somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের এন্টি ভ্যালেন্টাইন কথন..

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নিয়ন আলো গ্রাফিতি বানিয়ে সে রাতে ছড়িয়ে পড়েছিল রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে। শীতের মধ্যে কিভাবে যেন এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল সন্ধ্যায়। তারপর রাত অবধি ঠাণ্ডা বাতাস শিস কেটে যাচ্ছিল, থেমে থেমে। এমন একটা রাতে বই-টই বন্ধ করে হয় কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোতাম নাহয় টুয়েন্টি নাইন খেলে সময়টা কাটাতাম। কিন্তু সে রাত ছিলো আলাদা, গুরুত্ববহ।তাই ঘুমাড্ডা বাদ দিয়ে প্রচন্ড ঠান্ডায় বের হতে আমাদের কেউ কার্পণ্য বোধ করিনি এতটুকু।

বলে রাখি, বিকেল থেকেই ক্যাম্পাস জুড়ে কেমন যেন উৎসব উৎসব ভাব ছিল। রাত পোহালেই ভ্যালেন্টাইন ডে।চারপাশ সরগরম।একদিক দিয়ে প্রেমিক জুটির মুঠোফোনে উড়ছে খুদেচিঠি অগুনতি, অন্যদিকে আমাদের অনেক অভাগারা নিচ্ছিল এন্টি ভ্যালেন্টাইন মিছিলের প্রস্তুতি। শীতের রাতে এমন থমথমে পরিস্থিতিতে লেডিস হোস্টেলের সীমানার বাইরে ভিড় করা আমাদের অনেকেই তখন ঘেমে নেয়ে একাকার।

যদিও বয়েজ আর লেডিস হোস্টেলের মাঝখানের দূরত্বটা খুববেশী না। তবুও লেডিস হোস্টেলের সাথে আমাদের বঞ্চিতদের মনের দূরত্ব সবসময়ই বেশী ছিল। ওদের হোস্টেলের ছয় ফুট উঁচু প্রাচীর, তারউপর কাঁটাতার বেড়ামতোন। কয়েকস্তরের নিরাপত্তা চাদরে ঘেরা প্রাচীর টপকানো পাকা দড়িবাজদের পক্ষে সম্ভব হলেও ওই মনের দূরত্বটা টপকানোর সাধ্য দড়িবাজ দূরের কথা কোন টেমহক মিসাইলেরও ছিলোনা। তবুও সে রাতে আমাদের স্লোগানগুলো প্রেমহীন বঞ্চিতের আর্তনাদের প্রতিনিধি হয়ে ভেঙেচুরে দিচ্ছিলো সব প্রাচীর, ব্যবধানের দেয়াল।

-ভায়েরা আমার ! স্লোগান থামিয়ে আমাদের ‘একা থাকো, ভালো থাকো’ কমিটির সদ্য নির্বাচিত সভাপতি শরীফ ভাই গুরুগম্ভীর ভাবে শুরু করলেন।
-ভায়েরা আমার ! আমারা সউৎসাহে চেঁচিয়ে উঠলাম।
-আজ আমি গালভরা স্লোগান দিতে আসিনি। আসিনি সস্তা আবেগ প্রকাশ করতে।পিছনে ফিরে লেডিস হোস্টেলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে তর্জনী উঁচু করে আবার খেই ধরলেন- আমি এসেছি আজ, মজলুম জনতার কথা বলতে, শোষিতের আর্তনাদ তোমাদের বোঝাতে।
-মধু মধু ! পিছন থেকে চিৎকার করে উঠে জুনিয়র ব্যাচের ছেলেরা।
- আজ ভালোবাসা নামের একচোখা দুষ্ট দানবের বোঝা টানতে হচ্ছে এই বঞ্চিত প্রেমিক সম্প্রদায়ের। প্রেমিকার হাতের স্পর্শ আমাদের শরীরে বিদ্যুতের মতো শিহরন তুলে দিয়ে যায় না, লাখপতি বাবা অনিন্দ্য সুন্দরীরা আমাদের দিকে ভুলেও ফিরে তাকায় না, এই সমাজ ব্যবস্থা আর ওই লেডিস হোস্টেল বিরহের যাঁতাকলে আমাদের পিষে বারবার মনে করিয়ে দেয়, ওরে হতভাগার দল! এ জন্মে আর ওসব প্রেম-ট্রেম তোদের পক্ষে সম্ভব না।
- আহা ! আর্তনাদ করে উঠে সমবেত কণ্ঠ।
-ভায়েরা আমার !আবার পিছনে তাকিয়ে নিয়ে বলেন শরীফ ভাই। যাদের ভালোবাসা বঞ্চিতদের পাশে নেই, যাদের ভালোবাসা প্রেমিকের মানিব্যাগে পুরুত্তে ভাঁজ হয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের ভালোবাসা কি সত্যিকারের ভালোবাসা ?
আশেপাশের সিনিয়র ভাইরা মাথা ঝাঁকান, সদ্য ছ্যাকা খাওয়া জুনিয়র মাথা ঝাঁকায়।না। দেখাদেখি আমরাও মাথা ঝাঁকাই, না না না।
- আজ তোমার টাকা আছে, ওই পিছনের মেয়েদের ভালোবাসা তোমার আছে। কাল নেই তো ভালোবাসাও নেই।
হাততালি আর শিসে ফেটে পড়ে উপস্থিত জনতা। দু হাত উঁচু করেন শরীফ ভাই-
-তাহলে, তোমরা যারা জেনে গেছো ভালোবাসা বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগা কত ভয়ঙ্কর এক দানব। বর্তমান পৃথিবীর সুবিধাবাদী স্বার্থান্বেষী একটা চরিত্র। যে সবার প্রতি সুবিচার করে দেখাতে পারেনি কোনদিন।
- সিউর সিউর ! একমত প্রকাশ করে আমাদের অনেকজন।
এমন সময় লেডিস হোস্টেলের দোতলা থেকে শব্দ হয়। মেয়েরা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে আর পাল্টা স্লোগান দিচ্ছে। আমরাও ছেড়ে কথা বলার মতো কেউ ছিলাম না। দ্রুতই পাল্টাপাল্টি স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে পরিবেশ।
-থামতে বলো ওই ডায়নিদের। ওরা ভালোবাসা নামক মিথ্যে মায়ায় তোমাদের প্রলোভন দেখাতে চায়। আমাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করেন শরীফ ভাই।
শোরগোল শুরু হয়। আমরা আবার স্লোগান ধরি –

ভালোবাসা ভালো না
ভালোবাসা মানি না
প্রেমিকার কালোহাত
ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও……
মুহুমুহু স্লোগানে কাঁপতে থাকে দমকা বাতাস আর জাঁকিয়ে বসা শীতটাও।জমে উঠেছে।

হঠাৎ দেয়ালের ওপাশ থেকে প্রাসের গতিতে নিক্ষিপ্ত কি যেন শরীফ ভাইয়ের মাথায় নিজের লক্ষ্যস্থল খুঁজে পায়।স্তব্ধতায় ভাসে গোটা সমাবেশ। শরীফ ভাই তার মাথার সাথে লেগে থাকা কি যেন উঁচিয়ে ধরে দেখান জনতার দিকে।
-টমেটো !! বিস্মিত উপস্থিত সবাই। নেতার উপর লেডিস হোস্টেলের ওপাশের দেয়াল থেকে এমন আঘাতের প্রতিবাদে হট্টগোল শুরু হয়ে যায়।
-ওকি ! করিস না করিস না ! আমাদের শান্ত হতে ইশারা করেন শরীফ ভাই। এদিকে আমাদের কয়েকজন পাল্টা টমেটো ছুঁড়ে মারে ওপাশে। দেখে জিব কাটেন শরীফ ভাই। এই থাম তোরা, থাম তো। কালনাগিনীর কাজ ছোবল দেওয়া, ওকাজ মানুষের সাজে না। ভায়েরা আমার, শান্ত হও………
নেতার ত্যাগের মহিমার সামনে লজ্জায় পড়ে যায় সামনে উপবিষ্ট জনতার রোষ। এদিকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। ওদিকটা তখনো উত্তপ্ত।শরীফ ভাই আবার শুরু করেন-
-এখানে উপস্থিত সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাচের একজন হিসেবে আমি এতক্ষন তোদের যা বলছিলাম সব প্রমান পেলি তো ?
সম্মেলিত স্বরে সবাই উত্তর দেয় – হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।
-আমি কিন্তু তোদের ভালো না বাসতে বলছি না।মেডিকেলে পড়তে এসেছিস, ভালোবাসবি। কিন্তু নিজের পরিবারকে, ওয়ার্ডের পেশেন্টকে, ডিপার্টমেন্টের টিচারদের, ব্যাচমেটদের, সিনিয়রদের।
- সিউর সিউর ….
-কিন্তু ভুলেও ওই লেডিস হোস্টেলের কাউকে না। কারন ওরা ভালোবাসতে পারে না। শরীফ ভাই হাতে ধরা টমেটোটা শুকতে গিয়ে নাক কুঁচকে ফেলেন। তারপর টমেটো দেখিয়ে বলেন, ওরা শুধু পারে আঘাত করতে।
চিৎকারে ফেটে পড়ে উল্লেসিত জনতা। যেন হাজার বছর পর কোন দেবদূত এসেছে। মুক্তির পয়গাম নিয়ে।
-একটু কেশে নেন শরীফ ভাই। আজ এখানেই শেষ করবো। আমি চাই তোরা যারা এখানে আছিস, আগামী বছর যেন আবারও বঞ্চিতদের কাতারে থাকিস। কারন ভালোবাসা ভালো না, ভালোবাসা মানি না।
শেষবারের মতো স্লোগান শুরু হয়-
আর নয় কোন প্রেম
সামনে শুধু আইটেম………

প্রেমিকার কালো হাত
ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও......

সে রাতে মিছিল আর মিছিল পরবর্তী সমাবেশ শেষ হওয়ার পর আমাদের ঘুমোতে ঘুমোতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিলো। সকালে আধঘুমো খালিপেটে ক্লাসে ছুটতে ছুটতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, লাঞ্চটা কোন রেস্টুরেন্টে করবো।তাই লাঞ্চ আওয়ারে গালভরা নামের এক রেস্টুরেন্টের ঢুকে পড়ে আমরা যখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচার শ্বাস নিচ্ছি, তখনই আমাদের একজন সামনের টেবিলে বসা কারোদিকে ইশারা করলো।

টেবিলের একপাশে শরীফ ভাই বসেছিলেন। অপরপাশে লেডিস হোস্টেলের এক অধিবাসিনী। যিনি ক্রমাগত শরীফ ভাইকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন-
-এন্টি ভ্যালেন্টাইন মিছিল করো না ?
- না মানে এমনেই…..
-রাখো তোমার এমনেই ! কি বলসিলা জানি ? ভালোবাসা ভালোনা, ভালোবাসা মানো না ?
- ভুলে, শরীফ ভাই তৎপর হয়ে সংশোধন করে দিলেন। ভুলে বলে ফেলসি।
- তুমি কার হাত গুড়াই দিবা, বলো তো ?
জিব কাটেন শরীফ ভাই। কারো না। আমি কেন কাউরে মারতে যাবো ?
-আমি ডিআইজির মেয়ে। খবরদার সাবধানে কথা বইলো কিন্তু।

আমাদের খিদে মিটে গিয়েছিলো সেখানেই।রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পথে আমাদের কয়েকজন শরীফ ভাইকে ‘একা থাকো, ভালো থাকো’ কমিটি থেকে বহিষ্কৃত এবং অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। বাকিরা ব্যথিত মনে সায় জানায়। আমি চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে থাকি। ওদের একজন এসে বলে, মাম্মা, এইবার তুমি কমিটির সভাপতি হবা, ঠিকাছে ?

অবশ্য ওদের এই প্রস্তাবনায় বিষয়ে আমি আমার ‘ও’-কে রাতে মুঠোকথনে জানাতেই আমার ‘ও’ গর্জে উঠে-
“শরীফ ভাইরে তো আপু শুধু টমেটো মারসিলো ছাদ থেকে। সামনের বার যদি ভুলেও তোমারে ওই মিছিলে দেখি তবে আমি পচা ডিম মারবো সবার সামনে”।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৪
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আলী জাকের মারা গেছেন

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:১৪


ভোর বেলা আজ তাড়াতাড়ি উঠে গেছি , কেন জানিনা । পি সি খুলে কেউ একজন বাংলা একাডেমী ইন্টারন্যাশনাল সাইটে দুসংবাদটি দিল । পত্রিকায় আসেনি তখনো । ক্যান্সারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার শিক্ষক, কবি, লেখক, অভিনেতা, সমাজকর্মী, উচচ-পদস্হ কর্মচারীরা চুপচাপ মরছেন!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০



যাযাবর সম্প্রদায়ের গৃহকর্তা পানি খাবে; পানি আনার জন্য অর্ডার দেয়ার আগে, ছেলেমেয়ে, বা বউকে কাছে ডাকবে; যে'জন কাছে আসবে, তার হাতে একটা থাপ্পড় দেবে জোরে, বিনাকারণে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ কাব্য

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:৫৮



হতেই পারে এই রাত শেষ রাত
হতেই পারে এই দিন শেষ দিন,
হতেই পারে এই লেখা শেষ লেখা
হতেই পারে এই দেখা শেষ দেখা।

হতেই পারে এই চোখ শেষ আঁকা
হতেই পারে এই চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রায় দেড় মিলিয়ন ভিউসংখ্যার ভিডিওটিসহ আমার ইউটিউব চ্যানেলের শীর্ষ ১৫টি মিউজিক ভিডিও

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:৫৩



আপনারা অনেকেই জানেন, আমি ব্লগিং করার পাশাপাশি ভ্লগিংও (ইউটিউবিং) করে থাকি, ফেইসবুকিং-এর কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এ পোস্ট ফাইনাল করতে যেয়ে দেখলাম, ইউটিউবে আমার অ্যাকাউন্ট ওপেন করার তারিখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন সেতু পদ্মা-- ফটোব্লগ

লিখেছেন সাদা মনের মানুষ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:২৪


স্বপ্ন সেতু পদ্মা নির্মিত হচ্ছে অনেক দিন হল। এই নির্মান যজ্ঞ দেখার জন্য বেশ কিছু দিন যাবৎ যাই যাই করেও যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে শিকে ছিড়ল কয়েক দিন আগে। পদ্মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×