somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গুপ্তঘাতক - ৪ (গোয়েন্দা উপন্যাস)

২৯ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৫:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৩য় পর্ব - Click This Link

কত সময় ঘুমিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই। ঘড়িও দেখিনি। দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে বোঝা যাচ্ছিল। গরম লাগায় ঘুম ভেঙ্গেছে। উঠে বসলাম বিছানায়। মাথার উপর ফ্যানটা স্থির হয়ে আছে। বুঝলাম, ইলেক্ট্রিসিটি নেই। রুমে তামিমদাও ছিল না। বেরিয়ে বারান্দায় দাড়ালাম। শীতকালে গরম ততটা লাগার কথাও না, তবুও লাগছে কারন একদম বাতাস বন্ধ হয়ে আছে। সকালের সেই চমৎকার পরিবেশ কোথায় হারিয়ে গিয়েছে! গাছের ডালগুলোতে পাখিরা এলোমেলা খেলা করছে। এক মনে তাকিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ তামিমদার ডাকে বাস্তবে ফিরে এলাম। তামিমদা বলল, “আকাশ, চল খেয়ে আসি। মরা-বাড়ি, এখানে রান্না হবে না। সামনের একটা বাড়িতে রান্নার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। পেট ভরে খাস, তা না হলে ক্ষিদে লাগলে কিন্তু খাওয়া পাবি না।”
যেতে ইচ্ছে করছিল না। একটু গরম লাগছিল বটে, কিন্তু তার পরও। পাখি, সবুজ বনানী, কি ভীষন সুন্দর।
তামিমদা ডাক দিল আবার। “কি রে, আস।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেলাম খেতে।

আমাদের খাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়েছিল সামনের মজুমদার বাড়িতে। এদের অবস্থা পড়তির দিকে। এক কালে হয়তো প্রতিপত্তি ছিল। কিন্তু আজ সে সব অতীত। আসবাবগুলো এ্যন্টিক জিনিসের মত লাগছিল। বেশ পুরোনো কিন্তু মজবুত। বাড়ির মালিক মালেক মজুমদার নিজে দাড়িয়ে থেকে আমাদের খাওয়া পরিবেশন করছিলেন। আমাদের সাথে আছে আশরাফ সাহেব। সকালে আসার পর আশরাফ সাহেবকে আর দেখিনি। এই এখন আবার দেখলাম। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের দেখাশোনার ভার তাকেই দেয়া হয়েছে। আশরাফ সাহেব মজুমদার সাহেবের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদের উদ্দেশ্যও খুলে বললেন। এতটা হয়তো তামিমদা চাচ্ছিল না। তবুও বলে যখন ফেলেছেন কি আর করা।
খেতে খেতে আশরাফ সাহেব বললেন, “ছেলে হিসেবে হাবিব খুবই ভালো ছিল। ভদ্র ব্যাবহার। খুব বেশি মিশতো না, তবুও এলাকায় যাদের সাথে মিশেছিল, একটা ভালো সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল।”
মজুমদার সাহেব বললেন, “আমাদের বাসাতেও মাঝে মাঝে আসতো। ছেলেটার সবচেয়ে ভালো গুন ছিল তার নিরহঙ্কার ব্যাবহার। কল্পনাই করা যায় না চৌধুরী পরিবারের ছেলে।”
তামিমদা বলল, “তার কি কোন শত্রু ছিল এখানে?”
“শত্রু কে থাকবে? সে তো কারো সাতে-পাঁচেই ছিল না।” কিছুটা যেন বিস্ময়ই প্রকাশ পেলো তাঁর কন্ঠে, “মাঝে মাঝে আমাদের এখানেও আসতো, আমার ছেলে রাজু এবং মেয়ে কনার সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। ওরা হয়তো আরও ভালো ভাবে বলতে পারবে।”
তামিমদা হঠাৎ করে প্রসঙ্গ একেবারেই পাল্টে ফেলে বলল, “খাওয়া খুবই ভালো হয়েছে। কে রেধেছে?”
মজুমদার সাহেব একটু লজ্জিত হয়ে বললেন, “আমার মেয়ে।”
তাকে ধন্যবাদ দেবেন আমার পক্ষ থেকে।
মজুমদার সাহেব উঁচু গলায় ডাকলো, “কনা, এই কনা।”

ভেতর ঘর থেকে যে মানুষটা বের হয়ে এলো তাকে এক পলক দেখলে যেকোন মানুষ, আরও নির্দিষ্ট করে বললে পুরুষ মানুষ, সম্মোহিত হয়ে যাবে। ঢাকার মেয়েরা সুন্দর হয় দুটো কারনে প্রধানত; এক. অঢেল বিউটি পার্লার। সাজসজ্জার অভাব নেই। দুই. শহুরে তথাকথিত স্মার্টনেস কিম্বা ফাস্টনেস। এই মেয়ে এদুটো জিনিসের কোনটিই পায়নি, কিন্তু তার পরও এত সুন্দর, এত পবিত্র, তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ফর্সা মুখে ভ্র, চোখের পাপড়ি এত কালো যে এক অপূর্ব সাদা কালোর কম্পোজিশন তৈরী হয়েছে। কালো এবং ঘন চুল নদীর ঢেউ এর মত নেমে গেছে হাটু পর্যন্ত। হালকা সবুজ ও সাদার মিশ্রনে একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে। দেহের গড়ন পাতলা। চোখগুলো একটু ফোলা ফোলাই মনে হলো। আমার মনের ভুলও হতে পারে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে মাঝে মাঝে গ্রীক দেবী বলে ভ্রম হতে পারে।
তামিমদা খুব সহজ গলায় বলল, “আপনার রান্নার হাত খুবই ভালো। অনেকদিন এত সুন্দর ‘ন্যাচারাল’ খাওয়া খাইনি।”
কনা কি বলবেন ভেবে পেলেন না। তাই বোধহয় চুপ করে রইলেন। তামিমদা কাজের কথায় চলে আসলো খুব দ্রুত। বলল, “ইহসান সাহেবের ছেলে হাবিবের সাথেতো আপনার পরিচয় ছিল। ছেলে হিসেবে সে কেমন ছিল?”
এবার কথা বললেন তিনি। জলতরঙ্গের মত শব্দ করে কথা বলেন। একটু ধীরে, কিন্তু কেমন যেন একটা লয় আছে। বললেন, “মাঝে মাঝে আসতো। আমার ভাই রাজুর সাথেই বেশি মিশতো। আমার সাথেও কথা হতো। বেশ ভালো ছেলে। অন্তত অহঙ্কার জিনিসটা তার ছিল না। বন্ধুত্ব করতে পারতো খুব তাড়াতাড়ি।”
“তার সাথে আপনার শেষ দেখা হয় কবে?” তামিমদা জিজ্ঞেস করলো।
“কাল বিকেলে।” একটু অন্যমনোষ্ক হয়ে উত্তর দিল কনা।
তাকে কি তখন একটু অন্যরকম লাগছিল? নাকি অন্য দিনগুলোর মত স্বাভাবিক ছিল?
সেভাবে লক্ষ্য করিনি।
তার সাথে যখন কথা হতো, তখন কি কোন রকম বিপদ বা শত্রুতার কথা আপনাকে কখনও বলেছিল ?
না, সেরকম কিছু কখনও বলেনি। সেরকম থাকার সম্ভাবনাও নেই। সে একেবারে অন্যরকম ছেলে।
সম্ভাবনা নেই, এ কথা এখন আর বলার উপায় নেই। শত্রুতা ছিল বলেইতো তাকে নিজ কক্ষে গিয়ে হত্যা করা হলো।

তামিমদার কথায় রুমে একটা নিরবতা নেমে এলো। সবাই হয়তো একথাই ভাবছিল, যত ভালোই হোক, প্রাণ যখন তাকে দিতে হয়েছে আততায়ীর হাতে, তখন কোথাও একটা কিন্তু আছে বৈকি। তামিমদাই নিরবতা ভাঙ্গলো, “আপনার ভাই রাজু কি বাসায় আছেন?”
না। রাজু পরশুদিন শহরে আমার ফুফুর বাসায় গিয়েছে। এখনও ফেরেনি।
আচ্ছা। আমরা তাহলে এবার উঠি। রান্নার জন্য আবার ধন্যবাদ।

* * *

গ্রামের এই অংশের বাড়িগুলো সব একতলা এবং সারি সারি ভাবে সাজানো, একটা সরু রাস্তা বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে সোজা চলে গিয়েছে। মজুমদার বাড়ি থেকে বের হয়ে আমরা সেই রাস্তা ধরে হেটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় আনেকটা যেন আমাদের দেখেই একটা বাড়ির উঠোনে বসা এক বৃদ্ধ গলার স্বরটা খানিকটা চড়িয়ে বলল, “বাহিরে গোয়েন্দাগীরি করে লাভ নেই। খুন করতে হলে ভেতরের লোকই যথেষ্ট। সেটা বের করাও গোয়েন্দার সাধ্যের বাহিরে।” কথাটা শুনে তামিমদা থামলো। আশরাফ সাহেবের দিকে স্বপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো। আশরাফ সাহেব একটু চাঁপাগলায় বলল, “জোয়ার্দার বাড়ি। এই ভদ্রলোক হচ্ছেন শরীফ জোয়ার্দার। এদের সাথে চৌধুরীদের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। একদম দেখতে পারে না চৌধুরীদের এরা।”

তামিমদার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম এমনটাই যেন চাচ্ছিল। সাথে সাথে ঘুরে বাড়ির উঠোনে চলে এলো তামিমদা। বৃদ্ধ একটু ঘাবড়ে গেলো। হঠাৎ করে চশমা খুলে চশমার কাঁচ মুছতে শুরু করলো। ভাবটা এমন যেন তামিমদার উপস্থিতি দেখতেই পায়নি। এবার তামিমদা গলা খাখারি দিয়ে বলল, “স্লামোয়ালাইকুম চাচা।” ভদ্রলোক আরো ঘাবড়ে গেলো। তামিমদা অতি অমায়িক একটা হাসি মুখে এনে বলল, “শুনতে পেয়েছেন হয়তো, চৌধুরী বাড়িতে তাদের ছোট ছেলে খুন হয়েছে। আমি সে ব্যাপারে তদন্ত করতে এসেছি। যদি আপনি একটু সাহায্য করেন তাহলে খুব ভালো হয়।” তামিমদার নরম গলা শুনে ভদ্রলোক একটু সহজ হলো। তার পর আগের সেই স্বর এনে কথা বলা শুরু করলো।
কি জানতে চাও বলো?
চৌধুরীদের ব্যাপারে। তাদের শত্রুমিত্রদের ব্যাপারে। যদি কিছু তথ্য পাই আপনার কথা থেকে তাহলে আমার তদন্তে সুবিধা হবে।
চৌধুরীরা এত বেশি অন্যায় করেছে যে তাদের শত্রুর কোন অভাব নাই। কোন দিক দিয়ে কে এসে তাদের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে সেটা বলা খুব কঠিন। আমি যদি পারতাম তাহলে আমিও এরকমই একটা প্রতিশোধ নিতাম।
ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে সত্যই এক প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। জানি না কেন, তবুও মনে হলো এ আগুন কয়েক প্রজন্মের আগুন। বয়ে চলেছে এই বৃদ্ধ যুগযুগ ধরে।
তামিমদা বলল, “আপনার কি মনে হয় প্রতিশোধের জন্য এই হত্যাকান্ড সঙ্ঘটিত হয়েছে?”
তাছাড়া আর কি? চৌধুরীদের ছেলেতো এখানে আসেও না খুব একটা। এখানে তার শত্রু কোথা থেকে আসবে? খোঁজ নিয়ে দেখো, গ্রামেই পাবে হয়তো আসল লোককে খুঁজে।
ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। বুঝলাম আর কথা বলতে চান না। তামিমদাও আর চাপাচাপি করলো না।

ফিরে আসার সময় একটা ঘটনা ঘটলো। একটা বাড়িতে রাজমিত্রীরা কাজ করছিল। একজন লোক মাথায় করে বাড়ির বাহিরে রাখা ইট নিয়ে যাচ্ছিল ভেতরে। আশরাফ সাহেব কোন কারনে একটু অন্যমনষ্ক থাকায় অল্পের জন্য সেই লোকের সাথে মুখোমুখি বাড়ি খাওয়া থেকে বেঁচে গেলেন। ব্যাপারটা খুব অকস্মিক ঘটলেও আমি দেখলাম তামিমদা আড় চোখে আশরাফ সাহেবকে পরখ করে নিল। এবং তখনও তাকে অন্যমনষ্ক লাগছিল।

* * *

চৌধুরী পরিবারের সবার যে অবস্থা তাতে তাদের সাথে কথা বলার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। তাই দুপুরের খাবারের পর ফিরে এসে তামিমদা একটু ঘুমিয়ে নিল। আমার আর ঘুম আসছিল না। আমি লাগোয়া বারান্দটায় গিয়ে একটু ঘোরাঘোরি করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম বারান্দার দেয়ালের সাথে লাগানো একটা পাইপ আছে। সেই দেয়ালের চুন বেশ কিছু জায়গায় খসে পড়েছে। কেউ যেন পাইপ বেয়ে উঠতে চেষ্টা করেছিল, কিম্বা উঠেছিল। তার পায়ের ঘসায় এটা হয়ে থাকতে পারে। আবার আমার ধারনা ভুলও হতে পারে, কারন বাড়িটা অনেক পুরোনো। শেষ বার চুনকাম করা হয়েছে কবে সেটা অনুমান করা না গেলেও, অন্তত এতটুকু বলা যায় বছর পাঁচ সাত হবে। এরকম বাড়ির দেয়ালের চুন আপনা থেকেও খসে যেতে পারে।

সন্ধার দিকে আশরাফ সাহেব আসলেন আমাদের খোঁজ খবর নিতে। তামিমদা ঘুম থেকে উঠে একটু হাতমুখ ধুয়ে রেডি হচ্ছিল। আশরাফ সাহেব আসায় তাই খুশিই হলো। বলল, “আপনার খোঁজেই যেতাম। মনে হয় না কেউ কথা বলবে আজ, তাই না?”
আশরাফ সাহেব বললেন, “এরকম একটা শক, কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগছে। কনা ভাবীতো এখনও বিছানায়, উঠে বসার মত শক্তিও যেন নেই।”
তামিমদা বলল,“তাহলে এই বেলায় ব্যাঙ্ক ঘরটা দেখে আসি। দেখা যাবে?”
“হ্যা, সেটা যাবে। নুতন একটা তালা লাগানো হয়েছে। একটা চাবি আমার কাছেই আছে। চলুন, আমি দেখিয়ে নিয়ে আসি।”

আমরা নিচে নেমে এলাম। বেশ কিছু ঘর হেটে একটা নিরিবিলি ঘরের সামনে আসলাম। একটা ষাট পাওয়ারের লাইট জ্বলছে সরু বারান্দায়। কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভুতি। তালাটা খুলে আমরা ঘরে ঢুকলাম। ঘরের ভেতরে দমবন্ধ করা একটা গন্ধ। ঘরে কোন জানালা নেই। সেটাই হয়তো এই গন্ধের কারন। ঘরের ভেতরে একটা টেবিলের উপর রাখা ছিল একটা বেশ পুরোনো তালা। তালাটা হাতে নিয়ে তামিমদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালো আশরাফ সাহেবের দিকে। আশরাফ সাহেব জানালেন এটাই আগের তালা যেটা চোর খুলে এই রুমে ঢুকেছিল। এবার ভালো করে তাকালাম তালাটার দিকে। এটা বেশ বড় এবং মজবুত তালা। এটাকে ভাঙ্গা খুবই কঠিন, অন্তত শব্দ না করে তো সম্ভবই না। এটা একটা কম্বিনেশন তালা। সুটকেস বা ব্যাগে যে রকম কম্বিনেশন তালা থাকে, অনেকটা সেরকম। কম্বিনেশন ঘোরানোর যে অংশটা থাকে সেখানটা ফাকা হয়ে আছে। ভেতরের পদার্থ কোন ভাবে গলিয়ে বের করে আনা হয়েছে। এখনো কিছু পদার্থ জমাট বেঁধে আছে খোলসের সাথে। তামিমদা তালাটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিল। তার পর একটু হাসলো। তামিমদার হাত থেকে তালাটা নিয়ে আমিও গন্ধ নিলাম। বেশ ঝাঁঝালো কোন পদার্থের গন্ধ। গা গুলিয়ে যায়।

আশরাফ সাহেব আমাদের ঘরের মাঝখানে নিয়ে গেলো। সেখানে আরেকটা ছোট লকারের মত আছে। এটাতেও একটা কম্বিনেশন লক লাগানো। আশরাফ সাহেবকে লকারটা খুলতে হলো না আর। কারন সেটা খোলাই ছিল। লকারটা দেখিয়ে ভদ্রলোক জানালেন এটার ভেতরেই থাকতো গুরুত্বপূর্ন দলিল। প্রধান দরজা এবং এই লকার, দুটোরই কম্বিনেশন জানতেন শুধু ইহসান সাহেব। মাঝে মাঝে ইহসান সাহেব এসে এখানে কাজ করতেন। তবে এই ঘরে কারো ঢোকার অনুমতি ছিল না। বড় তালাটা দিয়ে এই ঘর সবসময় আটকানোই থাকতো। তবে চোর ঢোকার পর এই ঘরটাকে আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না। তাই এই লকার থেকে সব কিছু বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উপরে। আশরাফ সাহেব দোকান থেকে একটা সাধারন তালা এনে লাগিয়ে রেখেছেন।
তামিমদা আশরাফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, “এই লকার থেকে কি কিছু মিসিং হয়েছে ?”
না। কিছুই মিসিং হয়নি এখান থেকে। আমি কখনও দেখিনি এটার ভেতরে কি আছে, তাই জানিও না এর ব্যাপারে। তবে ইহসান সাহেব ভালো করে পরীক্ষা করে বলেছেন কিছু মিসিং হয়নি।
এটার কম্বিনেশনতো ভাঙ্গা হয়নি। এটা কি কোন ভাবে খুলতে পেরেছিল?
চুরির আলামন পাবার পর যখন আমরা এই ঘরে ঢুকি তখনও এটা তালাবদ্ধই ছিল। ইহসান সাহেব বলেছেন ভেতরের জিনিস নাকি তার কছে মনে হয়েছে নাড়াচাড়া করা হয়েছে। বাহিরের অন্যন্য জিনিসপত্রও ওলোট পালোট অবস্থায় ছিল।
তামিমদা আর প্রশ্ন করলো না। এক মনে দেখতে লাগলো রুমটাকে। লকারটা যে দিকে আছে ঠিক তার উল্টো দিকে একটা বিশাল পোট্রেট আছে। আগে যে পোট্রেটটা দেখেছিলাম এটাও তারই। তবে এই ছবিতে একটু যেন নরম লাগছে। মেজাজের সেই রুক্ষ দিকটা নেই। অবশ্য বয়সও এখানে বেশি লাগছে। তামিমদা পোট্রেটটা ভালো করে দেখলো। তার পর বলল, “এই ভদ্রলোককে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। ষাট-সত্তর বছর আগের এই মানুষটা কেমন করে যেন বার বার ফিরে আসছে বর্তমানে।” মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কথাটার মানে আশরাফ সাহেব কিছুই বোঝেননি। আমিও যে খুব বেশি কিছু বুঝেছি তা নয়। তবে এতটুকু বুঝেছি, যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই এই মানুষটা আলোচনায় চলে আসছে। তামিমদা হয়তো সেটাই বোঝাতে চেয়েছে।

রাতে ঘুমোতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কম্বলের নিচে ঢুকে পড়েছি আমি এবং তামিমদা। তখন মনে পড়লো বারান্দায় চুন খসে পড়ার সেই দাগের কথা। তামিমদাকে বলতেই ও একটু হাসলো। তার পর বলল, “শুধু এটুকুই দেখলি? আমাদের রুমের সামনেই যে একদম টাটকা আধহাত ব্যবধানে দুটো গর্ত হয়ে যাওয়া দাগ আছে দেয়ালে সেটা লক্ষ্য করিসনি?” আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম, “না। অত ভালো ভাবেতো দেখিনি? কিন্তু কিসের দাগ ওটা?” আমার কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে তামিমদা বলল, “আমি নিশ্চিত ওরকম আরেক জোড়া দাগ নিচের নরম মাটিতে পাওয়া যাবে। ওই জায়গায় কেউ মই লাগিয়ে উপরে উঠে এসেছিল।”

আমার শিরদাড় বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো। সাথে সাথে তাকালাম দরজাটার দিকে, ঠিক মত বন্ধ করা হয়েছে কিনা দেখতে। তামিমদা তখন বলল, “দরজাটা বন্ধই আছে এবং বেশ ভালোভাবেই। ওটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।” আমিতো অবাক। তামিমদা আমার দিকে উল্টোফিরে চোখ বন্ধ করা। ও কি করে বুঝলো যে আমি দরজাটার দিকে তাকিয়েছি এবং সেটা বন্ধ করা আছে কি না সেটা দেখছি? তামিমদাকে জিজ্ঞেস করতে ও হেসে বলল, “এটা খুবই সহজ একটা ব্যাপার। কথা হচ্ছিল বারান্দায় মই দিয়ে উঠা নিয়ে। কথার মাঝে তুই এমনভাবে চুপ হয়ে গেলি যে বোঝাই যাচ্ছিল কোন একটা বিশেষ বিষয়ে তোর চিন্তা ডাইভার্ট হয়ে গিয়েছে। সেটা অবশ্যই ওই বারান্দা নিয়ে। মাত্র গতকাল রাতে কেউ ওখান দিয়ে এসে একজনকে খুন করে গেলো। আমরা যেহেতু সেই খুনের তদন্ত করছি, অতএব আমরাও নিরাপদ নই। এর পরের ব্যাপারটা হচ্ছে প্রটেকশন এবং সিকিউরিটি। দুটোই ওই দরজাটা। সেটা ঠিক মত লাগানো আছে কিনা সেটা তুই দেখার চেষ্টা করবি, এটাই কি স্বাভাবিক না? আমি শোবার আগে ওটা ভালো ভাবে লাগিয়ে শুয়েছি। তাই তোকে বললাম ওটা ঠিকতম লাগানো আছে। মানুষকে বিচার করার সময় খুব স্বাভাবিক ব্যপারগুলো দিয়ে বিচার করিস। দেখবি পর্যবেক্ষন ভুল হবে না। আমরা কেউই অতিমানব নয়। তাই, সাধারন ভাবেই পর্যবেক্ষন করা উচিত। এবার ঘুমা।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, আসলেইতো কত সহজ। কিন্তু বলে দেবার পর। আগেতো এত সহজ লাগছিল না। এজন্যই তামিমদা আমার গুরু আর আমি ওর শিষ্য। আর অতিমানব? আর কারো কাছে না হোক, অন্তত আমার কাছে তামিমদা অতিমানব। (চলবে)
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×