somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার হল জীবন: কিছু স্মৃতি রোমন্থন ৪

৩১ শে জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার হল জীবন: কিছু স্মৃতি রোমন্থন ৩

সেদিন ছিল ২৪ মে, কটকা ট্রাজেডির তদন্ত নামক প্রহসন এর প্রতিবাদে আর্কিটেকচার এর ছাত্র ছাত্রীদের প্রতিবাদের সাথে একাত্নতা প্রকাশ করে সাধারন ছাত্র-ছাত্রীরা। প্রতিবাদের একপর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের দাবী আদায়ে অবরুদ্ধ করে রাখে ভিসি, প্রোভিসিসহ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের দাবী আদায়ের দ্বার-প্রান্তে তখনই ঘটল এক নতুন নাটক, আর সেদিনই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হলো শিবিরের নিকৃষ্ট মানসিকতার।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি অরাজনৈতিক হলে ও গোপনে সংগঠিত ছিল শিবির। সেদিন প্রশাসনের সাথে ছাত্রদের আলোচনা যখন চৃড়ান্ত হতে চলেছে তখন শিবিরের বহিরাগত প্রায় ৪০ জন ক্যাডার ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এবং অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়। এতে সাধারন ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজনকারীদের ভূল বুঝে তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে এবং ক্যাম্পাসে অস্ত্রের মহড়া প্রদর্শণ করায় পরদিন তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সম্মেলন করে এবং মৌন মিছিল ও করে। শিবিরের একটি চালে প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজনকারীরা দেখতে না দেখতে হিরো থেকে ভিলেনে পরিনত হলো।

এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে কটকা ট্রাজেডি থেকে সবার নজর অন্য দিকে চলে গেল, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় শিবির সেদিন যে ঘৃন্য ডাইভারশন দিলো সেদিকেই নজর গেলো সবার। এতে প্রশাসনের দূর্নীতি বিরোধি সচেতন ছাত্ররা ভিতরে ভিতরে আর ও ফুসে ওঠে কিন্তু তাদের কিছু করার ছিল না ঐ মুহুর্তে, কারন কথা বললেই অস্ত্রধারী শিবির তকমা লেগে যাবে গায়ে, তাই তারা আপাতত চুপ থাকাই ভালো মনে করল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় এ গ্রীস্মের ছুটি ঘোষনা করা হয়।
আমিও হল জীবন এ আপাতত ইস্তফা দিয়ে গেলাম গ্রামের বাড়িতে, আব্বু আম্মু ও এলো। অনেকদিন পরে আব্বু আম্মু ভাই বোন সবাই একত্রিত হলাম। বেশ মজা হলো, আব্বুর ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি ফিরে গেলেন কর্মস্থলে। কিন্তু আম্মু এবং অন্য সবাই সহ আমরা থেকে গেলাম গ্রামের বাড়িতে, মজা করে আম, কাঠাল, জাম, ডাব এগুলি খাওয়া আর আড্ডা, সত্যি যেন অনেকদিন পর আমি আমার ঘরে ফিরেছি এমন একটা ফিলিংস।
একদিন এই ছুটি ও শেষ হলো, ২৭ জুন ফিরে এলাম হলে। সন্ধ্যা বেলায় সেতু ও দূর্ভাষী'র সাথে দেখা হলো, ক্যাম্পাসের সংবাদ য শুনলাম তাতে তো মাথায় হাত। দূর্ভাষীদের বিভাগে নতুন একজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে পাস করেছেন এবং ইন্টারমিডিয়েটে তিনি নকলের দায়ে বহিস্কার হয়েছে। এর প্রতিবাদ ওরা করবেই। কিছুতেই নকলের দায়ে বহিস্কৃত কেউকে ওরা শিক্ষক হিসাবে মেনে নিবে না।
পরদিন হরতাল থাকায় ক্যাম্পাস এ কোন ক্লাস ছিল না এবং সেতুরা তাদের কর্মসূচী স্থগিত করে। ঐ দিন অনেকক্ষন আড্ডা মারলাম, একসাথে লাঞ্চ সেরে হলে ফিরলাম।
এরপর থেকে ক্যাম্পাস ক্রমে উত্তপ্ত হতে থাকে এবং ৪ জুলাই ঘটে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের সবচেয়ে ঘৃন্য ও নোংরা ঘটনা। কর্তৃপক্ষের কুচক্রে সেতুরা ১৫ জন বহিস্কার হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, যা 'আমার বন্ধু ' পোস্টে আপনারা জেনেছেন।
পরদিন ক্যাস্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয় এবং প্রশাসন হল খালি করার নির্দেশ দেয়, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে হল খালি করার নির্দেশ প্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
ক্লাস বন্ধ থাকার ঐ সময়গুলির কথা ভূলতে পারি না আজও। সারাদিন কোন কাজ নেই, ক্যাম্পাসে যাই, সেতুদের সাথে বসে আড্ডা দেই, কিন্তু সে আড্ডা আর আড্ডা ছিল না। সবসময় প্রশাসনের কর্মকান্ড পর্যালোচনা, পরবর্তী করনীয় এসব নিয়েই ওদের আলোচনা, আমি শূধু নিরব দর্শক। সেদিন দেখেছিলাম, আমার বন্ধুরা কতটা ঠান্ডা মাথায় সামনে এগুতে জানে চরম প্রতিকূল পরিবেশে ও। প্রশাসন যখন দেখল কোনভাবেই ওদের দমন করা যাচ্ছেনা তখন মামলার পর মামলা দেয়া শুরু করল। সেতুরা ও কম যায় না। সবকিছু চরম ধৈর্য্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্বার সাথে ট্যাকল করতে লাগল। আমার কাজ দূর্ভাষীকে সময় দেয়া, না সে চায়নি আমি আমার দায়িত্ববোধ থেকে করেছি।
আগস্টের ৫ তারিখ সেতুদেরকে পুলিশ দিয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। সেতু বা দূর্ভাষী কেউ তখন হলে ছিল না। মোবাইলে ওদের এক বন্ধু খবরটি ওদের জানায়, দূর্ভাষী তখন তাকে জানায় শুধু মাত্র ১ টা বেডশীট নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আয় যাতে প্রশাসন বোঝে যে আমরা হল ছেড়ে দিয়েছি, রুমে বাকী যারা ছির সবাই সেতুর জুনিয়র ওরা থাকবে তাই জিনিসপত্র নিয়ে চিন্তা না করতে বলল। ঐ একটাই ছিল দূর্ভাষীর জীবনে বড় ভূল। বই সংগ্রহের বাতিক ছিল ওর। ইকনমিক্সের প্রায় ১০০ রেপারেন্স বই ছিল ওর কাছে এর বাইরে ছিল কয়েক শত উপন্যাস ও গল্প সমগ্র। পরে যখন দূর্ভাষী ক্যাম্পাসে ফেরে তখন সেগুলি আর পাওয়া যাইনি।
ওদের যখন হল থেকে বের করে দেয়া হয়, দূর্ভাষী তখন একটা ভর্তি কোচিং এ ক্লাস নিতে ব্যস্ত। ফোনেই নিরালা আবাসিক এলাকায় বাসা ঠিক করে ফেলল, হল থেকে বিতাড়িত সবাই সেকানে উঠল। দূর্ভাষী আমাকে ফোন করে কোচিং এ ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দিয়ে বলল এগুলি যা করে হোক সেতুর কাছে পৌছে দিতে ঘর ভাড়া দেয়া লাগবে। আমি সেদিন অবাক হয়েছিলাম, এমন দূর্দিনে ও কিভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে কোচিং এ ক্লাস করাচ্ছে। পরে যখন ওর কাছে জানতে চাইলাম, ও বলল উপায় নেই, বাড়তি খরচের টাকা তো যোগাড় করতে হবে। কিন্তু ওরা যদি সেদিন চাইত টাকার বিছানায় ঘুমিয়ে থাকতে পারত, প্রশাসন থেকে কম্প্রোমাইজের প্রস্তাব, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়া নেতাদের খূব প্রথম টার্গেট ছিল ওরা দুই বন্ধু, সবাই ওদের কে হাতে রাখতে চায়, কিন্তু দুই বন্ধুর একই কথা কার ও লেজুরবৃত্তি করব না।
আমার দিনগুলি ঐ সময়ে খুব্ই বোরিং ছিল, আম্মু বারবার বাসায় যেতে বলছেন, কিন্তু আমি যেতে পারছি না। দূর্ভাষীর এমন বিপদের দিনে ওকে ছেড়ে কোথা ও যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা, আবার থেকে ও কিছু করতে পারছি না, ওরা সারাদিন ব্যস্ত থাকে বিভিন্ন কর্মকান্ডে, যেখানে আমাকে কোনভাবেই জড়াবে না ওরা। হলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উড়োখবর এ বিচলিত হয়ে পড়তাম, ফোন করতাম ওদের, ওরা এসবে কান না দিতে বলত। কিন্তু আমি তখন কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হলের সেই সিনিয়র আপু তখন বেশ সহযোগীতা করেছে ভেঙ্গে পড়তে দেয়নি। প্রায় সন্ধ্যা বেলা দূর্ভাষীকে ঝাড়ি মেরে ফ্রি রাখত আর আমাকে সাথে নিয়ে চলে যেত নিউমার্কেটে আর দূর্ভাষী ও সেতুকে সেখানে আসতে বাধ্য করত আপু।


(ক্রমশ)
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×