somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাকরাইন : ঢাকাইয়াদের পৌষ সংক্রান্তির ঐতিহ্যবাহী উৎসব

১২ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চৌদ্দ জানুয়ারী পুরান ঢাকার আকাশ থাকবে ঘুড়িদের দখলে। আকাশ জুড়ে নানান রং আর বাহারের ঘুড়িদের সাম্যবাদ। গত এক সপ্তাহ ধরে পুরান ঢাকার বাহান্ন রাস্তা তেপান্ন গলির অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে চলছে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলছে পুরোদমে। তাই শীতের উদাস দুপুর আর নরম বিকালে আকাশে গোত্তা খাচ্ছে নানান রঙের ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে হৃদ্যতামূলক কাটা-কাটি খেলাও চলছে। অহরহ কাটা-কাটি খেলায় হেরে যাওয়া অভিমানী ঘুড়ি সুতার বাধন ছিড়ে উড়ে যাচ্ছে দূরে।

চৌদ্দ জানুয়ারী পৌষ মাসের শেষ দিন। পৌষ সংক্রান্তির দিনই পালিত হয় পুরান ঢাকার এবং আদি ঢাকাইয়াদের ঐতিহ্যের সাকরাইন উৎসব। ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু হবে ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট বড় সকলের অংশগ্রহনে মুখরিত থাকবে প্রতিটি ছাদ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে উৎসবের জৌলুস। আর শীতের বিকেলে ঘুড়ির কাটা-কাটি খেলায় উত্তাপ ছড়াবে সাকরাইন উৎসব। এক দশক আগেও ছাদে ছাদে থাকতো মাইকের আধিপত্য। আজ মাইকের স্থান দখল করেছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। উৎসবের আমেজ থাকবে পুরান ঢাকার সর্বত্র। গেন্ডারিয়া, তাঁতীবাজার, লক্ষীবাজার, চকবাজার, লালবাগ, সূত্রাপুর মাতবে ঐতিহ্যের এই উৎসবে। আকাশে উড়বে ঘুড়ি আর বাতাসে দোলা জাগাবে গান। মাঝে মাঝে ঘুড়ি কেটে গেলে পরাজিত ঘুড়ির উদ্ধেশ্যে ধ্বনিত হবে ভাকাট্টা লোট শব্দ যুগল।


এই বছর গেন্ডারিয়ায় প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাকরাইন র‌্যালী। র‌্যালীর উদ্যোগ গ্রহন করেছে প্রাচীন স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠন ফ্রি বার্ডস ক্লাব আর তরুন সংগঠন ঢাকা ইয়ূথ সার্কেল। র‌্যালীটির পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছে আবাসন প্রতিষ্ঠান গ্রান্ড এরিয়ান। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত যুব সংগঠক এবং ফ্রি বার্ডস ক্লাবের সভাপতি জনাব জাকির হোসেন বলেন, "আমার ছোটবেলাতেও দেখেছি এই উৎসব খুব জাকজমকের সাথে পালিত হতো। এখন এই উৎসব আর শুধু ঢাকাইয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাকরাইন পুরান ঢাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পুরান ঢাকার এই সকল ঐতিহ্যগুলো সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন এবং ঐতিহ্যগুলো পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই র‌্যালীর আয়োজন করা হয়েছে।" সাকরাইন র‌্যালীর পৃষ্ঠপোষক গ্রান্ড এরিয়ান-এর সিইও আবু সাঈদ আহমেদ বলেন, "পুরান ঢাকার সার্বজনীন উৎসব ঈদ মিছিল, বৈশাখী মেলা আর সাকরাইন উৎসব। সাকরাইন র‌্যালীর পৃষ্ঠপোষকতা করতে পেরে গ্রান্ড এরিয়ান আনন্দিত। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবন, সংরক্ষন এবং জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে গ্রান্ড এরিয়ান সবসময়ই পাশে থাকবে।"

ঢাকার আদিবাসীদের লালবাগ ভিত্তিক সংগঠন ঢাকাবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত হবে র‌্যালী এবং ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা। ঢাকাবাসীর উদ্যোগে বেশ কয়েকবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে আসছে। সার্কপদক প্রাপ্ত যুব সংগঠক শুকুর সালেকের কুশলী দক্ষতায় নতুন মাত্রা পায় সাকরাইন।

সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো ছিলো অবশ্য পালনীয় অংগ। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্নীয়-স্বজন এবং পাড়ার লোকদের মধ্যে। নীরব প্রতিযোগিতা চলতো কার শ্বশুরবাড়ি হতে কত বড় ডালা এসেছে। আজ এই সব চমৎকার আচারগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে। পুরান ঢাকার আদি বসবাসকারী সকল মানুষ এই ঐতিহ্যগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করেন। নতুন প্রজন্মকে শোনান সেই সব মুখরিত দিনের কথা। মনের খুব গভীরে পরম মমতায় লালন করেন ঐতিহ্যের পরম্পরা। স্বপ্ন দেখেন এই সকল প্রাণময় ঐতিহ্যগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত হবে।

তাঁতী বাজার, সূত্রাপুর আর লালবাগে চলছে ঘুড়ি বানানোর শেষ সময়ের ব্যস্ততা। নাটাই কেনবার পালা শেষ। পুরান ঢাকা অপেক্ষা করছে ১৪ই জানুয়ারীর শীত সকালের। শুরু হবে উৎসব। আর সন্ধ্যায় আধার ঘনাবার সাথে সাথে পুরান ঢাকা সকল জঞ্জাল আর কালিমা পুড়িয়ে ফেলার আর আতশবাজীর খেলায় (ইংরেজীতে যাকে বলে ফায়ার ওয়ার্কস) মাতবে। রাতে কেউ কেউ উড়াবে ফানুস। সাকরাইন এমনই সুন্দর আর অর্থপূর্ণ ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব।



পুনশ্চ :

১.ঢাকাইয়াদের ভাষায় ঘুড়িকে বলে ঘুড্ডি বা গুড্ডি। ঘুড়ি উড়ানোর জন্য সূতাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধারালো করা হয়। ধারালো করবার এই প্রক্রিয়াকে বলে মাঞ্জা । ঘুড়ির কাটাকাটি খেলায় কোন ঘুড়ি কেটে গেলে বলা হয় বাকাট্টা লোট। বিভিন্ন রকমের/ডিজাইনের ঘুড়ি পাওয়া যায় যেমন চোখদার, মালাদার, ঘায়েল, দাবা প্রভৃতি। স¤প্রতি যুক্ত হয়েছে রেসলার রকের মার্কাটিও।

২. সাকরাইন শুধু ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব নয়। পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে চলবে মুড়ির মোয়া, ভেজা বাখরখানি আর পিঠা বানানোর ধুম। যারা সাকরাইনে ভেজা বাখরখানি খেতে আগ্রহী তারা (০১৯১৫১৮৮৮৩১) ফোন করে চলে আসুন গেন্ডারিয়ায়।

৩. আমার আড়াই বছর বয়সী সন্তান মুমিতের জন্য গতকাল একটি ছোট্ট নাটাই কিনেছি। আর দুটো লাল ঘুড়ি। সাকরাইনের উন্মাদনায় ঢাকার আগামী প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বাজুক তার উচ্ছাস।





সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১০:০৫
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লাস ভেগাসকে পেছনে ফেলে ঢাকা মহানগরী এখন ক্যাসিনো ক্যাপিট্যাল। চাঁদাবাজি, মাদক আর গডফাদারদের তীর্থভূমি।

লিখেছেন কাওসার চৌধুরী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:০২


'ক্যাসিনো' এবং 'কুজিন' শব্দ দু'টি নিয়ে অনেকেই দ্বন্ধে পড়েন। কেউ কেউ ক্যাসিনোকে কুজিন ভেবে ভেতরে ঢুঁকে দৌড়ে পালান; আবার কেউ কেউ কুজিনকে ক্যাসিনো ভেবে সমস্যায় পড়েন। এই তো কিছুদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নবান্ন

লিখেছেন ইসিয়াক, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৫৯


ডানা মেলে উড়ে চলে
নীল প্রজাপ্রতি ,
সাথে সাথে উড়ে চলে
তার সাথিটি ।

আসমানের সাদা মেঘ
হয়েছে উধাও ,
হেমন্তের আগমনী
জয়ধ্বনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাসিনো একটি বিশাল চাকুরী সৃষ্টিকারী ইন্ডাষ্ট্রী, বিশাল ট্যাক্সের উৎস

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৩০



ধনীদেশগুলোর জন্য ক্যাসিনো হচ্ছে বিনোদন কেন্দ্র, ইহাতে দেশের সাধারণ মানুষই বেশী যায়; ইহা চাকুরী সৃষ্টিকারী ইন্ডাষ্ট্রী, ট্যাক্সের উৎস; এবং সেইসব দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ইহাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জয়-বাংলা শেঠ

লিখেছেন রবাহূত, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩০



আমি বোকা লোক বেশী বুঝি না, কেউ একটু সাহায্য করতে পারবেন?

এইযে যুবলীগের খান কয়েক টাকি-পুঁটি ধরা পড়লো, সেটি নাকি পিএম এর নির্দেশেই হয়েছে। ধন্যবাদ পিএম কে। উনি কয়েকদিন আগেই ইংগিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝড় বৃষ্টি

লিখেছেন পদাতিক চৌধুরি, ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:২২




ঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ছে আকাশ থেকে,
আকাশটা ঢাকা আছে কালো মেঘে।
রোদ লুকিয়ে গেছে যেন কালোমেঘের তলায়,
ঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ছে গাছের পাতায়।
বৃষ্টি থেকে আসলো মারাত্মক ঝড়,
ঝড় এসে উল্টে দিল গাছপালা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×