বাবা সরকারী চাকুরে, তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় কেটেছে আমার শৈশব, আর প্রাইমারী স্কুল ও সেভাবে শেষ হয়েছে। ক্লাস এইটে উঠলে আমাদের শহর সাতক্ষীরার সরকারী বালিকা বিদ্যালযে ভর্তি হই এবং সেখান থেকেই এসএসসি পাস করি। বাবা ততদিনে বদলী হয়েছেন খুলনায়। এসএসসি পাশ করে চলে আসি খুলনায় এবং খুলনা সরকারী মহিলা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হই। বাসা থেকে কলেজের দুরত্ব এক কিলোমিটারের ও কম, তাই বাসায় থেকেই ক্লাস করতাম।
জীবনের প্রথম মেস জীবনের স্বাদ পাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকায় কোচিং করতে এসে। ফার্মগেটের একটা মেসে থাকতাম আমরা আট বান্ধবী। কিন্তু একমাস যেতে না যেতেই আমার নাভিশ্বাস। এর মধ্যে আম্মা দুইবার এসে ঘুরে গেছেন তারপর ও কোন লাভ হয়নি। এক মাস যেতেই সিদ্ধান্ত যা হয় হবে আর মেস নয় এবার ঘরে ফিরব, তাই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে ফিরে গেলাম খুলনায়।
তারপর প্রস্তুতি শুরু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। ভর্তি পরীক্ষা শেষে চান্স ও পেলাম। তখন ও বাসায় থাকি, প্রথম দিকে বাসায় থেকেই ক্লাস করতাম। হটাৎ বাবার ট্রান্সপার রংপুরে, কি আর করা সমাদান একটাই হলে উঠা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের তখন একটাই হল (এখন ও একটাই তবে দোতলা হয়েছে)। একতরা এই ভবনে ফার্স্ট ইয়ারে সিট পাওয়া সম্ভব নয়। আম্মু কথা বলল দূর্ভাষীর সাথে, দূর্ভাষী তখন ক্যাম্পাসে সিনিয়র এবং বেশ প্রভাবশালী (না তাকে তুষ্ট করার জন্য বলছি না)। সে এবং সেতু দু'জনে মিলে আমার জন্য একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিল। একদিন বিকাল বেলা ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ হাজির হলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রঅ হলে। গেস্ট হাউজ পর্যন্ত দূর্ভাষী এবং সেতু আমার সাথে, সেখানে প্রভোস্ট স্যারের সাথে ওরা কি কথা বলল ওরাই জানে, স্যার দেখলাম আমার ব্যাপারে যথেষ্ট কেয়ারিং। হলের খালার পিছু পিছু সেদিন আমার সিটে পৌছলাম। রুমে গিয়ে দেখি চারজনের সিট একটা রুমে। আমার সিট টা জানালার কাছে। রুমে অন্যদের সাথে পরিচিত হলাম, সবাই থার্ড ইয়ার বা ফোর্থ ইয়ারের, এদের মধ্যে একজন আবার দূর্ভাষী এবং সেতুর বান্ধবী। যাই হোক সেই আপু আমাকে আমার সিট ও লকার দেখিয়ে দিল। দেখলাম চারজনই আছি আমরা আমাদের রুমে। ভাবলাম যাক যা মুনেছি তাহলে তা মিথ্যা, ডাবলিং করতে হবে না।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক!
রাতে আপুর সাথে ক্যান্টিনে খেতে গেরাম, কিন্তু খাবার আমার মুখ দিয়ে আর ভিতর দিকে যায় না। এমন খাবার আমি জীবনেও খাইনি। কোন রকম খাওয়া শেষ করে রুমে এলাম, সবার সাথে পরিচিত হতে এবং গল্প করতে সেদিন রাত ১২ টা বেজে গেল, এরই মধ্যে দেখলাম দূর্ভাষীকে ফোন করেছে আপু। আর আমার কাওয়ার বিবরন দিচ্ছে। একটু পরে দূর্ভাষী আমার ফোনে ফোন করে বলল চিন্তার কিছু নেই, আগামীকাল থেকে খাবার পাল্টে যাবে।
রাতে বাকীরা সবাই তিনটা বেডে আর আমি একা এক বেডে ঘুমালাম। সকালে উঠে নতুন বিড়ম্বনায় পড়লাম, বাথরুমে যেতে সিরিয়াল দিতে হলো। আমার আবার আট টায় ক্লাস ছিল। যাই হোক ছুটতে ছুটতে ক্লাসে গেলাম। দুপরের পর থেকে টানা সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস থাকায় অন্য কোনদিকে তাকানোর সময় পাইনি। সন্ধ্যায় রুমে ফিরে দেখি রুমে একটি হিটার, হাড়ি পাতিল এবং চাল ডাল সহ বিভিন্ন সব্জী। একটু অবাক হলাম, এগুলি তো আগে ছিলনা। এমন সময় দূর্ভাষীর ফোন, রিসিভ করতেই বলল হাড়ি পাতিল চেক করে দেখ কি রান্না হয়েছে। দেখি ইলিশ মাছ ভাজি এবং অন্য একটা সব্জি রান্না হয়েছে এবং কমপক্ষে আট দশজন ভালো মত খাওয়া যাবে। জিঞ্জাসা করলাম ঘটনা কি! জানালো এখন থেকে প্রতিদিন দুপুরে এবং রাতে হলেল এক খালা আমাদের সবার রান্না করে দিয়ে যাবে। বাজার করার দায়িত্ব আমাদের। ব্যস, খেতে বসে গেলাম, সত্যি খালা রান্না করত ও দারুন। এরপর থেকে বাজার আমরা ও করতাম, আর বেশী করত দূর্ভাষী।
(ক্রমশ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


