প্রথম টিউশানীর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেল। খেলাধূলা আর আড্ডাবাজির চাপে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম টিউশানী করলে টাকা পাওয়া যায়।দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে কলেজের রি-ইউনিয়ন নিয়ে তোড়জোড় শুরু হল...অনেক বড় ভাইদের সাথে পরিচয় হচ্ছিল।একদিন এক বড় ভাই একটা টিউশানীর প্রস্তাব দিলেন, বললেন বাকি টিউশানী গুলো সব ছেড়ে দাও,এটাতে ভালো টাকা পাবা।মেঘ না চাইতেই বজ্রপাত,আমি বজ্রাহত।ভাইকে বললাম আপনি বড় ভাই, আপনার কথা তো ফেলতে পারি না, এ মাসেই সব টিউশানী ছেড়ে দিব।
যথাসময়ে বালকের বাপের সাথে দেখা হল, আস্ত এক ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির মালিক।আমার ছাত্র পড়ে ক্লাস ওয়ানে, ওকে শুধু পড়াইলেই হবে না, ইংরেজী কথা বলা শিখাতে হবে, তার সাথে সাথে টুকটাক কম্পিউটার স্কিল...টাকার অঙ্ক নিয়ে আর কথা হয় নাই, দরকার মনে করি নাই(বড় ভাই যেহেতু একটা অঙ্ক বলে দিয়েছিল)।ছোট বাচ্চাদের এমনিতেই পছন্দ করি, ভাবলাম এর থেকে মজার কিছু আর হতে পারে না।
প্রথম দিন গিয়ে দেখি টুপি পরা ভদ্র, চুপচাপ একটা ছেলে।যা বলি তাই শুনে, একটা পড়তে বললে দশটা পড়ে ফেলে।তবে ক্লাস ওয়ানের তুলনায় একটু বড়ই মনে হল।প্রথম দিনের পরে আর কোনদিন টুপি পরতে দেখি নাই।কে জানতো সেদিন টুপির ভিতরে সব শয়তানি লুকানো ছিল !
কয়দিন যেতে না যেতেই আসল রূপ বেরিয়ে এল।স্যার কম্পিউটার শিখব ।এর মানে হল স্যার আমি আর আপনি মিলে এলিয়েন হান্টার গেম খেলব। আমি সবকিছু করব আপনি শুধু গুলির বোতাম টা চেপে ধরে থাকবেন। কিছুক্ষন পর... ছোট একটা কাজ দিলাম এটাও পারেন না স্যার, কে আপনারে টিচার বানাইছে ?
আমিও পাল্টা ব্যবস্থা নিলাম।কম্পিউটারে ডাইরী লিখতে হবে, প্রতিদিন দশ লাইন।কাজ হল। দুই দিন পরে বলে স্যার কম্পিউটার নষ্ট।আমিও কথা বাড়ালাম না। শান্তিচুক্তি মেনে নিলাম।
এর পরে শুরু হল উপদেশ বর্ষণ... স্যার কখনো বিয়ে করবেন না স্যার। মেয়েরে খুব খারাপ হয়। স্যার প্রেম করবেন না স্যার। একদিন আমার মানিব্যাগ কেড়ে নি দৌড় !! পরে ফেরত দিয়ে বলে স্যার ভিতরে গার্লফ্রেন্ড এর ছবি রাখেন নাই কেন ? আমার মোবাইল কেড়ে নিয়ে বলে স্যার একটু গেম খেলি স্যার, প্লিজ প্লিজ প্লিজ। কিছুক্ষন পরে ফেরত দিল। তারপর অঙ্ক করতেছি, এর মাঝে বলে আপনার গার্ল ফ্রেন্ড সুন্দর আছে স্যার, একদিন বাসায় নিয়ে আসবেন !!!! এই করনেই তাহলে মোবাইল ছিনতাই ! এটা পোলা না আগুনের গোলা ? কত বুঝাইলাম এটা সালমা হায়েক, খালি মিটিমিটি হাসে।
অদ্ভূত সাইকোলজি ছিল ওর ! মাঝে মাঝেই আমাকে বলত স্যার আমি মনে হয় আমার বাবা মায়ের আসল ছেলে না,আমাকে একটুও আদর করেনা। আমাকে মনে হয় রাস্তায় কুড়ায়ে পাইছে। আরো অনেক কথা। পড়ানোর থেকে মনে হয় কাউন্সিলিং বেশি করছি। আমার সম্পর্কে বাবা মা যা বলত সব আমাকে অভিনয় করে দেখাতো। এই অংশ আমি আবার খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম।
একদিন আমাকে বলে স্যার একটা গোপন কথা বলব।কাছে আসেন।স্যার আরো কাছে আসেন, আরও।তারপর ঠাস করে আমার বাড়ানো গালে একটা চড় মেরে দৌড় !! দুই মিনিট পরে ফিরে আসল। সে কি হাসি !!! হাসি আর হাসি !! থামতেই চায় না।
আরেক দিন। রাগ করে তুলে নিয়ে বিছানার উপর আছড়ে ফেললাম।ওর খুশি দেখে কে ?? বিছানার উপর লাফাইতেছে আর বলতেছে স্যার আরেকবার।প্লিইইইইইইইইজ...প্লিজ প্লিজ... এই ইংরেজি শব্দটা সে ভালই শিখছে।কি আর করা, আরও চার পাঁচ বার ফেলতে হল ।
আমার বড় ন্যাওটা ছিল পোলাটা।আমি ওরে চকলেট দিব কি, উল্টা ও ই আমার জন্য চকলেট লুকায়ে নিয়ে আসত।স্কুলে কার সাথে কেন মারামারি করছে এগুলা পুরা কাহিনী শুনতে হত। মারামারি কর কেন ? স্যার আমার আম্মু আমাকে শিখাইছে কেউ যদি তোমাকে একটা মারে তুমি দুইটা মারবা । আমি চেক করে দেখতে গেলাম, এবং প্রায় আহত হয়ে সেদিন বাড়ি ফিরলাম।
একটা পিচ্চি বোন ছিল ওর, বড়জোর তিন বছর হবে।ওই বাসার সবচে ভয়ঙ্কর গুন্ডা !আমি আসছি খবর পেলেই হল ! কোলে উঠে বসবে, তারপর শুরু হবে খামচানি,আমার নাক খুলে নিয়ে কানের জায়গায় বসানোর চেষ্টা করতো,আর যদি মুড চলে আসত, তাহলে ওর দাঁত কেমন ধারালো আমি সেই এক্সপেরিমেন্টের অংশ হয়ে যেতাম।একটাই আবদার,তিতার তুমি আমাতে পরাও, ওই তিতার। ভিতর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এমন চিৎকার শুরু করত, মনে হয় এলাকাবাসী ছুটে আসবে। ওর ভয়ে বাসায় ঢুকার সময় কলিংবেল দিতাম না।
ও, এইটা বলতে ভুলে গেছি। আমার ছাত্রকে সাইজে আনার জন্য একটা কঠিন স্যাডিস্টিক শাস্তি আবিস্কার করেছিলাম।যখন মেজাজ খারাপ হয়ে যেত, তখন রুমের মাঝখানে দাড়া করায়ে দিতাম আর বলতাম এবার এই টপিকে পাঁচ মিনিট বক্তৃতা দাও। ঘড়ি ধরে থাকতাম পাঁচ মিনিট, কোন মাফ নাই। এই জিনিস টাকে ও সবচে ভয় পেত...বলত, স্যার তার চেয়ে স্যার আমাকে একটা চড় মারেন স্যার, নাহলে হুজুরের ব্যাত টা নিয়ে আসি ওইটা দিয়ে মারেন । স্যার আপনি তো পাগল, এইটা কোন শাস্তি হল ? এই শাস্তি কেউ কাউকে দেয়? আরে ব্যাটা আমি তো বুঝতাম কোনটা শাস্তি আর কোনটা খেলা। যাই হোক,শেষের দিকে শাস্তিতে কাজ হত না, ও পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারত।
এই অংশটা আমি বলতে চাই না, বলতে ভাল লাগবে না। কিন্তু কিছু করার নাই, এটা না বলে কাহিনী শেষ করা যাবে না। ছাত্রের বাবা-মা দুজনেই উপার্জন করে, মা ব্যাঙ্কে চাকুরী করে।আগেই বলেছি বাবা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির মালিক, কাজেই বাবা-মায়ের আয়ের পার্থক্য টা যোগ বিয়োগের অঙ্ক কষে বের করা যাবে না, গুণ ভাগের দরকার আছে। মা স্বাধীনচেতা, সংসারে কন্ট্রিবিউশন রাখার চেষ্টা করতেন, যার ফল হিসেবে আমার বেতনটা তিনিই দিতে চেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই একজন বড় ব্যবসায়ী আর চাকুরীজীবীর টিউটরের বেতন নিয়ে ভিন্ন ভাবনা থাকবেই, এবং সেটা যোগ বিয়োগের অঙ্ক দিয়ে হিসাব করা যাবে না।কাজেই প্রথম মাসে বেতন পেলাম বড় ভাইয়ের কথার তুলনায় অনেক কম।কথা বললাম এবং আমার দিকের বক্তব্য জানালাম। আশ্বাস পেলাম। দ্বিতীয় মাসে আবার একি ঘটনা,একি অঙ্কের টাকা পেলাম, বক্তব্য জানালাম, আশ্বাস পেলাম।এর মাঝে ছাত্রের কাছে শুনলাম আমার বেতন নিয়ে তার বাবা আর মায়ের ঝগড়া হয়েছে, ছাত্রের কথার সুরে বুঝলাম আমাকে দায়ী করছে।পরের মাসে যখন একি বেতন পেলাম এবং সামনের মাস থেকে বেতন বাড়বে বলে আশ্বাস পেলাম, তখন বুঝতে পারলাম টিউশানীটা ছেড়ে দেয়ার সময় হয়ে গেছে।
এই টিউশানীটা আমি খুব উপভোগ করতাম, শুধু টাকার ব্যাপার হলে হয়তো ছাড়তাম না।কিন্তু প্রতি মাসে আশ্বাস দিয়ে কথা না রাখা ইনসাল্টিং মনে হয়েছিল। তার চেয়ে একদিন খোলাখুলি কথা বলাটা আশা করেছিলাম। যাই হোক তিনমাসের টিউশানী শেষে আমিও কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, আবার খেলাধূলা আর আড্ডাবাজির মত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। তবে এখনো শপিং মলে গেমস এর ডিভিডির দোকানগুলোতে ওই বয়সী কোন ছেলে দেখলে আর একবার ভাল করে তাকাই।
আগের লেখাটি এখানে দেখুন
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সকাল ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


