সকাল ছয়টা। তখনো সূর্য ওঠেনি। অগত্যা ঢুলুঢুলু চোখে ঘুম থেকে উঠে পড়তে হয় ওদের। কাজে হাত লাগাতে হয়। সকাল সোয়া সাতটা থেকে ডাইনিংয়ে খাবার দেওয়া শুরু। তাই ভোরে ওদের তাড়াহুড়া করে উঠতে হয়। এরই মধ্যে খাবার খেতে এসে কেউ হয়তো বলে, ‘পারভেজ, চা দিয়ে যাও।’ অন্যদিকে আরেক টেবিল থেকে জোর গলায় ডাকছে, ‘পারভেজ, আমার চা কোথায়?’ ছোট্ট পারভেজ ততক্ষণে দিশেহারা না হয়ে সামলে নেয়। মুখে একপশলা হাসি টেনে ঠিকই সবার মন রক্ষা করে কাজ করে।
পারভেজকে ডেকে কাছে বসাই। প্রশ্ন করি, কত দিন এখানে? নিজের হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে উত্তর দেয়, ‘এক বছর হইল। তয় এইবার ছুটিতে দ্যাশে জামুগা। দ্যাশে গিয়া লেখাপড়া করুম, মানুষ হমু।’
তাহলে কেন এসেছিলে, কাজে?
পারভেজের চোখ চকচক করছে।
পারভেজ স্বপ্ন দেখে সে জমির আল ধরে হেঁটে যাচ্ছে স্কুলের দিকে। হাতে বই আর চোখে বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন।
ধানমন্ডি ৮ নম্বর লেকের ব্রিজের ধারেই হেঁটে বেড়ায় নানা বয়সী শিশু। কেউ বোতল টোকায়, কেউ বা চকলেট বিক্রি করে, আবার কেউ বাদাম বিক্রি করে। এই কচি মুখগুলোর হয়তো স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তার বদলে হাতে তুলে নিয়েছে কাজ। রোজগার করছে আর পুরোদস্তুর চালিয়ে নিচ্ছে একটা সংসার।
পানি খেয়ে বোতলটা ফেলেছি, এরই মধ্যে ছুটে আসে ছোট্ট এক শিশু, কাঁধে ঝোলা। বোতলটা পেয়েই ঝোলায় পুরে ফেলে। কাছে ডাকতেই ভয় পেয়ে যায়, পাছে বোতল নেওয়ার অভিযোগে দণ্ড পেতে হয়! অভয় দিয়েই ডাকি, নাম কী? ভীত চোখেই উত্তর দেয়, ‘ডাক নাম তারেক আর ভালো নাম তারেকুল ইসলাম। মাদ্রাসার সবাই আমারে তারেক নামেই ডাকে।’ বোঝা যাচ্ছে, তারেক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
থাকো কোথায়?
রায়েরবাজার, আমি, মা আর ছোড বইন।
প্রতিদিন কত টাকা হয়?
সামনের বড় দুই দাঁত বের করে বলে, ‘আছে না! তয় কব না।’
রীনা ডাকতে থাকে হাসান আর তারেককে, ‘বেলা বাড়তাছে। অহন কথা বাদ দিয়া কামে আয়।’ রীনা ওদের সঙ্গী, ওদের সঙ্গে অভিভাবকসুলভ আচরণ করে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওদের সবার স্বপ্ন আছে এবং তা হলো বড় সাবগো মতো হওয়া।
আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। অথচ আমাদের দেশে কর্মে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৭৪ লাখ। আর এসব শিশুর একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। এরাও স্বপ্ন দেখে বড় মানুষ হওয়ার, তবে কারও কারও স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাওয়ার আগেই ঝরে যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



