somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাধারণ কষ্টের খেরোখাতা

২৪ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ৩:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ বাড়ি ফেরার পথে অন্যদিনের মত ঘুম পাচ্ছিল না। রাত নেমে আসার সাথে সাথে দু'দিন হল একটা শীত মেশানো হাওয়া কোত্থেকে যেন উড়ে আসে। শীতকালের আগমনী কানে কানে বলে যাওয়ার এই সময়টাতে প্রতি বছর আমার মন খুব ভালো থাকে। কোন বাড়তি কারন ছাড়াই। অথচ আজ বাস ভর্তি লোকের সামনে কান্না পাচ্ছে ভীষণ।

বাসটা ফার্মগেট পার হচ্ছিল। আমার কলেজের রাস্তা পেরিয়ে। যে কলেজ থেকে বিদায়ের দিনে এক ফোঁটা কষ্ট্ও লাগেনি। সিস্টারদের কড়া শাসন, নিয়মের কঠিন বাঁধন আর মিসদের গাম্ভীর্য মাখা কলেজটাকে রীতিমত বিষন্ন বলে মনে হত। শুধু সারি বাধা দেবদারু, মা মেরির শুভ্র মুর্তি আর অজানা কারনে বেজে ওঠা ঘন্টাটার জন্য একটু মন কেমন করেছিল। কিন্তু এই পঁচা ওভার ব্রিজ, কাদা মাখা নোংরা রাস্তা, উদ্ভট ইউনিফর্ম, মুড়ির টিনে আসা-যাওয়ার মত যন্ত্রণাগুলো থেকে বাঁচতে পেরে যতটা খুশি হয়েছিলাম, তার তুলনা হয়না।

তারপর একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা, অজস্র বন্ধুর খোঁজ, কিছু খুব প্রিয় ক্লাসরুম আর শিক্ষকের সাথে কবে যে আমার পাঁচটা বছর পার হয়ে গেল এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। যেন হঠাৎই বলা নেই কওয়া নেই আমি বড় হয়ে গেলাম।

আমাকে এখন চাকরি করতে হয়। সেখানে উঠতে বসতে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে যায়। আমার ক্লাসের সহপাঠীরা কেউই এত নগণ্য কাজ করেনা, কথাটা হরদম মাথায় ঘুরপাক খায়। না, কোন কাজকে অসম্মান করতে নেই জানি। কিন্তু যে কাজটা আমি করি তার আসলেই কোন মূল্য খুঁজে পাইনা আমি। নামমাত্র যে বেতন পাই তার পুরোটা মাকে দিয়ে দেই। যা কিনা আমার যাতায়াতের জন্যই তাকে খরচ করতে হয়। টানাটানির সংসারে কোনই পরিবর্তন আনেনা নেই বেতনটুকু।
তারওপর, কমপক্ষে চার ঘন্টা আমার কাটে বাসের ভেতরে। কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে স্রেফ ঝুলে থেকে। আর পারিনা......... প্রতিদিনই ভাবি, আর পারবোনা। একদিন বিরক্ত হয়ে ওদের জানিযে দিলাম, আগামী মাস থেকে আর কাজ করবোনা। ওরা বললো এমাসটুকু কাজ করতে। বেশ, তাই হোক। ভাবলাম, অন্তত ঈদের বোনাসটুকু দিয়ে মা বাবাকে কিছুটা সাহায্য তো করা যাবে।

আজ বোনাস দিয়েছে। অফিসের সবাই হামসমুখে টাকা গুণছে। পিওন এসে বললো, তাড়াতাড়ি বোনাস নিয়ে আসেন। অ্যাকাউন্টসের শাজাহান ভাই বাইরে যাবে। আমি তড়িঘড়ি ছুটলাম; টাকা রিসিভ করার পর সই করতে যাতে কলম খুঁজতে না হয় সেজন্য ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে, তার ক্যাপটাও খুলে নিয়ে।

শাজাহান ভাই আমি পৌছাতেই তার হাজার টাকার নোটের বান্ডিলটা রেখে আমার দিকে আমসি মুখ তাকালেন। সামনে পড়ে থাকা লিস্টটা তুলে বললেন,‍‍ "আপনি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন বলে আপনার বোনাস দিতে মানা করে দেয়া হয়েছে।" ঝট করে মনে পড়লো আমি গত ঈদেও বোনাস পাইনি। কাজের ৬ মাস পূর্ন হয়নি বলে। মুখে বললাম, "গুড"। আর কি বলা যেত জানিনা। যে গতিতে এসেছিলাম তার দ্বিগুণ গতিতে পালিয়ে এলাম। আমার মত তুচ্ছ মানুষগুলোর তো কারো সামনে চোখের পানি ফেলার সাহসটুকুও নেই। অগত্যা ছোটবেলার মত বাথরুমের কল ছেড়ে কাঁদলাম খুব।

একসময় আয়নায় তাকিয়ে মারাত্মক হাসি পেয়ে গেল। কী করছি আমি! আমি কী আর সিনেমার নায়িকা নাকি যে কষ্ট পেলেই কাঁদবো আর তারপরও মেকআপ থাকবে নিখুঁত!! না, আমি হলাম জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এক দুপেয়ে প্রাণী। আমি কাঁদলে আমার কাজল লেপ্টে যায়, চোখ লাল হয় আর সর্দি হয়ে নাকটা যায় বন্ধ হয়ে। ফলে আয়নায় যাকে দেখা গেল তাকে আমার কাছে লাগলো জোকারের মত, যে অতিরিক্ত অভিনয় করছে। সহ্য হলনা, মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলাম।

সারাদিনে যতজন আমার সামনে খেকে গেছে তাদের প্রত্যেকে প্রশ্ন করেছে, বোনাস পেয়েছেন?? আমি সানন্দে না পাওয়ার কথা জানিয়েছি। তাও এমন কন্ঠে যেন, টাকাটা যে আমাকে দেয়া হয়নি এটাই সংবিধিবদ্ধ নিয়ম, এবং সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি বলে আমি যারপরনাই সন্তুষ্ট।

জানিনা, আমার সাথে যা করা হল সেটা ন্যয্য কিনা। বরাবরই জানার আগ্রহ কম ছিল। আসলে আমাদের মত মানুষের কষ্ট সবসময়ই অর্থহীন হয়। কোন কেন্দ্রীয় চরিত্রে উপস্থিতির যোগ্যতা নেই বলেই আমাদের জীবন নিয়ে কোন গল্প লেখা হয়না। আমাদের লেখা কেউ পড়েনা। কেউ প্রশ্ন করেনা কেন ওই শৃঙ্খলায় বাধা কলেজটাতেও আজ আমার ফিরে যেতে আপত্তি নেই। কাউকে বলতে হয়না, জীবন যে শৃঙ্খলে বেধেছে, যে কাদায় নোংরা করেছে, য়ে বিষনি:শ্বাস ফেলছে প্রতি মুহূর্তে - তার তুলনায় কলেজের দিনগুলো ছিল রীতিমত লোভনীয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ৩:২৯
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×