আগের পর্বের লিঙ্কঃ প্রেম প্রচেষ্টা - পর্ব ১
কন্যা আমার ছোট ভাইয়ের বান্ধবীর বান্ধবী টাইপের কিছু একটা হইবে। উহাকে এই কন্যার সহিত পরিচিত হইবার মনোবাঞ্ছনা ব্যক্ত করিলে ও একখানা কাষ্ঠ হাসি হাসিয়া কহিল যে হইবে হইবে, সময়ে সবই হইবে। কন্যাকে আমার সহিত পরিচিত করাইবার পূর্বে তাহার নিজেরই নাকি কন্যার সহিত আরও ভালমতো একটু পরিচিত হইতে হইবে। প্রয়োজনে তাহার বন্ধু-বান্ধব লইয়া সে চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে পার্টি থ্রো করিবে কন্যার সম্মানে (এবং পার্টির ব্যায়ভার যে আমাকেই বহন করিতে হইবে, ইহা বলাই বাহুল্য)। শত হইলেও নিজে ঠিকমতো যাচাই না করিয়া তো আমাকে কাহারও সহিত সে জড়াইয়া ফেলিতে পারে না আমার ভাই হইয়া। তবে কিনা এইসব তাহার কাছে বায় হাত কা খেল। অতীব সত্বরই একটা ব্যবস্থা করিয়া ফেলিবে সে।
এই আশাতেই আমার দিন পার হইতে লাগিলো। কিন্তু দিন ঘুরিয়া সপ্তাহ, এবং সপ্তাহ ঘুরিয়া মাস পার হইয়া যায়, তথাপি ঘটনার আর কোন অগ্রগতি নাই দেখিয়া আমি বড়ই বিচলিত হইয়া পড়িলাম। ছোটভাইকে যতোই পাকড়াও করি, তাহার একই কথা। সবুরে নাকি মেওয়া ফলে। ইতোমধ্যে মেওয়া ফলিতে ফলিতেই বৃত্তান্ত আমার মাতৃদেবীর কর্ণ পর্যন্ত গোচরীভূত হইয়া গেল। ওঁনার চক্ষুদ্বয় ৫০০ ওয়াটের টর্চলাইটের ন্যায় জ্বলজ্বল করিয়া জ্বলিতে নিভিতে লাগিলো। উত্সাহের অতিশয্যে তিনি তক্ষুণি কন্যার বাসায় গিয়া কন্যা দেখিয়া আসিবেন বলিয়া অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। তিনি বলিলেন কন্যা দেখিবার মতো জটিল কর্ম সম্পাদন কখনোই আমার ছোটভাইয়ের মতো নিরীহ গোবেচারার দ্বারা সম্ভব নয়। কন্যা সম্প্রদায় মাত্রেই নাকি বহুবিধ ছলাকলার অধিকারিনী। তাই এই মহান কর্তব্য তিনি নিজ দায়িত্বে পালন করিতে ইচ্ছুক। এবং ওঁনি কন্যা দর্শন করিয়া একমাত্র আমাকে সবুজ বাত্তির সিগন্যাল দেখাইলেই আমি যেন চক্ষু বন্ধ করিয়া নির্দ্বিধায় প্রেমে ঝাপাইয়া পড়ি। মনে হইলো যেন ছেলে প্রেম করিবে, ইহার চাইতে আনন্দের আর কিছুই বুঝি হইতে পারে না। আমি দেখিলাম সামনে আমার কপালে খারাবীর সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। কন্যা যদি আমার পছন্দ না হইতেই মাতৃদেবীর পছন্দ হইয়া যায়, তখন যে কি হইতে পারে উহা ভাবিতেই আমার হাত পা ঠান্ডা হইয়া আসিতে লাগিলো। বুঝিলাম আর দেরী করা যায় না। এইবার দায়িত্ব নিজ কাধে তুলিয়া লইয়া শিঘ্রই ইহার একটা বিহিত করিতে হইবে।
আমি নিজেই বা কম যাই কিসে? ঘনিষ্ট পরামর্শদাতা এবং যথেষ্ট কূটবুদ্ধিসম্পন্ন দোস্তকে ডাকিয়া লইয়া গোপন মিটিংয়ে বসিলাম। আলোচনায় যথাবিহিত আমার উর্বর মস্তিষ্ক হইতে কন্যার সহিত পরিচিত হইবার এক অভাবনীয় সরল ফর্মুলার উদগীরণ হইলো।
১. কন্যার বান্ধবী বা সহপাঠিনী কাউকে খুঁজিয়া বাহির কর তোমার পরিচিতদের মধ্য হইতে।
২. অতঃপর উহার মাধ্যমে কন্যার সহিত পরিচিত হও।
খুঁজিতেই আমার এই বন্ধুর পরিচিত এক কন্যার সন্ধান পাওয়া গেলো যে কিনা একই বছর একই স্কুল হইতে পাশ করিয়া বাহির হইয়াছে। স্বভাবতঃই দুই কন্যার মধ্যে বন্ধুত্ব না থাকিলেও পরিচয় থাকিবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রহিয়াছে। এবং খবর লইয়াও জানা গেলো যে আমাদের ধারনাই সঠিক। অতএব উহাকে খবর দেয়া হইলো। ধরা যাক এই কন্যার নাম অনামিকা। ইহাকে শেষবার আমি যখন দেখিয়াছিলাম, তখন সে ক্লাস সিক্সের ফুটফুটে পুঁচকে এক বালিকা, মুখ ঝামটা দিয়া দৌড়াইয়া সিড়ি দিয়া নামিয়া যাইতেছিলো। সেই বালিকাই এখন কলেজে অধ্যায়ন করিতেছে, এবং ইহা আমাকে প্রেম করিবার জন্যে সহায়তা করিবে, ভাবিতেই কিঞ্চিত্ ভ্যাবাচেকা খাইলাম। যাই হোক, আমার দোস্ত অনামিকাকে জানাইলো যে আমি এই ব্যপারে বিস্তারিত আলাপের নিমিত্তে উহার সাক্ষাতপ্রার্থী। শুনিয়া কন্যাও নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণে উহার কলেজের গেইটে আমাদিগকে অপেক্ষা করিবার সংবাদ পাঠাইলো।
যথাসময়ে গার্লস কলেজের গেইটের সামনে আমি এবং আমার দোস্ত গিয়া উপস্থিত হইলাম। এবং শুরু হইলো কাঠফাঁটা রোদের মধ্যে আমাদের পায়চারী পর্ব। গেইট দিয়া কতো কন্যা কলেজে ঢুকিলো আর বাহির হইলো, কিন্তু কাংক্ষিত কন্যাটির কোন পাত্তা নাই। যেন আমাদের মতো এহেন প্রেমকাতর কাউকে পাত্তা দিবে না বলিয়াই সে মনস্থ করিয়াছে। এইদিকে খরতাপ রোদে আমরা যতো না কাতর হইতেছি, তাহার হইতে অধিক কাতর হইতেছি যখন দেখি পথচারীরা রাস্তা দিয়া আমাদের পার হইবার সময় অধিকাংশই বক্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া যাইতেছে। বুঝিলাম গার্লস কলেজের সামনে দাড়াইয়া থাকাটা কোনমতেই সুবিধাজনক কোন কর্ম নয়। মনে মনে আক্ষেপ করিলাম, অবশেষে এও ছিলো আমার কপালে! এই সময়ে কাঁটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটা দিতেই কোথা হইতে যেন পুঁচকে এক ছোকরার আবির্ভাব ঘটিলো সেইখানে। আসিয়াই সে আমাকে দেখিয়া যেন আসমান হইতে টুপ করিয়া পতিত হইলো। অবাক হইয়া জানিতে চাহিলো, "পল্লব ভাই! আপনি এই অসময়ে এইখানে কি করিতেছেন?!?" বুঝিলাম আজ সত্যিই আমার খবর আছে। এই ইচঁড়ে পাকা আমার এলাকারই সুযোগ্য সন্তান। এবং খুব শিঘ্রই আমার এলাকায় ইহা রটিয়া যাইবে যে আমাকে নিয়মিত গার্লস কলেজের গেইটে ঘুরঘুর করিতে দেখা যাইতেছে আজকাল। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে অভিসম্পাত করিতে করিতে কিছু একটা বলিয়া এই পুঁচকে-কে কোনমতে সেইখান হইতে বিদায় করিলাম। অতঃপর আমার দোস্তের দিকে ফিরিয়া দেখি যে সে কোথা হইতে আগত এক নিনজার সহিত গুজুর গুজুর করিয়া খোশগল্প করিতেছে। আমি মরিতেছি আমার জ্বালায়, আর আমার দোস্ত ব্যস্ত আছেন কোথাকার কোন এক বোরখাওয়ালীর সহিত গল্পে। বড়ই বেজার হইয়া উহার পার্শ্বে গিয়া দাড়াইলাম। অতঃপর বোরখাওয়ালীকে আপাদমস্তক একবার ক্রুঢ় দৃষ্টিবিদ্ধ করিয়া চোখ ফিরাইয়া লইতে লইতেও আবার ফিরিয়া তাকাইলাম বোরখার ফাঁক দিয়া গোচরীভুত তাহার চক্ষুদ্বয়ের সৌন্দর্য অবলোকন করিতে। এবং কোন কন্যার দিকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়া তাকাইয়া নিজের অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করায় নিজেই যেন কিঞ্চিত্ লজ্জিত হইলাম। এরই ফাঁকে দোস্ত আমাকে পরিচিত করাইয়া দিলো বোরখাওয়ালীর সহিত। এ-ই তাহা হইলে অনামিকা! বোরখার ছদ্মবেশে তাহাকে চিনিতে পারি নাই বলিয়া দ্বিতীয়বারের মতো আমি লজ্জিত হইলাম।
পরের পর্বের লিঙ্কঃ প্রেম প্রচেষ্টা - শেষ পর্ব

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

