১.
স্কুলে পড়িবার সময় দুইটি জিনিসকে ভয় পাইতাম। ইংরেজী ব্যাকরন আর মাকড়সা। মাকড়সার আটটি মাত্র পা। কিস্তু ইংরেজী ব্যাকারন তাহার হাজারটা পা লইয়া ভেংচি কাটিতো। এই রকম এক ভয়ানক বিষয় হইতে জানিয়াছিলাম কমন নাউন বলিয়া কিছু একটা রহিয়াছে। যাহার মাধ্যমে আমরা বুঝিতে ও বুঝাইতে পারি যে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র- বয়স নির্বিশেষে সকল গরুই গরু. সকল গাধাই গাধা এবং জনতা মানেই আম জনতা।
আমাদের পুরাতন ঢাকার প্রতিটি মহল্লায় কমপক্ষে একজন করিয়া কমন নাউন বাস করেন। আমাদের মহল্লার কমন নাউন হইলেন মামা। তিনি ধনী-গরীব, জাতি-গোত্র- বর্ণ ও বয়স নির্বিশেষে সকলের মামা। তিনি আমার মামা, আমার পুত্রের মামা আবার আবার আমার বাবরও মামা। মোদ্দা কথা হইলো তিনি আমাদের এলাকার কমন নাউন। কমন মামা। সকলের প্রিয় মামা।
২.
মামা অমায়িক ভালো মানুষ। তাহার আড়তদারী ব্যবসার রমরমা অবস্থা। কিন্তু মামা সংসারী হন নাই। হয়তো তিনি কোন সুন্দরীকে এলাকার কমন মামী বানাইতে চাহেন নাই। অথবা প্রেমে পড়বার বয়সে ওভার ডোজের ছ্যাকা খাইয়াছিলেন। সরল কথায় মামা আজ অবধি বিবাহ করেন নাই। কাজীর অফিসে নিয়মের কবুল তাহাকে শক্ত গিঁটে বাঁধিতে পারে নাই।
মামার আর্থিক অবস্থা ভালো। মন উদার। ব্যয় করিতে দ্বিধা করেন না। 'কয়েকজন চাটুকার তাহাকে ঘিরিয়া রাখেন। চাটুকারিতার বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করিয়া তাহারা মামার পকেটের ওজন হ্রাস করেন। মামার কল্যাণে কয়েকটি সংসার ভালো চলাই চলে। ইহাতে দোষের কিছু দেখি না।
৩.
কমিশনার নির্বাচন। চাটুকারগণ এলাকার উন্নয়নে মামার বিকল্প খুঁজিয়া পাইলেন না। মামা নির্বাচন নামক ঝামেলায় নিজের অনাগ্রহের কথা বারবার প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কিন্তু যাহারা চাটুকারিতার মলম প্রয়োগ করিয়া পাথর হইতে পানি বাহির করিতে জানে তাদের নিকট মামা নিতান্ত শিশুমাত্র। চাটুকারগন বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়া বুঝাইয়া দিয়াছে নির্বাচনে দাড়াইলে মামার বিজয় সুনিশ্চিত। সুতরাং মামা না দাড়াইবার মত শক্ত যুক্তি খুঁজিয়া পাইলেন না।
মামার নির্বাচনী কার্যক্রমে চাটুকারদের আন্তরিকতার অভাব নাই। নির্বাচনী ফান্ডেরও অভাব নাই। প্রতিদিন বিকাল বেলায় কয়েকটি হাফপ্যান্ট পরিহিত বালককে লইয়া চাটুকারগণ মিছিল করেন। তাহাদের প্রিয় শ্লোগান -"এলাকা ভরা ভাইগ্না যার/তাকে হারায় সাধ্য কার"। মিছিলটি মামার বাড়ির নিকটে আসিলে উচ্চকিত হইয়া ওঠে। মিছিলকারীরা গলা ফাটাইয়া শ্লোগান দেয়। মামা আনন্দিত হন। আহ্লাদিত হন। নির্বাচনী বাজেট বৃদ্ধি করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
৪.
মামার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মানিক চাঁন। এলাকাবাসী এতদিন তাহাকে ফেন্সিডিল বিক্রেতা 'গলাছিলা মাইনক্যা' নামেই চিনিত। তাহার নাম যে মানিক চাঁন তাহা পোস্টার প্রকাশের পূর্বে এলাকার কাহারো জানা ছিলোনা। এলাকাবাসী নিজেদের অজ্ঞতার জন্য কতটা লজ্জিত হইয়াছিলো তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ । তবে বিস্মিত যে হইয়াছিলো তা প্রকাশ করিতে কুন্ঠিত হয় নাই।
মামা বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ করিতে লাগিলেন। প্রত্যেককে বলিতে লাগিলেন যে তিনি নির্বাচিত হইলে সকল ভালো কাজে আর উদ্যোগে তাহার আন্তরিক অংশগ্রহন থাকিবে। এলাকার সকলকে লইয়া এলাকার সমস্যা সমাধান করিবার উদ্যোগ গ্রহন করিবেন। এই সকল উদ্যোগ অপরের মুখাপেক্ষী না হইয়া নিজেদের সাধ্যমত চেস্টায় বাস্তবায়ন করিবার ব্যবস্থা করিবেন। নিজেদের এলাকাকে নিজেদেরকেই মডেল এলাকা হিসাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে। সকলেই বলিল 'অতি উত্তম'।
অপরদিকে গলাছিলা মাইনক্যা বসিয়া নাই। সে বাড়ি বাড়ি যাইয়া তাহাকে ভোট দানের জন্য আহ্বান জানাইতে লাগিলেন। তিনি বিজয়ী হইলে সকল সমস্যা একাই সামধান করিয়া দিবেন বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিতে লাগিলেন। তাহার চারপাশে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদেও দেখা যাইতে লাগিলো। তাহারা বিনীয় ভংগীতে গলাছিলা মাইনক্যার জন্য ভোট চাহিতে লাগিলেন। তাহারা বলিতে লাগিলেন মামা নিতান্ত ভালোমানুষ। তিনি কমিশনার হইবার যোগ্য নহেন।
৫.
নির্বাচন সম্পন্ন হইল। নির্বাচনে মামা হারিয়া গিয়াছেন। তিনি সর্বসাকুল্যে ভোট পাইয়াছেন দুইটি। একটি ভোট তাহার নিজের। কিন্তু অপর ভোটটি কাহার!! ঘটনা অত্যন্ত রহস্যময় এবং জটিল। কারন যাহার সহিতই দেখা হইতেছে সকলে দাবী করিতেছে যে দ্বিতীয় ভোটখানা তাহারই দেয়া।
নির্বাচন শেষে মামা তাহার আশেপাশে পরিচিত মুখগুলি আর দেখিতে পাইলেন না। তাহারা হাওয়া হইয়া গিয়াছে। তাহাদের দেখা গেল বিজয়ী মাইনক্যাকে লইয়া মিছিল করিতে, ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরন করিতে আর মামা কমিশনার নির্বাচিত হইলে যে কী ভয়ানক অবস্থা হইতো তাহা জনে জনে বলিয়া বেড়াইতে।
মামা কষ্ট পান নাই। বিস্মিত হন নাই। তিনি শুধু অনুধাবন করিবার চেস্টা করিলেন কি কারনে এতগুলো লোক একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে ভোট প্রদান করিল!! বাস্তবের ডালভাত অপেক্ষা কেন অবাস্তবের পোলাও কোর্মায় সকলে বিশ্বাস স্থাপন করিল!!
৬.
নিতান্ত ভালো মানুষ কমন মামা ইলেকশন ডিজিজ-এ আক্রান্ত হইয়াছেন। নির্বাচন আসিলেই তিনি অস্থির হইয়া পড়েন। তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। তাহার মনের ভিতরে বিশ্বাস লালন করেন যে একদিন সকলে বুঝিবে স্বপ্নের পোলাও কোর্মা অপেক্ষা বাস্তবের ডালভাত উত্তম। অতি সুস্বাদু।
আশার কথা এখন আর মামার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়না। তিনি পরাজিত হন বটে। তাহার ভোটের সংখ্যা বাড়িয়াছে। মামা আশাবাদী একদিন সকলের বোধদয় হইবে। ততদিন মামা নির্বাচন করিয়া যাইবেন। বোধদয় না হইবার বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহন করাটাও মামার এক ধরনের প্রতিবাদ। বারবার হারিয়া যাইবার মত করুণ কষ্টকর প্রতিবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ১:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


