///দুই////
সকালে ঘুম ভাঙতেই মেজাজটা চরম খারাপ হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছোঁয়ার আগেই লোডশেডিং। এ বসন্তকালেও এত গরম! ঘেমে একদম নেয়ে উঠলাম। এমনিতেই আমাদের ফ্ল্যাটটা পশ্চিম দিক ঘেঁষা। তাই এখানে গরম বা ঠাণ্ডা দুটোই বেশি লাগে। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের আবহাওয়া অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। কখন যে গরম পড়বে, আবার কখনই বা ঠাণ্ডা লাগবে কিংবা সময়ের বৃষ্টি অসময়ে হবে কিনা তার কোন তাল ঠিক নেই। প্রকৃতির এ আজব আচরণ যতটা না অস্বস্তির তার চেয়ে অধিক বেশি আতঙ্কের- কখন আবার বড় অঘটন ঘটে কে জানে!
ওরে বাপরে! পাঁচটা মিসড কল! কিন্তু এত সকালে রাকিব কল দিল কেন? আমি তাড়াতাড়ি ওকে কলব্যাক করলাম।
‘কি রে এত সকালে ফোন দিছিস কেন?’
‘শোন, এখন মেডিকেলে যাচ্ছি। দুটোর মধ্যে বাসায় ফিরে আসব।‘ বলল রাকিব। ‘তুই পাঁচটার আগেই আমাদের বাসায় চলে আসবি। আজকে ওর সাথে কথা বলব। তুই সাথে থাকবি!’
‘কার সাথে?’
‘আররে ওই যে সেদিন দেখলাম শহিদ স্যারের ছাত্রী, রিকশায় আমাদের সামনে থেকে গেল।‘
‘তুই কি পাগল হয়েছিস? রাস্তায় রিকশা আটকিয়ে একটা মেয়ের সাথে কথা বলবি! এলাকার সবাই কি বলবে? মান সম্মান তো কিছুই থাকবে না! তাছাড়া এখন ইভটিজিং নিয়ে নানান আন্দোলন হচ্ছে। মেয়ে যদি কোন সিন ক্রিয়েট করে তাহলে কিন্তু খবর আছে। সোজা জেলে যেতে হবে!’
‘উহ তুই একটা ভীতুর ডিম। আমি কি একবারও বলেছি যে আমি রিকশা আটকাব? তুই আগে আয় তো!’
‘মামা তোমার দেখি সাহস অনেক বেড়ে গেছে! তা এতই যখন তুমি বীরপুরুষ একাই যাও, আমারে ডাক কেন?’
আমার কণ্ঠের দৃঢ়তা বুঝতে পেরে রাকিব নরম সুরে বলল, ‘ দোস্ত! প্লিজ তুই আয়। তুই ছাড়া আমার কে আসে বল!’
রাকিবের কণ্ঠের এমন অসহায় আকুতিতে সাড়া না দিয়ে পারলাম না। বুঝলাম ওর অবস্থা এখন শামুকের মতন! উপরে শক্ত হলেও ভেতরে পর্যাপ্ত কাঠিন্য নেই।
বিকেলবেলা।
রাকিব আজকে বেশ সাজুগুজু করে এসেছে! ক্লিন শেভ মুখে শরীর জুড়ে লাল টিশার্ট আর নীল জিন্স প্যান্টের বসবাসে ওকে বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছে। তবে পরনের স্যান্ডেলটা একটু রংচটা হয়ে গেছে – এই আর কি!
যতই ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা অতিক্রম করে একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে চলল ততই আমার মধ্যে কেমন যেন একধরনের বিব্রতকর অনুভূতি গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগল। এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে তো আমরা প্রতিদিনই চা খাই কিন্তু কখনও তো এমন লাগেনি। অবশ্য এর একটা ব্যাখ্যা এমন হতে পারে – অন্যদিনগুলোতে আমাদের দাঁড়ানোর পেছনে কোন বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে না কিন্তু আজ যে আছে!
‘দোস্ত ওই যে আসছে!’ রাকিবের সতর্কবাণী। অবশ্য এখানে আমার সতর্ক হবার কিছু নাই। কারণ আমি কিছুই করতে পারব না। যদি কোন গণ্ডগোল বাঁধে তাহলে ওকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও করতে পারি! আবার কিছু নাও করতে পারি। যা হোক এখন আমি চুপচাপ দর্শকের ভূমিকায় থাকলাম।
একটুপর অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম রাকিবও চুপচাপ দর্শকের ভূমিকায়ই থাকল। সেও কিছুই করতে পারল না। মেয়েটা আমাদের সামনে থেকে রিকশা নিয়ে যথারীতি চলে গেল।
জীবনে এই প্রথম মনে হয় একটু সাহস দেখিয়ে ফেললাম। ‘এই রিকশা যাবে?’ বলেই একটা খালি রিকশা দাড় করালাম। ‘চল, ওর বাসাটা চিনে আসি।‘ বলেই স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া রাকিবকে রিকশায় তুলে নিলাম। আমাদের রিকশা ওই মেয়েটার রিকশা ফলো করতে লাগল।
বটতলা থেকে বগুড়া রোড হয়ে মেয়েটার রিকশা নতুনবাজার পার হয়ে মড়কখোলার পোলের দিকে এগুতে লাগল। নামটা ‘মড়কখোলার পোল’ হলেও আসলে এটা একটা বড় ব্রিজ। ব্রিজের একপারে নতুনবাজার আর অন্যপাড়ে শ্মশানঘাট। বরিশালের শ্মশান কিন্তু যেনতেন শ্মশান নয়। অনেকের মুখেই শুনেছি এটা নাকি উপমহাদেশের অন্যতম বড় এবং পুরনো শ্মশান – তাই একে শুধু শ্মশান বললে ভুল হবে এটা হল মহাশ্মশান। এখানে প্রতিদিন অনেক মরা পোড়ান হয়। যাদেরকে এ ব্রিজের উপর দিয়েই বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারনে হয়ত বা এর নামকরণ করা হয়েছে ‘মড়কখোলার পোল’।
মেয়েটার রিকশা মড়কখোলার পোলের উপর উঠতেই আমাদের রিকশার চেইন পড়ে গেল।
‘শিট!’ রাকিবের চোখ-মুখে অযাচিত বিরক্তি।
আমাদের রিকশা যখন আবার চালু হল ততক্ষণে আমরা মেয়েটার রিকশা হারিয়ে ফেলেছি। মড়কখোলার পোল দিয়ে নামার পর রাস্তা তিনদিকে চলে গেছে। আন্দাজে কোন দিকে যাই?
‘ধ্যাত! এত দাপাদাপি করে এসে কোন লাভ হল না।‘ বললাম আমি।
হঠাৎ রাকিব পাশের একটা মেহগনি গাছের মাথার দিকে আঙুল তুলে বলল, ’দোস্ত দ্যাখ সেই শকুনটা!’
‘কই আমি তো কিছুই দেখছি না!’
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১১ রাত ১১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


