আমার হল জীবন: কিছু স্মৃতি রোমন্থন (২)
রাতে হলে ফিরে ৪ টি পড়ার টেবিলে ৮ জনের পড়াশুনা। কেউ চেয়ার টেবিলে তো কেউ খাটে বসে পড়াশুনা। আর দুষ্টুমী, খুনসুটি তো লেগেই থাকত। লোকে বলে তিন নারী এক জায়গা হলে নাকি বাজার হয়ে যায়, সেখানে আমরা এক রুমে আটজন তাহলে কয়টা বাজার হয়
রুমে রাত দশটা পর্যন্ত সাধারনত গল্পই হত, কাকে কোন ছেলে কি বলে টিজ করেছে, কার পিছনে কোন ছেলে হল পর্যন্ত হেটে এসেছে এইসব।
দূর্ভাষীর বান্ধবী তাহমিনা আপু আবার এক কাঠী সরেস। যেহেতু ক্যাম্পাসে সিনিয়র আর তার ফ্রেন্ড সার্কেল টা ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকারী গ্রুপ তাই তার প্রভাবটা রুমে একটু বেশী আর কি
সাড়ে নয়টা বাজার সাথে সাথে আপু তার কম্পিউটার অন করতেন আর একটা হিন্দি ছবি চালিয়ে দিতেন, তখন ডিভিডি এত বেশী প্রচলিত হয়নি, সিডি সাপ্লাই আসত খানজাহান আলী হল বা খান বাহাদুর আহসানুল্লা হল থেকে। রাত ১২টা পর্যন্ত ছবি দেখা, তারপর ডিজুসের ফ্রি আলাপ রাত ৩টা ৪টা পর্যন্ত। আমার ডিজুস সিম না থাকায় রুমমেটদের গল্প করা ষুনা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলাই ছিল কাজ। এভাবে চলতে লাগল আমার হল জীবন।
সকাল বেলা শুরু হত আবার নতুন একটা দিন। কোন কোন দিন ঘন্টা হিসাবে রিক্সা ভাড়া নিয়ে আমি আর দূর্ভাষী বেরিয়ে পড়তাম ঘুরতে। রুপসা ব্রীজ, বটিয়াঘাটা এলাকা চষে বেড়িয়েছি দু'জনে তখন।
হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূর্যাস্ত আইন জারী করল। সূর্য ডোবার আগে হলে প্রবেশ করতে হবে না হলে অভিভাবকের আসা লাগবে হলে ঢুকতে গেলে। কি আর করা বিকালের ঘোরাঘুরিটা কমাতে হলো।
এরই মধ্যে ২০০৪ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ১৩ মার্চ কটকা সীবিচে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচারের ৯জন এবং বুয়েটের ২ জনসহ মোট ১১ জনের সলিল সমাধী হলো। ফজরের আজানের সময় ১১ জনের মধ্যে ২ জন রুপা আপু আর কাওছার ভাইয়ের শবদেহ এসে পৌছায় ক্যাম্পাসে। বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বসন্তের সেই ভোরে প্রথম প্রতক্ষ করার সুযোগ হয় মানুষের লাশ নিয়ে রাজনীতি করার ঘৃন্য মানসিকতাকে। সেদিন দুই বন্ধু সেতু আর দূর্ভাষীর প্রতিবাদের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় প্রশাসন। ছাত্রদের দাবী অনুযায়ী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রাজী হয় প্রশাসন (বিস্তারিত পরে কোন এক পোস্টে জানাব)।
এই ঘটনায় পুরা ক্যাম্পাসে শোকের মাতম। কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে রুপা আপু বৃহস্পতিবার বিকালে আমাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলেছেন তার নিথর দেহ তখন আমাদের সামনে অথচ ৩৬ ঘন্টা সময়ও পার হয়নি।
মার্চের এই ঘটনার সূত্র ধরে তদন্ত নামের প্রহসনের এক পর্যায়ে ২৪ মে ছাত্ররা ভিসি দপ্তর অবরোধ করে এবং সে অবরোধের প্রতিশোধ নিতে কুচক্রিমহল কত নগ্ন হতে পারে তা প্রকাশ করে জুলাই মাসে এক স্যাবোটাসের মাধ্যমে যা আমার লেখা "আমার বন্ধু" ধারাবাহিকে আপনারা অনেকেই পড়েছেন। সেদিনের স্মৃতি আজও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাদেরকে।
(ক্রমশ)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

