বসন্তের বিকেলবেলা বরিশাল শহরটাকে আমার অসম্ভব ভালো লাগে। ধূলোবালিহীন, শান্ত-ছোট্ট এক শহর। যেখানে নেই অতিরিক্ত মানুষের চাপ, গাড়ির মাত্রাতিরিক্ত কালো ধোঁয়া, নেই সারাক্ষণ ঢাকার মত অযথা টেনশনের যন্ত্রণা – ঘর থেকে বের হয়ে আবার ফিরতে পারব তো! এজন্যেই বোধহয় কবি জীবনানন্দ দাশ বরিশালে বসে নিশ্চিন্তে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন আর সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন অসাধারণ ভালোলাগার কবিতার শরীর।
আমি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি শত বছর আগে এখানেই হয়ত বহুবার হেঁটেছেন জীবনবাবু। দেখেছেন চারদিক। ভেবেছেন তার কবিতা নিয়ে। হ্যাঁ, আমি এখন একদম তার বাসার সামনে। বরিশালের বগুড়া রোডের মুন্সির গ্যারেজ এলাকার এ ‘ধানসিঁড়ি’ নামক বাড়িটিতেই কবি তার জীবনের বহুকাল কাটিয়েছেন। আমি সবসময় গর্ব করে বলি, বরিশালে জীবনবাবুর বাসা আর আমার বাসার দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা। এমন ভুবনবিখ্যাত কবির প্রতিবেশী হতে পারাটা আমার কাছে বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে হয়। শুনেছি মানুষ মারা গেলে তার কথা, তার আত্মা অনন্তকাল ধরে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মৃত মানুষের আত্মা তার জীবিতকালের প্রিয় স্থানগুলোতেই নাকি বার বার ফিরে ফিরে আসে। আচ্ছা জীবনবাবুর আত্মা কি এখন এখানে আছে? আমার মত উদাস প্রকৃতির এক তরুণকে তার শৈশবের বাড়ির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি এখন কি ভাবছেন? ইশ যদি মাত্র দুইশ বছর আগে এখানে জন্মগ্রহণ করতাম তাহলে নিঃসন্দেহে আমি কবির সাথে বন্ধুত্ব করতাম!
হঠাৎ পকেটের মধ্যে কি যেন নড়ে উঠল! ওরে বাপরে কে নড়ে! না তেমন ভয়ের কিছু নেই। সাইলেন্ট করা মোবাইলে ভাইব্রেশন অন করা ছিল বলে ওটাই কেঁপে কেঁপে উঠছে। রাকিব কল করেছে,’ওই তুই কই? আসবি না?’
আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ বিকেলে রাকিবদের বাসায় আমার যাবার কথা। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দোস্ত আসতেছি। রিকশা নিলে জাস্ট দশ মিনিট লাগবে।‘
‘তুই এখনো রিকশা-ই নিশনি! আয় তাড়াতাড়ি আয়!’
‘আসছি। আসছি।‘
রাকিব কল কেটে দেয়।
রাকিব আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার জীবনে দেখা অসম্ভব বুদ্ধিমান ছেলেদের একজন। বরিশাল মেডিকেলে পড়ে। মেডিকেলে পড়লেও নতুন টেকনোলজি বিশেষ করে কম্পিউটারের প্রতি তার আগ্রহ মারাত্মক। আমি যখনই ওর বাসায় গিয়েছি তখনই দেখেছি ও ল্যাপটপ নিয়ে গুঁতোগুঁতি করছে। আমরা বন্ধুবান্ধবরা অনেকেই কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ব্লগ ইত্যাদি বিষয়ে প্রথম ধারণা পেয়েছি ওর কাছ থেকে। আমি তো প্রায়ই বলি তুই ডাক্তারি না পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে অনেক ভাল করতি!
রাকিবদের বাসা বরিশালের বটতলা এলাকায়। আমি দশ মিনিটের আগেই ওখানে পৌঁছে গেলাম। ও বাসার গলি থেকে বের হয়ে মেইন রোডে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমাকে দেখেই ক্ষেপে গেল, ‘গাধা তকে বললাম পাঁচটার মধ্যে আসতে। তুই এসেছিস ছয়টা বাজিয়ে।‘
‘কেন? কি হয়েছে?’
‘তাড়াতাড়ি চল। চা খেয়ে আসি। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।‘
‘মানে কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।‘
‘পারবি। পারবি। সময় হলে এমনিতেই বুঝে যাবি।‘
রাকিবদের বাসা থেকে একটু সামনে এগুলেই অক্সফোর্ড মিশন রোড। এ রোডটা যেখানে বটতলা মেইন রোডের সাথে মিশেছে ঠিক সেখানে একটা চায়ের দোকান রয়েছে। হারুন নামক মধবয়সি একলোক এ দোকানটি চালায়। আমরা একে ‘হারুন টি স্টল’ বলি। হারুনের হাতে যাদু আছে কিনা জানি না তবে সারাটা বছর তার দোকানে উপচে পড়া ভীড় লেগে থাকে। এত স্বাদ ওর চায়ে! অনেকে বলে নির্ঘাত ও ওই চায়ে আফিম মেশায়। তাই যে একবার খায় সে আসক্ত হয়ে পড়ে! কী ভয়াবহ কথা! তাহলে কি আমরা সবাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছি! আমি না হয় মাদকাসক্ত (!) হয়ে পড়েছি কিন্তু এদিকে রাকিব যে অন্যকিছুতে তীব্র আসক্ত হয়ে পড়ছে তা বিকেলে চা খেতে খেতেই টের পেলাম!
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি মূলত সেখান থেকেই অক্সফোর্ড মিশন রোডের শুরু। এ রোড ধরে একটু সামনে এগুলেই বরিশালের বিখ্যাত গণিত শিক্ষক শহিদ স্যারের বাসা। স্যার মহিলা কলেজের প্রভাষক বিধায় তার কাছে প্রতিদিন বিকেলে এ রোড ধরে অনেক মেয়ে পড়তে আসে, আবার ফিরে যায়। আর আমরা প্রতিদিন ঠিক এখানটাতেই ঠিক এসময়য়েই এভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাই! এদিক অদিক তাকাই! আর এটা তো আমাদের দোষ না, এটা হল বয়সের দোষ! তাছাড়া বিখ্যাত বিজ্ঞানী আল হাজেন তো বলেছেন, বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে এলে আমরা তা দেখতে পাই। তাই কী আর করা!
হঠাৎ রাকিবের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে আমি এতটাই নড়ে উঠলাম যে আর একটু হলেই হাত থেকে চায়ের কাপই পড়ে যেত! ‘কিরে, কি হইল?’ আমি বললাম। রাকিব মুখে কিছু বলল না চোখে ইশারা করল। দেখলাম নীল রঙের শর্ট কামিজ পরা একটা মেয়ে রিকশায় চড়ে এদিকেই আসছে। আর আমাদের রাকিব তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেবার আগেই রিকশাটা আমাদের সামনে থেকে চলে গেল। আমি বললাম, ’মামা! তুমি তো শেষ!’
‘আমারও তো তা-ই মনে হচ্ছে রে!’ বলল রাকিব। মেয়েটার চলে যাওয়া রিকশার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে রাকিব চিৎকার করে উঠল, ‘দোস্ত দেখতো ওইটা কি? শকুন না? এদিকেই তো উড়ে আসছে!’
‘কই আমি তো কিছুই দেখছি না! তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি! বাংলাদেশ থেকে শকুন বিলুপ্ত হয়ে গেছে তো বহু বছর আগেই! শালার মাথা নষ্ট!’ এ কথা বলেই রাকিবের মাথায় হালকা একটা চাটি মারলাম। তারপর ওকে বললাম, ‘এখনো কি শকুন দেখতে পাচ্ছিস?’
‘না, পাচ্ছি না।‘
রাকিবের কণ্ঠে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার আভাস!
(চলবে)
তন্ত্রশক্তি বিধান (বড় গল্পের পথে ছোট করে শুরু)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।