somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অসম্ভবের পথে (শেষের আগে)

১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ দুপুর ২:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেই থেকে আমি রাজা। এই নদীচুম্বিত পাহাড়ী জনপদে দৈত্যাকার ফাঁকা রাজবাড়িতে আমি রাজাধিরাজ। এখানে আমি কবি; দিনভর মহুয়ার নেশায় মজে আমি গর্জে উঠি। পাহাড়ে পাহাড়ে সাড়া জাগে- ধ্বনি-প্রতিধ্বনির অপূর্ব মাতম; উৎসাহে ঝলকে উঠে নদীর বুক। প্রতি চন্দ্ররাতে জলসা বসে এখানে- এই রংমহলে। সেখানে অতৃপ্ত নারীআত্মার তীব্র হাহাকার- বুকের অনেক গহীনে কোন এক অ›ধ-প্রদেশে সূক্ষ্ম ব্যথার সুর তুলে তা। একনিষ্ঠভাবে আমি সেই সুরসাগরে ভাসি। মহুয়ার নেশায় নেশায় আমি নিশিদিন ভেসে ভেসে যাই। -ও জিনিসের অভাব হয়না এখানে। সপ্তাহ অন্তর দুটো পাহাড়ি যুবক ঘড়াভর্তি নিয়ে আসে তা। দু-দশ টাকাতেই খুশি ওরা। এ এক অন্য অনুভূতি; বাস্তবতাবোধের শেষ অংশটুকুও এক আশ্চর্য দক্ষতায় নিংড়ে নেয় তা- থাকে শুধু কল্পনা, থাকে শুধু কাব্যময়তা। এ কাব্যময়তা আমার আবেগে,আমার অনুভূতিতে, আমার দোদুল্যমানতায়। কলম ধরা হয়নি কখনো; সব কবিতা জমা হয়ে আছে বুকের উষ্ণতায় ভালবাসার অক্ষরে। আমি নদীকে ভালবাসি- তার শান্ত জলরাশি; ভালবাসি চন্দ্ররাত, মহুয়া আর আমার কাঠের বাড়ি। মরুক সরকার; এ বাড়ি আমি ছাড়ছি না।

শেষ পর্যন্ত বাড়ি আমাকে ছাড়তেই হল। আমার ভালবাসাই কাল হয়ে উঠেছিল। তিনদিন না খেয়ে ছিলাম আমরা। ঘরে ফুঁটো পয়সাটিও নেই, রান্নার চাল, প্রদীপের তেল- এমনকি মহুয়া। রাজবাড়ির তৈজসপত্র বিক্রি করে ভালই চলছিল এতদিন। অসাধারণ সব- নকশাকাটা কাঠের বাক্স, সোনা মোড়ানো কলমের পালক, চীনামাটির ফুলদানি, শ্বেতপাথরের নারীমূর্তি-। শেষ পর্যন্ত ঘরের কাঠ খুলে বিক্রি করা বাকি ছিল। সোনাই নির্বিকার; অনেক তো করল বুড়ো লোকটা- আর কত? আর, কিইবা করার আছে ওর? -কোণায় জড়োসড়ো- একটানা চোখের জল ঝড়ায় সে। শেষে ভেঙে পড়া কন্ঠে বলে
বাড়িটা সরকারকে দিয়ে দেন ছোটবাবু।
আর দু-একটা দিন। আমরা মরে গেলে ওরা এমনিতেই পেয়ে যাবে।
নিরুত্তর সে; কান্নাটা আরো বাড়ে। সে ভালভাবেই বুঝে গেছে মরে গেলেও এ বাড়ি আমি ছাড়ব না। ওর কষ্টটা আমার জন্য; ছোটবেলা থেকে একটু একটু করে যাকে বড় করে তুলেছে- তার ধ্বংসটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা লোকটার অবচেতন মন। আমি তখনো নেশার ঘোরে- দূরে কোথাও আশার জ্বলজ্বলে আলো । -কোথায়? -কোন তেপান্তরে?

এবার আমার মনে পড়ে গেল- কারা যেন আসতে চেয়েছিল এখানে। মাসে দু-চারদিন থাকবে। তার বদলে-
ওদের আসতে দিলেই তো হয়।
ওরা লোক ভাল নয়, ছোটবাবু।
পৃথিবীতে খুব বেশি ভাল মানুষ নেই রে সোনাই।
ওরা অতিমাত্রায় খারাপ। মানুষ মারে ওরা। অকারণে-
ছোটবেলা থেকে মানুষকে মরতে দেখেছি আমি; শুধুই মরতে দেখেছি। তখন মরত সুন্দরীরা। আমার মা মরেছিল অকারণে। নদীর প্লাবনে মরেছিল আরো কত জন। নাহয় সেই তালিকায় আরো দু-একজন যোগ হল।
সে নিশ্চুপ; অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আরেকটি দিন অনাহারে। আরো একটি। এইবার আমার সংগ্রামী মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এক প্রকান্ড দৈত্যের কাছে পরাজিত আমি। -সকল অপশক্তির শ্রেষ্ঠ- পেটের ক্ষিধে। আমার ভগ্ন কন্ঠ বলে উঠে
বাড়িটা সরকারকে দিয়ে দাও সোনাই।
সে চমকে উঠে তাকায় একবার। একসময় বেরিয়ে যায়- এক ভবিষ্যতের দিকে; হয়তো অনিশ্চিত, হয়তো নিশ্চিত- আমি ভাবতে চায় না।

সোনাই ফিরল বিকেলে। সাথে দুজন লোক- অনেক খাবার-দাবার।
ওরা কি আজকেই বাড়ির দখল নিতে এল।
না, বাবু। এরা অন্যজন।
কি আনন্দ! বাড়ি বিক্রি হয়নি! সোনাই সেই লোকগুলোকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু, এরা তো নিরীহ; দেখে মনেই হয় না এদের দ্বারা খুন করা সম্ভব। সোনাই ভুল শুনেছিল। হয়তো এরা আমার মতই নির্জনতাবিলাসী। -আবার সবকিছু ফিরে ফিরে আসবে; সেই চন্দ্ররাত, সেই মহুয়া, আর কবিতা। আনন্দের ফেনায় ফেনিল আমি খুশিতে উথলে উঠি।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×