গল্পটি আমার বন্ধু রাশেদের। আমি আর রাশেদ ক্লাস সিক্স থেকে এক সাথে পড়াশুনা করেছি। রাশেদ আমার এতই ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল যে আমরা কেউ কারো কাছে কিছুই গোপন রাখতাম না। পড়াশুনা থেকে শুরু করে মেয়েদের গোপন বিষয় নিয়ে গবেষনা, সব কিছুই আমরা এক সাথে করেছি। এমনকি স্কুল পালিয়ে ফার্মগেটের ছন্দ সিনেমা হলে পর্ণ ফিল্মও দেখেছি এক সাথে। যখন প্রথম নাইনে উঠলাম তখন একসাথে সিগারেটও খেয়েছি। কি ভয়টাই না পেয়েছিলাম প্রথম সিগারেট খেয়ে। গপা-গপ করে দু-দুইটা চকলেট চাবিয়ে খেলাম আবার বাসায় ঢুকার আগে চুইংগাম চাবাতে চাবাতে গেলাম, ঘরে ঢুকেই দাঁত ব্রাশ। কি ভয়! কি উত্তেজনা কাজ করেছিল তখন। এখন রাশেদ সম্পর্কে একটু বর্ণনা দেয়া যাক। রাশেদ আমাদের ক্লাসের ভাল ছাত্রদের মধ্যে একজন। তবে ভালো ছাত্রদের মত আঁতলামি ভাবটা তার মোটেও ছিল না। খুবই চন্চল প্রকিতির ছেলে ছিল সে। তবে দেখতে ছিল মাশাল্লাহ্। গায়ের রং ছিল ধবধবে ফর্সা। স্কুলের অনেকেই তাকে লাল্টু বাবু বলে ডাকতো।
আমরা তখন ক্লাস টেনে, রাশেদ হঠাৎ আমাদের স্কুলের এক রুপবতী মেয়ে সোনিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। এই চন্চল ছেলেটি তখন থেকেই চিমসে গেল। সব সময় কেমন যেন উদাস উদাস থাকতো। রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে যে ছেলে আগে বলত- ওগুলো বুড়ো মানুষের গান। সে ছেলে তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুরু করলো। যে কোনও দিন একটি ছোট গল্পও পড়ে দেখেনি সে তখন শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্করের উপন্যাসও পড়া শুরু করলো। কথায় কথায় কবিতার লাইন উল্লেখ করতে থাকলো। তার এই হঠাৎ পরিবর্তন সবার দৃষ্টি এড়াতে ব্যর্থ হলো। সবাই আমাকে প্রশ্ন করতো- কিরে, তোর
দোস্তো কি প্রেমে পড়ছে নাকি! (ও’র প্রেমে পড়ার ঘটনা আমি ছাড়া আর কেউ জানতো না)। একদিন আমি রাশেদকে বললাম- দোস্তো, পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া? যা গিয়ে বলে ফেল্। রাশেদ বলারই সাহস পায় না। বলে- ভয় লাগে রে। যদি ফিরাইয়া দেয়।
- আরে ধুর হালা, ভয় কিসের? কবি, তুই তারে ভালোবাসোস্। এখানে ভয়ের কি হলো? প্রেম আর যুদ্ধে ভয় পেলে কখনোও জয়ী হওয়া যায় না, বুঝলি?
তারপরও সাহস বাড়ে না রাশেদের। শুধু সোনিয়া মেয়েটিকে দেখলে সে এক অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। যেন সে পৃথিবীর এক আজব সৌন্দর্য দেখছে। রাশেদ প্রায়ই আজব আজব ডায়লগ ছারতো, যার কিছুই আমার মাথায় ঢুকতো না।
যেমন- একদিন আমি আর রাশেদ ও’ দের বাসার ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছি। তখন রাত ন’টা কি সাড়ে ন’টা বাজে। রাশেদ আমাকে হঠাৎ বলল- বলতো, মানুষ কখন উপলব্ধি করে সে একা, তার বুকে অনেক কষ্টের বোঝা। যে বোঝার ভার বহনের সাধ্য তার নাই। আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম- জানি না তো! রাশেদ তখন আকাশের দিকে তাকালো, বলল - দেখ্, ওই আকাশে দিকে তাকা। দেখবি তোর বুকটা খালি খালি লাগছে, তার মানে তুই একা। হঠাৎ দেখবি কোন এক অজানা কারণে তোর কষ্ট হচ্ছে, মানে তোর মনে অনেক কষ্ট আছে যা হয়ত তুই জানিস হয়ত জানিস না। আমি আকাশ দেখবো কি, অবাক হয়ে রাশেদকেই দেখছিলাম।
দেখতে দেখতে টেষ্ট পরীক্ষাও শেষ। মেট্রিক পরীক্ষার জন্য আমরা ধুমসে পড়াশুনা করা শুরু করে দেই। মাসটি ছিল ফেব্র“য়ারী। তারিখ ১৪। আমাদের মেট্রিক পরীক্ষার প্রবেশ পত্র দেয়া হবে তাই গিয়েছিলাম স্কুলে। সেদিন রাশেদের হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ ফুল। বলল- দোস্তো আর তো সহ্য হয় না। আজকেই মনের কথাটা কইয়া দিমু। স্কুলের মেয়েরা তখন কেন্টিনে আড্ডা দিচ্ছিল। এক ঝাক মেয়ের মাঝে সোনিয়াও ছিল। যে এতদিন ভয়ে কিছু বলতেই পারেনি সেদিন সেই ছেলে ফুল নিয়ে মেয়েদের ঝাকে ঢুকে সোনিয়াকে জানিয়ে দিলো তার মনের কথা। পুরো কেন্টিন যখন মেয়েদের কিচিরমিচিরে ভরপুর হঠাৎ এই কান্ডটি দেখে সবাই স্তব্ধ খেয়ে গেলে। ভেবেছিলাম এই ভরা মজলিশে হয়ত আমার বেচারা বন্ধুটি চড়-থাপ্পর খাবে। কিন্তু না, এমন কিছুই হলো না। সহজভাবে, সাবলীল ভাবে রাশেদ বেরিয়ে এলো কেন্টিন থেকে।
রাশেদের মুখে তখন মিষ্টি হাসি। যেন বুকের উপর থেকে পাহাড়টা সরে গেছে। এরপর? এরপর আমার বন্ধু শুরু করলো একটি নতুন জীবন।
অনেকেই বলে দুই ছেলে বন্ধুর মধ্যে কোন মেয়ে আসলে সেই বন্ধুত্ব বেশীদিন স্থায়ীত্ব পায় না। কিন্তু আমি তা কখনই মানতে পারতাম না। একটি মেয়ের জন্য বন্ধুত্ব কিভাবে নষ্ট হয়? কিন্তু একটা সময় মানতে হলো। মেট্রিক পরীক্ষার শেষে আমার আর রাশেদের ঘুরে বেড়াবার অনেক প্ল্যান ছিল। কিন্তু রাশেদের কারণে কোথাও যাওয়া হলো না। এই সমস্যা ঐ সমস্যা করে রাশেদ ঘুরাঘুরি থেকে বিরত থাকলো। আস্তে আস্তে দেখলাম সে আমার সাথে দেখা করাও কমিয়ে দিল। একদিন হঠাৎ সে আমাকে বলে বসলো- তোর সাথে মিশি এটা সোনিয়া পছন্দ করে না। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। বলে কি ছেলে! মেয়ে বলেছে বলে ও সেটা মেনে নেবে? যাইহোক, এরপর রাশেদ অন্য কলেজে আমি অন্য কলেজে। দেখা নেই, সাক্ষাত নেই আমার বন্ধু রাশেদের সাথে।
২.
এথন বলবো তার অনেক বছর পরের ঘটনা। মানে তা ইদানিংকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে চাকরীর খোঁজে গেলাম একটি বেসরকারী ব্যাংকে। রিসিপসানে সি.ভি জমা দেবো এমন সময় লক্ষ্য করলাম হেংলা পাতলা একটি লোক, গোঁফ এবং খোচাখোচা দাড়িও আছে। সেই লোকটি আমার দিকে অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। খুব অস্বস্তিবোধ হচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তা কেটে যায়। কারন আমি বুঝে ফেলেছিলাম লোকটি আমার হারানো বন্ধু রাশেদ। তবে কথা বলবো কি বলবো না এমন একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। দ্বিধাদ্বন্দ্বের দেয়ার ভেঙে রাশেদই কাছে এসে বলল- কিরে? চিনিস নি? একটু হেসে জড়িয়ে ধরলাম। যখন ছাড়লাম তখন দু’জনের চোখের কোণায় জমা হয়েছে একফোটা জল। যেন শীতের সকালে ঘাসের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দু। প্রশ্ন করলাম - কিরে এখানে চাকরি করিস নাকি?
- হ্যা, এখানেই আছি। জুনিয়ার সেলস্ ।
- তোর মত ভালো স্টুডেন্ট, জুনিয়ার সেলস! মানে?
- ও’সব পরে হবে এখন বল তোর খবর কি?
কথা বলতে বলতে দ’জনই অফিস থেকে বেরিয়ে একটি হোটেলে গিয়ে বসলাম। কথা চলল দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু আমি খুব কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম সোনিয়া এবং তার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাটি জানার জন্য। খুব জানতে ইচ্ছে করছিল। ও’ দের সম্পর্ক কি এখনো আছে? তাদের কি বিয়ে হয়ে গেছে? নাকি সম্পর্কটি মৃত?
আমার এসব ভাবনার দরজায় হঠাৎ রাশেদই কড়া নাড়লো। বলল- কিরে? সোনিয়া আর আমার সম্পর্কের অবস্থাটা জানতে চাচ্ছিস, তাই না? আমি তখন চুপ করে বসে আছি আর তাকিয়ে আছি রাশেদের চোখের দিকে।
- এভরি থিং ইজ ক্লোজড। ঐ মেয়েটির সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই রে দোস্তো। সব শেষ।
কথাগুলো যখন বলছিল তখন রাশেদের চোখে-মুখে ভেসে উঠেছিল এক তীব্র যন্ত্রণা। যা এখন কলমে প্রকাশ করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
এরপর রাশেদ অবলীলায় সঙ্কচহীন ভাবে বলা শুরু করলো তার ব্যর্থ প্রেমের গল্প।
তুই তো জানিস আমাদের সম্পর্কটা কিভাবে হয়েছিল। সেই সময়ে আমি একটা ঘোরের মধ্যে থাকতাম। সোনিয়া ছাড়া আমি আর অন্য কোন বিষয়ে ভাবতে পারতাম না। কলেজে যখন পড়তাম আমার ভাবনা,আমার চিন্তা, আমার সুখ-দুঃখ সবই ছিল ও’কে নিয়ে। সব কিছু ঠিক-ঠাক মতই চলছিল। পড়াশুনা তো লাঠে উঠেছিল। আমার সে সময়টি ছিল সপ্নের মত এবং উত্তেজনাময়। এর কারণও ছিল বটে। সোনিয়ার বাবা-মা দু’জনই চাকরি করতেন। সোনিয়া ছিল তাদের একমাত্র সন্তান। তাই সকালে ও’দের বাসাটা খালি থাকতো। অন্যান্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের ডেটিং প্লেইসের অভাব থাকে । কিন্তু আমাদের সে বিষয়ে কোন চিন্তাই ছিল না। কারণ সোনিয়ার বাসাই ছিল ডেটিং এর জন্য সবচাইতে নিরাপদ জায়গা। সেই বাসাটিতেই প্রথম হাত ধরা, প্রথম চুমু খাওয়া, আর, তারপর.... ? আই স্লেপ্ট্ উইথ হার মেনি মোর টাইমস্। একই বিছানাতে ও’ আমার বুকে মাথা রেখে কতোদিন যে ঘুমিয়েছে তার কোন হিসেব নেই রে দোস্তো।
এইসব করে করে ইন্টারের রেজাল্টও খুব বেশী ভালো হলো না। কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চান্সও হলো না। বাবা অনেক রিস্ক নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.বি.এ তে। সেখানে ভর্তি হওয়ার পর সোনিয়া কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যায়। কথায় কথায় জেরা করে। এতক্ষণ ভর্সিটিতে কি করো? সুন্দর সুন্দর মেয়েদের দিকে নিশ্চই ভ্যাল ভ্যাল করে তাকিয়ে থাকো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
একদিন হঠাৎ আমাকে বলে বসলো - তোমাকে নিয়ে বিশ্বাস নাই। আসলে পুরুষ জাতটাকেই বিশ্বাস করা যায় না। এরা বড়লোকের সুন্দর মেয়ে দেখলেই পটে যায়। মেয়েদের এট্রাকটিভ ফিগার আর একটু ঢং এগুলোই তো একটি পুরুষের চাওয়া। আর তোমাদের প্রাইভেট ভার্সিটির যে অবস্থা! মেক্সিমাম মেয়েরা টাইট ফিটিং জামা পরে। ওড়নাটা এক পাশে ঝুলিয়ে রাখে আর অন্যপাশ খালি। এসব দেখলে মাথা ঠিক থাকে নাকি! কোনদিন কোন মেয়ের সাথে পটে যাও আল্লাই যানে।
অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বললাম- তুমি যা বলছ তা ঠিক। তবে ভার্সিটিতে অনেক শালিন মেয়েও আছে। আর তাছাড়া তোমাকে ছাড়া অন্য কোন মেয়ের কথা আমি ভাবতেই পারি না।
সে বলে - দেখো, তোমার আর আমার বর্তমানে সম্পর্ক যেই স্টেইজে আছে তা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতই। শুধু তিনটি শব্দের জন্য আমাদের সম্পর্কটা পরিপূর্ণতা পাচ্ছে না। তা হচ্ছে- কবুল, কবুল, কবুল। আমার সাফ কথা আমাকে বিয়ে করো।
আমি তো স্তব্ধ খেয়ে বললাম- বিয়ে?
- হ্যা, এত অবাক হওয়ার কি আছে?
- না... মানি, এখন... এই মুহূর্তে বিয়ে? আমি তো এখনো স্টুডেন্ট। তোমাকে খাওয়াবো কি?
এরপর শুরু হলো আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি। তার এমন রূপ আমি কখনও দেখি নি।
বলে - কুত্তার বাচ্চা, যখন একই বিছানায় আমার সাথে শুয়েছিস তখন মনে আছিল না তুই স্টুডেন্ট? এখন ঢং দেখাও। কও খাওয়ামু কি? হারামজাদা, আমারে কি তুই মাগি পাইসোস?
সোনিয়ার মুখে এইধরনের বাক্য এর আগে আমি আর কোনদিন শুনি নি। আমার বুকটা সেদিন আতঙ্কে কাঁপতে থাকলো। ধক্ ধক্ আওয়াজ যেন আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। এরপর প্রায় এক মাস আমার সাথে কোন যোগাযোগই করলো না সোনিয়া।
যাইহোক আস্তে আস্তে সব ঠিক ঠাক হলো। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে সে অনড়। তাকে বিয়ে করতেই হবে। বহু কষ্টে রাজি করানো হলো যে - ঠিক আছে, বিয়ে করবো। কিন্তু তা গোপন থাকবে আমার আর তোমার মাঝে। ফেমিলিগত ভাবে পরে হবে।
কিন্তু শর্ত জুড়ে দিল সে। বলল - ঠিক আছে, তবে তিন বছরের মধ্যে আমাকে ঘরে তুলে নিতে হবে।
এরপর বিয়ে করলাম কাজী অফিসে। আমার এক মামা আর সোনিয়র খালাতো বোন এবং বোনের জামাই সাক্ষী হলো। এরপর শুরু হলো চিন্তা। চিন্তা মানেই তো দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তাটা হলো কিভাবে তিন বছরের মধ্যে গ্র্যাজুয়েশানটা শেষ করা যায়। যেহেতু প্রাইভেট ভার্সিটি তাই প্রতি সেমিষ্টারে বেশী করে কোর্স নিয়ে শেষ করার একটা সুযোগ তো ছিলই। তবে এর খারাপ দিকটা ছিল গ্রেড অত ভালো পাওয়া যাবে না। কিন্তু তখনকি আর গ্রেডের চিন্তা মাথায় থাকে। তখন যে শুধু বউ চিন্তা। বেশী করে কোর্স নিয়ে শুরু করলাম পড়াশুনা। আর রেজাল্ট? জাহান্নামে যাক্।
দুই বছরে ভালই আগাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার বাসায় আমার বিয়ের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। কে বা কাহারা আমার বাসায় ফোন দিয়ে বলেছে - “আপনের পোলা যে কি সব কইরা বেরায় তার খোঁজ কি কিছু রাখেন? এক মাইয়ার লগে পিরিত কইরা তার পেটে সন্তান আইয়া পরছিল। হাসপাতালে অপারেশান করাইয়া বিষয়ডা ধামাচাপা দিছে। তয় বিয়াডা করছে।” বলেই ফোনের লাইনটি নাকি কেটে দেয়।
পুরো ব্যাপারটি জেনে আমার বাসায় মহা-প্রলয় হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই হলো। রাতেই বাসায় মিটিং। আমাকে ডাকা হলো। প্রথমে মা বললেন- তুই কি বিয়ে করেছিস?
- জ্বি।
বাবা তখনও চুপ। বড় চাচা প্রশ্ন করলেন- বিয়ের আগেই মেয়ের পেটে বাচ্চা এসেছিল এটা কি সঠিক?
- না চাচা। যারা এ কাজটি করেছে তারা নিশ্চই আমার ক্ষতি করার জন্যই করেছে। তাই এ কথাটি তারা বানিয়ে বলেছে। এমন কিছুই হয়নি।
তারপর মা কাদোঁ-কাদোঁ স্বরে বললেন- তুই কি বিয়ের আগে এই মেয়ের সাথে শুয়েছিস্ ?
প্রশ্নটি শুনেই আমি ভড়কে গেলাম। সারা শরীর কাঁপা শুরু করলো। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছিল না। অনেক কষ্টে বলতে পারলাম মিথ্যেটি। বললাম- ছিহ্! মা, কি বলো?
বাবা বিছনায় বসা ছিলেন। উঠে এলেন। আমার সামনে এসে দাড়ালেন। আমার চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকালেন। কি যেন খুজছিলেন বাবা আমার চোখে। তারপর আমার ডান হাত তাঁর মাথায় রেখে বললেন- বল্, তুই বিয়ের আগে ঐ মেয়ের সাথে বিছানায় যাস্ নি।
আমি তখন নিশ্চুপ। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছি এক অনুতপ্ত অপরাধীর মত। বাবার মাথা ছুঁয়ে আমি আর মিথ্যে বলতে পারলাম না। তবে আফসোস হচ্ছে একটি সত্যিকে মিথ্যে বানাতে গিয়ে অন্য মিথ্যেটি সত্য হয়ে গেলো। কেউই বিশ্বাস করলো না প্রেগনেটের বিষয়টির কোন ভিত্তি ছিল না।
আমাকে সেই রাতেই ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়। বাবা বললেন- জেনাহ্ কারী আল্লাহর সর্ব নিকৃষ্ট বান্দা। আর আল্লাহর সর্ব নিকৃষ্ট বান্দা আমার সন্তান হতে পারে না। তখন বুঝলাম- এখন বিয়ে করাটা মুখ্য নয়, প্রধান অন্যায় ছিল বিছানায় শুতে যাওয়া। আমি তেজ্য সন্তান ঘোষিত হলাম। কি মর্মান্তিক। আরও মর্মান্তিক বিষটি কি জানিস? তার এক সপ্তাহ পর বাবা হার্ট এ্যটাকে মারা যান। কষ্ট দোস্তো, অনেক কষ্ট। বাবার জানাযায় আমার অংশগ্রহন নিষিদ্ধ ছিল। এমনি তাঁর কবরে আমার স্পর্শ কৃত মাটি যেন না পড়ে সেই নির্দেশও ছিল। আর এই শক্ত নির্দেশগুলো দিয়েছিলেন আমার জন্মধাত্রী মা। মা নাকি বলেছেন- তার স্বামীর কবরে যেন কোন জেনাহ্ কারীর স্পর্শ কৃত মাটি না পড়ে।
তার কিছুদিন পর মা , মামাকে দিয়ে আমার জন্য কিছু টাকা পাঠালেন। ও একটা কথা বলা হয়নি। ঘর থেকে বের করে দেয়ার পর আমি মামার বসায় থাকতে শুরু করি। যাইহোক, মা, মামার কাছে টাকা গুলো দিয়ে বলেছিলেন আমি যেন পড়াশুনাটা শেষ করি। হায়রে মা! মার মন তো। সন্তান অশিক্ষিত থেকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে আর ঠোকর খাবে, তা কি কখনো কোন মা কল্পনা করতে পারে? পারে না। আর তাই বাবার রিটায়ার মেন্টের কিছু অংশ আমাকে পাঠানো হলো। তা দিয়েই আমি আমার পড়াশুনাটা শেষ করলাম।
শুরু করলাম চাকরির সন্ধান। তখন সোনিয়ার সাথে দেখা করা একটু কমে গেলো। চাকরির পেছন ছুটছি। এত সময় কই?
ও’ কে বললাম- চাকরিটা পেলেই আমরা টোনা-টুনির সংসার শুরু করে দেব।
একদিন খুব টায়ার্ড হয়ে ঘরে ফিরছিলাম। চিন্তা করলাম একটা ছবি নিয়ে দেখা যাক। অবসন্ন মনের ক্লান্তিটা দূর করা যাবে। মামার বাসার সাথেই একটি ভি.সি.ডির দোকান ছিল। দোকানদার সোহেল আমাকে চিন্তো। আমাকে দেখেই সে বলে উঠলো- কি রাশেদ মামু, ভালো আছেন?
- আছি, ভালোই। তোমার খবর কি?
- জ্বে, চলতাছে, আপনেগো দুয়ায়।
- একটা ভালো দেখে ছবি দাও তো। যা দেখে মজা পাওয়া যাবে।
- তাইলে মামু আপনেরে টু আর থ্রি দেওন লাগে। এডি দেখবেন তো মন ভি খুশ হালার শরীল ভি খুশ।
আমি হেসে বললাম- ঠিকাছে, দাও তাইলে একটা।
সোহেল তখন একটা সিডি দিয়ে বলল- নেন মামু, নয়া আইসে। গোপন ক্যামেরার ভিডিও। ইদানিং এগুলাই চলে।
- তাই নাকি?
- আরে হ মামু, পরথমে পোলা ঘরের এক সেইভ চিপায় ক্যামেরা সেট করে। তারপর তো বুজেনি.. মাইয়া বেচারি ফান্দে। তারপর তো আমরাই লাল। পুলাপাইন থেইক্কা শুরু কইরা বুইরা বেডারাও এডি দেইখ্যা মজা পায়।
- গোপন ক্যামেরার এটাতে এত মজা পাওয়ার কি আছে?
- আরে মামু, অন্য ছবিতে তো হোটেল অথবা রা¯তার মাইয়া দিয়া করায়। আর এডিতে থাকে ফ্রেশ মাল। ভালোবাসার ফান্দে ফালাইয়া বেচারী মাইয়া গুলার লগে হারামজাদা পোলাডি আকাম করে। ভালোবাসার সেক্স দেখতে মজা আছে। হা!হা!...
সিডি নিয়ে আমি বাসায় চলে আসি। একটু রেস্ট নিয়ে, খেয়ে-দেয়ে সিডিটি কম্পিউটারে ছাড়লাম। সাথে সাথেই একটি ছেলেকে দেখা যায়। পুরো শরীর নয় শুধুমাত্র তার পেট। বোঝা যাচ্ছে সে একটি টি-শার্ট পরে আছে,জিন্স পেন্টের কিছু অংশও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে ক্যামেরাটা একটা নিরাপদ জায়গায় রাখছে। এবার ছেলেটি বিছানায় গিয়ে বসে। এবার তাকে ভালো মতো দেখা যায়। আহারে, না জানি, কোন মেয়ের এত বড় সর্বনাশটা সে করতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একটি মেয়েকে রুমে ঢুকতে দেখা যায়। সেলোয়ার কামিজ পরা মেয়েটা দাড়িয়ে থাকে। হয়তো কোন কথা বলছে। হঠাৎ ছেলেটিও দাড়িয়ে যায়। বোঝা যাচ্ছে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। দু’ জনরই পা থেকে বুক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। মাথাটা দেখা যাচ্ছে না। কারন, ক্যামেরার সেটিংটা এমনভাবে করা হয়েছে যেন বিছানার কর্ম ঠিক মতো দেখা যায়। কিন্তু তারা তো দাড়িয়ে। ছেলেটি নিজ হাতে মেয়েটির কাপড় খোলা শুরু করে। হঠাৎ আমার নজর পড়ে সেই রুমটির জানালার পর্দার দিকে। সাথে সাথে আমার সারা শরীর দূর্বল হয়ে অসলো। আরে! এত সেই ঘরের পর্দা। সাথে সাথে চোখ সরিয়ে পাশে দেখলাম ড্রেসিং টেবিল। সেই একই ড্রেসিং টেবিল, একই জায়গায় রাখা। একই রকম খাট, আরে একই রকম রুম। সব আমার পরিচিত, সব আমার চেনা, সব আমার দেখা। তাহলে! তাহলে, মেয়েটি কে?
কিছুক্ষণ পর মেয়েটিকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখা গেলো বিছানায়। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। না, না, আমি কি ভুল কিছু দেখছি? এতো আমার প্রেমিকা, না! প্রেমিকা নয় সে তো আমার বিবাহিত স্ত্রী। যার জন্য আমার এত ত্যাগ, আমার এত সংগ্রাম। সে কিনা!! ছি! ছি!
সেই রাত আমার কিভাবে কেটেছে তা বলে বোঝানো যায় না। কাঁদতে-কাঁদতে আমার মাথা,চোখ ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। সকালে উঠেই সিডিটি নিয়ে রওনা দিলাম সোনিয়ার বাসায়। কি করবো আমি? কিভাবে? নিজের স্ত্রী! এত জঘন্য পর্যায়ে!!
আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বিশ্বাস করি কি করে দোস্ত্? যেই মেয়ে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না দেখে বিয়ে করার চাপ দিয়েছিল। সেই মেয়ে! এই অবস্থায়?
আমি যখনই সোনিয়াদের বাসায় গিয়েছি ও’কে আগে থেকে জানিয়ে রাখতাম। আজকে আর জানানো হয় নি। তাই টেনশানও ছিল। যদি না পাই। সোনিয়ার বাসায় গেলাম। দরজায় কোন তালা নেই, মানে সে ঘরেই আছে। কনিংবেল চাপলাম। একবার, দুবার, তিনবার....... করে বিশ বার। কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। খুলেই অপ্রস্তুত সোনিয়া। চুলগুলো এলোমেলো, বিধ্বস্ত ভাব তার চেহারায়, চোখে ভয়।
- আরে তুমি?
প্রশ্ন করেই আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ফিসফিস করে বলল- তুমি যাও, বাবা আছে। বলেই সে দরজাটা লাগিয়ে দিলো।
বিশ্বাস করতে পারছিলাম না তাই সিড়ির কোঠায় হতবিহবল হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। মনের ভিতর তখন উত্তাল ঢেউ। সেই ছেলেটি এখন তার বাসায় নাতো?
হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ। আমি মাতাল চোখে তাকিয়ে আছি দরজার দিকে। কে? কে বের হবে এখন? তার বাবা? সোনিয়া নিজে? নাকি সেই পুরুষ?
দরজা পুরোটা খুলল। সোনিয়া পেছনে দাড়িয়ে। সামনের মানুষটির দিকে তাকাতে ভয় হয়। তাকালাম। হ্যা,এইতো,এইতো সেই ছেলে। ক্যামেরার সেই ছেলেটি। ছেলেটি আমার পাশে কেটে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। ছেলেটি যখন আমার পাশ দিয়ে গেলো আমি যেন আমার স্ত্রীর দেহের গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমার, আমার সারা শরীর ঘামছে, কাঁপছে। বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। এ কি হলো? কেন হলো? আমার সাথেই কেন? যার জন্য তেজ্য পুত্র হলাম, বাবাকে হারালাম, বাবার কবরে মাটি দেয়ার অধিকার হারালাম, মার মুখ দেখার অধিকার হরালাম, পড়াশুনার বারোটা বাজিয়ে জীবনকে নড়বড়ে করলাম। সে কিনা, এত বড় প্রতারক?
ছেলেটি চলে যায়। সোনিয়া খুব স্বাভাবিক ভাবে বলে- এই গাধা, বললাম না বাবা আছে। এখনও দাড়িয়ে আছো?
- লোকটি কে? (আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই প্রশ্নটা বেরিয়ে যায়)
- আমার মামা।
হাসি পেয়ে যায় আমার। যার সাথে এতটা সময় বিছানায় কাটালো তাকে সে অকপটেই এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলল। দুঃখও হয় বেচারীর জন্য। সে যে কত বড় ফাঁদে আটকে গেছে তা তো সে জানে না।
আমি হাসতে হাসতে বললাম- তোমাকে দেয়ার জন্য একটা জিনিস নিয়ে এনেছিলাম।
বলেই সিডিটা ও’র হাতে দিয়ে আমি চলে আসি।
সেই থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। ঘটনাটির একবছর পার হয়ে গেল সেও কখনোও যোগাযোগ করার চেষ্টা করে নি।
- এই হইলো কাহিনী দোস্তো। বুঝলি ?
- সোনিয়া এখন কোথায় আছে, কেমন আছে তোরও জানতে ইচ্ছে হয় নি?
- মাঝে মাঝে হয়। কিন্তু ইচ্ছেটাকে দমন করি।
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাশেদ আরও বলল- দোকানদার সোহেলের কথাটা আজও কানে বাজে। হোটেল অথবা রা¯তার মেয়েদের সাথে বেচারী মেয়েদের পার্থক্যটা নিয়ে সে যা বলেছিল আর কি। আমার বউকে আমি সেরকম বাজে মেয়ে বলতে পারি না, কারন ও’ নিশ্চই পয়সার জন্য কাজটি করে নি। আর বেচারী তো সে নয়। তাহলে সে কি? কোন স্থানে তাকে আমি ফেলতে পারি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজছি। উত্তর খুঁজছি সেই ভিডিও টেপের মেয়েটিকে আমি কি বলতে পারি?
৩.
সেদিন বাসায় আসার পর থেকে রাশেদের গল্পটি ভুলতেই পারছি না। শুধু মনে প্রশ্ন জাগে, ব্যর্থতাটি কার? কোথায় সমস্যা ছিল? সারারাত শুধু এগুলোই ভাবতে থাকলাম। তাহলে ব্যর্থতাটি কোথায়? কার, কিসে ভুল ছিল? কি অপরাধ ছিল রাশেদের?
তবে, তবে কি সব দৈহিক? দেহের জন্য রাশেদকে বিয়ে করতে হলো, দেহের জন্য তাকে তেজ্য পুত্র হতে হলো, দেহের জন্য তাকে তার স্ত্রীকে ছেড়ে আসতে হলো। এই পৃথিবীতে কি দেহের জন্য একটি মানুষকে এতসব মুল্য দিতে হবে! ভালোবাসা, বিশ্বাস এসব কিছরই কি কোন মূল্য নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

