somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্নজনের মা (১ম পর্ব)

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ৯:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক বৃষ্টিস্নাত বিকালে আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করে বসলাম। কি জঘণ্য ছিল দিনটা! একটানা একঘেঁয়ে বৃষ্টির মধ্যে আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মাণ আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হতে রাজপথের ধুলিকণায় পর্যবসিত। বেঁচে থাকার ইচ্ছাপ্রদীপ নিমেষেই অন্ধ হয়ে গেল। আমার সকল অনুভব, অনুভূতি; যা কিছু আনন্দ, যতটুকু আশা- সব পঁচে গলে অবশিষ্ট ছিলএকটি ঘৃণার দলা- আমার বাবা এবং তাঁর পূজিত ঈশ্বরের প্রতি তীব্রতম ঘৃণা। আত্মগ্লানিতে ম্রিয়মান আমি মেঘ-বৃষ্টি ছাপিয়ে গর্জে উঠেছিলাম, ঘৃণার গোলা ছুড়েছিলাম, ব্রক্ষ্মান্ডের শ্রেষ্ঠতম শক্তিধর ঈশ্বরের পূজারি আমার বাবার দিকে একের পর এক ছুটে যাচ্ছিল ধিক্কারের ফণা তোলা কালনাগ। বাবার বাড়ি, সাজানো ড্রয়িংরুম, ঝুলন্ত ঝাড়বাতি, বুয়া-মালী-দারোয়ান; স্তম্ভিত ম্যানেজার; আমার শোকে পাথর বোন- তাদের নিষ্পলক আঁখিপটে লাঞ্ছিত ঈশ্বর। তখন আমি দূর্নিবার; ঝড়কবলিত জ্বলন্ত মশাল- দমকে দমকে উস্কে ওঠা আগুনের গোলা। আমার দেখার সময় ছিল না কাকে জ্বালাচ্ছি; জানার সুযোগ ছিল না কিভাবে জ্বালাচ্ছি; বুঝে ওঠার পর্যাপ্ততা ছিল না- কেন? একটি কথা, একটি কারণ, একটি লাইনই আমার জন্য যথেষ্ট- দৈত্যাকার বাড়ির খাঁ খাঁ ড্রয়িংরুমে নিষ্ঠুর শূন্যতার মাঝে আমার মায়ের হৃদযন্ত্রটা একঘেঁয়েভাবে বিকল হয়েছিল। পাঁচ-ছয় আয়া দারোয়ানের বাড়িতে- কি আশ্চর্য! তার শেষ শব্দগুলো মেঘগর্জনে বন্দী, শেষ নিঃশ্বাস ঘরময় কেঁদে ফিরেছে; আর সজল চোখের ঝাপসা দৃষ্টি রুমের কোণায়, ফোনের কাছে, ঝাড়বাতির নিচে, টেলিভিশন, সাউন্ড সিস্টেম, এটা-সেটার দঙ্গলে একটি মানুষের জন্য হাহাকার করে মরছিল- একটিমাত্র রক্তমাংসের মানুষ। যখন তাঁর মাথা ঘুরে উঠেছিল (লাল ভেলভেটের সোফা আর টিভিপর্দার সংবাদ পাঠিকাও হয়তো ঘুরছিল) -মা আমার লাল কার্পেটে শয্যাশায়ী। বাবুর্চির রান্নাঘর, ঘুমকাতুরে বুড়ো মালী আর বুয়া-ড্রাইভার বেপাত্তা। ঝিরঝির বৃষ্টি হয়তো তাদের ভরা নদীতে বান ডেকেছিল। হাতের পিঞ্জরে বন্দী কপোত- নরোম তাদের শুভ্র শরীর কি এক দূর্নিবার ভয়ে কাঁপছিল। কাঁপছিল সব- ঠোঁটের কোণা, চোখের পাতা-। বৃষ্টির মাদকতায় নিচতলার কোন সারভেন্ট রুমে আধো-আঁধারিতে একখানা লোমশ বুকের উত্তপ্ততায় তার রাধা হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এমনটি হরহামেশাই ঘটে- জন্মসূচনা, এবরশন; কে তার খোঁজ রাখে। বাবা সী-গাল; নদী-নালা তার চোখে ধরে না। আমি পরবাসী- বই খুঁটানো ছাড়পোকা। বোনের ফ্রেন্ডসার্কেল। আর, মা- নিঃসঙ্গ গৃহচারী; নিজ ভুবনে নিজেই বন্দী। তখনো পর্যন্ত আমার মা একই অবস্থার আর দশজনের মতো হয়ে ওঠেনি। হয়ে যেত- যদি জীবনের পর্যাপ্ততা থাকত। আমার ইন্টেলেকচুয়াল বাবা তাঁর ভালোমানুষী কাজ ছেড়ে আকষ্মাৎ এক দূর্নিবার ঈশ্বরের উপাসক আর রাতারাতি মিডল্ ক্লাস থেকে সবসুদ্ধ একধাপ উপরে। টেলেন্ট ছিল লোকটা- সুপারটেলেন্ট।কি সুন্দরভাবেই না সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলÑ আমাকেও। বুঝতে যদিও দেরি হয়েছে; আমি অভিভূত। লেখাপড়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলাম পনেরোতে। তখন থেকেই বাবার ফোনে মায়ের কুশলাদি।
তোর মাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ভালো আছে। খালি তোর কথা বলে।
বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে। ভাবিস না। ডাক্তার দেখে গেছে।
বাড়ি আসবি কখন? তোর মা অস্থির।
কিন্তু আমার ভাবার সময় কোথায় এত কাজের ভিড়ে? লোকটা জেনে গিয়েছিল আমার দূর্বলতা; ব্যবসায়ীদের এটাই দরকার- অন্যের সাইকোলজি পড়ার দক্ষতা। ‘মা’ শব্দটা দিয়ে আমাকে আশ্বস্ত করত বাবা। -দূর্বলতাটা আমার ছেলেবেলা থেকেই। প্রবল হয়েছিল বিচ্ছিন্ন হয়ে। আর, চূড়ান্তরূপ- অনন্যের কারণে।

সেই কবে হোস্টেলে পা রেখেছিল- মুখভার, আলুথালু, অ্যাবনরমাল ছেলেটা। অকথ্য কথাবাণে অনড়, সামাজিকতায় জগদ্দল পাথর, ঠাট্টাঙ্গনে অপাচ্য, রুমের অকারণ হতাশা, ইযারমেটদের চক্ষুশুল অনন্য- ধরতনা কিছুতেই। সেও হয়তো বুঝত। উত্তরণের চেষ্টা-চরিত্রও কিছুটা ছিল। তারপর- এক সর্বনাশা বিকালে ধরে গেল আমাতে। ঘটনাটা এমন; হোস্টেলে উঠেছিলাম আমরা ত্রিশজনের মতো- কমবেশিও হতে পারে। প্রথম সপ্তাহগুলো নতুন ক্লাস, নবীনবরণ, দল গঠন, পরিচিতি-সভা, হেন-তেন; আরো কিছু হাউকাউ- আমরা স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম। বিকালের ক্রিকেটটা জমে উঠলে পরে- ্হঠাৎ আবিষ্কার ‘অনন্য চিড়িয়া’।
এই শুভ, তোর রুমমেট কোথায়?
ও তো রুম থেকে বের হয় না। ক্লাসটা করে- বাকি সময় রুম আর বারান্দায়-।
আঁতেল নাকি! লেখাপড়া করে?
না, বইপত্র তো ধরতে দেখিনা।
ভাব! -বুঝছিস্; এটা একধরনের ভাব। তোরা রুমে থাকলে ভাব দেখায়- গো-বেচারা। যখন কেউ থাকে না; দেখে নিস্- ঘাড় গুঁজে বই মুখস্ত করছে।
আরে না।এখনো তো বইই কিনেনি।
তাহলে করেটা কি?
গাঞ্জা টানে না তো!]
না কি শালায় ডাইলখোর!
কি জানি? সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকে; ঘুমায়- কখনো আকাশ দেখে-।
খেলতে আসে না কেন?
ওর নাকি ভালো লাগে না।
মামদোবাজি! দাঁড়া, ওর আঁতলামো ছুটাচ্ছি-
চেষ্টাচরিত্র ভালোই হয়েছিল। ডাইনিং, ক্যান্টিন, কমনরুম, বারান্দা- অভিযান সবখানে।
জগতের সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা হল খেলাধুলায় সময় নষ্ট করা; তোমার কি মত আনন্য-।
রাইট ইউ আর। আরে ভাই, খেলাধুলায় কি আছে! তারচেয়ে আকাশ দেখ- আকাশ।
কি দেখব ভ্রাতা? আমার প্রেমিকাকে!
ছিঃ! অনন্যকে এত ক্ষেপিয়ো না তো। ও কিন্তু রেগে গিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিবে।
আচ্ছা! ও তাহলে কোন একসময় কথা বলত!
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×