somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাসিনার ভারত সফর: সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইস্যু

২৮ শে জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৬:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাসিনার ভারত সফরকে কেন্দ্র করে যৌথ ঘোষণার নিরাপত্তা বিষয়ক পয়েন্টে দাসখত স্বাক্ষর বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইস্যুকে বহু দিক থেকে বিপদজনক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে; সোজাসাপ্টা বললে, ভারতের শাসক শ্রেণী নিজ রাষ্ট্রকে নিজ কর্মনীতির দোষে কাফফারায় যেসব নিরাপত্তা সমস্যা, ঝুকির মধ্যে ফেলে এই সংক্রান্ত তার উদ্বেগে রাতের ঘুম হারাম করেছে - এগুলোকে আমাদের রাষ্ট্রেরও উদ্বেগ, ভাবনার বিষয় বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে আকাম আমাদের রাষ্ট্রের কখনই করেনি, জড়ায়নি অথচ অন্যের কর্মফলের ভাগীদার করে ফেলা হয়েছে আমাদেরকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যা আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়ক কোন ইস্যুই ছিল না তা গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা হিসাবে হয়ে হাজির হয়েছে, আর এসবই করা হয়েছে বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়কে পায়ে দলে এবং খাটো বিবেচনা করে যৌথ ঘোষণায় নিরাপত্তা বিষয়ক বয়ানে শেখ হাসিনার স্বাক্ষরে। আমাদের রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিষয়ে যা আমাদের সমস্যা নয়, এখনো হয়নি, সমাজের নিজস্ব ডায়নামিক্সের কারণে একটা প্রতিরোধ আছে - এই সুবিধাগুলোকে উপেক্ষা করে ভারত রাষ্ট্রের শত্রুকে আমাদের রাষ্ট্রেরও যেন শত্রু হয়ে উঠে তার তাবৎ বন্দোবস্ত সম্পন্ন করা হয়েছে, এ যেন কাতিল বা নিজের খুনিকে খুন হবার জন্য দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে আনা।

যৌথ ঘোষণায় নিরাপত্তা ইস্যুর মুখ্য বিষয় "সন্ত্রাসবাদ"। কাজেই "সন্ত্রাসবাদ"কে কিভাবে দেখব এবিষয়ে আগে কথা না বলে নিলে আমাদের এই আলোচনা বিভ্রান্তিতে পড়বে। এই বিবেচনায় আগে "সন্ত্রাসবাদ" ধারণাটাকে পরিস্কার করে নিতে সময় নিব। যাতে এরপর সেই ধারণার উপর ভরসা করে যৌথ ঘোষণায় নিরাপত্তা ইস্যুতে কিভাবে আমরা নিজের রাষ্ট্রকে বিপদগ্রস্হ করেছি তা পরিস্কার বুঝা যায়।
অনুমান করছি একাজ করতে গিয়ে পোষ্ট দীর্ঘ হবে ফলে সম্ভবত দুই পর্বে এই পোষ্ট শেষ করতে হবে; দেখা যাক আমরা কোথায় দাঁড়াই।

"সন্ত্রাসবাদ" পশ্চিমে এক মুখরোচক শব্দ। ওদের রাষ্ট্রগুলোকে নিপীড়ক করে গড়ে তুলার বদ কাজগুলোকে আড়াল করতে "সন্ত্রাসবাদ" - এই শব্দের জুড়ি নাই, খুবই লাগসই কাজের। রাষ্ট্র নিজ ব্যর্থতায় "সন্ত্রাসবাদ" জন্ম দেয়, অর্থাৎ খোদ রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের নীতি, জবরদস্তিতে নিজের কোন জনগোষ্ঠির প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা উপেক্ষার একটা মিলিত ফলাফল হলো সন্ত্রাসবাদী পরিস্হিতির জন্ম দেয়া। রাষ্ট্রের নিজ ব্যর্থতায় জনগোষ্ঠির প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা, জবরদস্তিতে ফেলে রাখলে একসময় এরই উল্টো পিঠের চেহারা হয়ে উঠে "সন্ত্রাসবাদ"। কেউ যেন "সন্ত্রাসবাদ" উল্টিয়ে দেখে সেদিক থেকে প্রশ্ন না তুলতে পারে যে, "সন্ত্রাসবাদ" কেন জন্ম নিল, রাষ্ট্রের এই শত্রু গজিয়ে উঠলো কেন? - জন্ম দেবার পিছনে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলো কেন ভুমিকা রেখেছিল, এই দায় সে অস্বীকার করতে চায় বলে কেবল "ফলাফলটাকেই" অর্থাৎ "সন্ত্রাসবাদ" খারাপ - ঘটনার বাইরে থেকে এই আরোপিত নৈতিকতায় নেতিধারণা, "সন্ত্রাসবাদ"ই সবসমস্যার গোড়া - এই ভাবনা ছড়িয়ে একদিকে রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতা, অসৎ স্বার্থের পরিচালিত ও এর কর্মফলকে ভুলিয়ে রাখতে চায় অন্যদিকে রাষ্ট্রকে নিপীড়ক আইনী ও অন্যান্য অলঙ্কারে সাজাতে ন্যায্যতা হিসাবে "সন্ত্রাসবাদ" কত খারাপ জিনিষ এই প্রচারকে ব্যবহার করে। "সন্ত্রাসবাদ" হয়ত খারাপ - কেউ সহজেই এ সিদ্ধান্ত আসতে পারে কিন্তু খোদ রাষ্ট্রই যে "সন্ত্রাসবাদ"এর প্রযোজক কারণ এটা বুঝতে আমাদেরকে কষ্ট করতে হয়, মাথা খাটাতে হয়। প্রচারের নীচে কী আছে তা পর্যন্ত পৌছাতে পারতে হয়।

আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার হামলার সময় থেকে "ওয়ার এন্ড টেরর" আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের ঘোষিত শত্রু টেররিজম -এটাই রাষ্ট্রনীতি হিসাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এবার টেরর বা সন্ত্রাস এক নতুন সংজ্ঞায় হাজির করা হয়েছে তাতে দুনিয়াজুড়ে রাজনীতিতে যে নতুন গ্লোবাল ফেনোমনা হাজির - ইসলামি র‌্যাডিক্যাল রাজনীতি - এরই আমেরিকান ন্যারেটিভ বা ভাষ্য হলো সন্ত্রাসবাদ। আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার হামলা ও যুদ্ধ ঘোষণায় অংশগ্রহণ করে সারা পশ্চিম আমেরিকান রাষ্ট্রের এই শত্রুকে ইউরোপও নিজেদের শত্রু বলে বরণ করে নিয়েছে। সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় ইসলামি র‌্যাডিক্যাল রাজনীতিকে টার্গেট করা হলেও এতে কার্যত খোদ ইসলাম পশ্চিমের শত্রু বলে ঘোষিত হয়ে গেছে। মানুষের ইসলামী নাম বা কোন মুসলিম অধ্যুসিত রাষ্ট্রের নাগরিক - এরা সবাই ঐ সংজ্ঞায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের আচার আচরণ, উচ্চারণে একএকজন ভয়ঙ্কর সন্দেহভাজন শত্রু বলে গণ্য হতে শুরু করেছে। ফলাফল দাঁড়িয়েছে তাঁদের মুখে বলা "সন্ত্রাসবাদের" বিরুদ্ধে যুদ্ধ কার্যত হয়েছে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ফলে দুপক্ষের লড়াই, "ওয়ার এন্ড টেরর" এর আড়লে একালে আবার এক ধর্মযুদ্ধ বা ক্রসেডের প্রক্সি লড়ছে।

জাতিসংঘ যাকে মনে করার কথা ও যার জন্ম উদ্দেশ্য দিক থেকে দুনিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবাদ, সংঘর্ষ ইত্যাদি আলাপ আলোচনার পথে নিরসনের চেষ্টা করাই এর কাজ, লক্ষ্য ও ম্যান্ডেট; বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য এটা মেনে নিয়েও যুদ্ধের দ্বারা এর মীমাংসার বদলে এর একটা কুটনৈতিক সমাধান, বিভিন্ন নীতি বা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের মাধ্যমে একটা সমাধান খুজে বের করা জাতিসংঘের কাজের মূলনীতি বা কর্মপরিধিমূলক গাইড লাইন। বিবদমান কোন পক্ষভুক্ত না হয়ে এড়িয়ে গিয়ে - এই আবশ্যকীয়তা বজায় রেখেই একে তাই কাজ করতে হয়। সালিশদার নিজেই বিবাদের কোন না কোন পক্ষভুক্ত হলে ঐ সালিশী কার্যক্রম অসার হতে বাধ্য - এই মৌলিক দিক মেনে চললে তবেই কোন সালিশী সংগঠন খাড়া হতে পারে, টিকতে পারে। কিন্তু আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি পশ্চিম বনাম ইসলামি র‌্যাডিক্যাল রাজনীতি - এই দুইয়ের সংঘাতে জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই নিজেকে পশ্চিমের পক্ষভুক্ত করে ফেলেছে, সন্ত্রাসবাদের পশ্চিমা সংজ্ঞাকে নিজের সংজ্ঞা বানিয়ে ফেলেছে। বুশের ইরাক আক্রমণের প্রাক্কালে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত সভায় হামলার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়াতে না পারলেও অনেক নাটক আমরা সেখানে হতে দেখেছি। WMD বা জীবন ধ্বংসী মারাত্মক মারণাস্ত্র সাদ্দাম হোসেন বহণ করছেন বলে বুশের পররাষ্ট্র উপদেস্টা কলিন পাওয়েল ঐ সভায় (ঐ শেষ সভা সে সময় বিবিসি, সিএনএনে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছিল) একটা লরীর হাতে আঁকা স্কেচ দেখিয়ে ওটাই মারনাস্ত্র বহণের প্রমাণ বলে হাস্যকর কান্ড ঘটিয়েছিলেন। ইরাকে হামলা ও দখল হয়ে যাবার পরে অবশ্য বুশ-ব্লেয়ার স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তাদের মারণাস্ত্রের গল্প ডাহা মিথ্যা ছিল। নিজ নিজ দেশের ভুল গোয়েন্দা তথ্যদাতা বা তথ্য ম্যানুফ্যাকচারারকে অবশ্য এতে কোন শাস্তি পেতে হয়েছে এমন আমরা শুনিনি কারণ তাহলে তো শাস্তি দিতে হতো খোদ বুশ-ব্লেয়ারসহ পশ্চিমের সরকার-প্রধান অনেককেই যাদের ইরাক হামলার একটা অজুহাত দরকার এবং তা মিটাতেই এই তথ্য ম্যানুফ্যাকচারিং ঘটেছিল। কিন্তু "ওয়ার এন্ড টেরর" অর্থাৎ তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জালে ফেলে ইরাক দখল করে নিতে পারলেও জাতিসংঘের খাতাপত্রে ইরাক হামলা ও দখল ছিল অবৈধ এবং ইরাকে আমেরিকা, বৃটেন সৈন্যরা দখলদার সৈন্য - জাতিসংঘের চোখে এখনও এটাই তাদের ষ্টাটাস। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল কফি আনান একবার এই খাতাপত্রের কথাটা মুখে পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন, এতে তাঁকে ক্ষমতাধর বুশের হাতে কী পরিমাণ হেস্তনেস্ত হতে হয়েছিল তাও আমরা দেখেছিলাম।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও মানি লন্ডারিং আইনের দায় জাতিসংঘ নিয়ে ফেলেছে। মানি লন্ডারিং আইন - অর্থাৎ "সন্ত্রাসবাদের" বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়াইয়ের পশ্চিমের একটা আইনী হাতিয়ার; নিজেদের টাকা বহনে "সন্ত্রাসবাদীরা" যেন আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক ব্যাবস্হা ব্যবহার না করতে পারে, টাকা হালাল না করে নিতে পারে - তাতে বাধা দেওয়া ও তা মনিটারিং এর জন্য বাংলাদেশের ব্যাঙ্কের মত বিভিন্ন দেশের প্রধান ব্যাঙ্কগুলোকে জাতিসংঘের মানি লন্ডারিং আইন মানতে বাধ্য করা এর লক্ষ্য। এর মানে দাড়িয়েছে "সন্ত্রাসবাদ" বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়াইয়ে পশ্চিমের একটা আইনী হাতিয়ার - মানি লন্ডারিং আইন - এই দায় বইতে গিয়ে পশ্চিমের বিশেষত আমেরিকার "সন্ত্রাসবাদের" সংজ্ঞা জাতিসংঘ গিলে ফেলেছে; যুদ্ধ এড়িয়ে সালিশের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার সালিশদার প্রতিষ্ঠান হিসাবে জাতিসংঘ ইসলামি র‌্যাডিক্যাল রাজনীতি বনাম পশ্চিমের যুদ্ধ, বুশের ভাষায় ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ, সে লড়াই বিবাদে খোদ সালিশদার জাতিসংঘই একটা পক্ষ অবলম্বন করে বসে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি দেখে আমেরিকার উদ্যোগে ও অন্যান্যদের সমর্থনে জাতিসংঘ নামে সালিশদার প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। কিন্তু এজন্য বিড়াল আর মাছ খাবে না - এমন ভাবনায় পশ্চিমারা আর যুদ্ধ করবে না এটা ভেবে তা করা হয়নি। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, জাতিসংঘ জন্মের চার বছরের মধ্যে April, 1949 পশ্চিমা যুদ্ধজোট ন্যাটোর (NATO) জন্ম। ন্যাটোর জন্ম হওয়াতে জাতিসংঘের কাজ কমে যায়নি বা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নাই প্রমাণ হয়নি। কারণ ফ্যাক্টস হলো, দুনিয়াতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে অথবা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিবাদ স্বার্থ সংঘাত আছে এবং আগামী বহুদিন থাকবে - এই সত্য স্বীকার করে নিয়েই জাতিসংঘের জন্ম। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে ন্যাটোর জন্ম নেওয়াতে জাতিসংঘের কোন সমস্যা হয়নি, হুমকিও বোধ করেনি। কমিউনিজমকে পশ্চিমের বহু দেশই আমেরিকার মত সন্ত্রাসবাদ বা টেররিষ্ট কাজ কারবার হিসাবে চিহ্নিত করেছিল; ঠিক যেভাবে আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা প্যালেস্টাইনীদের মুক্তির সংগ্রামকে টেররিষ্ট বলে আমেরিকার মত অনেক দেশ ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মুলকথা জাতিসংঘ টেররিজমের এসব সংজ্ঞাকে নিজের বলে কখনই গ্রহণ করেনি, আর এতে তার ঘোষিত ম্যান্ডেট নিয়ে চলতে, কাজ করতেও সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবারের ভয়ঙ্কর ক্রুসেডের ইঙ্গিতপূর্ণ সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজমের সংজ্ঞাকে জাতিসংঘ নিজের সংজ্ঞা বলে মেনে নিয়েছে। এর নগদ ফলাফল, লক্ষ্য করলে দেখব, ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির চোখে ইরাকে এবং পাকিস্তানে জাতিসংঘ অফিসকে ইতোমধ্যেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। অর্থাৎ হামলার লক্ষবস্তু হওয়া ব্যাপক হয়ে না উঠলেও আপাতত তা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সালিশদার নিজের কাজের সীমা লঙ্ঘন করলে, বিবদমান পক্ষগুলো থেকে দূরে না থাকতে পারলে কোন না কোন পক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক!

"সন্ত্রাসবাদ"কে নৈতিকভাবে নেতিবাচক লেবেল লাগানো কাজ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র তার নিজ তৈরি শত্রুদের গায়ে লাগিয়েছে। রাষ্ট্র নিজের আকাম, অন্যায় অবিচার, বেইনসাফির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদীদের বল প্রয়োগে দমন করে কোন ঠাসা করতে চায়, ভাবে এতেই তার রাষ্ট্রের আকাম, অন্যায় অবিচার, বেইনসাফির বলতে আর কিছু থাকবে না; সব হালাল হয়ে যাবে। অথচ দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা উপেক্ষার দিকে নজর না দিয়ে রাষ্ট্রের এই বেকুবি পদক্ষেপই প্রতিবাদকারীদের অস্ত্র তুলে নিতে পরোক্ষে প্রণোদিত করে, ঠেলে দেয়; এরপর উপায়ান্ত না দেখে রাষ্ট্র এদেরকেই শত্রু গণ্য করে "সন্ত্রাসবাদ" নৈতিক লেবেল লাগিয়ে দেয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের চোখে আমরাও এমন রাষ্ট্রশত্রু, "সন্ত্রাসবাদী" ছিলাম। ফলে এসবের মুলকথা হলো, সাধারণভাবে নিপীড়ক রাষ্ট্রের দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরের নীতি নিজেই "সন্ত্রাসবাদের" প্রযোজক কর্তা। এই ধারণার বাইরে, পুরা ঘটনা বিচার না করে, বিচ্ছিন্নভাবে, শুধু কাউকে হাতে অস্ত্র তুলে প্রতিবাদ জানাতে দেখলেই সেটাকে "সন্ত্রাসবাদ" বলে আখ্যায়িত করা শঠতা, প্রবঞ্চনামূলক অসততা।

তবে এটা ঠিকই যে প্রতিবাদ - হাতে অস্ত্র তুলে প্রতিবাদ জানানোর পর্যায়ের গেলে তা রাষ্ট্রের জন্য তা নিরাপত্তার সঙ্কট অবশ্যই তৈরি করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে হাতে অস্ত্র তুলে প্রতিবাদ জানানো মানেই এ থেকে সিদ্ধান্ত আসা যায় ঐ কাজ খারাপ, বা "সন্ত্রাসবাদ"একটা নেতি ধারণা; সব দায় "সন্ত্রাসবাদের", ঘটনার বাইরে থেকে একটা নৈতিকতা খাঁড়া করে কেবল "সন্ত্রাসবাদের" দিকে আঙ্গুল তুলে বিচার বসানোর কাজ আমরা করতে পারি না। কারণ এটা স্রেফ নৈতিকতার মামলা নয়; ভালো খারাপের বিষয়ও নয়। এটা মূলত একটা জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ত্ব, একটা উপযুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্হার দাবী উপেক্ষিত হবার সঙ্কট। আদর্শ হত আমরা যদি দেখতাম রাষ্ট্র দূরদর্শী হয়ে সময় থাকতে এই সমস্যার দিকে নজর দিয়েছে। কিন্তু জিইয়ে রাখা সঙ্কট "সন্ত্রাসবাদ" রূপে ও পর্যায়ে সামনে হাজির বলে একটা নৈতিক দন্ড হাতে কেবল "সন্ত্রাসবাদ" খারাপ না ভাল বিচারে বসা এক বেকুবি এবং তার চেয়েও বড় বিষয় হলো এতে নিপীড়ক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে দাঁড়ানো হয়। তবু বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্ন সময় স্বীয় সৃষ্ট নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করে এবং নৈতিকতা আরোপ করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে "সন্ত্রাসবাদ" একটা নেতি ধারণা, টিকে থাকার জন্য "সন্ত্রাসবাদের" নতুন নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করানোর চেষ্টাও আমরা দেখি। নিজ রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তার হুমকি ডেকে এনে এরপর - ভোটার আইডি, চোখের স্ক্যানিং, বায়োমেট্রিক পাশপোর্ট, মেশিন রিডেবল পাশপোর্ট, ন্যাংটা করে স্ক্যানিং, সারা দুনিয়ার ইমিগ্রেশন অফিসকে একই ডাটাবেসের আওতায় আনা - ইত্যাদি কতকিছু করে যাচ্ছে কিন্তু তবু রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধ আসছে না। বরং পুরা দেশকে নিরাপত্তাহীন অনিদ্রায় রাখার একটা স্হায়ী ব্যবস্হাই পাকা করছে।
এই হলো, পশ্চিমের ক্রুসেডের ইঙ্গিতমূলক ওয়ার অন টেররের "সন্ত্রাসবাদ"।

এই প্রসঙ্গে এবার সুনির্দিষ্ট করে এবার ভারত রাষ্ট্রের দিকে তাকাবো; এক কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৮ সাল থেকেই সে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। সেই থেকে আজ অবধি এশিয়ায় জাতিসংঘের প্রথম ও সবচেয়ে পুরানো অবজারভার মিশন হলো কাশ্মীর মিশন। সেসময়ে এ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক সিদ্ধান্ত হয়েছিল - কাশ্মিরীদের গণভোটে নির্ধারিত হবে কাশ্মির ভারত বা পাকিস্তান কোন দিকে থাকবে। ঐ প্রস্তাবের কোন অগ্রগতি এরপর আর কখনই হয়নি বরং দুইদেশের অধিকৃত দুই কাশ্মির, লাইন অফ কন্ট্রোলের (LOC) দাগ টেনে গেড়ে বসেছে। ভারত অধিকৃত কাশ্মির ভারতের কী একটা রাজ্য অথবা রাজ্য নয়, ওখানে স্বায়ত্ত্বশাসন দেয়া হবে, কী হবে না - এই নিয়ে মীমাংসা, সমস্যা সুরাহার দোলাচালে আশির দশকে এসে ঠেকে যায়। আগেই বলেছি, কুশাসন, খোদ রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের নীতি, জবরদস্তিতে দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা উপেক্ষার একটা মিলিত ফলাফল হলো সন্ত্রাসবাদী পরিস্হিতির জন্ম দেয়া। কাশ্মিরেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
গণভোটের পথ ভারতের জন্য অস্বস্তিকর মনে হলে এর বদলে, ভারত অধিকৃত কাশ্মিরবাসীদের আকাঙ্খা পরিপূরণে একটা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ত্ব, সে অনুযায়ী শাসন ব্যবস্হা, বাকি সারা ভারতের সাথে লেনদেন বাণিজ্যের ভিতর দিয়ে একটা সম-উন্নয়নের কর্মসুচি ইত্যাদি করে বঞ্চনাবোধ কাটিয়ে তুলতে পারা হতে পারতে নুন্যতম পদক্ষেপ। কিন্তু সেদিকে কোন দৃষ্টি না দিয়ে চল্লিশ বছর ধরে এই সমস্যা জিইয়ে রাখা হলো। ভারত রাষ্ট্র মনে করলো LOC বরাবর শক্ত সামরিক সমাবেশ রাখতে পারলেই কাশ্মিরবাসীর মন জয় করা যাবে, কাশ্মির ভারতের পক্ষে থাকবে। আবার সেই সাথে কাশ্মির বাকি ভারতের কাছে স্হাস্হ্যনিবাস, প্রাকৃতিক নৈসর্গ উপভোগ, ভ্রমণের স্হান হিসাবে টিকে থাকলেই কাশ্মিরের অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। কিন্তু এতে যে কাশ্মিরকে একটা সন্ত্রাসবাদী পরিস্হিতির জন্ম দেয়ার উপযোগী করে যাকে বলে খাঁটি ব্রিডিং গ্রাউন্ড তৈরি করে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হচ্ছে সেদিকে না ভারত রাষ্ট্রের না ওর পরিচালক রাজনীতি কারও নজরই সে কাড়তে পারেনি। নজর কাড়লো যখন ওখানকার রাজনীতি সত্যি সত্যিই "সন্ত্রাসবাদী" ধারার পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলল। নিঃসন্দেহে একাজে - কাশ্মিরের রাজনীতি এমন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হবার পিছনে এক্সটারনাল ফ্যাক্টরের সহায়তা হিসাবে এসেছে। আমরাও ১৯৭১ সালে এক্সটারনাল ফ্যাক্টরের সহায়তা পেয়েছিলাম, কাজে লাগিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের কোন বঞ্চনা ছিল না, আমাদের উপর কোন নিপীড়ন ছিল না, আকাঙ্খা ছিল না - কেবল ভারত মদদ দিয়ে আমাদেরকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছিল - পাকিস্তান রাষ্ট্র ও জামাতের এসব বয়ান শুনে আমরা যেমন অপমানিত বোধ করি, রাগে ক্ষোভে অস্হির হয়ে উঠি - সেধরণেরই এক ডাহা মিথ্যা, অসৎ স্বার্থের ব্যাখ্যা হবে যদি আমরা মেনে নেই কাশ্মিরের সমস্যা তৈরি হয়েছে এক্সটারনাল ফ্যাক্টর বা পাকিস্তানের কারণে। এটাকেই ভারত "সীমা পার কে আতঙ্কবাদ" বলে প্রচার চালায়, ভারত রাষ্ট্রের "সন্ত্রাসবাদী" বিপদ বলে প্রমাণের চেষ্টা করে।
এটা সত্যি যে আফগানিস্তানে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত দখলদারের প্রবেশের পর, ভারতের কুটনীতি, গোয়েন্দাবৃত্তি কার্যক্রম এর সহযোগী ভুমিকা নিয়েছিল; ভেবেছিল পাকিস্তানের উপর সুবিধা নেবার সুযোগ আছে এখানে - ফলে ভারী মজা। কিন্তু আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক রাজনীতি করাচী থেকে আইএসআইকে দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র আর টাকা পয়সা ঢেলে সহায়তা দিয়ে মুজাহেদিন প্রতিরোধ লড়াইকে চাঙ্গা করে তুললে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতকেও প্রমাদ গুনতে হয়। স্বভাবতই তা সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ভারত কার জন্যই ভাল ফল বয়ে আনে নাই। এই আফগান মুজাহেদিনই সেই এক্সটারনাল ফ্যাক্টর; ঘরে কাশ্মিরবাসীকে বঞ্চনার ভিতরে রেখে আবার সেখানে সন্ত্রাসবাদী পরিস্হিতির জন্য খাঁটি ব্রিডিং গ্রাউন্ড জিইয়ে রেখে আফগান পুতুল বারবাক কারমেল সরকারের সাথে ঘষাঘষির সম্পর্কের খেসারত তো এমনই হবার কথা। এভাবেই তা ব্যাকফায়ার করতে পারে - ভারত রাষ্ট্র ও এর শাসকরা এই পরিণতিকে খাটো করে নজর আন্দাজ করেছিল। আজকে ভারত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে বলে "সীমা পার কে আতঙ্কবাদ" - তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধীতার গল্প বয়ানের আড়ালে সেই কর্মদোষ, ব্যর্থতা ঢাকা পড়বে না।
এককথায় বললে, ১৯৪৮ এর পর থেকে ভারতের কাশ্মির নীতিই ভারত রাষ্ট্রের জন্য সমস্ত দুর্ভাগ্যের কারণ। এই নীতিতে ভারত মনে করেছে কাশ্মির সমস্যা ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের বিবাদজনিত সমস্যা। উত্তরাধিকার সূত্রে ভারত ভাগের সময় পাওয়া দুই জাতীয়তাবাদ পরবর্তীতে কার্যত মানে হয়েছে - যা এন্টি-ইন্ডিয়ান তাই পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ, অপরদিকে যা এন্টি-পাকিস্তানী তাই ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। অথচ এই এন্টি ভাবনার উপর ভিত্তি করে কোন জাতীয়তাবাদ খাঁড়া হতে পারে না, কারণ ওটা ইতিবাচক নয়। ফলে এধরণের জাতীয়তাবাদের উপরে ভর করে সমস্ত জনগোষ্ঠিকে সাথে নিয়ে এক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন ও কায়েম কখনই সম্ভব নয়। অথচ এরকম দুই অদ্ভুত জাতীয়তাবাদের ভিতর দিয়েই ভারত ও পাকিস্তান রাদ্ট্র দেশ ভাগাভাগির পর চলার রাস্তা ঠাউরিয়েছে। মনে করা হয়েছে কাশ্মির সমস্যা এই দুই রাষ্ট্রের বিবাদজনিত ফলাফল বা ফসল। দুই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এই সহজ পথেই রওয়ানা হয়ে আছে। অথচ কেউই লক্ষ্য করেনি কাশ্মির সমস্যা হলো আসলে কাশ্মিরী জনগোষ্ঠির উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্ব, প্রতিনিধিত্ত্ব প্রতিফলিত হতে পারে এমন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্হা।এই রাজনৈতিক ব্যবস্হা কোথায় তারা পাবে - এই মুখ্য বিষয়টাকে গৌণ করে কাশ্মির কোথায় যোগদান করবে, পাকিস্তানে না ভারতে এটাকেই মুখ্য করে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে বরং LOC দাগ ধরে সে আপাত স্হিতি একটা পাওয়া গিয়েছিল এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে একটা প্রতিনিধিত্ত্ব ঘটানো সম্ভব করা যায় এমন রাজনৈতিক স্বশাসন ব্যবস্হা গড়ে ওতে যার যার কাশ্মির অংশে প্রতিনিধিত্ত্ব নিশ্চিত করাই হতো এই সমস্যা চিরতরে মিটাবার পক্ষে এক অগ্রপদক্ষেপ। কিন্তু দুই রাষ্ট্রই ভেবে এসেছে উল্টা, সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেই কাশ্মিরে দখল কায়েম রাখার আসল পদক্ষেপ হয়ে আছে । সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের প্রতিযোগিতা না করে কে কত ভাল প্রতিনিধিত্ত্বমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্হা নিজ নিজ কাশ্মির অংশের জনগণকে সাথে নিয়ে হাজির করতে পারে - প্রতিযোগিতা হতে পারত এখানে; এই প্রতিযোগিতাই পাকিস্তান, ভারত উভয় রাষ্ট্রকে যে নিরাপত্তা দিত তা বর্তমানের কয়েকগুণ বেশি সৈন্য ও রসদ জুগিয়েও কখনও অর্জন করা সম্ভব নয়, বলা বাহুল্য।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যাটা মূলত উপযুক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্হা ও তাতে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্বমূলক সুযোগ না থাকা - এই অনুপস্হিতি থেকে উৎসারিত। রাজনৈতিক ব্যবস্হা অর্থাৎ কনষ্টিটিউশন সহ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক - সবকিছুতে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্ব ঘটানোর সুযোগ না থাকলে আজ অথবা কাল ঐ রাষ্ট্র নিরাপত্তার বড় ধরণের বিপদে পড়বে; একদিকে কখনই তা শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারবে না, অন্যদিকে নিরাপত্তা সমস্যায় তার সমস্ত সম্পদ ঢেলেও রাতের নিদ্রা নিশ্চিত করতে পারবে না। ঐ রাষ্ট্রের যে কোন দূর্বল সময়ে অথবা উন্নতিতে বড় কোন উল্লফনের সুযোগ নিবার আগে "সন্ত্রাসবাদের" বিপদ হয়ে তা হাজির হবে। আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, পাকিস্তান রাষ্ট্রের পেট চিরে আমরা তাই ঘটিয়েছিলাম।

কাশ্মির প্রসঙ্গে এতক্ষণ কথা বললাম দেখে মনে করা ভুল হবে রাষ্ট্রে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা, যার উল্টো পিঠ হলো "সন্ত্রাসবাদ", তা বোধ হয় কেবল ভারতের কাশ্মীরেই আছে। না, বরং এই সমস্যা ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই সব জায়গায়, রাজ্যে- এই বিপদের মধ্যে সে আছে এবং তা বাড়ছে। রাজ্য ভেঙ্গে আরও আলাদা রাজ্য গড়ার দাবী, চাইকি রাজ্যকেই আলাদা রাষ্ট্রের দাবীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, ভুতুড়ে কেন্দ্রের ক্ষমতাটা কোথায়, কে চালায় রাজ্যে বসে তা টের না পাওয়া, দিন কে দিন আঞ্চলিক রাজ্য ভিত্তিক দলগুলোর সহযোগিতা নিয়েই একমাত্র কেন্দ্রে সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে - এই পরিস্হিতি ও ঝোঁকের আধিক্য, মুসলমান নাগরিকের প্রতি সন্দেহ অবিশ্বাস, তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে এক জনগোষ্ঠিকে(হিন্দু) অপর জনগোষ্ঠির(মুসলমান) বিরুদ্ধে সরকারী কর্মসূচি নিয়ে অস্ত্র বিতরণ করে নিরাপত্তা খুজতে হচ্ছে, গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি কান্ড এই সেনসেটিভ ইস্যুতে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ত্ব, এছাড়া ক্লাস লাইনে মাওবাদী সমস্যা - এইসবগুলোই এর উদাহরণ। পাঞ্জাবে খালিস্তান জাতীয় বিচ্ছিন্নবাদের সমস্যার পর নব্বুইয়ের দশকে ভারত রাষ্ট্রের বিপদের নতুন মাত্রা হলো, "সীমা পার কে আতঙ্কবাদ" বলে যেদিন থেকে কাশ্মীর সমস্যাকে চেনানোর ব্যাপক প্রচারে তৎকালীন বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্রে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যা বলে কিছু নাই, বরং এর উল্টো পিঠে যা, যা এর প্রতিক্রিয়া সেই "সন্ত্রাসবাদ"ই নাকি ভারতের সমস্যা। শুধু তাই নয় এটা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তান থেকে এসেছে, দেশের ভিতরের কোন সমস্যা নয় - এই হলো বিজেপির ন্যারেটিভ গল্প; ভারত রাষ্ট্রের সমস্যার বিজেপির মূল্যায়ন ও জনগণকে তা জানানো। এই গল্পটাকে আর একটু টানলে গুজরাটে নরেন্দ্র মোদি কান্ডের একটা ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে।
অনেকের মনে হতে পারে এসব তো বিজেপির রাজনীতি, এখনকার শাসকের এতে দায় নাই - এটা একেবারেই ভুল ধারণা। কারণ কংগ্রেসও মনে করে ভারত রাষ্ট্রে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যাকে বলে কিছু নাই, বরং এর উল্টো পিঠে যা, যা এর প্রতিক্রিয়া সেই "সন্ত্রাসবাদ"ই সব সমস্যা - এবং এই সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তান থেকে আসা। গুজরাট কান্ড কারবার বাদ দিলে বিজেপির ভাষ্য ও কর্মকান্ডের সাথে কংগ্রেসের এতে কোন ফারাক নাই। বরং গুরুত্ত্বপূর্ণ বাড়তি সংযুক্তি আছে। আমেরিকা যেটাকে "ওয়ার অন টেরর" বলে আবিস্কার করেছে এটা নাকি ভারত আরও আগেই আবিস্কার করেছিল; এটাকেই তো তারা "সীমা পার কে আতঙ্কবাদ"মানে টেররিজম বলে, এবং অনেক আগে থাকতেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। অর্থাৎ এতদিন যেটা ছিল ভারতের স্হানীয় "টেররিজমের" বয়ান এবার এরই আন্তর্জাতিকায়ন ঘটেছিল বুশের "ওয়ার অন টেরর" বয়ানে; ভারতের "টেররিজমের" ভাবনা বুশের "ওয়ার অন টেরর"ভাবনার মধ্যে দিশা খুজে পেয়েছিল। ফলে স্বভাবতই এই ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা দুজনের নীতি দুজনে দুজনার হয়ে একাকার হবার শর্ত খুঁজে পেয়েছিল। ভারতের কংগ্রেস রাজনীতি ভারত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমস্যা মিটাতে ব্যর্থ হয়ে নিজ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের বদলে পশ্চিমের "সন্ত্রাসবাদ"কে নিজের সমস্যা বলে বরণ করে নিয়েছিল। এতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। তবে ইসরায়েল আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার হওয়ার সুবাদে মিলিটেরী হার্ডওয়ার পাবার পথে সুগম হয়েছে, সীমান্ত পাহারা দেবার ব্যাপারে প্যালেস্টাইনী ভুমিদখল সুরক্ষা করতে ইসরাইলের হাতে বিকশিত হওয়া নতুন নতুন অস্ত্র পাওয়া, টেকনিক বিষয়ে ভারতের ট্রেনিং পাওয়ার সুবিধা এতে বেরেছে - এককথায় সবমিলিয়ে ভারত রাষ্ট্র একটা দাঁত নখ বের করা এক সামরিক রাষ্ট্র রূপে হাজির হওয়ার তাবৎ বন্দোবস্ত পাকা করার কাজেই এগিয়েছে। ওদিকে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দিন কে দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে; রাত্রের নিরাপত্তাজনিত অনিদ্রা সমস্যা বাড়ছে বৈ কমে নাই। তবে প্রতিবেশী হিসাবে আমাদেরকে ভয় দেখানোর কাজে বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলা যায়। আমাদের সীমান্তে মাসে আট দশটা করে বাংলাদেশি মানুষ মেরে ইসরাইলী ট্রেনিং যে ভালই রপ্ত হয়েছে তার প্রমাণ পাচ্ছি। ভয় দেখানোর এই পদ্ধতি যে খুবই ফলদায়ক তা আমাদের বিডিআর প্রধানের বয়ান ও শেখ হাসিনার সফর সবখানেই এই গুরুত্তপূর্ণ ইস্যুতে মি্উমিউ করে ভারতীয় ভাষ্যকেই নিজের ভাষ্য করে নিতে দেখেছি। ভারতীয় ভাষ্য হলো, বর্ডারে এগুলো সব Cross border Crimes, (যৌথ ঘোষণার ১৮ নম্বর পয়েন্ট দেখতে পারেন) তাই দুস্কৃতিকারী, চোরাচালানীদের মারা হচ্ছে। অথচ ভারতের দাবী অনুযায়ী এসব বাংলাদেশীরা যদি অপরাধী হয়েও থাকে তবুও এদের নির্বিচারে হত্যা করার অধিকার ভারতের নাই। ইসরাইলের এমন একটা নাইট ভিশন অস্ত্র আছে যা দুইতিন কিলোমিটারের মধ্যে অন্ধকারে নড়াচড়া করছে এমন যা কিছুকেই সেন্স করতে পারে এবং অব্যর্থ লক্ষ্যভেদে তাকে শুট করতে পারে। এই অস্ত্র এখন ভারতের বিএসএফের কব্জায়।
পাঠকের কাছে একটা কথা পরিস্কার করে রাখা দরকার, ভারত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আরও বিপদজনক পর্যায়ে পৌছানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে ইসলামী র‌্যাডিক্যাল রাজনীতির প্রভাব নাই এটা আমার বলার উদ্দেশ্য নয়। এটা অবশ্যই আছে, সর্বশেষ মুম্বাই হামলা ও তিনদিনের বাণিজ্যিক রাজধানী অবরোধ প্রমাণ করে "ওয়ার অন টেররের" রাজনীতির সাথে নিজস্ব "আতঙ্কবাদের" রাজনৈতিক শখ্যতা, ঐক্য ভারতের জন্য কতটা ভারী হতে পারে। এছাড়া জন্মের পর থেকেই ভারত রাষ্ট্র নিজেই নিজ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ত্বের সমস্যাকে জিইয়ে রেখে তার "আতঙ্কবাদের" ব্রিডিং গ্রাউন্ড হয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে রেখেছে -সেদিক তো আছে।

[সন্ত্রাসবাদের ব্যবচ্ছেদ শেষ হয়নি একটু বাকি আছে। পরের পর্বে শেষ করে যৌথ ঘোষণায় যাব। এখানেই এই পর্ব শেষ করছি। আগামীকালের মধ্যে শেষ ও পরের পর্ব পোষ্ট করব আশা করছি। সকলকে ধন্যবাদ।]

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৬:২৩
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×