“নব-প্রজন্ম বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে”- শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেছেন। তিনি উক্ত অনুষ্ঠানে শিশুদের বিজ্ঞান শিক্ষায় আকৃষ্ট করার কথা বলেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মর্যাদা সম্পন্ন জাতি গঠনের ও আহবান জানান। লেখক মনে করে বক্তব্যটি অত্যন্ত সময়োপযোগী।
শিক্ষা মন্ত্রীর উদ্দেশ্য সফল করতে হলে, বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি নব-প্রজন্ম কেন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সে বিষয়টি আগে জানতে হবে। সমস্যার মূল কারণ খুজে বের করা গেলে, তার সমাধান ও সহজ হয়ে যায়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এতদিনে সম্ভবতঃ মূল কারণ খুজে পেয়েছেন।
একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলীর বেশীর ভাগই গ্রামে, আর অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজধানী শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশে বিজ্ঞান-শিক্ষা মুলতঃ শুরু হয় গ্রাম থেকেই এবং প্রকৃতিই তাদের বড় শিক্ষাগুরু। কিন্ত বাস্তবতা হল; গ্রামের শিশুরা বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা অবহেলিত। তারা বিজ্ঞান শিক্ষাসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিজ্ঞান শিক্ষার হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারন রিমোটনেসের প্রতি কতৃপক্ষের উদাসীনতা। সত্য কথা বলতে কি, বিজ্ঞান কেন পড়তে হবে এবং পড়লে শিশুদের কি লাভ বা ক্ষতি হবে সে বিষয়টি বলার মত কেউ তাদের পাশে নাই। তবে গ্রাম পর্যায়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন রকম উদ্যোগ নিলে, সেটিকে বাধা দেয়ার জন্য সকলেই এগিয়ে আসে।
বিগত এক দশকের ও বেশী সময় যাবত বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, স্থানীয় বিজ্ঞান অর্থাৎ লোকাল সায়েন্স থেকে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করতে গিয়ে তিক্ত কিন্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের অন্য প্রান্তে গ্রামীন পরিবেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে প্রায় একই রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। গ্রাম অথবা মফশ্বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের যেকোন প্রকল্পকে রনক্ষেত্রের সাথে তুলনা করা যায়। সমাজ, সরকার এবং রাজনীতিবিদসহ প্রায় সকলের সাথেই যুদ্ধ করে আগাতে হয়। তবে অনেক সময় এলাকার কিছু মেধাবী তরুনকে সহযোগীতায় এগিয়ে আসতে দেখা যায়।
বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্যই বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উন্নয়নে আগ্রহী। যেহেতু ডিজিটাল বাংলাদেশ-প্রকল্প হবে সমগ্র দেশব্যাপী, সেহেতু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আগে, গ্রাম বাংলায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বাস্তব অবস্থা জানা সরকারের জন্য অতীব জরুরী।
বিগত বৎসরগুলীতে গবেষনায় দেখা গেছে বাংলাদেশে শত শত ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষ বিজ্ঞানের বিভিন্ন স্তরে এবং বিভিন্ন শাখায় লেখাপড়া শিখে দুর্বিসহ বেকার জীবন যাপন করছে। তাদের অধিকাংশই জানেনা কোথায় তাদের বিজ্ঞানের বিশেষ শিক্ষা ও জ্ঞান কাজে লাগাবে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোথাও কোন দিক নির্দেশনা কিংবা গবেষনার ব্যবস্থা নাই, অথচ আধুনিক যুগে যা থাকা খুবই জরুরী।
বাংলাদেশে সম্ভবত; বিজ্ঞান পেশা অর্থাৎ বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞানে ডিগ্রীধারী জনগনই সবচাইতে বেশী অবহেলিত ও সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানের অধিকাংশ কার্যক্রম এখন অবিজ্ঞানী কিংবা ভুয়া-বিজ্ঞানীদের হাতে। বাংলাদেশে একদিকে ছাত্র-ছাত্রীরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, অন্যদিকে অভিভাবকগন ও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত দেশসমুহের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে।
আশার কথা হল- মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত এবং বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে তিনি একজন বিজ্ঞানী ও বটে। তাঁর সদিচ্ছা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনায় দেশে হাজার হাজার মেধা সম্পন্ন বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিগত বিদ্যায় দক্ষ মর্যাদা সম্পন্ন সুনাগরিক তৈরী হতে পারে, যেমনটি তিনি তাঁর বক্তব্যে আহবান করেছেন। বিদেশী সাহায্যের জন্য হাত না বাড়িয়ে এবং বিদেশী প্রযুক্তি আমদানী না করে, নিজের দেশের তরুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পারদর্শী বানিয়ে, জাতীয় মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণ ও তার সুষ্ঠু ব্যবহার অধিক সম্মানজনক এবং লাভজনক। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে - প্রযুক্তি কেউ কাউকে ধার দেয়না বা দিতে পারেনা - নিজের মেধা এবং যোগ্যতা দিয়ে তা আর্জন করতে হয়। বিষয়টি দেশ ও জাতির জন্য ও সত্য এবং প্রযোজ্য।
বাংলাদেশীদের মাঝে এখনো শত শত দেশ-প্রেমিক বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষক রয়েছেন, যারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নিজের অর্থ-সম্পদ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী- সেজন্য প্রযোজন অনুকূল পরিবেশ এবং তাদের প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন। এখানে গুরুত্বপুর্ন বিষয় হল প্রতিটি মানুষই তাঁর কাজের স্বীকৃতি বা মুল্যায়ন চায়। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ও আজ ভি-আই-পি বা ছি-আই-পি দের মত এস-আই-পি (সাইন্টিফিক ইম্পোর্টেন্ট পারসন) মর্যাদা চান - যা মোটেই অযৌক্তিক নয়।
শিক্ষামন্ত্রী আশা করেন বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতি, গুনগত মান বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে এবং শিক্ষার সর্বস্তরে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সুনিশ্চিত হবে। শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির প্রয়োগ নিঃসন্দেহে একটি উত্তম পদক্ষেপ। তবে ঊদ্যোগটি বেশী কার্যকরী হবে, যদি দূর্গম এলাকা থেকে শুরু করা যায়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে দেখা গেছে গ্রামের ছেলে মেয়েরা সনাতন পদ্ধতিতে বাবা-মা ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে স্থানীয় প্রযুক্তি শেখার সুযোগ পেয়ে যায়। এভাবেই তারা হয়ে ওঠে সনাতন বা ট্রাডিশনাল বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। ফলে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শেখা তাদের জন্য হয়ে পড়ে সহজ এবং আনন্দদায়ক। দুর্গম এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিগত দিনের বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তম ফলাফল এবং শত ভাগ পাশের হারই প্রমাণ করে এর সত্যতা। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাতি, কামার, কুমার সকল পরিবারে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত (বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং প্রকৌশলী) তরুন তরুনীরা বদলে দিচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা।
গবেষনাটি দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলদেশের এক দুর্গম এলাকার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কারিগরী বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর চালানো হয়েছে। নানারকম বাধ্যবাধকতা এবং প্রতিবন্ধকতা সত্বে ও আশানুরুপ ফল পাওয়া গেছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশসহ উন্নয়শীল দেশে নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞান শিক্ষায় সহায়ক।
প্রফেসর লুৎফর রহমান, চেয়ারম্যান কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ষ্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
এবং সাবেক ভিসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ; মোবাইলঃ ০১৭১৩-০৮১৭৬৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


