এক বৃষ্টিস্নাত বিকালে আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করে বসলাম। কি জঘণ্য ছিল দিনটা! একটানা একঘেঁয়ে বৃষ্টির মধ্যে আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মাণ আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হতে রাজপথের ধুলিকণায় পর্যবসিত। বেঁচে থাকার ইচ্ছাপ্রদীপ নিমেষেই অন্ধ হয়ে গেল। আমার সকল অনুভব, অনুভূতি; যা কিছু আনন্দ, যতটুকু আশা- সব পঁচে গলে অবশিষ্ট ছিলএকটি ঘৃণার দলা- আমার বাবা এবং তাঁর পূজিত ঈশ্বরের প্রতি তীব্রতম ঘৃণা। আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মান আমি মেঘ-বৃষ্টি ছাপিয়ে গর্জে উঠেছিলাম, ঘৃণার গোলা ছুড়েছিলাম, ব্রক্ষ্মান্ডের শ্রেষ্ঠতম শক্তিধর ঈশ্বরের পূজারি আমার বাবার দিকে একের পর এক ছুটে যাচ্ছিল ধিক্কারের ফণা তোলা কালনাগ। বাবার বাড়ি, সাজানো ড্রয়িংরুম, ঝুলন্ত ঝাড়বাতি, বুয়া-মালী-দারোয়ান; স্তম্ভিত ম্যানেজার; আমার শোকে পাথর বোন- তাদের নিষ্পলক আঁখিপটে লাঞ্ছিত ঈশ্বর। তখন আমি দূর্নিবার; ঝড়কবলিত জ্বলন্ত মশাল- দমকে দমকে উস্কে ওঠা আগুনের গোলা। আমার দেখার সময় ছিল না কাকে জ্বালাচ্ছি; জানার সুযোগ ছিল না কিভাবে জ্বালাচ্ছি; বুঝে ওঠার পর্যাপ্ততা ছিল না- কেন? একটি কথা, একটি কারণ, একটি লাইনই আমার জন্য যথেষ্ট- দৈত্যাকার বাড়ির খাঁ খাঁ ড্রয়িংরুমে নিষ্ঠুর শূন্যতার মাঝে আমার মায়ের হৃদযন্ত্রটা একঘেঁয়েভাবে বিকল হয়েছিল। পাঁচ-ছয় আয়া দারোয়ানের বাড়িতে- কি আশ্চর্য! তার শেষ শব্দগুলো মেঘগর্জনে বন্দী, শেষ নিঃশ্বাস ঘরময় কেঁদে ফিরেছে; আর সজল চোখের ঝাপসা দৃষ্টি রুমের কোণায়, ফোনের কাছে, ঝাড়বাতির নিচে, টেলিভিশন, সাউন্ড সিস্টেম, এটা-সেটার দঙ্গলে একটি মানুষের জন্য হাহাকার করে মরছিল- একটিমাত্র রক্তমাংসের মানুষ। যখন তাঁর মাথা ঘুরে উঠেছিল (লাল ভেলভেটের সোফা আর টিভিপর্দার সংবাদ পাঠিকাও হয়তো ঘুরছিল) -মা আমার লাল কার্পেটে শয্যাশায়ী। বাবুর্চির রান্নাঘর, ঘুমকাতুরে বুড়ো মালী আর বুয়া-ড্রাইভার বেপাত্তা। ঝিরঝির বৃষ্টি হয়তো তাদের ভরা নদীতে বান ডেকেছিল। হাতের পিঞ্জরে বন্দী কপোত- নরোম তাদের শুভ্র শরীর কি এক দূর্নিবার ভয়ে কাঁপছিল। কাঁপছিল সব- ঠোঁটের কোণা, চোখের পাতা-। বৃষ্টির মাদকতায় নিচতলার কোন সারভেন্ট রুমে আধো-আঁধারিতে একখানা লোমশ বুকের উত্তপ্ততায় তার রাধা হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এমনটি হরহামেশাই ঘটে- জন্মসূচনা, এবরশন; কে তার খোঁজ রাখে। বাবা সী-গাল; নদী-নালা তার চোখে ধরে না। আমি পরবাসী- বই খুঁটানো ছাড়পোকা। বোনের ফ্রেন্ডসার্কেল। আর, মা- নিঃসঙ্গ গৃহচারী; নিজ ভুবনে নিজেই বন্দী। তখনো পর্যন্ত আমার মা একই অবস্থার আর দশজনের মতো হয়ে ওঠেনি। হয়ে যেত- যদি জীবনের পর্যাপ্ততা থাকত। আমার ইন্টেলেকচুয়াল বাবা তাঁর ভালোমানুষী কাজ ছেড়ে আকষ্মাৎ এক দূর্নিবার ঈশ্বরের উপাসক আর রাতারাতি মিডল্ ক্লাস থেকে সবসুদ্ধ একধাপ উপরে। টেলেন্ট ছিল লোকটা- সুপারটেলেন্ট।কি সুন্দরভাবেই না সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলÑ আমাকেও। বুঝতে যদিও দেরি হয়েছে; আমি অভিভূত। লেখাপড়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলাম পনেরোতে। তখন থেকেই বাবার ফোনে মায়ের কুশলাদি।
তোর মাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ভালো আছে। খালি তোর কথা বলে।
বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে। ভাবিস না। ডাক্তার দেখে গেছে।
বাড়ি আসবি কখন? তোর মা অস্থির।
কিন্তু আমার ভাবার সময় কোথায় এত কাজের ভিড়ে? লোকটা জেনে গিয়েছিল আমার দূর্বলতা; ব্যবসায়ীদের এটাই দরকার- অন্যের সাইকোলজি পড়ার দক্ষতা। ‘মা’ শব্দটা দিয়ে আমাকে আশ্বস্ত করত বাবা। -দূর্বলতাটা আমার ছেলেবেলা থেকেই। প্রবল হয়েছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে। আর, চূড়ান্তরূপ- অনন্যের কারণে।
সেই কবে হোস্টেলে পা রেখেছিল- মুখভার, আলুথালু, অ্যাবনরমাল ছেলেটা। অকথ্য কথাবাণে অনড়, সামাজিকতায় জগদ্দল পাথর, ঠাট্টাঙ্গনে অপাচ্য, রুমের অকারণ হতাশা, ইযারমেটদের চক্ষুশুল অনন্য- ধরতনা কিছুতেই। সেও হয়তো বুঝত। উত্তরণের চেষ্টা-চরিত্রও কিছুটা ছিল। তারপর- এক সর্বনাশা বিকালে ধরে গেল আমাতে। ঘটনাটা এমন; হোস্টেলে উঠেছিলাম আমরা ত্রিশজনের মতো- কমবেশিও হতে পারে। প্রথম সপ্তাহগুলো নতুন ক্লাস, নবীনবরণ, দল গঠন, পরিচিতি-সভা, হেন-তেন; আরো কিছু হাউকাউ- আমরা স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। বিকালের ক্রিকেটটা জমে উঠলে পরে- ্হঠাৎ আবিষ্কার ‘অনন্য চিড়িয়া’।
এই শুভ, তোর রুমমেট কোথায়?
ও তো রুম থেকে বের হয় না। ক্লাসটা করে- বাকি সময় রুম আর বারান্দায়-।
আঁতেল নাকি! লেখাপড়া করে?
না, বইপত্র তো ধরতে দেখিনা।
ভাব! -বুঝছিস্; এটা একধরনের ভাব। তোরা রুমে থাকলে ভাব দেখায়- গো-বেচারা। যখন কেউ থাকে না; দেখে নিস্- ঘাড় গুঁজে বই মুখস্ত করছে।
আরে না।এখনো তো বইই কিনেনি।
তাহলে করেটা কি?
গাঞ্জা টানে না তো!]
না কি শালায় ডাইলখোর!
কি জানি? সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকে; ঘুমায়- কখনো আকাশ দেখে-।
খেলতে আসে না কেন?
ওর নাকি ভালো লাগে না।
মামদোবাজি! দাঁড়া, ওর আঁতলামো ছুটাচ্ছি-
চেষ্টাচরিত্র ভালোই হয়েছিল। ডাইনিং, ক্যান্টিন, কমনরুম, বারান্দা- অভিযান সবখানে।
জগতের সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা হল খেলাধুলায় সময় নষ্ট করা; তোমার কি মত আনন্য-।
রাইট ইউ আর। আরে ভাই, খেলাধুলায় কি আছে! তারচেয়ে আকাশ দেখ- আকাশ।
কি দেখব ভ্রাতা? আমার প্রেমিকাকে!
ছিঃ! অনন্যকে এত ক্ষেপিয়ো না তো। ও কিন্তু রেগে গিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিবে।
আচ্ছা! ও তাহলে কোন একসময় কথা বলত!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

