বন্ধুরা,
আমরা সবাই জানি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সকালে ০৬ ব্যাচের তৌসিফ আহমেদ ঈশান কে কতিপয় সন্ত্রাসী পিটিয়ে আহত করে । এই ঘটনা বুয়েট ইতিহাসের সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত একটি আন্দোলনের জন্ম দেয়। সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবীতে বুয়েটের সকল বিবেকবান ছাত্র-ছাত্রী একজোট হয়ে এবং টানা তিনটি দিন বুয়েট ক্যাম্পাসে অবস্থান করে তারা নিজেদের দাবী আদায় করে নেয়। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দেয় বুয়েট প্রশাসন। এই আন্দোলনে কোন বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা মুখ্য ছিলনা, নিজেদের ও বুয়েটকে রক্ষা করার স্বার্থেই প্রতিটি বুয়েটিয়ান স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়।
দুঃখজনক হলেও সত্যি এই ঘটনার প্রায় ৪ মাস পর আমরা জানতে পারি যে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে এবং উপ-উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ করার অভিযোগে বিশ জন ছাত্রের একটি তালিকা করা হয়েছে। এদের ফলাফল তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটকে রাখা হবে, এবং এদের শেষ টার্মের গ্রেডশিট ও সরবারহ করা হবে না। এই তথ্য কোন বিজ্ঞপ্তি আকারে আমাদের জানানো হয়নি । তালিকাভুক্ত একজনছাত্র তার গ্রেডশিট তুলতে যেয়ে বিষয়টি জানতে পারে। পরবর্তীতে ০৬ ব্যাচের কয়েকজন মিলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় হতে ২০ জন ছাত্রের নাম মৌখিক ভাবে সংগ্রহ করে, যদিও তাদেরকে মূল তালিকার কাগজটি দেখতে দেওয়া হয়নি । এর প্রেক্ষিতে ০৬ ব্যাচের কয়েকজন ছাত্র গত সপ্তাহে মাননীয় উপাচার্য স্যারের সাথে দেখা করে , উপাচার্য স্যার জানান যে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এদের ফলাফল প্রকাশ করা হবে না । উপাচার্য স্যার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটির সাথে কথা বলার জন্য তাদেরকে পরামর্শ দেন ।
আজ ১৭ই এপ্রিল, ২০১২ তারিখ আমরা তদন্ত কমিটির প্রধান জনাব আব্দুর রশিদ সরকার স্যারের সাথে কথা বলার সুযোগ পাই, এর আগের কয়েকদিন তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও আমরা ব্যর্থ হই। আব্দুর রশীদ সরকার স্যার জানান উপ-উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশ এই ঘটনার তদন্ত এখন শেষ হয়নি এবং কোন তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠেনা। ছাত্রদের তালিকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন এই তালিকা কোন ব্ল্যাকলিস্ট নয় বরং ঐ সময়ে কি ঘটেছিল তা জানতে চাওয়ার জন্যেই এই সব ছাত্রের সাক্ষাতকার নেওয়া হবে, এবং তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় এদের কাউকে অপরাধী বলা সম্ভব নয়। রশীদ সরকার স্যার জানান, শিক্ষকদের কর্মবিরতি শেষ হওয়া মাত্রই এই ২০ জনের সাক্ষাতকার নেওয়া হবে এবং তার পরই তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্ট পেশ করবে। এই ২০ জনের তালিকা কিভাবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে গেল তা তিনি জানেননা। এই মুহুর্তে ২০ ছাত্রের ফলাফল আটকানোর কোন কারন বা এখতিয়ারও তার নেই। তিনি আরও বলেন কিছু ছাত্রের শুধুমাত্র ডাকনাম পাওয়া যাওয়ায় একই/কাছাকাছি নামের অনেককেই তালিকায় রাখা হয়েছে। কর্মবিরতি শেষ হওয়া মাত্রই এদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে বলে তিনি আমাদেরকে ধৈর্য ধরতে বলেন। তবে আমাদের পক্ষ থেকে বারবার এই তালিকা কিভাবেই বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসে গেল অথবা এই তালিকার ভিত্তিতে কিভাবে ২০ জন ছাত্রের গ্রেডশিট আটকে দেওয়া হল তা উনার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এই বিষয়ে তার কোন ধারণা নেই বলে জানান। ছাত্রদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্দোলনের রাতে পাচঁ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী উপ-উপাচার্যের রুমের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল। সেক্ষেত্রে সবাইকে তদন্তের অধীনে না এনে কেবল এই ২০ জনের নাম কিভাবে আসলো? এ প্রসঙ্গে স্যার জানান, এই নাম কারা দিয়েছে তা জানবার এখতিয়ার তদন্ত কমিটির বাইরের কারোরই নেই, এটি সম্পূর্ণ গোপন বিষয়। তিনি বারবার আমাদেরকে এই নিশ্চয়তা দেন যে ২০ জনের তালিকাটি শুধুমাত্রই তদন্তের স্বার্থে করা হয়েছে এবং কর্মবিরতি শেষ হলেই এই ২০ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে।
এরপর আমরা বিকাল চারটার দিকে মাননীয় উপাচার্য স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করি এবং স্যারকে রশীদ সরকার স্যারের সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে অবহিত করি। উপাচার্য স্যার বলেন যে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই তালিকার কারো ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব না। উপাচার্য স্যার আরো জানান তালিকায় ৭-৮ জনের নাম থাকার কথা, এসময় আমরা স্যারকে জানাই যে তালিকায় ২০ জনের নাম আছে এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস থেকেই এটা আমাদের জানানো হয়েছে। মাননীয় উপাচার্য স্যার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে বলেন। এসময় আমরা স্যারকে অনুরোধ করি যে এই ছাত্রদের গ্রেডশিট গুলো যেন অন্তত সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়, যাতে করে এদের কারো চাকরীতে নিয়োগ এবং মাস্টার্সের ভর্তিতে কোন প্রকার অসুবিধা না হয়। আমরা তদন্ত কমিটির প্রধানের সাথে সাক্ষাতের ভিত্তিতে উপাচার্য স্যার কে জানাই যে এই ২০ জনকে এখন অপরাধী বলা যাবে না, তদন্ত চলছে এবং এই ২০ জনের তালিকা গঠন করা হয়েছে সাক্ষ্য গ্রহনের জন্য। আমরা স্যারকে বলি যে এই ২০ জনের কেউ যদি কোন অপরাধ করে থাকে এবং তদন্ত তা প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রে বুয়েট কর্তৃপক্ষ তার ফলাফল যে কোন সময়েই স্থগিত করতে পারে এছাড়া এই মুহূর্তে তাদের সার্টিফিকেট না দিয়ে গ্রেডশিট দিলেই চলবে আমরা স্যারকে জানাই। আমাদের এ যুক্তি দেখানো সত্বেও স্যার বারবার এদের গ্রেডশিট প্রদানে অসম্মতি জানান। এ অবস্থায় কাদের সুপারিশে এদের গ্রেডশিট আটকে দেওয়া হচ্ছে তা জানতে চাওয়া হলে উপাচার্য জানান ডিসিপ্লিনারি কমিটির নির্দেশে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস গ্রেডশিট প্রদান করছেনা। তিনি আরো জানান ডিসিপ্লিনারি কমিটির প্রধান তিনি নিজেই। এরপর আমরা আবারো স্যারকে অনুরোধ করি এই ২০ জনের ফলাফল প্রকাশ না করলেও তাদের গ্রেডশিট যেন প্রদান করা হয়, কারন তাদের চাকরী নিয়োগের জন্যে এই মুহুর্তে সেটি খুবই জরুরী। উপাচার্য স্যার আমাদের অনুরোধ উপেক্ষা করেন এবং তদন্ত শেষ হওয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে এখানেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটান।
আমাদের বক্তব্যঃ
যে ২০ জনের তালিকার প্রণয়ন করা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি সেই তালিকাটি আমরা এখনো নিজ চোখে দেখিনি, কর্মবিরতি চলার কারনে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও আমরা জানতে পেরেছি যে কর্মবিরতি চলা অবস্থাতেই তালিকাটি প্রণীত হয়েছে। যেই ২০ জনের নাম এখানে আছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আন্দোলনের সাথে কোনোভাবেই জড়িত ছিলো না। অন্যদিকে যেখানে আন্দোলনে শত শত ছাত্র ছাত্রী প্রকাশ্যে অংশগ্রহন করেছে, সেখানে আলাদাভাবে এই ২০ জনকে হেনস্তা করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটাও আমাদের প্রশ্ন। আন্দোলনে অংশ নেওয়াটা কোন অপরাধ ছিল কিনা সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না , কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হবার আগেই আমাদের সাথে অপরাধীর মত আচরন করাই বা কতটা যুক্তিযুক্ত। এই সময়ে প্রতিটি দিন আমাদের জন্য অনেক মূল্যবান, প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর ইন্টারভিউ এবং পরীক্ষা হচ্ছে, আট টার্মের গ্রেডশিট ছাড়া অনেক জায়গায় আবেদন গৃহীতও হচ্ছেনা। আমদের মধ্যে একজনও যদি নির্দোষ প্রমাণিত হয় তবে তার এই অমূল্য সময়টুকুর ক্ষতিপূরণ কে দিবে সেই মানবিক প্রশ্নটি সবার কাছে রইল। আমরা বার বার বলছি যে কোন সুষ্ঠু তদন্তকে আমরা স্বাগত জানাই, আমরা জানি আমাদের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি কতটা দৃঢ় ছিল, আমরা জানি আমাদের আচরন কতটা শান্তিপূর্ণ ছিল, সেই সময় আমরা সবাই সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি এবং এখনো দিচ্ছি, কোন তদন্তের মুখোমুখি হতে আমরা ভয় পাইনা। আমদের কেউ যদি দোষী প্রমাণিত হয় প্রশাসন তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাকে শাস্তি দিতে পারে , কিন্তু তার আগেই আমাদের সাথে একচোখা আচরণ না করার জন্য আমরা বুয়েট প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানাই। আমাদের বক্তব্য হল কোন নির্দোষ ছাত্র যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, শুধু সন্দেহের বসে ফলাফল আটকাতে হলে ০৬ ব্যাচের অসংখ্য ছাত্রের ফলাফল স্থগিত করতে হয়। শিক্ষকদের কর্মবিরতি কতদিন চলবে আমরা তা জানিনা, এই অবস্থায় তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগেই আমাদের গ্রেডশিট প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপাচার্য স্যারের কাছে যৌক্তিক আবেদন জানাচ্ছি
লিংক: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১২ রাত ১২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


