো? নাকি আরও বড় কিছু।
আশরাফ সাহেবকেও বেশ নার্ভাস দেখালো। কি যে হয়েছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের গাড়িতে বসিয়ে রেখে তিনি নেমে গেলেন। বলে গেল একটু খোঁজ নিয়েই ফিরে আসছেন। আমরা গাড়িতে বসে দেখতে লাগলাম। চার দিকে মানুষের চোখে চাঁপা আতঙ্ক। কেন, বুঝলাম না। ভেতর বাড়িতে কিছুটা চিৎকার বা কান্নার মতও হয়তো শুনলাম। তামিমদার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখেও ঘাবড়ে যাওয়া একটা চাহনি।
অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই আশরাফ সাহেব ফিরে এলেন। চোখে কেমন যেন একটা অতঙ্ক। খুব আস্তে করে তামিমদাকে বলল, “ইহসান সাহেবের ছোট ছেলে, হাবিব, কাল রাতে তার নিজের রুমে খুন হয়েছে।” (চলবে)
৩য় পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০০৮ রাত ৩:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


