somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টি ব্রেক গল্প - বেজোড়

৩০ শে মে, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তোমাকে অনেক বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে, একটু চা করে দেই ? অনিমা বলে উঠে। অদিতের অফিস ব্যাগ আর ঘামের গন্ধ মাখা শার্টটা হাতে নিয়ে ড্রয়িং-এ এসে দাঁড়িয়েছে অনিমা। বাঙালী বিবাহিতা নারীর স্বামীরা সবসময় অগোছালো থাকবে এটা যেন শত পুরনো এক রীতি। এসব সংসার জ্ঞানশূন্য পুরুষের জীবনকে মৃত্যু অবধি ফুলদানির মতো সাজিয়ে রাখার একমাত্র দায়িত্ব অর্পিত হয় তাদের স্ত্রীদের কাঁধে। বোধহয় সেই দায়িত্ববোধ নিজেকে মনে করিয়ে দিতেই অনিমা ফোঁস করে উঠে এবার।
-অ্যাই অদিত।
আর অদিতের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। তার পুরো মনোযোগ যে এখন ফোনের বড় পর্দা জুড়ে। হাতের আঙুলগুলো ওটাকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যেন, তা তাদের মতোই রক্ত মাংসের কোন একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আচমকা অদিত তার ঘাড়ের উপর তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো টের পায়। চোখ দুটো বুজে ফেলে সে। ফোনটা টপ করে সোফায় ছুঁড়ে উঠে দাঁড়ায় সে।
আশ্চর্য তো .. অদিতের গলা চড়ে যায়। অনিমার মুখোমুখি দাঁড়ায় সে।
মানে ? অবাক হয় অনিমা।
অফিস থেকে এসেও কি একটু শান্তিতে থাকতে পারবো না? কৈফিয়তের সুরে জানতে চায় অদিত।
আমি কোথায় তোমাকে….. পুরোটা শেষ করতে পারে না অনিমা।

আযানের শব্দ ভেসে আসছে। দূরে কোথাও এ্যাম্বুলেন্সের বিরতিহীন সাইরেন এই মাত্র মিলিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চাটা প্রচণ্ড জোরে কাশছে। এইসব শব্দ ছাপিয়ে অদিতের চিৎকার দাপিয়ে বেড়ায় পনেরো শো স্কয়ার ফুট ফ্ল্যাটের চারপাশ।
-দ্যাখো অনিমা, আমার স্পেস দরকার…

এরপরেই অদিত চলে যায়। পেছনে রেখে যায় গ্লাস ভাঙ্গার কর্কশ শব্দ।তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। এরপর বয়ে যাওয়া পরের মুহূর্তগুলোতে অনিমা চুপচাপ কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে এক জায়গায় জড়ো করতে থাকে। ভাবে অনিমা, তাদের সম্পর্ক কি শুরু থেকেই এমনই ভঙ্গুর ছিল না ?

মফঃস্বলের এক অতি সাধারণ মেয়েকে অদিতের মতো ইমারজিং কর্পোরেট অফিসারের বিয়ে করার রূপকথাগুলো অনেক আগেই পার করে এসেছে সমাজ। এমন নয় যে প্রেমের বিয়ে। বিয়ের আগে কখনো অদিতের চেহারা পর্যন্ত দেখে নি অনিমা। বিয়ের আগ পর্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে থেকেই জীবনের বড় এক পর্ব কাটিয়েছে ও। বিয়েটা হয়েছিল শুধুমাত্র অদিতের মায়ের জেদের কারণেই। এই জেদ ছিমছাম মফঃস্বলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে এক ধাক্কায় পৌঁছিয়ে দিয়েছে মেট্রো শহর, রাজধানীতে। এই যে আজ অদিত স্পেস শব্দটা বলল, আধুনিক মেট্রো দাম্পত্য জীবনের এই স্পেসের মর্মার্থ করতেই অনিমাকে বেগ পেতে হয়েছে অনেক।
আজকাল অনিমার পেটের ভেতরে একটা ছোট পুকুরের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, দিন ধরে ধরে পুকুরটা একটু একটু বড় হতে থাকে। মাঝে মাঝে পুকুরে ঘাই মেরে উঠে একটা কিছু। টের পায় অনিমা। মাছ নয় মানুষ। আবার ঘাই মারে মানুষ, শেষ কাঁচের টুকরোটা তুলে সরাতে গিয়ে টের পায় ও। কেঁদে ফেলে অনিমা।


নাহান অনলাইনে আসছে না প্রায় তিনদিন। বারবার একটিভ হয়ে মেসেঞ্জারে কাঙ্কখিত নামের পাশে সবুজ বাতি খুঁজে বেড়ায় অদিত। হ্যাজবেন্ডের সাথে কোন ছোটখাটো যুদ্ধ বাঁধাল নাকি কে জানে! অদিত ভাবতে থাকে, এই মুহূর্তে নাহানকে একটা ফোন করা উচিত হবে কি না তার! যদিও আজ থেকে মাস ছয়েক আগে নাহানকে ফোন করতে দ্বিতীয়বার ভাবতো না অদিত। ছয়মাস পরে, অনেকগুলো বছর একসাথে স্বপ্ন দেখার পর নাহানের পথ বেঁকে গেলো উত্তরা থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে। আদিতের পথটা ধানমন্ডি হয়ে এক ছিমছাম মফঃস্বলের দিকে। অনিমার কথা ভাবতেই আবার রাগটা ফিরে আসে তার।


নাহান ইচ্ছে করেই অদিতকে আনভিজিবল লিস্টে রেখেছে। অতীতকে কখনোই বর্তমানের সাথে স্বীকার করতে চায় না সে। অদিতের মেসেজগুলোর রিপ্লাইও দিবে না বলে ঠিক করেছে ও। নাহানের চিন্তা চেতনা জুড়ে এখন শুধুই সাইফুল। বিয়ের ছয় মাস যেতে না যেতেই সাইফুলকে জড়িয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে তাকে।একবার সাইফুলকে ছেড়ে চলে এসেছিল নাহান। এরপর সমাজ তাকে বুঝিয়ে বলল পরস্ত্রীর ছায়া থেকে স্বামীকে রক্ষা করাও বাঙালী নারীর দায়িত্ব বৈকি। সেই টানেই এই ঘরে ফেরা, স্বামীকে ঘরে ফেরানোর যুদ্ধ।


অফিস থেকে ফেরার পথে সাইফুল ওর গাড়িটা হাতিরপুলের ফ্ল্যাটের দিকে নিয়ে যায়। মিমিকে আগে থেকেই ফ্ল্যাটের চাবি দেওয়া আছে।


সেইরাতে গা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে অনিমার। জ্বরের ঘোরে হাবিবকে দেখতে পায় অনিমা। মফঃস্বলের স্কুল মাস্টার হাবিব হেঁটে যেন ওর দিকেই আসছে।সামনে দাঁড়াতেই অনিমা মুখ ফুটে বলে ফেলে, “বাবা যে বিয়ে তে রাজি না।”
হাবিবের চোখ দুটো পিটপিট করে উঠে। “তুমি একটু জোর দিয়ে বললেই কিছু একটা হয় না?”
অনিমার অনাগ্রহ ও বৈরাগ্য হাবিবের প্রশ্নের উত্তর ঢেকে দেয়।
ঢাকা যাওয়ার আগে আমার নতুন কবিতা শুনবে?, হাবিব জিজ্ঞেস করে।

ঘুম ভেঙ্গে যায় অনিমার। ভেতরের অনাগত সন্তান ভয়ে কাঁপছে যেন। বিছানা থেকে উঠে আলমারির ড্রয়ার খুলে একটা কাগজ বের করে ও।টেবিল ল্যাম্পের আলোয় শব্দ করে পড়ে উঠলো –

অন্ধকার থেকে আলোতে আসা মাত্রই সে বুঝতে পারলো, বাঁচতে হলে কাঁদতে হবে। এটা তার প্রথম জন্ম।
হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলো, প্রচণ্ড ব্যথা পেল। পৃথিবীতে শিখে নিতে হয়। তারপরেই হল তার দ্বিতীয় জন্ম।
শিক্ষা তাকে তৃতীয়বার জন্ম দিলো।
কোলাহল ও কর্ম দিলো চতুর্থ-বার।
চতুর্থ-বারের জন্ম মানবসন্তানকে বলল, "এক মানবজীবন এখনো পরিপূর্ণ নয়।" এরপর বিধাতার নির্দেশে মানবসন্তান নিজেই নিজেকে অস্তিত্ব দিলো। আগামীকালের বুকে রেখে গেলো পদচিহ্ন। পঞ্চম জন্ম।
এরপরে আরও দুইটি জন্ম আছে। বার্ধক্য ও মৃত্যু।
এভাবে চলে যায় একে একে সাতটি জন্ম। নিয়তি।



অদিতের ঘুম অনেক গভীর। কিছুই টের পায়নি সে।

সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪২
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আলী জাকের মারা গেছেন

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১০:১৪


ভোর বেলা আজ তাড়াতাড়ি উঠে গেছি , কেন জানিনা । পি সি খুলে কেউ একজন বাংলা একাডেমী ইন্টারন্যাশনাল সাইটে দুসংবাদটি দিল । পত্রিকায় আসেনি তখনো । ক্যান্সারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার শিক্ষক, কবি, লেখক, অভিনেতা, সমাজকর্মী, উচচ-পদস্হ কর্মচারীরা চুপচাপ মরছেন!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:৫০



যাযাবর সম্প্রদায়ের গৃহকর্তা পানি খাবে; পানি আনার জন্য অর্ডার দেয়ার আগে, ছেলেমেয়ে, বা বউকে কাছে ডাকবে; যে'জন কাছে আসবে, তার হাতে একটা থাপ্পড় দেবে জোরে, বিনাকারণে এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ কাব্য

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:৫৮



হতেই পারে এই রাত শেষ রাত
হতেই পারে এই দিন শেষ দিন,
হতেই পারে এই লেখা শেষ লেখা
হতেই পারে এই দেখা শেষ দেখা।

হতেই পারে এই চোখ শেষ আঁকা
হতেই পারে এই চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রায় দেড় মিলিয়ন ভিউসংখ্যার ভিডিওটিসহ আমার ইউটিউব চ্যানেলের শীর্ষ ১৫টি মিউজিক ভিডিও

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:৫৩



আপনারা অনেকেই জানেন, আমি ব্লগিং করার পাশাপাশি ভ্লগিংও (ইউটিউবিং) করে থাকি, ফেইসবুকিং-এর কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এ পোস্ট ফাইনাল করতে যেয়ে দেখলাম, ইউটিউবে আমার অ্যাকাউন্ট ওপেন করার তারিখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বপ্ন সেতু পদ্মা-- ফটোব্লগ

লিখেছেন সাদা মনের মানুষ, ২৭ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:২৪


স্বপ্ন সেতু পদ্মা নির্মিত হচ্ছে অনেক দিন হল। এই নির্মান যজ্ঞ দেখার জন্য বেশ কিছু দিন যাবৎ যাই যাই করেও যাওয়া হচ্ছিল না। অবশেষে শিকে ছিড়ল কয়েক দিন আগে। পদ্মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×