২য় পর্ব - Click This Link
ঠিক কি করবো বুঝে উঠতে পারলাম না। ব্যাপারটা এখন আর সামান্য চুরিতে নেই। আনেক খানি গড়িয়েছে। খুন। ভাবতেই গায়ে কাটা দেয়। আমরা এখন বসে আছি ফটক বাড়ির বসার ঘরে। থমথম করছে পরিবেশ। বেশ মোটাসোটা একজন অফিসার এসে কয়েকবার ঘুরে গেছে। কাধের দিকে তাকিয়ে তামিমদা আস্তে করে বলল “মনে হয় স্থানীয় থানার ওসি।”
বেশ খানিকক্ষন বসে ছিলাম। তামিমদা এক সময় উঠে রুমের ভেতরের পেইন্টিংস গুলো দেখতে লাগলো। আসলে আমিও জানি এটা পেইন্টিংস দেখার সময় না। কিন্তু এটা যে আসলে কি করার সময় সেটাও আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। তামিমদা হয়তো একটু রিলাক্সড হবার জন্যই পেইন্টিংস গুলো দেখছিল।
একজন বেশ শক্তিমান পুরুষের পেইন্টিং আছে। বন্দুক হাতে তোলা। চোয়ালের গড়ন দেখেই মেজাজ আঁচ করা যায়। তামিমদা বলল, মনে হয় ইহসান সাহেবের বাবা, ইমাম চৌধুরী।
আমরা যখন প্রেইন্টিংস গুলো দেখছিলাম ঠিক সে সময় যে মানুষটা ঘরে ঢুকলো তাকে দেখলে কারো বলে দিতে হবেনা তিনি কে। লম্বায় ছয় ফুটের কয়েক ইঞ্চি বেশিই হবেন। শরীর আনেক চওড়া কিন্ত মেদ নেই। মুখে বয়সের ভাবটা স্পষ্ট প্রকাশ পেলেও তাতে বরং আভিজাত্য আর গাম্ভির্যই বেড়েছে। ক্লান্তি নয়। চোখগুলো বেশ বড় এবং কিছুটা কঠিন। তার ভেতরে শোকের ঝড় বইছে কিনা জানিনা কিন্তু বাহিরে সম্পূর্ন কঠিন এক ব্যাক্তিত্ব। কারো বলে দিতে আর হয় না, ইনিই ইহসান চৌধুরী।
তামিমদা উঠে হাত মেলালো। ভদ্রলোক একটু গম্ভির ভাবে তামিমদার দিকে তাকালো। হয়তো দীর্ঘ্য অভিঙ্গতা থেকে মেপে নিল ওকে দিয়ে কাজ হবে কিনা। তার পর বলল, “বসুন আপনারা।”
তামিমদা একটু বিনয়ী হয়ে বলল, আমাকে তুমি করে বললে আমার জন্য একটু ভালো হয়।
ইহসান সাহেব কিছু বললেন না। কিছু সময় সিলিং এর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে বললেন, “কোনও দিনও আমি পুলিশকে বিশ্বাস করিনি। তাদের উপর আমার আস্থা নেই। আমি ওসি সাহেবকে বলে দেব পুলিশের পাশাপাশি তুমিও কাজ করবে।”
এর পর একটু থেমে, যেন কোন এক বাবার পক্ষ থেকে বললেন, “আমার ছেলেকেতো আর ফিরে পাবো না। কিন্তু আমি তাদের বিচার চাই যারা আমার উপরের প্রতিশোধ আমার নিরপরাধ ছেলের উপর নিয়েছে।”
ইহসান সাহেবের চোখ দুটো কঠিন থেকে নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো। কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। সাথে সাথে নিজে সামলে নিয়ে বললেন, “ফিল ফ্রি টু বি হিয়ার। আমি লোক দিয়ে দিচ্ছি, উপরে ইনসিডেন্ট প্লেসটা দেখে এসো।”
আমরা যখন রুম থেকে বের হচ্ছি, তখন ওসি সাহেব তামিমদার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে রুমে ঢুকলো। ভেতর থেকে শুনেতে পেলাম ওসি সাহেব খুব উত্তেজিত ভাবে বলল, “ইহসান সাহেব, আপনারা কেন এসব শখের গোয়েন্দাদের বিশ্বাস করেন? আমারা ট্রেনিং প্রাপ্ত পুলিশ যা করতে পারবো এরা কি কোন দিনও তা করতে পারবে? কেন আপনি একে কেসের তদন্ত করার অনুমতি দিলেন?”
ইহসান সাহেব খুব গম্ভিরভাবে বললেন, “আপনার যদি আপত্তি থাকে তবে বলেদিন। আমি বিকেলের ভেতর উপর থেকে অর্ডার আনিয়ে আপনার হাতে দিয়ে দেব। কি, আছে আপত্তি?”
ওসি সাহেবের গলা দিয়ে কোন স্বর বের হলো না। শুধু বিড় বিড় করে কি যেন বলল। তামিমদা এগিয়ে গিয়েছিল খানিকটা, আমাকে ইশারায় চলে আসতে বলল।
আমার নার্ভ যে এত শক্ত এটা আমিও জানতাম না। উপরে যে দৃশ্য দেখলাম তার চেয়ে সাধারন দৃশ্য ফিল্মে দেখতে আমার অস্বস্তি লাগতো। অথচ এখানে কঠিন বাস্তবতাকে কত সহজে সহ্য করে ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম, আমার স্নায়ু কি তবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। নাকি এডভেঞ্চারের জন্য স্নায়ু আগেই প্রস্তুত হয়ে ছিল?
উপরের তলায় অনেকগুলো ঘর। একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটায় থাকতো হাবিব। সে ঘরের সামনে এখনও পুলিশ পাহারায়। ইহসান সাহেব একজনকে পাঠিয়ে ছিলেন আমাদের সাথে। সে পাহারারত কনেস্টবলকে কিছু একটা কানে কানে বলল। সাথে সাথে আমাদের জন্য দরজা খুলে দিল। ভেতরের দৃশ্য বর্ননা করার সাধ্য আমার নেই। শুধু এতটুকু বলছি, সে এক বিভৎস, ভয়াবহ হত্যাকান্ড। লাশ পড়ে আছে বিছানার উপর। বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকা। বুকে ছুরি মারা হয়েছিল। বিশাল ক্ষত। সহজে অনুমান করা যায় ছুরিটা ছিল অনেক বড়। লাশের শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে দেয়ালের কিনারা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। লাশের মুখে খানিকটা চাদরও ঢুকানো ছিল। মনে হয় চিৎকার যাতে করতে না পারে সে জন্য। কোথাও ছুরিটা খুজে পাওয়া যায়নি।
হত্যাকারী এসেছিল রুমের সাথেই লাগানো একটা বারান্দা দিয়ে। আমরা গিয়ে ভালো করে বারান্দাটা দেখলাম। এটা একটা বড় কমন বারান্দা। সবগুলো রুমের সাথে সংযোগ দেয়া আছে। যে কোন রুম থেকেও কেউ আসতে পারে। বিচিত্র না। আবার পাইপ বেয়ে বা মই লাগিয়েও উঠে আসতে পারে। তবে যেই আসুক, সে খুব চতুর ভাবে করেছে সব কিছু। ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়েছে সব জায়গার। কিন্তু আসল মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো এত সুন্দর করে সাজানো সব কিছুর মাঝে একটা বড় খুঁত রেখে গেছে খুনি। দেখালের যে অংশটায় রক্তের ধারা গিয়ে ঠেকেছে, সেখানে সে ভুল করে পা দিয়ে ফেলেছিল। সেই রক্তে স্পষ্ট ভাবে তার পায়ের ছাপ ফুটে আছে। জুতা পড়া পা। জুতাটার সাইজও ফুটে আছে - আট। তামিমদা খুব আস্তে করে বলল, “অশ্চর্য।” আমিও অবাক হলাম। এত সাবধানতার পরও এটা কি করে হলো? তাছাড়া রুমের ঐ শেষ প্রান্তে যাবার দরকারই বা কি ছিল? কোন আসবাবও নেই সেখানে।
তামিমদা পুরো রুমটা খুব সুক্ষ ভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলো। হাবিবের শরীরে খুনের চিহ্নটা খুব ভালো ভাবে দেখে আমাকে ডাকলো। বলল, “দেখতো কোন বিশেষত্ব আছে কি না?”
আমিও ভালো ভাবে দেখলাম কিন্তু তেমন কিছু নজরে পড়ল না। শুধ বুকের বাঁ দিকে ছুরি দিয়ে করা ক্ষতটা খানিকটা ডান দিকে বাঁকা। এমনও হতে পারে ছুরি ঢোকানোর পর হাতের চাপে ওরকম হয়েছে। নিশ্চিত ভাবে কিছুই বলা যায় না। আমার মতামত তামিমদাকে বললাম। ও বেশ একটু হেসে বলল, “তোর মাথা দেখছি বেশ ভালো কাজ করছে!”
নিচে নেমে ইহসান সাহেবের বড় ছেলে একরাম চৌধুরীর সাথে কথা হলো। ইনিও তার বাবার মত। বেশ লম্বা এবং গম্ভির। তার কাছ থেকে শুনলাম পুরো ব্যাপারটা। কাল রাত থেকেই হাবিব কেমন যেন ছটফট করছিল। তার সাথে যখন রাত এগারোটার দিকে কথা হয় তখন তিনি সেটা লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু গুরুত্ব দেননি। প্রতিদিন রাতে হাবিব এক গ্লাস দুধ খায়। কাল রাতেও বাড়ির কাজের ছেলে সাইফুল দুধের গ্লাস নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় ঢুকতে পারেনি। সাইফুল দরজায় ধাক্কা দিলে ভেতর থেকে হাবিব জানায় সে দুধ খাবে না, তবে দরজা খোলেনি। এ ঘটনা রাত সাড়ে এগারোটার দিকের। এর পর আর হাবিবের ঘরের দিকে কেউ যায়নি। প্রতিদিনের মত আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাড়ান একরাম সাহেব। তিনি তখন দেখতে পান হাবিব এর বারান্দা সংলগ্ন দরজা হাট হয়ে খোলা। কৌতুহলী হয়ে উকি দিলে তিনি হত্যার ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। তখনও রুমের প্রধাম দরজা বন্ধই ছিল। এর পর পুলিশকে খবর দেয়া সহ সবাইকে তিনিই জানিয়েছেন।
হাবিব সম্পর্কে আরও টুকটাক তথ্য পেলাম বাগানের মালি ওসমান মিঞার কাছ থেকে, সাইফুলের কাছ থেকে এবং অন্যন্য লোক যারা বাড়িতে কাজ করে তাদের কাছ থেকে। ওসমান মিঞা জানান বাড়ির পেছনের দিকে একটা লাইব্রেরী ঘর আছে। সেখানেই হাবিব থাকতো বেশি সময়। সেই ঘরের চাবিও হাবিবের কাছেই থাকতো। ঘরটা ধুলো ময়লায় একাকার হয়েছিল। হাবিবই নিজ উদ্যোগে সেটাকে পরিষ্কার করিয়েছিল। তাছাড়া সে থাকতোও বাড়ির একেবারে শেষ প্রান্তে। নিজে থেকেই সে ওই রুমটা বেছে নিয়েছিল। ছেলে হিসেবে সে ছিল খুবই চুপচাপ এবং ভদ্র।
সাইফুলের কাছ থেকে একটা বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পেলাম আমারা। হাবিব নাকি মাঝে মাঝে গ্রামের ভেতরের দিকে একটা বাঁশ বাগান আছে। সেখানে যেত। কেন যেত সেটা কেউই বলতে পারেনি। এমনকি এই তথ্যটা সাইফুল ছাড়া আর কারো জানা ছিলনা। সাইফুলের উপর কতটা বিশ্বাস করা যায় সেটা সময়ই বলে দেবে।
ইহসান সাহেবের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কথা হলো না আর সেদিন। ইহসান সাহেবের স্ত্রী খুবই ভেঙ্গে পড়েছেন। ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। একরাম সাহেবের স্ত্রী লাশ দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়েছেন। তিনিও কথা বলতে পারছেন না। তাই আমরা আর বেশি চাপাচাপি করিনি কথা বলার জন্য। এত বড় একটা দুর্ঘটনা। একটু কাটিয়ে ওঠার সময় দেয়া উচিত। ওসি সাহেবের সাথে একবার চোখাচোখী হয়েছিল। বেশ বিরক্তি দেখতে পেলাম দু চোখে।
* * *
আমাদের থাকতে দেয়া হলো দোতালায়, হাবিব এর রুমের দুটা রুম পাশে। আগেই বলেছি, হাবিব এর রুমটা বাড়ির একেবারে শেষ প্রান্তে। আমাদেরটা খানিকটা মাঝামাঝিই। বেশ বড় রুম। পরিপাটি করে গোছানো। দেখেই বোঝা যায় আমাদের আসার কথা ছিল বলেই এই রুমটা গুছিয়ে রাখা হয়েছিল।
রুমে ব্যাগগুলো রেখে আমি বিছানায় বসলাম। একটা গুমোট আবহাওয়া আছে রুমটার ভেতর। এটা কি দরজা জানালা বন্ধ থাকার জন্য নাকি হাবিবের রুমের প্রায় পাশের রুম বলে, ঠিক বুঝতে পারলাম না। সারা রাত ঘুমানোর পরও আমার ক্লান্ত লাগছিল খুব। মনে হচ্ছিল সব কিছু ছেড়ে ঢাকা চলে যাই। এত রক্ত, এত হিংস্রতা আর ভালো লাগে না। একজন মানুষ তারই মত আরেকজনকে কি করে হত্যা করে? মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রানী কি স্বগোত্রীয় কাউকে হত্যা করে? করে না মনে হয়। তা হলে মানুষ কেন করে? সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। এই কি সেই সেরার নমুনা? মানুষের রক্তে মানুষ আজ আনন্দ পায়। আমার গা শিরশির করে উঠলো।
তামিমদা উঠে গিয়ে বারান্দা সংলগ্ন দরজাটা খুলে দিল। সাথে সাথে খানিকটা দমকা বাতাসে রুমটা ভরে গেলো। অল্প কিছু সময়ের জন্য মনে হলো এখানে আমরা কোন কাজে না, বেড়াতে এসেছি। আহ, কি আরাম। আমি ঠান্ডা বাতাসের পরশে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। (চলবে)
৪র্থ পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০০৮ রাত ৩:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



