somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসম্ভবের পথে (শুরুর পরে)

১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ দুপুর ১:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আশাভঙ্গের অভিশাপ নিয়ে লোকগুলো বাড়ি ছাড়ল। তখনই আরেক উৎপাত। খবর নিয়ে এল সোনাই। - এ বাড়িতে সবমিলিয়ে দুজন লোকের বাস;আমি আর আমার প্রৌঢ় ভৃত্য সোনাই। দুজনের সংসার-তরণীটা এক আশ্চর্য দক্ষতায় টেনে নিত লোকটি। ডিঙি বেয়ে এখানে-সেখানে যেত সে; আশেপাশের সব লোকের সাথে পরিচয় ওর। ঘরের জিনিস বিক্রি, সদাই-পাতি, রান্নাবান্না- সব একাই সামলায়। বাজার থেকে এসেই সে বলল, ওরা বাড়িতে উঠতে চায়।
কারা?
কতগুলো লোক- সে ভালভাবে চিনে না। কয়েকদিন নৌকা নিয়ে এ ঘরের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিল। তাদের দুজন সোনাইকে বাজারে ধরে বসে। একটি লোভনীয় প্রস্তাব আছে ওদের। কিছু জিনিসপত্র রেখে যাবে ওরা এই বাড়িতে। আর; মাসে দু-একদিন ওদের লোক এ বাড়িতে থাকবে। তার বদলে আমাদের পুরো মাসের খরচ বহন করবে ওরা।
-এ কি ধরণের পাগলামো!
জানি না। তবে, লোকগুলো সুবিধার না। ওদের সম্পর্কে অনেক কিছুই শোনা যায়। শেষে হয়তো বাড়িটাই হারাতে হবে।
বাদ থাক। আমাদের কষ্টবোধ নিয়ে আমরা ভালই আছি। কাউকে জড়াতে চাইনা এর সাথে।

এখানে আমি কবি। এক চন্দ্রালোকিত মধ্যরাতে সেই অতীন্দ্রিয় কাব্যময়তা আমাকে পেয়ে বসেছিল। আমার পরিচিত অনুভূতির অনেক বাইরে অন্যমাত্রীয় বিমূর্ত স্রোতধারায় নিমজ্জমান আমি ক্রমশ বয়ে চলছিলাম অস্তিত্ত্বের গভীর থেকে গভীরে- অনেক গভীরে। তখন লখিন্দরের বাসর ছিল না, ভীষ্মের শরশয্যা ছিল না; রাজবাড়িতে শান-শওকত, রাজপ্রহরীর হাঁকডাক, গ্রামোফোনে নৈশসঙ্গীত, পিয়ানোতে আলতো ছোঁয়া, রংমহলে বাঈজী- এমনকি একশ বছরের পুরানো ’রাজবাড়ি’ নামের এই কাঠের জঞ্জালে সামান্যতম গুঞ্জনেরও আভাস ছিল না।

কালোধরা সেগুন কাঠের বারান্দায় আমি তখন চন্দ্রবিলাসী। সামনে একচিলতে সবুজ, দু-একটি বনজ গুল্ম; আরেকটু সামনে রূপোলি বুকের কর্ণফুলি। তার ওপারে; পাহাড়- পাহাড়- আর, পাহাড়-। চন্দ্রধারায় ডুবো-ডুবো মাথা উঁচু উঁচু খাড়া-খাড়া পাহাড়। তাদের পা জড়িয়ে সাপের মতন একেবেঁকে বয়ে চলা চাঁদভাঙা জলধারা। -এ আমার জন্ম-জন্মান্তরের প্রেমিকা। কত কাল ধরে প্রেম আমাদের!

সেই শৈশবে- প্রতি চন্দ্ররাতে যখন বজরা ভাসত; সুরায়-নেশায়, বাঈজী-তবলায়, ঘুঙুরের ঝুমঝুম - আমার মহাবীর্যবান চন্দ্রভূক পূর্বপুরুষরা দেহকাব্যের নিপুণ কবি; তখন হাজার মোমের নিভু-নিভু আলোকছটায় নিমজ্জমান আমি নদীর প্রেমে বিভোর। কত বড় চাঁদ বুকে নিয়ে নদী- মিষ্টি-মিষ্টি দুষ্টু মেয়ে; ঢেউয়ের দোলায় চাঁদ গুঁড়োত। আর, বজরার দোতলায় আমার পূর্বপুরুষরা -সুরার বোতল, কতিপয় নর্তকীর সূক্ষ্ম সম্ভ্রমবোধ-। ভাঙাভাঙিতে ওরা ক্লাসিক। রাজ্যের অনেক সুন্দরীর প্রতিরোধ ভেঙেছিল তারা- চিরতরে। -কত আগের কাহিনী! অনেকেই জানেনা হয়তো- রাতের আধাঁরে ডাকাতের উৎপাত; মেয়েগুলো হারিয়ে যেত। -কোথায়? বুঝত অনেকেই- অতটাই সার।

-আমার বজ্রকন্ঠী পিতামহ অদ্বিতীয় একজন। কত রকম খেয়াল ছিল তাঁর! রংমহলের মেঝের নিচে বড়সড় এক বাঘ পুষতেন তিঁনি- অভুক্ত নরখাদক। ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাঘটা গর্জাতে থাকলে তাঁর বুকের মধ্যে ব্যাথার ঢেউ উঠত; অন্যরকম অনুভূতি সেখানে। বেশিদিন বাঘটাকে অভুক্ত থাকতে হত না। সেই একটানা পৌরুষদীপ্ত গর্জনে তাঁর ভিতরের পুরুষটা জেগে উঠলে একধরণের জান্তবতায় তিঁনি নিজেই একটা বাঘ। সে রাতেই এক ধ্বংসপ্রায় নারীকন্ঠের আর্তচিৎকারধ্বনি রংমহলের দেওয়াল-পিঞ্জরে বন্দী মুনিয়া। নারীশরীরের সবটুকু রস নিংড়ে নিয়ে রাজামহাশয় মজ্জাটা ছুঁড়ে দিতেন আরেকটি ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে। সেখানে অন্যধরণের জান্তবতা; অন্যরকম চিৎকার- ছিঁড়ে খাওয়াটাও। দুটি বাঘের তীব্রতম ক্ষিধের আগুনে অনেকেই আহুতি দিয়েছিল- পাহাড়-রাজ্যের অনেক ষোড়শী, অনেক অষ্টাদশী (এক বাঘের ক্ষিধে পেটে, অন্যটির অন্য কোথাও)। নিঝুম আধাঁরে কান পেতে শোন; মহলের দেওয়ালে তাদের অতৃপ্ত হাহাকার এখনো গুমড়ে মরে।

সে এক দিন ছিল বটে- অন্ধকারের দিন। আমার জন্মের আগে ইতি টেনেছিল যুগটি। লোকটি মরেছিল- রহস্যময়ভাবে। -কিভাবে? কেউ জানে না তা। জানার চেষ্টাও কারো ছিল না। সময়টা হাওয়া বদলের। রাজতন্ত্র নামক প্রথাটা কিছুদিন আগে বিদায় নিয়েছিল। রাজার শাসন - সে এক স্বপ্নকথা। তবে, দাপট ছিল। আর ছিল অঢেল সম্পত্তি। এ এক মদিরা; সব মদিরার বড়- রন্ধ্রে রন্ধ্রে নেশা জাগায়- তীব্র উন্মাদনা। সে নেশায় মজে রাজার সুপুত্তুরেরা যুদ্ধে নেমেছিল; নিরব যুদ্ধ- দামামাহীন, আক্রমণহীন, হাতি নেই, ঘোড়া নেই,ঢাল নেই, বর্ম নেই- এমনকি তলোয়ার। পুরো বাড়ি জুড়ে শুধুই ষড়যন্ত্র, শুধুই চক্রান্ত, শুধুই কূটকৌশল।

সর্বগ্রাসী মূকযুদ্ধ কেড়ে নিয়েছিল সবাইকে (এ কি তবে অতৃপ্ত নারী অশরীরীর অভিশম্পাত!)। টিকেছিল একজন- যার ঔরসে আমার জন্ম। হয়তো আমার বাবা; হয়তো নয়-। বাবা শব্দটার অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার নয়। আমি এতটাই জানি; কোন এক ফাল্গুনের চন্দ্ররাতে এক অতিকায় বজরায় হাজার মোমের সম্ভাষণে ঐ লোকেরই কোন এক রক্ষিতার পেট থেকে আমি বেরিয়ে এসেছিলাম। সারেং-এর হাঁকডাক, বাঈজীর মূর্ছনা, তবলার ত্রিতাল, নদীর ছলাৎ-ছল এক নবজাতকের আগমন ধ্বনিতে নিমেষেই স্তব্ধ। কোন খেয়ালে রাজা মহাশয় (নামেমাত্র রাজা; সম্পত্তি ছাড়া কিছুই ছিল না তাঁর।) এক প্রসূতিকে বজরায় তুলেছিলেন; কে বলতে পারে! হয়তোবা চাঁদ-মদিরায় মাতাল রাজা প্রতি চন্দ্ররাতে অবিরাম গজল-খেয়ালের একঘেঁয়েমি থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। এক নবজাতকের আগমনী উচ্চারণ তাঁকে কতটা পূর্ণতা দিয়েছিল- আমি ঠিক জানি না। জানার কথাও নয়। তবে, সেদিন রাজামশায় আনন্দ পেয়েছিলেন, উৎফুল্ল হয়েছিলেন, প্রচন্ড উদ্দীপণায় রাজ্যময় উৎসব ডেকেছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্র বিচারে রাজ-জ্যোতিষী ঘোষণা দিয়েছিলেন; এ ছেলে সৌভাগ্যবান। এর কপালে ভাগ্যলিখন। একদিন রাজা হবে এ- রাজাদের রাজা।

তৎক্ষণাৎ আমার রক্ষিতা মা সবশুদ্ধ একলাফে রাজরাণী। সেই মর্যাদার ভার সইতে না পেরে আ্মার মাসখানেকের মধ্যে মরেই গেল। পরে জেনেছিলাম, তাঁকে খুন করা হয়েছিল। এক রক্ষিতা রাজরাণী হবে; মুখ মেনে নিলেও মন যে মানেনা। (রাজতন্ত্র এক মোটরগাড়ি; ষড়যন্ত্র তার জ্বালানী।) তাদের দরকার ছিল ছেলেটা। আনন্দের আতিশয্যে এক অস্পৃশ্যকে অনেক উঁচুতে তুলেছিলেন রাজা।- এ তাঁর বদান্যতা। আর কত মহানুভবতা দেখাবেন তিঁনি! তাঁর সম্মানবোধ বলে তো কিছু একটা আছে (ওদের আর কিছু না থাক; সম্মানবোধ প্রচন্ড)।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:১৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×