সাহহোয়ারইন ব্লগে এর আগেও জেন গল্প প্রকাশ হয়েছে। ব্যাপারটি জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, তাই প্রোগ্রামাররা যেমন একই কাজের কোড বারবার লিখে কোন ধরনের অপচয় করতে চান না, সেই একই যুক্তিতে এই সিরিজটি আজ শেষ করা হচ্ছে। তবে শেষ করার আগে জেন গল্প বিষয়ে আমার তৈরী করা ভূমিকাটি ও আরো কিছু গল্প (অবশ্যই অনুবাদ) তুলে ধরছি। সেসঙ্গে সাহহোয়ারইনে যাদের জেন গল্প পেয়েছি তাদের ব্লগের লিংকগুলিও থাকছে সবার আগে।
শ্রদ্ধেয় কবি গবেষক জনাব মুজিব মেহেদী: তিনি “সটোরী লাভের গল্প” শিরোণামে জেন গল্পের বই প্রকাশ করেছেন। তিনি এখানে জেনসাধু নামে লিখতেন। তার ব্লগ লিংকটি হলো – Click This Link
শ্রদ্ধেয় জ্ঞানতাপস ব্লগার জনাব ইমন জুবায়ের: যিনি এখন বস-ডয়েচ ভেলের শ্রেষ্ঠ বাংলাভাষী ব্লগারের তালিকায় আছেন। দোয়া করি উনিই শ্রেষ্ঠের আসন পান। উনার ব্লগেও জেন গল্প আছে। উনার ব্লগ লিংকটি হলো – http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60
===========================================
কয়েক বছর আগে ইচ্ছে হয়েছিল, জেন গল্পের অনুবাদ বই আকারে প্রকাশের। এখন তা পুরনো কথা। সেসময় যে ভূমিকাটি তৈরী হয়েছিল সেটিই একটু বদলে এখানে তুলে ধরছি। জেন কি- এ বিষয়ের ব্যাখ্যা যা ব্যাখ্যা করা যদিও আমার সামর্থ্যের অতীত।
ভূমিকা
জেন কি? এই প্রশ্ন করা কিংবা এর উত্তর দেয়া যেন গল্পে শোনা দুই মাছের কথোপকথনের মত হবে: একবার এক মাছ তার সঙ্গের অন্য এক মাছকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি সমুদ্রের কথা বহু শুনেছি। কিন্তু এটা কী? এটা কোথায়?’ অন্য মাছটি বলল, ‘সমুদ্রের মাঝেই তুমি বেঁচে আছো, ঘোরাফেরা করছো আর তোমার সত্তার গঠন হয়েছে। সমুদ্র তোমার ভেতরে, আবার বাইরেও। সমুদ্র থেকেই তোমার উৎপত্তি আর সমুদ্রেই তোমার সমাপ্তি। তোমার নিজ সত্তার মতই সমুদ্রও তোমাকে ঘিরে আছে।’ আর তাই ‘জেন কি’ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়ত এটি যে আপনি নিজ অভিজ্ঞতায় তা জানুন। এছাড়া লাও ৎজু এর একটি কথা এ সময়ে মনে আসছে। তিনি বলেছেন: যারা বলেন তাঁরা জানেন না, যারা জানেন তাঁরা বলেন না। সবদিক বিচার করে জেন কি একথার উত্তর দেয়ার চেষ্টা না করে আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি এই চিন্তাধারা বা দর্শন বা এটি যাই হয়ে থাকুক না কেন কিভাবে তা সমৃদ্ধি পেল। জেন শিক্ষার্থীরাই বা কিভাবে একে বোধে আনার চর্চ্চা করে থাকে। এসব বলতে গিয়ে যদি আমাদের চেতনা জেন কি তা ব্যাখ্যার জন্য সচেষ্ট হয় তবে সে সুযোগ আমরা গ্রহন করব। আমাদের এই গৌরচন্দ্রিকার পর ৯৯টি পূর্ণাঙ্গ টুকরো গল্প হয়ত আমাদেরকে জেন বোধে আলোকিত হতে সাহায্য করবে। (আমরা ইতোমধ্যে ১২টি গল্প পড়েছি আগের চারটি পর্বে। ৯৯টি আর প্রকাশ করলাম না, পূর্বে উল্লিখিত সঙ্গত কারণেই)
তাহলে জেন কিভাবে এলো? অতীশ দীপংকরের দেশ এই বাংলাদেশ। আবার ‘জেন’ শব্দটি মূল যে শব্দ থেকে এসেছে সেটিও এ উপমহাদেশের। এরপরও এদেশে জেন ঠিক সুপরিচিত বলে বোধ হয় না। ‘জেন’ শব্দটি জাপানি। এই শব্দটি মূলত সংস্কৃত ‘ধ্যান’ শব্দের চীনা রূপ হতে জাপানে গিয়ে ‘জেন’ হয়ে যায়।
বলা হয়ে থাকে যে বুদ্ধ তাঁর বৃদ্ধবয়সে একবার এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মোপদেশের জন্য শিষ্যদের ডাকলেন। শিষ্যেরা সবাই একত্র হয়ে নীরবে অধীর আগ্রহে বসে আছেন। বুদ্ধ ফুল বিছানো মন্ডপে উঠে আসলেন। তাঁর শিষ্য ও ভিক্ষুদের দিকে তাকালেন। এরপর নুইয়ে পড়ে একটি ফুল তুলে নিয়ে তাঁর চোখ বরাবর ফুলটি ধরলেন। এরপর কোন কথা না বলে নিজ আসনে ফিরে গেলেন। শিষ্যেরা এক অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকলেন। একমাত্র মহাকাশ্যপ বুদ্ধের দিকে চেয়ে প্রশান-ভাবে হাসলেন। বুদ্ধও তাঁর দিকে চেয়ে হাসলেন এবং নীরবে সেই অব্যক্ত উপদেশ দান করলেন। সে মুহূর্তেই নাকি জেন-এর জন্ম।
মহাকাশ্যপ ও বুদ্ধের এই সাক্ষাতের পর প্রায় হাজার বছর পার হলো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জেন হস্তান্তরিত হয়ে একসময় বোধিধর্মের কাছে পৌঁছল। বোধিধর্ম ছিলেন দক্ষিণ ভারতের এক ভিক্ষু। তিনি দক্ষিণ চীনে প্রবেশ করে পরে একসময় উত্তর চীনে অবস্থান নেন। ৩১৮ থেকে ৫৩৪ সালের মধ্যের কিছু সময়ে তিনি চীনে ছিলেন। বোধিধর্ম এই জেন-এর ধারা চীনে প্রশস্ত করলেন। বোধিধর্মর প্রথম উত্তরাধিকারী হুইকে। হুইকে এবং তাঁর পরবর্তী দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম উত্তরাধিকারী সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। এভাবে বোধিধর্মের পর প্রায় এক শতাব্দী পার হয়ে গেল। এরপর ষষ্ঠ উত্তরাধিকারী হলেন এক চীনা দার্শনিক ও ধর্মতত্ববিদ হুই-নেং (৬৩৮-৭১৩)। তিনি জেনকে বৌদ্ধধর্মের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন।
হুই-নেং হতে জেন প্রসারিত হলো। এরপর চীনে একসময় পাঁচটি পরিপূর্ণ ধারা প্রতিষ্ঠা পেল: ক্যাওডং, লিনজি, গুইয়াং, ফেয়্যান ও য়্যুনমেন। এর বাইরেও কিছু গৌণ ধারা ছিল। এরিমধ্যে জেন ভিয়েতনাম ও কোরিয়ায় প্রবেশ করে বিস্তার লাভ করে। আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার এই মরমী অভিজ্ঞতার জ্ঞান চীনে গিয়ে লাও ৎজু-এর শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হলো। জেন-এর বীজ ভারত থেকে চীনে গেলেও সেখানে সেটি তাওবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলো। তবে জাপানে না পৌঁছানো পর্যন্ত জেন যেন পূর্ণতা পেল না। জাপানে জেন এক ধারায় স্ফটিক রূপ পেল। জাপানে জেন যেমন সাদরে গৃহীত হলো তেমনি সেটি অভিযোজিতও হলো। জাপানের বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর কাছে জেন ব্যাপক প্রিয়তা পেল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানে জেনবাদীর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ালো পঞ্চাশ লাখ। তবে অনেক জেনবাদী আবার মনে করেন যে জাপানে জেন আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব, এক বংশপরস্পরাগত মরমী ব্যবসায়-এ পরিণত হয়েছে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কিছু জেনবাদীর যুদ্ধবাদিতা ও উগ্র জাতীয়তাবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য জাপানি জেন ধারা সমালোচিত হয়।
জেন হচ্ছে বর্তমান মুহূর্তে জেগে ওঠা। বর্তমান মুহূর্তকে পরিপূর্ণভাবে বোধ করা, তা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা বা মতাদর্শের ছাঁকনিতে পরিস্রুত করে নয়। এটি চর্চ্চার একটি উপায় হলো নিজেকে একটি বিশাল প্রশ্ন করা। যেমন, আমি কী? এমন প্রশ্ন যদি প্রবলভাবে এবং আন-রিকতার সঙ্গে করা হয় তবে যা ভেসে আসে তা হলো ‘জানি না তো’। এই ‘জানি না তো’ হলো চিন্তার শুরু। এটি যদি মুহূর্তের পর মুহূর্ত লালন করা যায় তবে বোধ স্ফটিক রূপ পায়। এর ফল হয় - প্রতি মুহূর্তে আপনি যাই করেন কেবল সেটিই করেন। আপনি যখন বসে আছেন, কেবল বসে আছেন। যখন খাচ্ছেন, কেবল খাচ্ছেন। এভাবেই প্রতি মুহূর্ত এগিয়ে চলে। জেন-এর মতে অস্তিত্ব কেবল মনের নীরবতায়, আমাদের ভেতরের অন্তর্কথোপকথনের বাইরে অনুভূত হতে পারে। জেন দৃষ্টিভঙ্গিতে অস্তিত্ব এমন কিছু যা প্রতি মুহূর্তে স্বতঃর্স্ফূর্তভাবে হয়ে চলেছে। এবং এটি অবশ্যই আমাদের চিন্তাপ্রবাহের অংশ নয়। মহাবিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমানু প্রতি সেকেন্ডের কোটি ভাগ সময়ে পরিবর্তিত অবস্থায় বহমান এবং প্রতি মুহূর্তেই তা কোন না কোনভাবে আলাদা। তাহলে অস্তিত্ব কী? জেন বলছে এটি স্বতঃর্স্ফূর্ত। যেহেতু মহাবিশ্বের সবকিছুই সদাপরিবর্তনশীল সেহেতু আমরা প্রকৃত অর্থে কী তা কেবল প্রতি মুহূর্তে অভিজ্ঞতা লাভের ব্যাপার।
আপনি এখনই যদি সুন্দর একটি দৃশ্য দেখে থাকেন তবে দৃশ্যটি কি আপনার চেতনার অতীত একটি মুহূর্তের ব্যাপার নাকি বর্তমানের? যা কিছুই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি তাই কি অতীত সংবেদনের অংশ নয়? এটি আমাদের সর্বশেষ মুহূর্তের অনুভূতি বা চিন্তার অংশ হলেও তো কথাটি সত্য। তাহলে আমাদের প্রকৃত বাস-বতা কী? এভাবে দেখলে বলা যায় যে প্রতি মুহূর্তে অনন- অবস্থান থাকতে পারে। সেহেতু প্রতি মুহূর্তে অনন্ত সংখ্যক অস্তিত্বের সম্ভাবনা দেখা দেয়। একারণেই জেন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় যে আমরা অসি-ত্বকে অভিজ্ঞতায় লাভ করি না কেন?
এখন জেন বলছে যে আমরা যদি অসি-ত্বকে ব্যক্তিমাত্রিকতা না দেয়ার চেষ্টা করি অর্থাৎ মুহূর্তের চেতনায় যদি ব্যক্তিমাত্রিক ব্যাখ্যা যোগ না করি তবে অস্তিত্ব আমাদের কাছে স্বতঃর্স্ফূর্তভাবে ধরা দেবে। জেন মতে আমরা আসলে অস্তিত্বকে অভিজ্ঞতায় লাভ করি না কারণ আমরা প্রতি মুহূর্তে আমাদের ব্যক্তিমাত্রিক অস্তিত্বকে বোধ করতে ব্যস্ত থাকি।
তাহলে এই অস্তিত্বকে কিভাবে অভিজ্ঞতায় লাভ করব? আমরা যদি অস্তিত্বকে গড়ে না নেই তবে অস্তিত্ব কেবলই ধরা দেবে। সমস্যা হচ্ছে আমরা সাধারনত আমাদের মত করে বিশ্বটাকে গড়ে নিয়ে দেখতে থাকি। আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। জেন শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিমাত্রিক সচেতনতা থেকে দূরে সরে আসার জন্য নীরব ধ্যান এবং বিশেষ কোন সমস্যাপূর্ণ বাক্যের প্রতি মনোনিবেশ করে থাকে। বিশেষ সমস্যাপূর্ণ বাক্যগুলো জেন পরিভাষায় ‘কোয়ান’ হিসেবে পরিচিত। কোয়ানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: কোয়ান হলো হতবুদ্ধিকর ভাষ্যে গড়া কথা, কথোপকথন বা গল্প। কোয়ানকে যুক্তিবিদ্যক চিন্তাধারায় সমাধান করা যায় না। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ছুটে চলা বুদ্ধিবৃত্তির জগতের বাইরের মনের গভীর স্তরের চেতনায় কেবল এর সমাধান ঘটে থাকে। কোয়ানের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হলো: এক হাতের তালি।
কোয়ানের ভাবনা জেন শিক্ষার্থীকে চেতনার এমন জগতে যেতে সাহায্য করে যেখানে যুক্তিবিদ্যক চিন্তন থেমে যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীর চেতনা সি'র হয় ও অস্তিত্বকে প্রকৃতরূপে অভিজ্ঞতা লাভের পথ প্রশস- হয়। হঠাৎ কোন একসময় শিক্ষার্থীর অজানে-ই অস্তিত্ব সচেতনরূপে অভিজ্ঞতার চেতনায় সিঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থী চিন্তা, শব্দ বা বর্ণনার অতীত সেই পুলক-শান্তির অভিজ্ঞতা লাভ করে। আলোকপ্রাপ্তরা কেবল এটুকুই বলে থাকেন: সমগ্রই এক, একই সমগ্র। জেন এই অভিজ্ঞতাকে বলে নির্বাণ।
তবে গল্পে কেন? প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজ যন্ত্রমানবের যুগ অবধি একটি ভাল গল্পের ভেতরের উত্থান পতন মানুষের চেতনায় হানা দিয়ে আসছে। এই সংকলনের গল্পগুলো প্রাচীন গল্পের অন্যতম। আবার একথাও বলা যায় যে এ গল্পগুলো কিছু মনীষীর জীবনের টুকরো কাহিনী, টুকরো জীবনী, টুকরো আত্মজীবনী। জেন গুরুরা এসব চিত্তাকর্ষক ও মননে নাড়া দেয়ার গল্প কেবল মঠবাসী ভিক্ষুদের জন্য রেখে গেছেন তা নয়। গল্পগুলো মুখ থেকে মুখে বয়ে চলার মত গল্প। যে কোন স্থানে এক নজরে পড়ে ফেলার মত গল্প। জেন-এর ব্যাখ্যা দেয়া যতটা কঠিন গল্পগুলো বলে যাওয়া যেন ততটাই সহজ।
গল্পসমগ্রে ৯৯টি গল্প কেন? সত্যি বলতে কি, ইন্টারনেটে প্রথম যখন 101 Zen Stories ওয়েবসাইটটি খুঁজে পেলাম তখন কল্পনায় এক শতক এক জেন গল্প শিরোনামের এক বই ভেসে উঠল। তবে ইংরেজী ১০১টি গল্প পড়ার পর কেন জানি মনে হলো কিছু গল্প আমাদের দেশের পাঠককে হয়ত কম আকৃষ্ট করবে কারণ সেসব গল্প পরিচিত বৌদ্ধ জাতক কাহিনীর মতো। আবার কিছু গল্প ঠিক গল্প নয়, কিছু উপদেশকথার সমষ্টি। একারণে ১০১টির বাইরে আরো গল্পের খোঁজ করলে ইন্টারনেটে তাও মিলল। তবু শেষমেশ ৯৯টি কেন? ৯ সংখ্যাটি এমন এক রহস্যময় সংখ্যা যে একে যে কোন পূর্ণসংখ্যা দিয়ে গুণ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যায় তার সংখ্যাতাত্বিক মানও ৯। যেমন আমাদের ক্ষেত্রে, ৯x১১ = ৯৯। এখন এই ৯৯ এর সংখ্যাতাত্বিক মান কি? ৯+৯ = ১৮ বা ১+৮ = ৯। একারণে শতকের আকর্ষন এড়িয়ে নিরানব্বই এর ফাঁদে পা দিলাম। কারণ একটাই - এই গল্পসমগ্র তো যে সে সংকলন নয়, জীবনবোধের পূর্ণতা টুকরো কাহিনীর পরশে বিস্ময়করভাবে পুরোপুরি হৃদয়ে পৌঁছে দেয়ার গল্পসমগ্র।
কৃতজ্ঞতা ইন্টারনেট জগতের প্রতি। ঢাকায় পেশাগত প্রশিক্ষণে গিয়ে বীতশোক ভট্টাচার্যের জেন গল্প ও কবিতার বইটি আজিজ সুপারমার্কেটে হাতে না এলে ইন্টারনেটে জেন গল্পের খোঁজ নেয়ার সাহস হয়ত হতো না।
===========================================
এবার বাতি নেভার আগে ধোঁয়া দেখার আগে আর ক’টি গল্প। যাদেরকে বাধ্য হয়ে চাটুকারদের পাশে থাকতে তারা পড়তে পারেন কাসান ঘেমে উঠলেন এবং দাতার উচিৎ ধন্য হওয়া। প্রেমের ব্যাপারে অভিজ্ঞরা পড়তে পারেন দয়া প্রীতিহীন। ছাত্রাবস্থায় দুষ্টু ছিলেন যারা পড়ুন রাতের অভিযান। জেন কি, তা জানতে আগ্রহীরা দেখুন এক হাতের তালি এবং হাতি আর মাছি। যারা উপদেশের খোঁজে আছন তারা পড়ুন আগুনের মত জ্বলে হৃদয়। এছাড়া সবাই পড়তে পারেন সবশেষ গল্প সুড়ঙ্গ।
দয়া প্রীতিহীন
চীনে এক বৃদ্ধ মহিলা বিশ বছরের বেশী সময় ধরে এক সাধকের খরচপাতি চালাতো। সাধকের জন্য সে একটি ছোট কুঁড়েও তৈরী করে দিয়েছিল। আর সে প্রতিদিন সাধককে খাবার পৌঁছে দিত। একদিন মহিলার জানতে ইচ্ছে হলো, সাধক সাধনায় কত পথ এগিয়েছেন। তা জানতে সে এক কামনাপূর্ণ যুবতীর সাহায্য নিল। যুবতীকে সে মহিলা বলল, ‘যাও, গিয়ে তাকে আলিঙ্গন করো। এরপর তাকে বলো - এখন কী?’
যুবতী সাধকের কাছে গিয়ে কোন জড়তা ছাড়াই আদর করে তাকে আলিঙ্গন করল। এরপর সে সাধককে জিজ্ঞেস করল যে এরপর কী হবে। সাধক অনেকটা কাব্যিকভাবে বললেন:
শীতে এক হিম শিলায়
জন্মেছে এক বুড়ো গাছ।
কোথাও উত্তাপের ছিটেফোঁটা নেই।
যুবতীটি ফিরে এসে মহিলাকে সব খুলে বলল।
বৃদ্ধ মহিলা রেগে উঠে বলল, ‘এরই জন্য আমি ওকে বিশ বছর ধরে খাওয়ালাম! সে তোমার চাহিদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলো না! তোমার অবস্থার ব্যাখ্যা জানতে চাইলো না! কামের প্রতি বশ হওয়ার কোন প্রয়োজন তার ছিল না, কিন্তু একটু সমবেদনা তো প্রকাশ করতে পারত।’
মহিলা সঙ্গে সঙ্গে কুঁড়ের কাছে গিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল।
আগুনের মত জ্বলে হৃদয়
সয়েন শোকু সব প্রথম জেন শেখাতে আমেরিকায় পৌঁছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার হৃদয় আগুনের মত জ্বলে কিন্তু চোখ ছাইয়ের মত শীতল।’ প্রতিদিনের জন্য তিনি কিছু নিয়ম ঠিক করেছিলেন:
ভোরবেলায় দিনের জামাকাপড় পরার আগে ধুপ জ্বালান আর ধ্যানে বসুন।
এক নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্রামে যান। নির্দিষ্ট সময় পরপর খাবার খান। পরিমিত খান, কখনো পেট পুরে নয়।
একাকী অবস্থায় যেমন থাকেন ঠিক সেভাবে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানান। একাকী অবস্থায় ঠিক তেমন থাকেন অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় যেমন থাকেন।
যা বলবেন ভেবে বলবেন। যা বলবেন তা চর্চা করবেন।
সুযোগ আসলে হেলায় হারাবেন না, আবার কাজে নামার আগে দুবার ভাববেন।
অতীত নিয়ে কষ্ট পাবেন না। ভবিষ্যতের দিকে নজর দেন।
বীরের নির্ভিকতা ধরে রাখুন এবং শিশুর প্রেমময় হৃদয় লালন করুন।
বিশ্রামের সময় ভাবুন যে জীবনের শেষ ঘুম ঘুমাচ্ছেন। ঘুম ভাঙলে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছাড়ুন যেন আপনি একজোড়া পুরনো জুতা ছুঁড়ে ফেললেন।
এক হাতের তালি
কেন্নিন মঠের শিক্ষক গুরু ছিলেন মোকুরাই অর্থাৎ নীরব বজ্র। তোয়ো নামের বারো বছরের এক শিষ্য ছিল সেখানে। তোয়ো দেখত, সকাল সন্ধ্যায় গুরুর সেনজেন ঘরে বড়রা যাচ্ছে আসছে, ব্যক্তিগত উপদেশ নিচ্ছে কিংবা মনস্থির করতে কোয়ান নিচ্ছে। তারও খুব ইচ্ছে, সব শিখতে হবে।
মোকুরাই বললেন, ‘অপেক্ষা করো। তোমার বয়স একেবারে কম।’
কিন' বালক জেদ ধরলে গুরু রাজী হলেন।
সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে তোয়ো গুরুর সেনজেন ঘরের সামনে হাজির হলো। তার উপস্থিতি জানাতে ঘন্টা বাজালো। দরজার সামনে তিনবার নুয়ে সম্মান জানালো। এরপর নি:শব্দে গুরুর সামনে গিয়ে বসলো।
মোকুরাই বললেন, ‘তুমি দু’হাতের আওয়াজ শুনেছ। তালি দিলে তা শোনা যায়। তুমি আমাকে এক হাতের তালি শোনাও।’ তোয়ো ঘরে গিয়ে সমস্যার কথা ভাবতে থাকল। জানালা দিয়ে সে গেইশাদের বাজনার শব্দ শুনতে পেয়ে ভাবলো, ‘এই তো পেয়েছি!’
পরদিন সন্ধ্যায় শিক্ষক এক হাতের তালি শোনাতে বললে তোয়ো গেইশাদের সুর শোনাল।
‘না, না,’ মোকুরাই বললেন, ‘হয়নি, তুমি বোঝই নি।’
ওসব সুর ধ্যানের বাধা হতে পারে ভেবে তোয়ো শান্ত এক জায়গায় চলে গেল। ধ্যানে বসল। পানি পড়ার শব্দ শুনে ভাবল,‘এইবার পেয়েছি।’
তোয়ো শিক্ষকের সামনে হাজির হয়ে পানি পড়ার শব্দ করলো। মোকুরাই বললেন, ‘এ তো পানি পড়ার শব্দ। এক হাতের তালি না। চেষ্টা করো।’
তোয়ো চেষ্টা করতে থাকল। কখনো বাতাসের দীর্ঘশ্বাস শুনল। পেঁচার ডাক শুনল। পঙ্গপালের শব্দ শুনল। সবই খারিজ হলো। দশবারের বেশী সে মোকুরাইকে বিভিন্ন শব্দ শোনাল। এভাবে প্রায় একবছর পার হলো। শেষমেষ তোয়ো ধ্যানের প্রকৃত স্তরে পৌঁছল এবং সব শব্দকে অতিক্রম করল। পরবর্তীতে তোয়ো ব্যাখ্যা করেছিলো, ‘আমি আর শব্দ সংগ্রহ করতে পারছিলাম না। আমি শব্দহীন শব্দের জগতে পৌঁছে গেলাম।’
তোয়ো এক হাতের তালি বুঝতে পারলো।
কাসান ঘেমে উঠলেন
এক প্রাদেশিক সামন্ত শাসকের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে কাসানকে পৌরহিত্য করতে বলা হলো। এর আগে তিনি কখনো সামন- বা অভিজাত সমপ্রদায়ের লোকের সঙ্গে ওঠাবসা করেননি। তিনি অপ্রতিভ বোধ করছিলেন। অনুষ্ঠান শুরু হতে হতে তিনি ঘেমে উঠলেন।
অনুষ্ঠানশেষে শিষ্যদের কাছে ফিরে তিনি স্বীকারোক্তি করলেন যে তিনি জেন শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেননি। কারণ নির্জন মঠে মনে যে ভাব নিয়ে থাকেন, অভিজাত মানুষের মাঝে সে ভাব ধরে রাখতে পারেননি। কাসান পদত্যাগ করলেন। অন্য এক শিক্ষকের কাছে ছাত্র হিসাবে থাকলেন। আট বছর পর তার আগের জায়গায় ফিরে আসলেন। তখন তিনি বোধি পেয়েছেন।
রাতের অভিযান
জেন গুরু সেনগাই এর কাছে অনেক ছাত্র জেন শিখত। এক ছাত্র রাতে মঠের দেয়াল টপকে শহরে গিয়ে ফূর্ত্তি সেরে ফিরে আসত।
সেনগাই এক রাতে ছাত্রদের ঘরে ঘরে গিয়ে দেখলেন এক ছাত্র অনুপসি'ত। এরপর দেয়ালের পাশে রাখা উঁচু টুলও দেখতে পেলেন। তিনি টুলটি সরিয়ে নিজে সে জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেন।
ছাত্রটি ফিরে এসে দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকলো। সে প্রথমে বুঝলই না যে ভেতরে টুলের জায়গায় শেনগাই এর মাথা আছে। গুরুর মাথায় পা রেখে লাফিয়ে নীচে নেমেই সে ঘটনাটা বুঝতে পারল। ছাত্র তো ভয়ে সারা।
সেনগাই বললেন, ‘ভোর বেলায় এখন বেশ শীত। দেখো, ঠান্ডা লাগিয়ো না যেন।’
এরপর ছাত্রটি আর কখনো রাতে বাইরে বেরোয়নি।
দাতার উচিৎ ধন্য হওয়া
কামাকুরার নগাকু মঠের জেন গুরু সেইসেতসু একটি বড় ঘরের প্রয়োজন অনুভব করলেন। তখনকার ঘরে ছাত্রদের জায়গা হচ্ছিল না। উমেজা নামের এক ব্যবসায়ী পাঁচশ স্বর্ণমুদ্রা দিতে চাইলেন। উমেজা ঐ অর্থ নিয়ে সেইসেতশুর কাছে এলেন।
সেইসেতশু বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি নেবো।’
উমেজা থলিটি দিলেন। তিনি মনে মনে অসন্তষ্ট হলেন। এমন তিনটি মুদ্রায় একজনের একবছরের খরচ মিটে যায়। আর সেখানে পাঁচশো। তারপরও লোকটা তাঁকে ধন্যবাদ দিচ্ছে না!
উমেজা বললেন, ‘এ থলেতে পাঁচশো রায়ো আছে।’
সেইসেতশু বললেন, ‘আপনি তো তা বলেছেন।’
‘আমি ধনী ব্যবসায়ী হলেও পাঁচশো রায়ো ফেলনা অর্থ না।’
‘আপনি কি চাচ্ছেন, আমি আপনাকে ধন্যবাদ দিই?
‘আপনার তাই উচিৎ।’
‘উচিৎ হবে কেন?’ সেইসেতশু উত্তর দিলেন, ‘দাতার উচিৎ দান করে ধন্য হওয়া।’
হাতি আর মাছি
জেন শিক্ষক কাপলো একবার মনোসমীক্ষক চিকিৎসকদের এক দলকে জেন শেখাতে রাজী হলেন। ইনষ্টিটিউটের পরিচালক তাঁকে ছাত্রদের কাছে পরিচয় করিয়ে দিলে কাপলো মেঝেতে রাখা একটি কুশনের ওপর নীরবে বসলেন। একজন ছাত্র এগিয়ে এসে তাঁর সামনে নতজানু হয়ে সম্মান জানিয়ে কয়েক ফুট দূরে থাকা আরেকটি কুশনে বসলেন। ছাত্রটি শিক্ষককে প্রশ্ন করলেন, ‘জেন কি?’ শিক্ষক একটি কলা নিয়ে সেটি ছিললেন এবং খেতে শুরু করলেন। ছাত্রটি বললেন, ‘এটাই সব? আপনি কি আর কিছু দেখাতে পারেন না?’
জেন শিক্ষক বললেন, ‘দয়া করে আরেকটু কাছে আসুন।’ ছাত্রটি এগিয়ে গেলেন। কাপলো কলার বাকী অংশটি ছাত্রের মুখের সামনে দোলালেন। ছাত্রটি নুইয়ে শুয়ে পড়ে সম্মান জানালেন।
অন্য এক ছাত্র এবার উঠে দাঁড়িয়ে শ্রোতাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপনারা বুঝেছেন?’ কোন কথা শুনতে না পেয়ে ছাত্রটি যোগ করলেন, ‘আপনারা এখনি জেন এর এক প্রথম শ্রেণীর প্রদর্শন দেখলেন। কারো কোন প্রশ্ন আছে?’
বেশ কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে একজন বলে উঠলেন, ‘গুরুজী আমি আপনার প্রদর্শনে সন্তুষ্ট না। আপনি এমন কিছু দেখালেন যা আমি বুঝেছি বলে নিশ্চিত না। জেন কী তা নিশ্চয় কথায় বলা সম্ভব।’
কাপলো উত্তর দিলেন, ‘আপনারা যদি কথায় শোনার জেদ ধরেন তাহলে বলি মাছির সঙ্গে হাতির সঙ্গমই জেন।’
সুড়ঙ্গ
এক সামুরাইয়ের ছেলে জেনকাই। তিনি এদো নগরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অধীনে চাকুরী নিলেন। তিনি কর্মকর্তার স্ত্রীর প্রেমে পড়লেন এবং তা জানাজানি হয়ে গেল। একপর্যায়ে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে তিনি কর্মকর্তাকে হত্যা করে ফেললেন। তখন মহিলাকে নিয়ে তিনি পালিয়ে গেলেন।
পরবর্তীতে ফেরারী দু’জন চোর হয়ে পড়েন। কিন্তু মহিলার অত্যন্ত লোভ দেখে শেষমেষ জেনকাই বিরক্ত হয়ে বাজেন প্রদেশে চলে যান। সেখানে তিনি পরিব্রাজক ভিক্ষুক হয়ে যান। পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি কিছু করবেন বলে ভাবলেন। উঁচু খাড়া পাহাড়ের এক বিপজ্জনক রাস্তার কথা তিনি জানতে পারলেন। সে পথে প্রায়ই মানুষ মারা যেত কিংবা আহত হতো। তিনি পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ করবেন বলে ঠিক করলেন।
দিনের বেলায় ভিক্ষা করে তিনি রাতে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করলেন। তিরিশ বছর পর সুড়ঙ্গটি ২২৮০ ফুট লম্বা, ২০ ফুট উঁচু এবং ৩০ ফুট চওড়া হলো।
কাজ শেষ হওয়ার দু’বছর আগে একদিন হঠাৎ সেই কর্মকর্তার ছেলে এসে হাজির হলো। তরোয়াল চালনায় সে খুব দক্ষ। বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়।
জেনকাই বললেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় আপনাকে জীবন দিয়ে দিবো। আমাকে কেবল কাজটি শেষ করতে দেন। যেদিন কাজ শেষ হবে সেদিনই আমাকে হত্যা করবেন।’
ছেলেটি অপেক্ষায় থাকলো। কয়েক মাস পার হলো। জেনকাই খুঁড়েই চলেছেন। ছেলেটি কোন কাজ না করে ক্লান- হয়ে একসময় জেনকাইয়ের সঙ্গে কাজে যোগ দিল। এক বছরের বেশী সময় জেনকাইয়ের কাজে সাহায্য করার পর জেনকাইয়ের দৃঢ় প্রত্যয় আর চরিত্রবলের প্রতি তার শ্রদ্ধা জাগলো।
একসময় সুড়ঙ্গ কাটা শেষ হলো। মানুষের জন্য নিরাপদ রাস্তা তৈরী হলো।
এবার জেনকাই বললেন, ‘এখন আমার মাথা কেটে নেন। আমার কাজ শেষ।’
‘আমি কীভাবে আমার শিক্ষকের মাথা কাটব?’ ছেলেটির দু’চোখে পানি টলমল করে উঠল।
আপনার জেন ধৈর্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০১১ সকাল ৭:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


