somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Abdullah Arif Muslim এর তাবলীগের সমালোচনার আড়ালে কী ??-৩

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আরিফ সাহেবের মত যারা তাবলীগের সমালোচনা করেন,তাদের একটি সাধারণ পয়েন্ট যা সবসময় থাকে তা হলো তাসাওউফ। যদিও তাবলীগের সাধারণ লোকেরা সাধারণত ইসলামের এদিকটাতে খুব কমই যায়,কিন্তু তাবলীগের সর্বপ্রথম আমির ও অন্যান্য উপরের স্তরের আলেম মুরব্বিরা যেহেতু সবাই এই তাসাওফে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং এখনো আছেন তাই তাবলীগ বিরোধীদের বিরোধিতা যেন কখনো শেষ হবার নয়। ইনশাল্লাহ তাই এই পর্বে ইসলামে তাসাওফ কি আসলেই বিদায়াত এবং তা কি কোরআন হাদিসের বাইরে এ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাব।

মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গের সাথে যেমনভাবে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বিধি-বিধান রয়েছে ঠিক তেমনিভাবে মানুষের আত্মার সাথে সম্পৃক্ত বিধি-বিধানও আছে। শারিরীক বিধানের মতোই ফরয,ওয়াজিব,সুনান ও মুস্তাহাব যেমন আছে ঠিক তেমনি আছে হারাম,মাকরূহ । এই আত্মিক জগতের পরিশুদ্ধি কিংবা ইসলাহে কলবের নাম হলো তাযকিয়া। দ্বীনের এই অংশটি অতীতের কোন এক সময়ে "তাসাওউফ" নামে পরিচিত পেয়ে গেছে। আবার আমাদের উপমহাদেশে তা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে 'পীর-মুরিদী' নামে। যে ইলম অভ্যন্তরীণ সতগুণাবলীর বিশদ ব্যাখা এবং তা অর্জনের দিক নির্দেশনা দেয়; অন্তরের রোগ সমূহের বিশ্লেষণ এবং তার চিকিৎসা নির্ধারণ করে তারই নাম ইলমে তাসাউওফ। আর সেসব সতগুণাবলী অর্জন এবং আত্মিক রোগ মুক্তির জন্যে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও হক্কানী বুযুর্গের চিকিৎসা ও তরবিয়তের অধীনে থাকার নাম 'পীর-মুরীদী'।


তসাওউফের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ পাকের মহব্বত,আল্লাহর ভয়,ইয়াকিন,ইখলাস, ইস্তিহযার, ইহসান ও আখলাকে হামিদা অর্জন করা। ইসলামে তাই এর গুরুত্ব অনেক বেশি এবং নিঃসন্দেহে ঈমান ও ইসলামের পূর্ণতাও এগুলোর উপর নির্ভরশীল এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উম্মতকে এসব শিখিয়েছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন।

এই তাসাউফ অথা ইসলাহে বাতেনকে তথা আত্ম শুদ্ধিকেই কুরআনের ভাষায় তাযকিয়া বলা হয়। আর এই তাযকিয়াকেই আল্লাহ তাআলা সফলতার চাবিকাঠি বলেছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا
যে নিজের নফসকে পবিত্র করছে , সেই সফলকাম হয়েছে

وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
এবং যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়েছে ( সূরা আশ-শামসঃ ৯)

এ তাযকিয়াই আখেরী নবী মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরণের একটি উদ্দেশ্য। কুরআনের ভাষায়-
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ [٣:١٦٤
আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন(তাযকিয়া) করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুতঃ তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। (সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪)

উক্ত আয়াতে (এমনিভাবে সূরা বাকারার ১২৯ নং আয়াতে ) থেকে সুস্পষ্ট যে,কালামে পাকের তেলাওয়াত এবং কোরআন ও হিকমত শিক্ষার পাশাপাশি তাযকিয়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। আর এ তাযকিয়াই তাসাউফের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।


এখন প্রশ্ন জাগতে পারে তাযকিয়ার জন্য কেন কোন শায়খের প্রয়োজন যেখানে আমাদের সামনে কোরআন ও সুন্নাহ রয়েছে?

উপরের আয়াত থেকেই একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইলম ও কিতাব আত্মশুদ্ধির জন্য যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য জরুরী এমন একজন " মুযাক্কী' অথা সংশোধনকারীও ,যার তরবীয়ত ও তত্বাবধানে এ দৌলত অর্জন করা যেতে পারে।কারণ শুধু নীতি ও দর্শনগত দিক থেকে কোন বিষয় হাছিল হওয়ার দ্বারা আমলের পূর্ণতা অর্জিত হয় না। তাই যতদিন কোন মুরব্বীর অধীনে থাকে আমলী সংশোধনের মাধ্যমে দ্বীনকে অভ্যাসে পরিণত না করবে ততদিন পর্যন্ত অপূর্ণতা থেকেই যাবে। সুলূক ও তাসাওউফে একজন কামেল শাইখ কিংবা পীরের কাজ এতটুকু যে,কোরান-হাদিসে যেসব বিধানাবলীর তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে,তিনি সেগুলোকে আমলের রূপদান এবং অভ্যাসে পরিণত করিয়ে থাকেন।

কোরআন-হাদিস অনুযায়ী একথা স্পষ্ট যে, মানব জাতির ইসলাহ ও তরবিয়তের জন্য সর্বযুগে দুটি জিনিস প্রয়োজন। এক- কুরআন ভিত্তিক হেদায়াত । দুই- তা বুঝা এবং সে মুতাবেক আমল করার যোগ্যতা অর্জনের জন্য শরীয়ত বিশেষজ্ঞ ও আল্লাহওয়ালাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।
একথা শুধু দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়,বরং পৃথিবীর অন্যন্য বিদ্যা এবং শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা পদ্ধতির জন্যও প্রযোজ্য। যেমন একদিকে থাকবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নির্ভরযোগ্য পুস্তকাবলী,অন্যদিকে থাকবে বিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিবর্গের তা'লীম ও তরবিয়ত ও দিক নির্দেশনা।তাই সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের অধিকাংশ সময় নববী মজলিসে কাটাতেন। ইসলামি শিক্ষার তরবিয়ত হাতে-কলমে গ্রহণ করতেন। এজন্যই পূর্ববর্তীদের মাঝে শুরু থেকেই বুযুর্গদের সংশ্রব অবলম্বন এবং তাঁদের নসীহত ও ইসলাহের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার ধারা চলে আসছে।
আত্মশুদ্ধি ও আমলী তরবিয়ত এ পথে যতটুকু সম্ভব, শুধু কিতাবের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে তা সম্ভব নয়।

দ্বীনী ইলম যে শাইখ থেকে অর্জন করা হয় তাকে বলে শাইখুত তা'লীম বা উস্তাদ। আর যে শাইখ হতে তাযকিয়া ও তরবিয়ত অর্জন করা হয় তাঁকে বলা হয় শাইখুত তরবিয়ত তথা পীর বা মুরব্বী। কখনো এমন হতে পারে যিনি উস্তাদ তার মুরব্বী হওয়ার যোগ্যতাও আছে।যাহোক, নফসের ইসলাহ ও সংশোধনের জন্যে, তরবীয়তের জন্যে একজন শাইখ কিংবা মুরব্বীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। একে 'পীর-মুরীদী' বলা হোক কিংবা অন্য কিছু, সেটা মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।


সোহবত বা সান্নিধ্য লাভের প্রভাব স্বভাবের উপর অত্যন্ত কার্যকরী হয়। এটি অতি সুস্পষ্ট বিষয়। এজন্যে শরীয়তে নেককার এবং উলামায়ে কেরামের সংসর্গ অবলম্বনের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ [٩:١١٩]
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক। (সূরা তাওবা-১১৯)
উপরের আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলার ভয় অর্জনের পন্থা বাতলে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহওয়ালা তথা আল্লাহর সত্যিকারের বান্দাদের সান্নিধ্যই মানুষকে পাপমুক্ত শুদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে। অতএব আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ পথ হলো সত্যিকার আল্লাহওয়ালাদের সান্নিধ্য।

হাদিসেও আল্লাহওয়ালাদের সান্নিধ্যের কথা বলা হয়েছে এবং সাথে সাথে অসৎ সঙ্গ বর্জনের জন্য কঠোরভাবে তাকিদ দেওয়া হয়েছে।

ইমাম বায়হাকী (রহ) স্বীয় হাদিস গ্রন্থ 'শুয়াবুল ঈমান' এ লিখেনঃ
" স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন জ্ঞানীদের সাথে উঠা-বসা করে তখন তার বুদ্ধিমত্তা আরো বৃদ্ধি পায়। একজন আলেম যখন উলামায়ে কেরামের সংস্পর্শে আসে,তখন তার ইলম বৃদ্ধি পায়। এমনিভাবে একজন পুণ্যবান ও জ্ঞানীদের সোহবতে এলেও তাই হয়। কাজেই সৎগুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিদের সোহবতে একজন সৎচরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির নৈতিকতার উতকর্য সাধন হবে এটাও অনস্বীকার্য। " (শুয়াবুল ঈমানঃ ৬/২২৯)

হাদিসে ইরশাদ করা হয়েছেঃ
" পুণ্যবান সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গী যথাক্রমে মেশক বহনকারী এবং হাপরের ফুতকারদানকারীর ন্যায়। মেশক বহনকারী হয়ত তোমাকে মেশক প্রদান করবে কিংবা তুমি তার নিকট হতে ক্রয় করবে। তাও না হলে সুগন্ধি তুমি অবশ্যই পাবে। পক্ষান্তরে হাপরের ফুতকারকারী হয়ত তোমার কাপড় জ্বালাবে, নতুবা দুর্গন্ধতো অবশ্যই পাবে।" ( সহীহ বুখারীঃ ২/৮৩০, হাদিস ৫৫৩৪)
আরেক হাদিসের দুর্গন্ধের জায়গায় বলা আছে-" তার স্ফুলিঙ্গ না লাগলেও ধোঁয়া থেকে রেহাই পাবে না।" (সুনানে আবু দাউদঃ ২/৬৬৪,হাদিস ৪৮১৯)

অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে-" তোমাদের সর্বোৎকৃষ্ট সঙ্গী সে, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যার কথায় ইলম বৃদ্ধি পায়; যার কাজ-কর্ম তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।" (আব্দ ইবনে হুমাইদ, আবু ইয়ালা- ইথাফুল খিয়ারাঃ ৮/১৬৩)

আরেক হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছেঃ " মুমিন মুমিনের জন্য আয়না" (সুনানে আবু দাউদঃ ২/৩১৭,হাদিস ৪৯১৮)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মুনাভী (রহ) বলেনঃ
" যে ব্যক্তির মধ্যে ঈমানী গুনাবলীর সমন্বয় ঘটে, ইসলামের আদব-শিষ্টাচার পূর্ণতা লাভ করে এবং যার অন্তর সৎচরিত্রে আলোকিত,যার অন্তকরণ ইহসানেরর চূড়ায় আরোহণ করে,তিনি লির্মলতায় হন আয়নাতুল্য। মুমিনগণ তাঁর দিকে তাকালে তাঁর স্বচ্ছতায় নিজেদের দোষগুলো দেখতে পায়। ভেসে উঠে তার সুন্দরতম চরিত্রে নিজেদের অসুভ কার্যকলাপসমূহ।" (ফয়যুল কাদীরঃ ৬/২৫১-২৫২)

সারকথা আত্মশুদ্ধির জন্যে,তাকওয়া অর্জনের লক্ষে নেককার মুত্তাকীদের সোহবত-সংশ্রব অবলম্বনের অপর নাম 'পীর-মুরিদী' বা 'তাসাওউফ'। আর যে শাস্ত্রে কুরয়ান-হাদিস এবং সলফের (পূর্বসূরীদের) বাণীসমূহের আলোকে আত্মশুদ্ধি বা পীর-মুরীদী সম্পর্কিত নিয়ম কানুন ও তার বিধিবিধানের আলোচনা করা হয় তারই নাম "ইলমে তাসাওউফ"।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, " শুনে রাখ! মানব শরীরে একটি গোশতের টুকরোম আছে, যা ঠিক হয়ে গেলে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর তা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শরীরটাই নষ্ট হয়ে যায়। আর শুনে রাখ ! সে টুকরোটি হচ্ছে ক্বলব ।" (সহীহ বুখারীঃ ১/১৩,হাদিস ৫২; সহীহ মুসলিমঃ ২/২৮, হাদিস ৩৯৭৩)

চিন্তার বিষয় এই যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো শরীরের আমলের ইসলাহ ও সংশোধনকে অন্তরের ইসলাহ ও সংশোধনের উপর নির্ভরশীল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, অন্তরের ত্রুটি দেখা দিলে পুরো শরীরের আমলের মাঝে ত্রুটি ও বিপর্যয় দেখা দেয়।
আত্মিক গুণাবলীর মাঝে আছে-'ইখলাস,খোদাভীতি,তাওয়াক্কুল,সবর,শোকর,আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি,আল্লাহর মহব্বত,বদন্যতা ও নম্রতা ইত্যাদি।

পক্ষান্তরে আত্মিক রোগসমূহের মধ্যে রয়েছে- রিয়া,কপটতা,অহংকার, আত্মগর্ব,হিংসা-বিদ্বেষ,অবৈধ যৌনাচার,কুপ্রবৃত্তি,ধন-সম্পদ ও সম্মানের মোহ,লোভ-লালসা ও কুধারণা ইত্যাদি।


কুরআন হাদিসে অন্তরকে উপরোক্ত গুণাবলীসহ অন্যান্য গুণাবলী দ্বারা অন্তরকে সুসজ্জিত করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, সাথে সাথে উপরোক্ত রোগসমূহসহ অন্যান্য রোগ থেকে অন্তকে পবিত্র রাখা জন্যও জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং অন্তকে এসবের সাথে জড়ানোর ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।

এখন অনেকেই প্রশ্ন করেন তাসাওউফে আত্মশুদ্ধির জন্য যে বিশেষ ধরণের কাজগুলো করা হয় সেগুলোর সুস্পষ্ট বিধান তো কোরআন হাদিসে নেই,তাহলে এটা কি বিদায়াত নয়??

তাসাওউফের মূল লক্ষ্য ও উদেশ্য কি তা উপরেই আলোচনা করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে তাসাওউফের মাঝে এমন কিছু কাজ করা হয় যেগুলো মাধ্যম হিসেবে করা হয়। এসম মাধ্যমগুলোর কোন কোনটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কুরআন হাদিসে বিধৃত হয়েছে। যেমন শরয়ী মুজাহাদা,অধিকতর মৃত্যুর স্মরণ ও নফসের মুহাসাবা( হিসাব নেওয়া) ইত্যাদি।

আর কতিপয় মাধ্যম এমন আছে,যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই কুরআন হাদিসে বর্ণিত নেই, আবার শরীয়তের কোন দলীলের পরিপন্থীও নয়। বরং হক্কানী মাশায়েখ স্থান-কাল-পরিবেশ এবং মুরীদের বিশেষ অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে সেগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো শরীয়তের বিধান হিসেবে নয়,বরং কোন শরয়ী উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য চিকিৎসা স্বরূপ। যেমন-যিকিরের সময় বিশেষ পদ্ধতির জবর লাগানো এবং পানাহার অত্যাধিক কমিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এ গুলোকে শরীয়তের হুকুম মনে করা বা সুন্নাতের মর্যাদা দেওয়া নিতান্তই ভুল এবং এগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করাও ঠিক নয়।

তাছাড়া যিকির ও মুজাহাদার সময় বহু মানুষই অনিচ্ছাধীন বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। যেমন যিকিরের সময় আলো দেখতে পাওয়া, কোন গায়েবী আওয়াজ শুনা,ভাল স্বপ্ন দেখা এবপ্নগ ভয়ের আধিক্যে সংজ্ঞাহীন হওয়া ইত্যাদি।
এ ধরণের অবস্থা সৃষ্টি হওয়াও শরীয়তের নির্দেশনাবলীর অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলোকে তাসাওউফের উদ্দেশ্য মনে করা এবং সেগুলো সম্পর্কে অতিরঞ্জিত করা আদৌ ঠিক নয়। [ আল ইতিসাম (আল্লামা শাতেবী রহঃ ) : ১/২৬৫-২৬৯, তারবিয়াতুস সালেক (শাহ ইসমাইল শহীদ রহ ) :১/২৬-৩৪, কামালাতে আশ্রাফিয়াঃ ১৩৫,৩২৪; শরীয়ত ও তরীকত কা আলাযুমঃ ১৬৭-১৬৯, বিস বড়ে মুসলমানঃ ১০০-১০১৪, ইমদাদুল ফাতোয়াঃ ১/১১৬-১১৭]


কিন্তু বর্তমানে কিছু লোকের তাসাওউফ শব্দটি শুনা মাত্রই কপালের ভাঁজ পড়ে যায়। এর কারণ হল, এ পরিভাষার প্রতি তাদের ভীতি জন্মেছে এবং তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে স্বয়ং তথাকথিত সূফীদের সম্পর্কে।

কিন্তু এরূপ ঘটনা শুধু তাসাওউফের ক্ষেত্রেই ঘটেনি, বরং সকল শাস্ত্র, প্রতিটি ইসলাহী দাওয়াত এবং প্রতিটি নেক কাজের একই দশা। তার ধারক-বাহকদের মাঝে,তারা আহ্বায়ক এবং দাবীদারদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল
খাঁটি-মেকি,অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ,পরিপক্ক-অপ্রিপক্ক,সত্যবাদী-মুনাফেক সব প্রকৃতির মানুষ। এতদসত্বেও কোন তত্ত্বসন্ধানী ব্যক্তিই মূল বিষয়টির প্রয়োজনীতা অস্বীকার করতে বা তার বিরোধিতা করতে পারে না।
ইসলামের ইতিহাসে এমন কোন যুগ অতিবাহিত হয়নি, যে যুগে তাসাওউফ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ এবং তাসাওউফের ইমামগণ আসল-নকল,হাকীকত-সূরত, মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও প্রথাকে পৃথক পৃথক বুঝিয়ে দেননি ।

ইমাম গাযালী(রহ), শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ) ও শাইখ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী(রহ) থেকে নিয়ে মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ),হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ),হযরত সায়্যিদ আহমদ শহীদ(রহ), হযরত ইসমাইল শহীদ (রহ), হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ) ও হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ) প্রমুখ মনীষীরা সবাই মূল দ্বীনী ও আনুষঙ্গিক উভয় বিষয়ে বিস্তারিত ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়েছেন। বিশদ ব্যাখ্যার মাধ্যমে হক-নাহকের পার্থক্য তুলে ধরারা ক্ষেত্রে তাঁরা অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।কঠোর হস্তে ঐ সব রসম-রেওয়াজ খণ্ডন করেছেন, যেগুলো অমুসলিমদের সংশ্রব বা অপরিপক্ক সূফীদের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছিল।


এখন সূফিয়া-কিরামের কিছু বাণী দেখুন,তারা কি রূপ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাসাওউফের নাম করে যেসব লোকেরা ভণ্ডামী চালাতে চেয়েছে তাদের থেকে এই ইলকে রুক্ষা করার জন্য-

বিখ্যাত বুযুর্গ সূফীকুল শিরোমণি জুনাইদ বাগদাদাঈ (রহ) বলেন-"আমাদের এই ইলম (ইলমে তাসাওউফ) কুরয়ান-হাদিসের সাথেই সম্পৃক্ত (অর্থাত,এগুলোর ভিত্তি কোরআন হাদিস)। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনের ইলম অর্জন করেনি এবং হাদিস ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেনি তাকে আদর্শ বানানো যাবে না। " ( সিয়ারুল আলামিন নুবালাঃ ১১/১৫৪)

শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী(রহ) বলেন-
"সকল আউলিয়া কেরাম শুধু কুরআন-হাদিসের (শরীয়তের বিধানাবলী) আহরণ করেন এবং কুরআন হাদিসের যাহের মোতাবেকই আমল করেন।" -(রুহুল মাআনীঃ ১৬/১৯)

ইমামে রাব্বনী মুজাদ্দেদে আলফে সানী (রহ) স্বীয় মাততুবাতে লিখেন-
" স্বীয় যাহেরকে (বাহ্যিক দিক) শরীয়তের যাহের তথা আহকাম দ্বারা এবং বাতেনকে (অভ্যন্তরকে) শরীয়তের বাতেন ( আকীদা এবং ইসলাহে নফস সংক্রান্ত বিধানাবলী) দ্বারা সুসজ্জিত রাখুন । কেননা, হাকীকত ও তরীকত দ্বারা শরীয়তেরই হাকীকত ও তরীকত উদ্দেশ্য। এমন নয় যে, শরীয়ত এক জিনিস আর হাকীকত ও তরীকত ভিন্ন আরেক জিনিস। কেননা, এরূপ (ভিন্নতার) ধারণা যিন্দিকী,ইলহাদ ও কুফরী।" (ইরশাদে মুজাদ্দেদে আলফে সানীঃ মাকতুবঃ ৫৭)

বিখ্যাত বুযুর্গ আবু ইয়াযীদ বিস্তামী (রহ) লোকমুখে যিনি বায়েজিদ বোস্তামী নামে প্রসিদ্ধ বলেন, "তোমরা যদি কারো হাতে অলৌকিক কার্যাবলী প্রকাশ পেতে দেখ,এমনকি যদি তাকে আকাশে উড়তেও দেখ,তবু প্রতারিত হয়ো না,যতক্ষণ পর্যন্ত যাচাই করে না দেখবে যে, সে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ,শরয়ী সীমা সংরক্ষণ, শরীয়তের পাবন্দী এবং শরীয়তের অনুসরণ অনুকরণে সে কেমন?" ( সিয়ারু আলামিন নুবালাঃ ১০/৪৮৪, তালীমুদ্দিনঃ ১৪৩)

তাসাওউফ শাস্ত্রের ইমাম শাইখ আবু সুলাইমান দারানী(রহ) বলেন-" প্রায়ই আমার অন্তরে তাসাওউফের কোন ভেদতত্ত উদয় হয়,কিন্তু আমি তা নির্ভরযোগ্য সাক্ষীদ্বয়- কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূল-এর সাক্ষী ব্যতীত গ্রহণ করি না।" (সিয়ারু আলামিন নুবালাঃ ৮/৪৭৩)

তাসাওফের নাম করে অনেক ভণ্ড বলে থাকে তারা ইয়ায়াকীনের স্তরে পৌঁছে গেছে,তাই তাদের আর শরীয়তের হুকুম পালন করার প্রয়োজন নেই। দেখুন হক্কানী সূফিগণ তাদের সস্পর্কে কি বলেছেন-
এক লোক একবার জুনাইদ বাগদাদী(রহ) কে জিজ্ঞেস করেছিল, কেউ কেউ বলে থাকে,আমরা তো পৌঁছে গেছি। এখন আর আমাদের শরীয়তের অনুসরণের প্রয়োজন নেই।তিনি উত্তরে বললেন- "হ্যাঁ, তারা পৌঁছে গেছে।তবে জাহান্নামে।" (শরহু হাদিসীল ইলমঃ ১৬, রিসালাতুল মুসতারশিদীনঃ ৮৩ টিকা)

তিনি একথাও বলেছেন্ যে,"এমনটি বলা যিনা-বুয়াভিচার ,চুরি ও মদ্যপান অপেক্ষাও নিকৃষ্ট।"(মাজমূউ ফাতওয়া ইবনে তাইমিয়াঃ ১১/৪২০)

ইমাম গাযযালী(রহ) বলেন-" যে ব্যক্তি আল্লাহ তালার সাথে কোন বিশেষ অবস্থা বা সম্পর্কের দাবী করে ও বলে যে, এ অবস্থায় তার নামাযের বিধান এবং শরাবপান হারামের বিধান রহিত হয়ে গেছে,তাহলে তাকে কতল করা ওয়াজিব হয়ে যায়। যদিও তার চিরকাল জাহান্নামে থাকার ব্যাপারে কিছু কথা আছে। উপরোক্ত মতালম্বী লোককে হত্যা করা শত কাফেরকে হত্যা করার চাইতেও উত্তম। কেননা ,এ ধরণের লোক দ্বারা প্রভূত ক্ষতি সাধন হয়ে থাকে।" (রুহুল মাআনীঃ ১৬/১৯)


এভাবে হক্কানী সূফিগণ ভ্রান্তদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করেছেন,এবং তাদের হাত থেকে দ্বীনের এই প্রয়োজনীয় অংশটিকে অনেক সংস্কার এনেছেন ,হযরত মাওলানা আশরাফ থানভী (রহ) তো একে এতো সংক্ষিপ্ত ও সহজ করে এনেছেন যে, যে কেউ তা সহজে বুঝতে পারে এবং প্রয়োগ করতে পারে। হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী(রহ)-এর ভাষায় তাসাওউফ ও পীর-মুরীদীর হাকিকত বা সার সংক্ষেপ শুনুন। তারপর আপনি নিজেই ভেবে দেখুন এতে কোন বিষয়টি আছে যাকে বিদায়াত বা শরীয়ত পরিপন্থী বলা যায়।

হাকিমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ) বলেন-
"এতে (তাসাওউফে) :
১)কাশফ-কারামত প্রকাশ পাওয়া আবশ্যক নয়
২) কিয়ামতের দিন মাফ করানোর জিম্মাদারী নেই এবং তা সম্ভবও নয়।
৩) পার্থিব কোন লেনদেনে জিতিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নেই। এমনও জরুরী নয় যে, তাবীজ দিয়ে কোন কাজ উদ্ধার করে দিবে,দু'আ দিয়ে মামলা-মুকাদ্দমায় জিতিয়ে দিবে,কামাই-রোজগারে উন্নতি হবে,ঝাড়ফুঁক দিয়ে রোগ ভাল করে দিবে,ভবিষ্যতের কথা আগাম বলে দিবে।
৪) তাসাররুফও অত্যাবশক নয় যে, পীর সাহেবের তাওয়াজ্জুহ দ্বারা মুরিদের সংশোধন হয়ে যাবে। তার কোন গুনাহের খেয়ালও আসবে না , আপনাআপনিই ইবাদাত-বিন্দেগীর মানসিকতা তৈরি হবে।মুরিদের নিয়ত ও ইচ্ছার প্রয়োজন পড়বে না।
৫) বাতেনী কোন অস্বাভাবিক অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার ধরাবাঁধা অঙ্গীকার নেই যে, সর্বদা বা শুধু ইবাদাতের সময় পরম স্বাদ ও তৃপ্তি পাবে। আর ইবাদাতের সময় কোন বাধার সম্মুখীন হবে না। খুব কান্না আসবে এবং এমন আত্মভোলা হবে যে, আপন-পর কারোর কোন খবর থাকবে না।
৬) যিকির-শোগলরত অবস্থায় কোন নূর বা অন্য কিছু দেখতে পাওয়া যাবে অথাবা গায়েবী কোন শব্দ শোনাও জরুরী নয়।
৭) ভাল ভাল স্বপ্ন দেখা এবং ইলহাম সঠিক হওয়া আবশ্যক নয়।
বরং সব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তা'আলাকে সন্তুষ্ট করা ।যার মাধ্যম হল- শরীয়তের নির্দেশিত পথে চলা,বিধানাবলী অনুযায়ী পুরোপুরি আমল করা। ( আত তাকাশশুফ আন মুহাম্মাতিত তাসাওউফঃ ৭-৮)

হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ) অন্যত্র বলেনঃ " তাসাওউফের সারকথা অতি অল্প। তা হল, যে নেক কাজে অলসতা অনুভব হয়,অলসতার মোকাবেলা করে সে কাজটি সম্পাদন করবেন এবং গুনাহের চাহিদা হলে তা দমন করতঃ গোনাহের কাজ হতে বিরত থাকবেন। যে ব্যক্তি এ পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে, তার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। কেননা, এতটুকুই আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টিকারী,এটাই তার সংরক্ষক এবং এটাই তাকে উন্নতির পথে অগ্রসর করবে।" - (ওয়াযুত তাকওয়া-বাসায়েরে হাকীমুল উম্মতঃ ১০৬)

এই হল তাসাওউফ এবং পীর-মুরীদীর মূলকথা, তার আসল অববয়। অথচ এ ব্যাপারে উদাসিনতার কারণে,স্পষ্ট ধারণার অভাবে কিছু লোক তাসাওউফ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণায় পতিত হয়েছে এবং তাসাওউফকে বিদায়াত বা শরীয়ত পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছে। অথচ সত্যিকারের
তাসাওউফের মাঝে শরীয়তের অনুসরণ-অনুকরণ ব্যাতীত অন্য কিছুর সামান্যতম মিশ্রণ পর্যন্ত নেই। তাসাওউফের বর্ণিত হাকিকত( মূলতত্ত্ব) জানার পর বিষয়টি দিবালোকের মত সুস্পষ্ট হয়ে যায়।


তাসাওউফ দ্বীনের কাজ ছাড়ানোর জন্য নয়,বরং তাসাওউফের মাধ্যমে দীনের কাজে আরো শক্তি সঞ্চার হয়,তাতে প্রাণশক্তি আসে। কিন্তু কি বলবো, আল্লাহপাকের ইচ্ছা,যাদেরকে দীনের কাজের যোগ্য বানিয়েছেন, তারা এদিকে মনযোগ দেন না। অথচ তারা যদি এদিকে সামান্য মনযোগ দেন, তাহলে দেখতে পারবে তাদের কাজে কিরূপ শক্তি সঞ্চার হয়। ইমাম গাযালী(রহ), শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী(রহ), হযরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি(রহ) , হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ), হযরত শাহ ওয়ালীওল্লাহ(রহ), সাইয়েদ আহমদ শহীদ(রহ), শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ), হযরত শাহাজালাল (রহ) প্রমুখ বুজুর্গানে দ্বীনের যে খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন এবং যা কিছু দেখিয়েছেন [যার শতাং বা সহস্রাংশও বড় বড় সংগঠন ও দল করতে সক্ষম নয়] এ ক্ষেত্রে তাদের ইখলাস এবং হৃদয়ের ঐ আধ্যাত্মিক শক্তির বিশেষ ভূমিকা ছিল, যা তাসাওউফের এ পথে অর্জিত হয়েছিল। তাই দীনের দাঈ, আলেমদের এদিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিৎ।


এবার আরিফ সাহেবের মতো উপমহাদেশের এক ব্যক্তির কথা শুনুন যার সাথে আরিফ সাহেবের বিশ্বাস অনেকটা মিলে যায়,তিনি হলেন মওদুদী সাহেব। তিনি সূফীবাদের নাম,এর পরিভাষাসমূহ এবং তার রীতিনিয়মের সাথে উপহাস করেছেন। তিনি পূর্ববর্তীগণের পূণ্যময়
তাসাউফকে 'অনৈসলামিক' বলার দুঃসাহস দেখাননি বটে,কিন্তু তাসাউফকে ব্যাঙ্গ করে লিখেছেন-

"কাজেই পানি যেমন হালাল বস্তুও কোন সময় রোগীর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তা নিষিদ্ধ হয়, তেমনই এই আদর্শ (তথা তাসাওউফ) মুবাহ হওয়া সত্ত্বেও তখন এ কারণে অকাট্যরূপে বর্জনযোগ্য হয়ে গিয়েছিল যে, এর পোষাকে মুসলমানদেরকে 'আফিং'-এর চুমুক লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নিকটে যেতেই উক্ত দীর্ঘদীনের পুরাতন রোগীদেরকে পুনরায় সেই 'চুনাইয়া বেগম' -এর স্মরণ করিয়ে দেয়,যা তাকে ক্রমশ ক্ষত করতেই থাকে।" (তাজদীদ ও ইহইয়ায়ে দ্বীনঃ ১৩২)

তারপর উনি ইমাম গাযযালী (রহ),ইমাম তায়মিয়া(রহ), হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী(রহ), শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী(রহ), সাইয়েদ আহমদ শহীদ(রহ),শাহ ইসমাইল শহীদ(রহ)-দের উপর খড়গহস্ত হয়েছেন কেন তারা তাদের সংস্কার কাজের সময় এই "সুফিয়াতের রোগ" এর জীবানু থেকে নিজেদের মুক্ত করলেন না আর শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কেন মনযোগ দিলেন না। ( তাজদীদ ও ইহইয়ায়ে দ্বীন- ৭৮,৮৬,১৩১,১৩৩,১৩৪)


যারা তাসাওউফের সমালোচনা করেন ,তারা অনেকটা এপথে না এসেই, কিংবা ভাসা ভাসা ধারণার উপর। তাই একজন বুযুর্গ খুব সুন্দর কথা বলেছেনঃ " ঘরের ভেতরের জিনিস সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি তো ঘরে প্রবেশের পরই অর্জন করা যায়।"
এ যেন একটি প্রসিদ্ধ উক্তির বাস্তব উপলব্ধি-
من لم يذق جم يدر
অর্থাৎ, যে চেখে দেখেনি সে এর স্বাদ বুঝবে না

মওদুদী সাহেব তার লেখায় তাসাওউফ সম্পর্কে যা লিখেছেন,তাতে এ ধারণা হয় যে, একটি মেধাবী বালক এমন এক বিষয়ে স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছে, যে বিষয়ে প্রাথমিক ধ্যান-ধারণা লাভের সুযোগ তার হয়নি। তা সত্ত্বেও তার মেধা ধন্যবাদ লাভের যোগ্য। আর তার চিন্তা এরকমই যে, মাথা ব্যাথা হলে পুরো মাথাটাই কেটে ফেলা উচিৎ।


তাসাওউফ সম্পর্কে এত অল্প পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়,কারণ এটি একটি জুরুরী এবং জটিল বিষয়। একদিকে এটিকে নিয়ে যেমন চলছে ছাড়াছাড়ি আরেক দিকে এটিকে নিয়ে চলছে বাড়াবাড়ি। তাই বিনীত অনুরোধ তাসাওউফ সম্পর্কে ভালভাবে জানার জন্য নিচের বইগুলো পড়ুন,যাতে তাসাওউফের গুরুত্ব ভালভাবে অনুধাবন করা যায় এবং তাসাওউফের নামে যারা ভন্ডামী চালাচ্ছে তাদেরকে চিনা যায়-

১) তাসাওউফ তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ - মুফতী মুহাম্মদ আশরাফ উসমানী এবং মাওলানা আব্দুল মালেক (দা বা ), মাকতাবাতুল আশরাফ, বাংলাবাজার
২)তাসাওউফ কি ও কেন?- মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নোমানী (রহ), তাসাউফ সম্পর্কে জানার জন্য একেবারে সংক্ষিপ্ত একটি বই, উপরের প্রকাশনী থেকে বাংলাভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশিত হয়েছে।
৩)আল-আরবাঈন - ইমাম গাযালী (রহ) ,এটি বাংলাতে 'তাবলীগে দ্বীন' নামে প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি প্রকাশ করেছে এমদাদিয়া লাইব্রেরী
৪)শরীয়ত ওয়া তরীকত- মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ),এটিও এমাদিয়া লাইব্রেরী এই নামেই অনুবাদ করেছে।
৫)ইসলাহী মাজালিস- আল্লামা তাকী উসমানী (দা বা) এটির অনুবাদও মাকতাবাতুল আশরাফ করেছে
৬)ইসলাহী নিসাব- মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ) এটির অনুবাদও মাকতাবাতুল আশরাফ করেছে।
৭)ইকমালুশ শিয়াম- এটির অনুবাদ করেছে আযিযী গ্রাফিক্স এণ্ড নেটোয়ার্ক
৮)তারবিয়াতুস সালেক- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ),এটির অনুবাদ করেছে রাহনুমা প্রকাশনী
৯)তাযকিয়াতুন নুফূস- ইবনে তাইমিয়া(রহ),ইবনুল কাইয়িম ও ইবনে রজব (রহ)
১০)মাদারিজুস সালেকীন- ইবনুল কায়্যিম (রহ)
১১)কুসদুস সাবিল- মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ),এটির অনুবাদ একই নামে প্রকাশ করেছে এমদাদিয়া লাইব্রেরী

সবগুলো বই না পড়া গেলেও কম পক্ষে ১,২,৪,৬ নং কিতাবগুলো পড়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করব।

(উনার আলোচিত আরেকটি বিষয় পরের পোস্টে তুলে ধরা হবে ইনশাল্লাহ)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৯:৩৯
১৯টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুবা আমি তোমাকে ভুলিনি

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১২:৫৫



আমার বন্ধু রফিকের বিয়ে।
সে সাত বছর পর কুয়েত থেকে এসেছে। বিয়ে করার জন্যই এসেছে। রফিক একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। আমি তাকে প্রথমে দেখে চিনতেই পারি নাই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্যরচনাঃ ক্যামেরা ফেস

লিখেছেন আবুহেনা মোঃ আশরাফুল ইসলাম, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ৮:৫৯


খুব ছোট বেলায় আমাদের শহরে স্টার স্টুডিও নামে ছবি তোলার একটা দোকান ছিল। সেটা পঞ্চাশের দশকের কথা। সে সময় সম্ভবত সেটিই ছিল এই শহরের একমাত্র ছবি তোলার দোকান। আধা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবাসন ব্যাবসায় অশনি সংকেত

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১১ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৫:২২




জুলাইয়ের শুরুতে একটি বিজ্ঞাপন দেখা গেল একটি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের । তারা ৫০ পারসেনট কমে ফ্লাট বিক্রি করছে । মুখ চেপে হাসলাম এত দুঃখের মাঝেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

রৌপ্যময় নভোনীল

লিখেছেন স্বর্ণবন্ধন, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৯


একটা অদ্ভুত বৃত্তে পাক খাচ্ছে আত্মা মন,
বিশ্বকর্মার হাতুড়ির অগ্ন্যুৎপাতে গড়া ভাস্কর্যের মতো গাড়-
হাড় চামড়ার আবরণ; গোল হয়ে নৃত্যরত সারসের সাথে-
গান গায়; সারসীরা মরেছে বিবর্তনে,
জলাভুমি জলে নীল মার্বেলে সবুজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

""--- ভাগ্য বটে ---

লিখেছেন ফয়াদ খান, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৪৪

" ভাগ্য বটে "
আরে! সে কী ভাগ্য আমার
এ যে দেখি মন্ত্রিমশায় !!
তা বলুন দেখি আছেন কেমন
চলছে কেমন ধানায় পানায় ?
কিসের ভয়ে এতো জড়োসড়ো
লুকিয়ে আজি ঘরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×