somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ - ০৩

২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এর আগের পোস্টদের জন্য ক্লিক করুণ -- (মৃত্যুর সাথে প্রথম সাক্ষাৎ- ০২)


আমার দাদির বড়ই ইচ্ছা ছিল সেবার কোরবানি সে নিজে উপস্থিত থেকে বাড়িতে দেবে। কিন্তু, খুব ঠান্ডা পড়ায় বাবা ছাড়া কেউ রাজি হয়নি দাদিকে বাড়ি নিতে। প্রথমে বাবাও নিজে রাজি ছিল না, তবে দাদির পীড়াপীড়িতে রাজি হয়। তবে, অন্যদের বিরোধীতায় দাদির আর বাড়ি যাওয়া হয় নি কোরবানির আগে। জানি না আস্তিক নাস্তিক সকলে এটাকে কেমনে দেখবে, কিন্তু ঘটনা হল দাদির ঠিকই দেশের বাড়ি যাওয়া হল সেই কোরবানির ঈদে। তবে লাশ হয়ে। আমি বাবাকে বললাম, যেভাবেই হোক আমাদের গরু নিয়ে যেতে হবে দেশের বাড়িতে। আমরা একটা পিকআপ ভাড়া করলাম এবং এতে গরু তুলে নিয়ে রওয়ানা দিলাম দেশের বাড়ির পথে।
এ পর্যন্ত আমার লেখা পড়ে অনেকেরই মনে হতে পারে দাদি হয়ত আমার খুবই প্রিয় একজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু, সত্য হল আমার পৃথিবীতে যে অল্প কয়েকজন কাছের মানুষের প্রতি অভিযোগ আছে দাদি তাদের একজন। এক সময় তার প্রতি যথেষ্ঠ সহানুভূতি থাকলেও, তার মৃত্যুর পূর্ববর্তী ৪/৫ বছর তার পারিবারিক কিছু অবস্থানের জন্যে তার সাথে কোন যোগাযোগ রাখি নি। তার মৃত্যু আমার জীবনের এ যাবৎ কালে ঘটে যাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারন, আমার অবচেতন মনের গভীরে কোন এক প্রকোষ্ঠে তার জন্য একটা স্থান সুরক্ষিত রয়েছে।


আমরা ডেড বডি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। আমি ছিলাম লাশের গাড়িতে। এখানেও একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আমার নানি মারা যান ১৯৯৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ঢাকাতে। নানির মৃত্যুর পর আমরা লাশ নিয়ে বরিশাল যাই এবং তখনও লাশের গাড়িতে আমি ছিলাম। এ কথা শুনে আমার দাদি ও ছোট চাচা বড়ই মনক্ষুণ্ণ হয়েছিল। লাশের গাড়িতে উঠলে নাকি বিপদের সমূহ সম্ভবনা থাকে!! লাশ নাকি তার মৃত্যুর স্থান ছাড়তে চায় না, তাই নাকি সে গাড়ি ধরে রাখতে চায়। আমার বাবাকে এহেন কাজে আমাকে বাঁধা না দেবার জন্য এবং নানা বাড়ির আত্মীয়দের এই ব্যাপারটা না জানার জন্য মৃদু তিরস্কারও শুনতে হয়েছিল। কি অদ্ভুত সব কথাবার্তা!! অথচ, এই দাদির লাশবহনকারী গাড়িতেই আমার অবশেষে উঠতে হল।


ডেড বডি নিয়ে পৌছলাম বাড়িতে প্রায় ৩.৩০ এর দিকে। প্রথমে রাখা হল নতুন বাড়িতে এবং সেখান থেকে পুরান বাড়িতে। এবাড়িতেই প্রায় ৬৫ বছর আগে বউ হয়ে এসেছিল আমার দাদি। এ বাড়ির পাশেই পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবর ঠিক করে রাখাছিল। মাটি ফেলে জায়গা ঠিক করেছিলেন দাদি স্বয়ং। এমনকি, হজ্ব্ করে আসবার সময় নিজের জন্যে কাফনের কাপড়ও নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলোই গেছে তার সাথে কবরে।
একটা ব্যাপার খেয়াল করার মত ছিল এই যে, মৃত্যুর পর অনেক্ষন ধরে আমার মুখ থেকে দাদি শব্দটি আসে নি। তার দেহকে উল্লেখ করছিলাম “বডি” বা “ডেড বডি” হিসেবে। ডেড বডি বাড়িতে নিতে হবে, ডেড বডি গোসল করাতে হবে, ডেড বডি এম্বুলেন্সে করে নেওয়া হবে, ডেড বডি মসজিদে নিতে হবে ইত্যাদি। হঠাৎ, ব্যাপারটা উপলব্ধি করে এক পর্যায়ে নিজেই খানিকটা স্তব্ধ হয়ে পড়ি। কি অদ্ভুত এ জীবন এখনকার আমি, প্রাণ বায়ু বেরিয়ে গেলেই ডেড বডি। বাহ! কি অদ্ভুত সমাপন।


গ্রামে আগেই খবর পৌছে যাওয়ায় গ্রামের আত্মীয়রাই কবর খুঁড়ে যাবতীয় ব্যবস্থা করে রেখেছিল। আমরা তিনজন কবরে নামলাম আমি, আমার ফুফাতো ভাই ও গ্রামের এক নিকট আত্মীয়। কবর মূলত আয়তক্ষেত্রাকার একটি গর্ত যার দৈর্ঘ্য মৃতদেহের হাতের দৈর্ঘের সাড়ে তিন গুন, প্রস্থে প্রায় দুই-আড়াই ফুট, গভীরতায় প্রায় চার ফুটের মত (ছবি)। লম্বালম্বি উত্তর দক্ষিণ বরাবর বিস্তৃত। এর নিচে পশ্চিমদিকে নিচের দিকে ঢালু বর্ধিত অংশ থাকে যে অংশে মৃত দেহ রাখা হয়। মৃতের মাথা থাকে উত্তর দিকে এবং পা দক্ষিণ দিকে। মৃতের মুখের কাফন খানিকটা খোলা রাখা হয় এবং মুখটি পশ্চিমদিকে তাকিয়ে আছে এমন ভাবে কাত করে রাখা হয়।। দেহ কবরে রাখবার পরে, কাফনের কাপড়ে গিট গুলো খুলে দিতে হয়। গিট যে ফিতা গুলো দিয়ে দেওয়া হয়, সেগুলোও কবরে ফেলে দেয়। এভাবে কবরে লাশ রাখার পর, ছবিতে কবরের ভেতরে যে হদুল দাগ দেখা যাচ্ছে সেই বরাবর বাঁশ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর বাঁশ গুলোকে কলাপাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় মাটি ফেলা। প্রথমে কবর দিতে উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রত্যেকে তিন মুঠো মাটি কবরে ফেলতে থাকে। এই তিন মুঠো এমন ভাবে ফেলা হয় যেন কাউকে কিছু দেওয়া হল, দূরে দাঁড়িয়ে ছুড়ে দেওয়া হয় না। সবার দেওয়া হয়ে গেলে, অবশেষে মাটি দিয়ে পুরো কবর ঢেকে দেওয়া হয়। কবর খোড়ার সময় মাটি তুলে চারিদিকে এমন ভাবে রাখা হয় যেন, কবর দেবার পরে প্রথমের উপরের মাটি নিচে যায় এবং নিচের মাটি উপরে থাকে। সাধারনত, কবরে মৃতদেহের মাথা যে স্থানে থাকে, সেখানে চিহ্ন স্বরুপ কোন না কোন গাছ লাগানো হয় এবং কবরের উপরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে সকলে দোয়া পাঠ করে ফিরে আসে। কোন এক অজ্ঞাত ধর্মীয় কারনে, প্রত্যেক মানুষের জীবন অবসানকালে অবশ্য ঘটনীয় এই অনুষ্ঠানে মেয়েদের উপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ। কোথাও এমন লেখা আছে কিনা জানি না, তবে বাংলাদেশে এই নিয়ম। তবে, এ নিয়ম বড় অদ্ভুত মনে হয় আমার কাছে। এই ঘটনার পর থেকে আমার মনে হয় ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই জীবনে কারও না কারও অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থাকা উচিত।


দোয়া পাঠ কালে আমি দাঁড়িয়ে কোন দোয়া আওড়াচ্ছিলাম না। আমি স্থির দৃষ্টিতে ভাবছিলাম ঐ কবরের কথা। মাটি থেকে মাত্র তিন চার ফুট নিচে আমার দাদির দেহ। যে দেহ আর ২৪ ঘন্টা আগেও ছিল এক জীবিত মানুষের। ভাবলাম যদি হঠাৎ তখনই দাদির প্রাণ ফিরে আসে এবং নিজেকে সেই আঁধার কুঠুরির মাঝে বন্দী পায়, তবে। একটা ভয়াল শিহরণ খেলে গেল সম্পূর্ণ শরীর হতে। আমি নিজেই অস্থির হয়ে উঠলাম। এই কি জীবন!! যে দেহ জন্ম থেকে আজতক এ পৃথিবীতে হাজারো কাজে আমার সাথে থাকল, তার পরিনতি অবশেষে সেই বদ্ধ কুঠরিতে।


এই তো!! সব শেষ হলে, আমরা চলে এলাম, চলতে থাকল জীবন। দুটো কাজ বাকি ছিল। প্রথমত, কোরবানী দিলাম পরদিন সেই ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া গরু। দ্বিতীয়ত, প্রথমে কবরে বেড়া দেওয়া হয়েছিল, দরকার ছিল বাঁধানো। এখন সে কাজ চলছে। বায়তুল মোকাররম থেকে একটা এপিটাফ লিখিয়ে এনেছি, খুব শীঘ্রই তা শোভা পাবে দাদির কবরে।



(শেষ)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪০
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×