somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টি ব্রেক গল্প - বীজ

২৭ শে মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৫:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাতেমকে নিয়ে নিবিষ্ট মনে হেঁটে চলছে সেলিম। মাথার উপরের সূর্যটা কড়া রোদ বিছিয়ে দিয়েছে ধরনীতে। প্রচন্ড গরমে খাবি খাচ্ছে রহকপুরের প্রতিটি প্রানী, গাছপালা, এমনকি সরু মেঠোপথগুলোও। এদিকে গ্রীষ্মের দাপটে মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে ধূলোকনাও উড়ছে আর পথিক পথে হেঁটে গেলে তাদের নাকমুখে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে, ধূলোকনারা অন্তত তাপের প্রকোপ থেকে উদ্ধার পেতে চাইছে। শরীর ফেটে ঘাম ঝরছে সেলিমের। ওদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। আপন মনে হেঁটে চলছে সে হাতেমকে নিয়ে। মাঝে মাঝে পাশে ফিরে বুঝার চেষ্টা করছে হাতেমের কোন কষ্ট হচ্ছে কিনা! একটা ছাতা মাত্র, তাও ডজনখানেক তালি দেওয়া। ওটাতে সেলিম নিজেই রোদ আটকে রাখতে পারে না আর পাশের এত বড় অবলা প্রাণীকে কিভাবে ছায়া দিবে? নাহ, কিছুদূর গিয়ে কোন বটের নিচে জিরিয়ে নেওয়া দরকার। বাড়ি এখনো অনেকদূর। জিরিয়ে নিলে সেলিমের সাথে তার পাশে হেঁটে চলা অবলা ষাঁড়টারও তাহলে কিছুটা উপকার হয়। একটা প্রাচীন বটের ছায়ার লোভে হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দেয় সেলিম। কাঁধের পাশের ঝোলাটা দেখে আরেকটা লোভ সেলিমের মাথায় উঁকি দেয়। মর্জিনা বেগম কি রান্না করে দিয়েছে আজ কে জানে? সকালে কাজে গিয়ে আর খাওয়া হয়নি। আলুর ডাল আর মরিচ সহ ভাত হলেই মন থেকে বউকে দোয়া করবে ঠিক করে ফেলে সেলিম, সাথে কয়েকদিনের মারধোর বন্ধ।

অবশ্য আজ আজানের শব্দে সেলিমের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিলো। এরপর নিজের বউয়ের দিকে পাশ ফিরে তাকাতেই টের পেল মর্জিনা বেগম অনেক আগেই উঠে গেছে। সচরাচর এত আগে সেলিমের ঘুম ভাঙ্গে না যদি না খুব ভোরে হাটের দিকে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আজ যদিও হাটবার না। তবুও জলদি ঘুম ভাঙ্গার কারনটা আজ আরেকবার ভেবে কিছুটা রোমাঞ্চিত ও শিহরিত হয় সেলিম। বিছানা থেকে উঠে কাঠের দরজাটার হুড়কোটা একটানে খুলে ফেলে সে। ভোরের শীতল বাতাস মৃদু মন্দ গতিতে ছুটে এসে সেলিমের সারা শরীরে পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়। এই বাতাসটা পবিত্র কারন সূর্যের আলোর নিচে দিনের রোজকার কলুষতা তখনো শুরু হয়নি ধরনীতে। ভাবে সেলিম, আহা পাপ!

হঠাৎ বউয়ের খোঁজে মেজাজটা গরম হয়ে উঠে সেলিমের। 'শালী কি জানে না আজ সেলিমের কাজ আছে?' আজানের পর পরেই কদলপুরের দিকে বের হয়ে যাওয়ার কথা আছে ওর, এটা তো গতকালই শুনিয়ে দিয়েছিল সে। দরজার পেছনে ফিরে চারপাশে তাকায় সেলিম। খাটের এক পাশে খাবারের ঝোলা, ছাতা আর জামাটা ঠিকঠাক মতো গুছিয়ে রেখেছে মর্জিনা। আগে ভাগেই আয়োজন দেখে মনে মনে একটু খুশি হয় সেলিম। চটজলদি জামাটা পড়ে নেয়। এরপর গোয়ালে যেতে হবে, হাতেমের আজকে অনেক কাজ। তাই ওকে খাওয়ানো আর ওর দলাই মলাই করাটা খুব দরকার।

ছায়ায় বসে তৃপ্তির সাথে খাবারটা খেয়ে নেয় সেলিম। তাগড়া ষাঁড়টাও ঘাস বিছুলি আর একটু দূরের ডোবা থেকে পানি খেয়ে নিয়েছে। মনে মনে হেসে ফেলে সেলিম, চোখে ভাসে রহকপুরের চেয়ারম্যানের লোক বসিয়ে তার গাভীগুলো দেখে রাখার দৃশ্যটা, গাভীগুলো কখন গরম হয় কখনই বা ডাকে আসে! গর্বের চোখে হাতেমের দিকে তাকায় সে। দশগ্রামে হাতেমের মতো বীজ অন্য কোন ষাঁড়ের কাছে কিনা সন্দেহ। বরকপুরে পাল দেওয়ানো লাগবে? সেলিমের হাতেমের ডাক আসে। রহকপুর? হাতেম নিয়ে যাওয়ার জন্য গেরস্তের সে কি অনুরোধ। কদলপুরের খামারির ঘরে ঘরে হাতেমের বীজের ফসল দেখে এখনো মাঝেমাঝে অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না সেলিমের। বকনা পেট করাতে হলে হাতেম ছাড়া উপায় কি তাদের আর?

বিকেল হবে হবে এমন সময় ঘরের উঠানে পৌছে যায় সেলিম। অন্যদিনের তুলনায় আজ একটু আগে ফিরেছে সে। আশেপাশে মর্জিনার খোঁজে তাকায় সে। উঠানের পাশে দোলনাটাতে মর্জিনাকে দেখা যায় না, দাওয়াতেও না। পাকঘরের সামনেও না। অবাক হয়ে দেখে সেলিম ঘরের দুয়ার খোলা। হাতেমকে একপাশে বেঁধে চটজলদি হেঁটে খোলা দুয়ার দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে সেলিম। ভেতরে ঢুকেই ওর মাথাটা চরকির মতো ঘুরে উঠে। রইস উদ্দিনের মুখটা দেখা যায় ওর ঘরে, মর্জিনার পেছনটায় চড়ে বসে আছে, যেভাবে হাতেম আজ বসেছিলো চেয়ারম্যানের বকনা বিজলী উপর।

বান্দির পো.... চিৎকার করে উঠে সেলিম। ওর সমস্ত অনুভূতি যেন একটা প্রকান্ড রাগ হয়ে অস্তিত্বের জানান দিতে চায়। প্রচন্ড চিৎকারে একটা গোপন অভিসার সহসা থেমে যায়। অপ্রস্তুত হয়ে উঠে রইসউদ্দিন। সেলিমকে দেখে ফুঁপিয়ে কান্না করে উঠে মর্জিনা।


: ওর বিচার হইবো। এইটা নিয়া ভাইবো না। মল্লিক অভয় দেয় সেলিমকে। মল্লিক আর সেলিমের সামনে মাথা নিচু করে বসা আছে রইসউদ্দিন।
'তোমার বউয়ের কি করন যায়, তুমিই কও', জিজ্ঞেস করে উঠে মল্লিক।

প্রশ্নটা শুনেই সেলিম যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে। কি বলা উচিত তা ভেবে কূল কিনারা পায় না অনেকক্ষন ধরে।
সালিস বসেছে গ্রামের মুরব্বী বাড়ির বিশাল উঠানে। আশেপাশের কয়েকগ্রাম থেকেও মানুষ এসেছে সালিস দেখতে। গুটি কয়েক হ্যাজাকের আলোতে সেলিমকে ঘিরে সবার কৌতুহলী চোখ দেখা যায়। সেলিমের উত্তরের অপেক্ষায় অপেক্ষমান উপস্থিতি। সময় পার হয়ে যায়। সেলিমের মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয় না।

শেষে ভীড়ের মাঝখান থেকে তফাজ্জল বলে উঠে, 'এত বছর বিয়া কইরা বউরে বিয়াইতে না পারলে তো এমনই হইব।'
মল্লিক বলে উঠে, ' ষাঁড়ের বীজে মর্দের জীবন কাটে না মিয়া, বুঝো নাই? '

কথাটা হজম করে একটা বুনো উল্লাসে ফেটে পড়ে উঠানের উপস্থিতি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৩
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আলী জাকের মারা গেছেন

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:১৪


ভোর বেলা আজ তাড়াতাড়ি উঠে গেছি , কেন জানিনা । পি সি খুলে কেউ একজন বাংলা একাডেমী ইন্টারন্যাশনাল সাইটে দুসংবাদটি দিল । পত্রিকায় আসেনি তখনো । ক্যান্সারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার শিক্ষক, কবি, লেখক, অভিনেতা, সমাজকর্মী, উচচ-পদস্হ কর্মচারীরা চুপচাপ মরছেন!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০



যাযাবর সম্প্রদায়ের গৃহকর্তা পানি খাবে; পানি আনার জন্য অর্ডার দেয়ার আগে, ছেলেমেয়ে, বা বউকে কাছে ডাকবে; যে'জন কাছে আসবে, তার হাতে একটা থাপ্পড় দেবে জোরে, বিনাকারণে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ কাব্য

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:৫৮



হতেই পারে এই রাত শেষ রাত
হতেই পারে এই দিন শেষ দিন,
হতেই পারে এই লেখা শেষ লেখা
হতেই পারে এই দেখা শেষ দেখা।

হতেই পারে এই চোখ শেষ আঁকা
হতেই পারে এই চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রায় দেড় মিলিয়ন ভিউসংখ্যার ভিডিওটিসহ আমার ইউটিউব চ্যানেলের শীর্ষ ১৫টি মিউজিক ভিডিও

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:৫৩



আপনারা অনেকেই জানেন, আমি ব্লগিং করার পাশাপাশি ভ্লগিংও (ইউটিউবিং) করে থাকি, ফেইসবুকিং-এর কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এ পোস্ট ফাইনাল করতে যেয়ে দেখলাম, ইউটিউবে আমার অ্যাকাউন্ট ওপেন করার তারিখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন সেতু পদ্মা-- ফটোব্লগ

লিখেছেন সাদা মনের মানুষ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:২৪


স্বপ্ন সেতু পদ্মা নির্মিত হচ্ছে অনেক দিন হল। এই নির্মান যজ্ঞ দেখার জন্য বেশ কিছু দিন যাবৎ যাই যাই করেও যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে শিকে ছিড়ল কয়েক দিন আগে। পদ্মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×