somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বহুমাত্রিক স্বার্থ রক্ষায় ঝুলে আছে ফিলিস্তিন সমস্যা

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বহুমাত্রিক স্বার্থ রক্ষায় ঝুলে আছে ফিলিস্তিন সমস্যা


অবরুদ্ধ গাজার খান ইউনুস ও রাফা লক্ষ্য করে বুধবার দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। হামলায় শিশুসহ অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে। এসব এলাকার বহু বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তারপরও হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। বুধবার পর্যন্ত ইসরাইলী হামলায় এক সাংবাদিক ও ৬৩ শিশুসহ অন্তত ২২১ জন নিহত হয়েছে। দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইউসুফ আবু হোসেন নামের নিহত এই সাংবাদিক হামাস পরিচালিত একটি রেডিওতে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি হামাসও ইসরাইল সীমান্ত লক্ষ্য করে রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে। খবর এপি, বিবিসি ও আলজাজিরা অনলাইনের।

গাজার আবাসিক এলাকায় দখলদার ইসরাইলের বিমান হামলায় এ পর্যন্ত ৫২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে বলে জাতিসংঘের এক হিসাবে উঠে এসেছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘ জানায়, ইসরাইলী বিমান হামলায় এ পর্যন্ত ৫২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেখানে প্রায় সাড়ে চার শ’ ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনের আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। যদিও ইসরাইল তা অস্বীকার করেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যাতে বেসামরিক নাগরিকদের হতাহত হওয়ার ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যায়। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান এ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচএ) মুখপাত্র ইয়েন্স লেয়ার্কে বলেন, গাজায় জাতিসংঘের পরিচালিত স্কুল রয়েছে ৫৮টি। এতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৪৭ হাজার ফিলিস্তিনী। অন্যদিকে ইসরাইলের পক্ষে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি শিশু রয়েছে। গাজায় ইসরাইলী আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলেওবাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রতিবাদ করে যাচ্ছে । ।এই ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে একটু পেছন ফায়ার তাকাতে হবে, এসব চলছে ১৯৪৮ সালে আরব ভূখন্ডে ইসরাইল নামের ইহুদি রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে। এসমস্যা কেন্দ্র করে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে চার বার যুদ্ধ হয়েছে, জাতিসংঘে একাধিক প্রস্তাব নেয়া হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে কয়েকটি শান্তি চুক্তি হয়েছে, কিন্তু মূল সমস্যার কোন সুরাহা আজো হয়নি। বরং দিন দিন সমস্যাটি আরো জটিল হয়েছে। পরিণতিতে ইসরাইলের অবস্থান সুদৃঢ় হচ্ছে। যে ইহুদিরা এক সময় ফিলিস্তিন ভূখন্ড ইহুদি ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে দু’ভাগ করে দিলেই খুশি ছিল, এখন তারা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারই বিরোধী।

প্রয়াত ইয়াসির আরাফাত ফিলিস্তিন আইন পরিষদে যে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে স্বাগত জানিয়েছে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েল আরাফাতের ফিলিস্তিনী কতৃপক্ষ সংস্কারের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে সাহায্য করতে প্রস্তুত। তৎকালীন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র এরি ফ্রেশার বলেন, প্রেসিডেন্ট বুশ আরাফাতের বক্তব্যকে ইতিবাচক বলে মনে করেন। তবে প্রেসিডেন্ট কথা নয়, কাজে এর বাস্তবায়ন দেখতে চান। তিনি বলেন, ইয়াসির আরাফাত ও ফিলিস্তিনী কতৃপক্ষের অন্যান্য নেতা ফিলিস্তিনী জনগণের জন্য এবং এঅঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে কী বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন প্রেসিডেন্ট বুশ তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র্রনীতি বিষয়ক প্রধান হাভিয়ের সোলানা বলেন, ইয়াসির আরাফাত ইইউকে জানিয়েছেন, শরৎকালের গোড়ার দিকে ফিলিস্তিনে পার্লামেন্ট ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।এর আগে শ্যারন বলেছেন, ফিলিস্তিন কতৃপক্ষের মৌলিক সংস্কার সাধন না হলে কোন শান্তি আলোচনা হবে না। শ্যারন ইসরাইলী পার্লামেন্টে বলেন, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, পচাগলা প্রশাসনের সঙ্গে কোন শান্তি আলোচনা হতে পারে না।শ্যারনের এই মন্তব্যের পর ইয়াসির আরাফাত গত ১৮ এপ্রিল আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি বৃহত্তর সংস্কার কর্মসূচীর অংশ হিসেবে আগামি ছয় মাসের মধ্যে দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। ১৯৯৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বচনে আরাফাত ভোটারদের ব্যাপক সমর্থনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হন।
এদিকে ইসরাইল অধিককৃত এলাকায় তার সামরিক আগ্রাসন, হত্যা, নির্যাতন আব্যাহত রেখেছে। ফিলিস্তিনী কট্টর পন্থী গ্র“পগুলোও বসে নেই। তারা তাদের আত্মঘাতি হামলা একটার পর একটা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নিকট এবিষয়টি গোপন কিছু নয় যে, ইঙ্গ-ফরাসী- মার্কিনদের প্রত্যক্ষ মদদে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে আরব ভূমিতে অবৈধভাবে ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ইসরাইলের মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড সমর্থন করে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার তৈল স্বার্থ রক্ষায় আরব দেশগুলোর উপর ইসরাইলকে লাঠিয়াল বা বরকন্দাজ হিসেবে ব্যবহার করছে। ইঙ্গ-ফরাসী মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলেই ইসরাইলের সাথে ১৯৪৯, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের চারটি যুদ্ধেই আরবরা হেরে যায়। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের সময় মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বলেছিলেন, আমরা তো ইসরাইলকে হারাতে পারি; কিন্তু মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নয়। সেবার নাকি যুদ্ধে ইসরাইলের বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য ইসরাইলী সৈন্যদের ইউনিফরম পরিয়ে মার্কিন সৈন্যদের নামিযে দেয়া হয়েছিল। তার আগে ১৯৫৬ সালে তো ইঙ্গ-ফরাসী বাহিনী ঘোষণা দিয়ে ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সেবার সোভিয়েট রাশিয়ার ধমকে রণে ভঙ্গ দিয়ে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এক কথায় মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা দুনিয়ার শুধু তৈল স্বার্থ রক্ষাই কি ইসরাইলকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে , না এর পিছনে আরো কারো স্বার্থ জড়িত রয়েছে? সত্যিকথা বলতে কি, শুধু পশ্চিমা দুনিয়ার তৈল স্বার্থই নয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আরবদের মধ্যে অনৈক্যতা ও দ্বিধাদ্বন্দের বিষয়টিও উপেক্ষা করার নয়। কারণ ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ৫২ লাখ বর্গ মাইল এলাকাব্যাপী আরব রাষ্ট্রগুলোর জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি। সে সময় শুধু ফিলিস্তিনী আরবদের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৪০ লাখ। অপরদিকে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬ লাখ। সামরিক দিক থেকেও তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল আরবদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল না। তারপরও সাম্রাজ্যবাদ তোষণ ও নিজেদের মধ্যকার অনৈক্যতার ফলে আরবরা ইহুদীদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, রাজতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রগুলোও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মনে প্রাণে চায়নি এবং এখনো কতটু চায় বলা মুশকিল। তারা মনে করে, এমনিতেই মধ্যযোগীয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি তাদের দেশের সাধারণ মানুষদের সমর্থন নেই। তারা টিকে আছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ছত্রছায়ায়। পশ্চিম এশিয়ায় আরেকটি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের গদি রক্ষাই মুশকিল হয়ে পড়বে। অতীতের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে দু‘ভাগ করে ইহুদী ও আরব ফিরিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। উক্ত প্রস্তাবে জেরুজালেমকে জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে একটি আন্তর্জাতিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইহুদীরা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু আরবরা তা প্রথ্যাখ্যান করে। এরপর ইহুদিরা জাতিসংঘের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফিলিস্তিন অঞ্চল নিজেদের দখলে নেয়ার জন্য যুদ্ধ শুরু করে। ফিলিস্তিনী আরব স্বেচ্ছাসেবী দল বাধা প্রদান করে। এই যুদ্ধে ইহুদিরা জয়লাভ করে। ফিলিস্তিনীরা আরব রাষ্ট্রগুলোর নিয়মিত বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করে। কিন্তু আরব লীগে মতবিরোধ দেখা দেয়। এরূপ পরিস্থিতিতে বৃটেন ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ম্যান্ডেট প্রত্যাহার করে ফিলিস্তিন থেকে তার সৈন্য বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। কিšু— তার আগের দিন ১৪ মে ইহুদি নেতা ডেভিড বেন গুরিয়ান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা প্রদান করেন। আরব বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়। নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব করে। কিন্তু আপোষ মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়। সেবার ডিসেম্বরে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। এক পর্যায়ে আরবদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ইরাক, সিরিয়া ও জর্দান তাদের সৈন্য বাহিনী প্রত্যাহার করে। পরবর্তীতে মিসরও তার বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। এসময় মিসর দখল করে গাজা এলাকা, সিরিয়া গোলান মালভূমি এবং জর্দান দখল করে জর্দান নদীর পশ্চিম তীর। নিরাপত্তা পরিষদ কতৃক আরোপিত যুদ্ধ বিরতির প্রেক্ষিতে ১৯৪৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী ইসরাইল ও মিসরের মদ্যে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হয়। এরপর ইসরাইল এবং সিরিয়া ও জর্দানের মধ্যেও যুদ্ধ বিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আরব ও ইহুদিদের মধ্যে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু মাঝখানে ফিলিস্তিন ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো ফিরিস্তিনের কিছু অংশ নিজেরা দখল করার পর স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কাগুজে বিবৃতি ছাড়া তেমন কোন কর্যকর পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করে না। øায়ু যুদ্ধের দিনগুলোতে মিসর, সিরিয়া, ইরাক, উত্তর ইয়েমন, লিবিয়া সোভিয়েট ব্লকে এবং সৌদি আরব, কুয়েতসহ রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলো থাকে মার্কিন ব্লকে। ফলে ঐক্যবদ্ধ আরব শক্তি আর কখনো ইসরাইলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।
১৯৪৮ সালের পর ফিরিস্তিনের মুসলিম জনগোষ্ঠি মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন আরব ও অনারব দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। এতো বিপর্যয়ের মধ্যে তারাও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। তারা বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৬০ সালের গোড়ার দিকে তারা একটা জাতীয় সংগঠনের মাধ্যমে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। অবশেষে ১৯৬৪ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বা পিএলও গঠিত হয়। পিএলও’র কার্যনির্বাহী কমিটি ৪শ’ সদস্য বিশিষ্ট ফিলিস্তিন ন্যাশনাল কাউন্সিল দ্বারা নির্বাচিত। কার্যনির্র্বাহী কমিটিতে ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। ইয়াসির আরাফাত এই কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি পিএলও’র অঙ্গ সংগঠন আলফাতাহ্ গ্র“পের প্রধান। কার্যনির্বাহী কমিটিতে রয়েছে আলফাতাহ্ --৪, আসসাইকা --৩, পপুলার ফ্রন্ট--১, পপুলার ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট--১, এবং অন্যান্য গ্র“প থেকে--৫ জন।
ইসরাইল পাশ্চাত্যের পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন পুনরায় প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো আক্রমণ করে বসে। এই যুদ্ধে তারা আরবদের বেশ কিছু এলাকা দখল করে নেয়। মিসর গাজা ও সিনাই উপত্যকা হারায়। পশ্চিম তীর ও জেরুজালেম শহর জর্দানের হস্তচ্যুত হয়। সিরিয়া গোলান মালভূমিসহ কুনায়তারা থেকে বেদখল হয়। ১৯৭৩ সালের অকটোবর মাসে পুনরায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩২৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব ঘোষণা করে। মিসর তার সিনাই এলাকা ফিরে পায়। কিন্তু গাজা, গোলান মালভূমি, জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর এলাকা ইসরাইল তার দখলে রেখে দেয়। কিন্তু বিভিন্ন আরব রাষ্ট্র, বিশেষ করে রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ দেখা যায় না। তারা বরং তখনো জর্দানের অধীনে একটি স্বায়ত্ত শাসিত ফিলিস্তিন প্রদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখতে থাকে।
অবশেষে ১৯৭৪ সালে মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত আরব শীর্ষ সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়, জর্দান নয়, এখন থেকে পিএলও ফিলিস্তিনী জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হবে। সেবারই পিএলও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও ফিলিস্তিনীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু তারপরও পিএলও’র অঙ্গ দলগুলোর মধ্যে বিরোধ থেকেই যায়। ১৯৮২ সালে লেবাননের ত্রিপলী শহরে আরাফাতের বিরুদ্ধে পিএলও’র সিরিয়া পন্থী গ্র“প বিদ্রোহ করে। ফলে ৬ হাজার অনুচর নিয়ে আরাফাতকে ত্রিপলী ছাড়তে হয়। তাদের অধিকাংশ উত্তর ইয়ামেনে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৮২ সালের ১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিগান জর্দানের সাথে ফেডারেশন স্থাপনের শর্তে পশ্চিম তীরে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি তার সমর্থন ঘোষণা করেন। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ২৫ মার্চ কুয়েতে পিএলও’র দ্বিতীয় বৃহত্তম নেতা আবু সায়াদ ইসরাইলের সাথে শান্তি স্থাপনের ব্যাপারে জর্দানের বাদশাহ হোসেনের সাথে সহযোগিতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সিরিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক স্থাপনের পাল্টা প্রস্তাব করেন।
ইসলাইলও পিএলও’র এই অন্তর্র্র্বিরোধের সদ্ব্যবহার করে। সে মৌলবাদীদেরকে পিএলও’র বিরুদ্ধে উসকে দেয়। আরব ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সূত্রের মতে, পিএলও’র নীতি সেক্য্যুলার গণতান্ত্রিক। তাই পিএলও’র প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে ইসরাইল ইসলামিক ব্রাদারহুড, হামাস, ইসলামী জিহাদ, হিজবুল­াহ প্রভৃতি মৌলবাদী গ্র“পগুলোকে গোপনে মদদ যোগাতে থাকে। এসব মৌলবাদী সংগঠন ঘোষণা করে, ফিলিস্তিন হবে একটি ইসলামী রাষ্ট্র। বর্তমানে এই হামাস ও ইসলামী জিহাদই অধিককৃত এলাকায় অধিকাংশ আত্মঘাতি বোমা হামলা পরিচালনা করছে। তাদের উপর ইয়াসির আরাফাতের তেমন নেই। তারা আরাফাত বিরোধী। কিন্তু তাদের আত্মঘাতি হামলার অজুহাতে ইসরাইল পশ্চিম তীরের বিভিন্ন উদ্বাস্তু শিবিরে বর্বরোচিত আক্রমণ চালাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইসরাইল তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
সে যাক, ১৯৮৮ সালের ১৫ নবেম্বর আলজিয়ার্সে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইয়াসির আরাফাত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণা প্রদান করে একটি প্রবাসী সরকার গঠন করেন। এই সরকারকে ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা পূর্ণাঙ্গ সদস্য পদ প্রদান করে। ইরাকের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলে পিএলও ইরাকের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করে। তাতে কুয়েত, সৌদী আরব, আরব আমিরাতসহ দক্ষিণ পন্থী আরব রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনীদের নির্যাতন আরম্ভ করে। ইয়াসির আরাফাত বুঝতে পারেন, রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর সব সময়ের জন্য নির্ভর করা ঠিক হচ্ছে না। তাই ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনায় তিনি বাস্তব সম্মত পথে পা বাড়ান। নরওয়ের উদ্যোগে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে পিএলও- ইসরাইল শান্তি চুক্তির রূপরেখা নির্ধরিত হয়। ১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পিএলও এবং ইসরাইল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পিএলও ইসরাইলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করে নেয়। ইসরাইলও গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনীদের সীমিত স্বায়ত্ব শাসন প্রদানের অঙ্গীকার করে। সিদ্ধান্ত হয়, পশ্চিম তীরের জেরিকো থেকে এই স্বায়ত্ব শাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ১৯৯৪ সালের ৪ মে কায়রোতে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে এই স্বায়ত্ব শাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৯৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আরেকটি চুক্তির মাধমে স্বায়ত্ব শাসন স¤প্রসারণ করা হয়।
এরপর ১৯৯৮ সালের ২৪ অকটোবর মেরিল্যান্ডের ওয়ে নদী তীরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ইসরাইল ও পিএলও’র মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাতে আরো ১৩ শতাংশ ভূমি থেকে ইসরাইলী সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। পরবর্তীতে ইসরাইল ও পিএলও’র মধ্যে আরো কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনী মৌলবাদী সংগঠনগুলোর আত্মঘাতি তৎপরতা এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর অনৈক্যতার সুযোগে ইসরাইল তার নিরাপত্তা ও নানা অজুহাত দেখিয়ে এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না। কাল ক্ষেপণের মাধ্যমে ইসরাইল লাভবান হচ্ছে। প্রায় সব ক‘টি আরব রাষ্ট্রের নিকট থেকে সে তার অস্তিত্বের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। আর ফিলিস্তিনীরা তার বর্বরতার শিকার হচ্ছে।
তৎকালীন সৌদী যুবরাজ আবদুল­াহ একটি শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তাতে ইসরাইলকে আরব রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতির বিনিময়ে ইসরাইল কতৃক দখলকৃত সব এলাকা ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক রাষ্ট্র এটি অনুমোদন করেছে। কিন্তু কোন কোন আরব রাষ্ট্র তা অনুমোদন করেনি। তা’ছাড়া এটি নতুন কিছু নয়। এর আগেও ১৯৮১ সালে সৌদী আরবের তৎকালীন যুবরাজ বাদশাহ ফাহাদ ৮ দফা প্রস্তাবসহ একটি শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেন। কিন্তু তাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উলে­খ ছিল না। এজন্য পিএলও তা প্রত্যাখ্যান করে। যুবরাজ আবদুল­াহ পেশকৃত বর্তমান শান্তি পরিকল্পনা উক্ত শান্তি পরিকল্পনারই কার্বন কপি। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, প্রথমটাতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা ছিল না। এবারে তা রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে ইয়াসির আরাফাতের ঘোষণা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে একটি সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এধরনের রাষ্ট্র রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলো চায় না। কারণ তাতে তাদের নিজেদের গদি ধ্বসে পড়ার আশংকা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও মনে করে, এধরনের রাষ্ট্র কায়েম হলে তার বশংবদ তৈল সমৃদ্ধ রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা কাহিল হয়ে পড়বে। তাতে তার তৈল স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়া অনিবার্য। এমনকি, ধর্মভিত্তিক ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলও তা চায় না। তাই তারা ফিলিস্তিনীদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক ইয়াসির আরাফাতকে পিএলও’র নেতৃত থেকে সরানোর ষঢ়যন্ত্র করছে। একদিকে বলছে, পিএলও কতৃপক্ষ সংস্কার করতে হবে। বর্তমান নেতৃত্বের সাথে শান্তি আলোচনা করা যায় না। অপর দিকে মৌলবাদী ফিলিস্তিনীদের দ্বারা আত্মঘাতি বোমা হামলা করাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলই নয়, রক্ষণশীল আরব রাষ্ট্রগুলোরও এই ষঢ়যন্ত্রের পিছনে ইন্ধন রয়েছে। এরূপ পরিস্থিতিতে অতীতের মত এবারও মধ্যপ্রাচ্যে কায়েমী স্বার্থবাদিরা একটা না একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকিয়ে রাখবে । শুধু বিশ্ববাসীর চোখে ধূলা দেয়ার জন্য মাঝে মাঝে নানা পরিকল্পনা পেশ করাবে। তাতে করে বহু মাত্রিক স্বার্থ রক্ষার মারপ্যাঁচে ফিলিস্তিন সমস্যা ঝুলে থাকছে। ফিলিস্তিনীরা বার বার ইসরাইলের বর্বরতার শিকার হচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:০৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই তো আছি বেশ

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১২:২১




বেশ হয়েছে বেশ করেছি
কানে দিয়েছি তুলো
জগত সংসার গোল্লায় যাক
আমি বেড়াল হুলো

আরাম করে হাই তুলে
রোজই দেখি পেপার
দেশ ভর্তি অরাজকতা
আচ্ছা!! এই ব্যাপার

কার ঘরেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবনিক~২য় পর্ব (তৃতীয় খন্ড)

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ দুপুর ১:৩৯


আগের পর্বের জন্যঃ Click This Link
ভোরের শুরু থেকে রাতের দ্বি-প্রহর পুরোটা সময় আমার এলিনার কাছে পিঠে থাকতে হয়। অল্প বয়সীরা যা হোক আকার ইঙ্গিত আর অতি ভাঙ্গা ইংরেজি বুঝে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্বিষ্ট

লিখেছেন শিখা রহমান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৪:৫৮


আজকাল কোন কিছুই আর অবাক করে না।
রাজপথে ফুটপাতে হেঁটে যাওয়া অগণিত মানুষের গল্প
খুব সাদামাটা মনে হয়;
কোন কবিতাই অবাক করে না আর,
উপমা-উৎপ্রেক্ষা শব্দের ব্যাঞ্জনা আশ্চর্য করে না আজকাল।

মহামারীতে উজাড় হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথায় কথায় ধর্মকে গালি ও উপহাস করবেন না.........

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ বিকাল ৫:১২

কথায় কথায় ধর্মকে গালি ও উপহাস করবেন না.........

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সংখ্যালঘুদের উপর অনাকাংখিত হামলার জন্য যে কোন ধর্মকে গালাগালি করা বা ধর্মকে দোষারোপ করা বন্ধ করুন।

১। মুসলমানদের মধ্যে একদল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মীয়গ্রন্হ কে কিনতে পারবে, বহন করতে পারবে, কোথায় রাখতে পারবে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২১



কে ধর্মীয় বই কিনতে পারবেন, পড়তে পারবেন, কোথায় রাখতে পারবেন, কোথায় ফেলে দিতে পারবেন, এই নিয়ে কোন নিয়ম কানুন আছে?

আমি বাংলাদেশের কথা জানি না, নিউইয়র্কের কথা বলি;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×