বাসটা ফার্মগেট পার হচ্ছিল। আমার কলেজের রাস্তা পেরিয়ে। যে কলেজ থেকে বিদায়ের দিনে এক ফোঁটা কষ্ট্ও লাগেনি। সিস্টারদের কড়া শাসন, নিয়মের কঠিন বাঁধন আর মিসদের গাম্ভীর্য মাখা কলেজটাকে রীতিমত বিষন্ন বলে মনে হত। শুধু সারি বাধা দেবদারু, মা মেরির শুভ্র মুর্তি আর অজানা কারনে বেজে ওঠা ঘন্টাটার জন্য একটু মন কেমন করেছিল। কিন্তু এই পঁচা ওভার ব্রিজ, কাদা মাখা নোংরা রাস্তা, উদ্ভট ইউনিফর্ম, মুড়ির টিনে আসা-যাওয়ার মত যন্ত্রণাগুলো থেকে বাঁচতে পেরে যতটা খুশি হয়েছিলাম, তার তুলনা হয়না।
তারপর একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা, অজস্র বন্ধুর খোঁজ, কিছু খুব প্রিয় ক্লাসরুম আর শিক্ষকের সাথে কবে যে আমার পাঁচটা বছর পার হয়ে গেল এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। যেন হঠাৎই বলা নেই কওয়া নেই আমি বড় হয়ে গেলাম।
আমাকে এখন চাকরি করতে হয়। সেখানে উঠতে বসতে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে যায়। আমার ক্লাসের সহপাঠীরা কেউই এত নগণ্য কাজ করেনা, কথাটা হরদম মাথায় ঘুরপাক খায়। না, কোন কাজকে অসম্মান করতে নেই জানি। কিন্তু যে কাজটা আমি করি তার আসলেই কোন মূল্য খুঁজে পাইনা আমি। নামমাত্র যে বেতন পাই তার পুরোটা মাকে দিয়ে দেই। যা কিনা আমার যাতায়াতের জন্যই তাকে খরচ করতে হয়। টানাটানির সংসারে কোনই পরিবর্তন আনেনা নেই বেতনটুকু।
তারওপর, কমপক্ষে চার ঘন্টা আমার কাটে বাসের ভেতরে। কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে, মাঝে মাঝে স্রেফ ঝুলে থেকে। আর পারিনা......... প্রতিদিনই ভাবি, আর পারবোনা। একদিন বিরক্ত হয়ে ওদের জানিযে দিলাম, আগামী মাস থেকে আর কাজ করবোনা। ওরা বললো এমাসটুকু কাজ করতে। বেশ, তাই হোক। ভাবলাম, অন্তত ঈদের বোনাসটুকু দিয়ে মা বাবাকে কিছুটা সাহায্য তো করা যাবে।
আজ বোনাস দিয়েছে। অফিসের সবাই হামসমুখে টাকা গুণছে। পিওন এসে বললো, তাড়াতাড়ি বোনাস নিয়ে আসেন। অ্যাকাউন্টসের শাজাহান ভাই বাইরে যাবে। আমি তড়িঘড়ি ছুটলাম; টাকা রিসিভ করার পর সই করতে যাতে কলম খুঁজতে না হয় সেজন্য ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে, তার ক্যাপটাও খুলে নিয়ে।
শাজাহান ভাই আমি পৌছাতেই তার হাজার টাকার নোটের বান্ডিলটা রেখে আমার দিকে আমসি মুখ তাকালেন। সামনে পড়ে থাকা লিস্টটা তুলে বললেন, "আপনি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন বলে আপনার বোনাস দিতে মানা করে দেয়া হয়েছে।" ঝট করে মনে পড়লো আমি গত ঈদেও বোনাস পাইনি। কাজের ৬ মাস পূর্ন হয়নি বলে। মুখে বললাম, "গুড"। আর কি বলা যেত জানিনা। যে গতিতে এসেছিলাম তার দ্বিগুণ গতিতে পালিয়ে এলাম। আমার মত তুচ্ছ মানুষগুলোর তো কারো সামনে চোখের পানি ফেলার সাহসটুকুও নেই। অগত্যা ছোটবেলার মত বাথরুমের কল ছেড়ে কাঁদলাম খুব।
একসময় আয়নায় তাকিয়ে মারাত্মক হাসি পেয়ে গেল। কী করছি আমি! আমি কী আর সিনেমার নায়িকা নাকি যে কষ্ট পেলেই কাঁদবো আর তারপরও মেকআপ থাকবে নিখুঁত!! না, আমি হলাম জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এক দুপেয়ে প্রাণী। আমি কাঁদলে আমার কাজল লেপ্টে যায়, চোখ লাল হয় আর সর্দি হয়ে নাকটা যায় বন্ধ হয়ে। ফলে আয়নায় যাকে দেখা গেল তাকে আমার কাছে লাগলো জোকারের মত, যে অতিরিক্ত অভিনয় করছে। সহ্য হলনা, মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলাম।
সারাদিনে যতজন আমার সামনে খেকে গেছে তাদের প্রত্যেকে প্রশ্ন করেছে, বোনাস পেয়েছেন?? আমি সানন্দে না পাওয়ার কথা জানিয়েছি। তাও এমন কন্ঠে যেন, টাকাটা যে আমাকে দেয়া হয়নি এটাই সংবিধিবদ্ধ নিয়ম, এবং সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি বলে আমি যারপরনাই সন্তুষ্ট।
জানিনা, আমার সাথে যা করা হল সেটা ন্যয্য কিনা। বরাবরই জানার আগ্রহ কম ছিল। আসলে আমাদের মত মানুষের কষ্ট সবসময়ই অর্থহীন হয়। কোন কেন্দ্রীয় চরিত্রে উপস্থিতির যোগ্যতা নেই বলেই আমাদের জীবন নিয়ে কোন গল্প লেখা হয়না। আমাদের লেখা কেউ পড়েনা। কেউ প্রশ্ন করেনা কেন ওই শৃঙ্খলায় বাধা কলেজটাতেও আজ আমার ফিরে যেতে আপত্তি নেই। কাউকে বলতে হয়না, জীবন যে শৃঙ্খলে বেধেছে, যে কাদায় নোংরা করেছে, য়ে বিষনি:শ্বাস ফেলছে প্রতি মুহূর্তে - তার তুলনায় কলেজের দিনগুলো ছিল রীতিমত লোভনীয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

