somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হ্রেষাধ্বনি ও অন্যান্য কণ্ঠস্বর

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ সকাল ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

০১. জ্যোৎস্নায় একটি ঘোড়া
ওদের সামনে নাতিদীর্ঘ জলাশয়। তারপর বিচারপতির মত গম্ভীর, জবুথবু এক বটগাছ। বটগাছের ওপাশে পয়মন্ত জঙ্গল। জঙ্গলের উপরের আকাশ ভরে আছে এক প্রকার জলজ অন্ধকারে; মেঘখণ্ডসদৃশ একখণ্ড গাঢ় অন্ধকার ঈষৎ ঝুঁকে বটের মাথা ছুঁয়েছে; মাথা থেকে খানিকটা তরল অন্ধকার বটের ডালপাতা চুঁইয়ে ঝুরি বেয়ে টাল খেয়ে নেমেছে মাটিতে, আর যেই ছুঁয়েছে মাটি অমনি সময়ের উজান বেয়ে পেয়ে গেছে আদিমতম এক মাত্রা। সেই অদিমতায় ওদের যৌথ দৃকপাত; ওদের মধ্যে একজন রমিজ- পোষাকে আচারে ব্যবহারে যার শহুরে পালিশ এবং অন্যজন ইদ্রিস- অবিমিশ্র গেঁয়ো চাষা।
হঠাৎ আদিম আদিম অন্ধকারের জালিকা ফুঁড়ে জলাশয়ের ওপাশে নেমে আসে এক প্রকাণ্ড ছায়া-জানোয়ার। রমিজের মনে হয় যেন রূপকথার গ্রাউন্ড থেকে বাস্তবের প্রান্তরে নেমে এসেছে পক্ষীরাজ; ম্যাজিক রিয়ালিজম নাকি? রমিজের এ ধরনের ভাবনার সাথে পাল্লা দিয়ে যেন চাঁদটা ওঠে। পশ্চিম দিগন্তে অন্ধগলির মুখে যৌনকর্মীর গলা বাড়ানোর মত করে ধায় করে গলা বাড়ায় চাঁদ। অন্ধকার পাঁক খেতে শুরু করে, যেন মন্থন দন্ডে মন্থিত হচ্ছে কালো দুধ।
ক্রোধে জ্বলছিল ইদ্রিস, বুকে তার সূর্যের মত দাউ দাউ অগ্নি-তুফান; ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে, যেন ডাইনোসর; আধো আধো অন্ধকারে সদ্য পরিস্ফুটিত পক্ষীরাজের দিকে ছুটে যায় লিকলিকে নিঃশ্বাস।
‘শালা বাশারের ঘোড়া! পুন্নিমায় ডাক দিছে আর কামে অন্ধ হয়ে দড়ি ছিড়ে মাগি এখন বেদিশা... ঘোড়ার বাচ্চা ঘোড়া...’
কথাটা শেষ করে না ইদ্রিস, ওর গালে ছিল জংলী তৃণখণ্ড, দাঁতে দাঁত চাপায় তৃণ দ্বিখন্ডিত হয়। থুঃ করে একটা খণ্ড ছুড়ে দেয় সামনে। রমিজ বিস্মিত হয়। এত ঘৃণা? এই রাশিকৃত ঘৃণা কি শুধু ঐ ঘোড়ার ওপর? নাকি ঘোড়ার অতীত কোন ঘোড়া?
রমিজ আশ্চর্য হয়ে বলে, ‘বাশারের ঘোড়া? এখনো বেঁচে আছে?’
‘আছে মানে ! বহাল তবিয়তে। রীতিমতন এই অঞ্চলের হিরোইন... এখনো শালা রেসে ফার্স্ট হয়। মাদি ঘোড়া তো-।’ ইদ্রিস থামে, বড় করে শ্বাস নেয়, যেন হাঁপাচ্ছে, যেন ঘোড়া ছুটিয়ে ক্লান্ত, নাকি একটি জবরদস্ত মাদি ঘোড়া ওর বুকের ’পরে চেপে বসেছে? ইদ্রিস ছেড়ে দেয়া কথার বল্গা ফের টেনে ধরে বলে, ‘কৈ মাছের জান। শরীলে গোস্ত নেই অথচ দ্যাখো কলজেই আগুন জ্বলতিছে দাউ দাউ। এই জাতটারে আল্লা ক্যান দুনিয়ায় পাঠাইছে জানিস?..... পোড়াতি, বিশ্বযুদ্ধ লাগে না ওরা ইচ্ছে করলি তামাম দুনিয়াডা পুড়ায়ে তামা করে ফ্যালাতি পারে।’
রমিজের মনে হয় ইদ্রিস এক জ্বলন্ত ভিসুভিয়াস। ওর শরীরের পেশল দলা পাকানো মাংসের নিচে রাজ-অম্লের মত এই তীব্র ক্রোধ এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল? যে ইদ্রিস শিশু যে ইদ্রিস কিশোর যে ইদ্রিস যুবক যে ইদ্রিস পাথরের মত শীতল ঘাতসহ নির্ঝঞ্ঝাট- অনেক চেনা সেই ইদ্রিসের ভেতর এত আগুন কিভাবে এল? কিভাবে প্রবেশ করল এতটা গভীরে- মর্মমূলে? কোথায় এ আগুনের উৎস? শুধু ওর স্ত্রী কুলসুমের পলায়ন ? শুধু একটি নারী কর্তৃক একটি পুরুষকে অস্বীকার?
ওদিকে বাশারের ঘোড়ার চঞ্চলতা বাড়ে। কয়েক বার ইতি উতি ঘড় ফেরায়। কামার্ত চোখে দৃশ্যগুলো সব বুঝি ঝাপসা। জলাশয়ের অপর পড়ে বসে থাকা দুই যুবককে সে দ্যাখে নি। অতঃপর সামনে ঝুঁকে গলা বাড়িয়ে দেয় জলাভূমিতে। চুক্ চুক্ করে পানি খায়। এবার বুঝি সে বুঝতে পারে, পানিতে সব আগুন নেভে না। বুঝতে পেরে সামনের দু’পা আকাশের দিকে তুলে একবার হ্রেষাধ্বনি করে, তারপর পশ্চিম দিকে ঘুরে দৌড়ের ভঙ্গিতে হেঁটে যায়, যেন চাঁদের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। রমিজ ঘোড়ার হেঁটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মৌনতায় ভরাট ওয়ে ওঠে।
ইদ্রিস বেশ কিছুক্ষণ আগে রমিজের বর্ণনা করা একটি গল্পের খেই ধরে বলে, ‘তোর কথা যদি সত্যি হয় আমি কুলসুমরে খুন করব, ওর কলজে টেনে ছিড়ে আনব...।’
‘কী জন্যে? ও আরেকজনের সাথে চলে গেছে বলে ?’ অজান্তেই প্রশ্নটা বেরিয়ে যায় রমিজের মুখ থেকে।
‘না।’ ইদ্রিসের কণ্ঠস্বরে একটা আলগা দৃঢ়তার হল্কা টের পায় রমিজ। ‘বেশ্যাপনা করার জন্যি।’
রমিজ আবার প্রশ্ন করে, ‘তুই ওর নাগাল পাবি কিভাবে?’
এবার বিপক্ষ থেকে কোন উত্তর আসে না। উত্তরের অপেক্ষাও করে না রমিজ। খানিকটা অন্যমনস্ক হযে ঘোড়ার চঞ্চল পায়ে হেঁটে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওদিকে খোলা বে-বহা প্রান্তর, শুরুতেই একটা পুরোন মন্দিরের ধবংস-স্তুপ; অকস্মাৎ সেখানে বাতি ঘরের মত জ্বলে ওঠে এক আলেয়া। নিবেও যায়; আর নিবে যাওয়া আলেয়ার আভাসের দিকে হেঁটে যেতে থাকে বাশারের ঘোড়া।

চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৫২
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×