somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাগলা গারদে ২ সপ্তাহ (সত্য ঘটনা)- ৫ম পর্বঃ নর্তন-কুর্দন

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মাদকাসক্তরা ছিলো ৩য় তালায়। সেইখান থাকে ২য় তালা্র ওয়ার্ডে আমাকে চালান করে দেওয়া হলো। এখানে প্রথমে আমিসহ মাত্র ৪ জন রোগী ছিলো। পরে ৮ বছরের একটা বাচ্চাকে আনা হয়। এই ছেলেটার কথা আগেই বলেছি। ছেলেটি মুসলমান। কিন্তু, তার উপর মাঝে মাঝে দেবতা গণেশ ভর করেন। তখন তার চোখ দু'টো বড় বড় হয়ে যায়। অদ্ভুত সুরে বুঝি কথা বলতে থাকে। বাবা-মা-কে শাসায়। তাঁদের গোপন কথা বলে দেয়। সাথে সাথে এমন সব কথা মুখে আনে যা একটা ৮ বছরের বাচ্চার মুখে আসার কথা না। তার বাবা-মা ভয় পেয়ে এখানে রেখে গিয়েছে।

রোগীদের আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র। বয়স খুব বেশি হলে ২০-২২ হবে। জাতে হিন্দু। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে মেয়েদের বেস ধরে বাবাকে খেপাতো। কারণ, তার বাবা মা-কে জোর করে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে রাখতো। এর প্রতিবাদে সে এমন কান্ড ঘটায়। বাবা তার মা-সহ তাকে পাগলা গারদে ভর্তি করে দিয়ে গেছে। আমাদের পাশের রুমেই মাথা খারাপ মেয়েদের আবাস। সেখানেই তার মা-কে রাখা হয়েছে।

আমি ব্যাপারটা জানতাম না। একদিন দেখি সে আমার রুমে এসে বদ্ধ একটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে 'মা', 'ও মা' বলে চিৎকার দিতে লাগলো। আমি তার নাম ধরে বললাম, এ কি করছো! যাও নিজের বেডে যাও। কে শোনে কার কথা! সে 'মা' মা' বলে ডাক্তে লাগলো। কিছুক্ষণ পর শুনি, ওমা! দরজার ঐপাশ থেকে এক মহিলা গলার আওয়াজ! মা-ছেলে এরপর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে গেলো। আমি দুঃখিত মনে কথাগুলো শুনে গেলাম। বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাগলা গারদের এটেন্ডেন্টদের খারাপ ব্যবহার- আরো কত রকমের কথা!

এই ওয়ার্ডে একজন বয়স্ক পাগলও ছিলেন। খুব চুপচাপ মানুষ। কিছু বললে মিষ্টি একটি হাঁসি দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন। এই লোকটি বুঝি আগে বিদেশে থাকতেন। দেশে বাড়ি বানানোর জন্যে ছোট ভাইয়ের কাছে টাকা পাঠাতেন বেশ কয়েক বছর। কিন্তু, দেশে ফিরে দেখেন তা্র টাকায় বানানো বাড়ি আত্মসাত করে ফেলেছে ছোট ভাই। এই কারণে একদিন মাথা গরম করে ঝগড়া করার, ছোট ভাই তাঁকে মানুষ দিয়ে ধরিয়ে এখানে রেখে গেছে। যে কয়েকদিন ছিলাম, তত দিন দেখেছি, বিছানা-খাবার টেবিল আর টয়লেট, এই তিন জায়গায় যাতায়াত ছাড়া আর কোন কথা নেই। আমরা কথা বলানোর চেষ্টা করলে ঐ মিষ্টি হাঁসি আর দু-এক কথায় আলাপ শেষ করে দিতেন।

আমাদের ওয়ার্ডের সর্বশেষ ব্যক্তিটি হচ্ছে, শাহ জালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের একটি ছাত্র। কি একটা কারণে যেন বাবা-মায়ের সাথে রাগ করে হারপিক খেয়ে ফেলেছিলো। দেখতে খুবই সুশ্রী, কফি কালারের চোখ আর লম্বা দাড়িওয়ালা ছেলেটি বেশ চটপটে। একদিন রাতে বড় একটি সাউন্ডবক্স আর কর্ডলেস স্পিকার আনা হয়েছিলো আমাদের ওয়ার্ডে। এটা পুরোপুরি একটা সারপ্রাইজ। এর আগের দিনই আমরা গানের কলি খেলেছিলাম নিজেদের মাঝে।



'গানের কলি' একটা মজার খেলা। নিজে কোন গান গাওয়ার পর প্রতিপক্ষকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে গানের শেষ অক্ষর দিয়ে একটি গান গেতে হয়। না পারলে যে প্রথম গান গেয়েছিলো, সে যদি ঐ অক্ষর দিয়ে গান গেয়ে ফেলে তাহলে সে একটা পয়েন্ট পেয়ে যাবে। যেমন ধরুন- আমি গাইলাম- 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি'। এই লাইনের শেষ অক্ষর 'স'। তাই, প্রতিপক্ষকে ঐ অক্ষর দিয়ে গান গাইতে হবে।

যাহোক, স্পিকারে বাংলা-হিন্দি সব ধরণের গান বাজানো হলো। আর সেগুলোর সাথে সাথে আমাদের সে কি তিড়িং বিড়িং নাচ। আমি হাপিয়ে গেলাম, কিন্তু, সেই দাড়িওয়ালা ছেলেটির নাচ আর থামে না। হাত-পা ছুড়ে নাচ নামের কসরত চলতে লাগলো। সেই সাথে স্পিকারে চললো নিজেদের গলায় গান। সত্যিই, সেই রাতটা অনেক আনন্দের ছিলো।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৩৪
৬টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছুটিরদিন বিকেলে বইমেলায়

লিখেছেন তারেক_মাহমুদ, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৮:২৪




গত কয়েকদিন ধরেই বইমেলায় যাওয়ার কথা ভাবছিলাম, অবশেষে ছুটিরদিনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম মেলায় যাওয়ার। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বইমেলায় উপচে পড়া ভিড়। বিশাল লাইন দেখে বেশ বিরক্তি নিয়েই মেলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরুর দুধের চেয়ে মূত্রের দাম বেশি কলকাতায়! দৈনিক আনন্দবাজার

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সকাল ১০:২৩



ছবি: দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত

গরুর দুধের চেয়ে মূত্রের দাম বেশি কলকাতায়! দৈনিক আনন্দবাজার

বহুদিন আগের কথা, ‘পঞ্চগব্য’ নামে একটি পুজো-উপাচারের নাম শুনেছিলুম। হয়তো অনেকেরই ইহা জানা থাকিবে। মুসলিমরা সবাই না জানিলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল মাহমুদকে নিয়ে সাধারন মানুষ যা ভাবছেন

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:৩০



১। কবি আল মাহমুদ মারা গেছেন। প্রকাশ্যে শোক করতে লজ্জা লাগলে অন্তত মনে মনে শোক করুন। কেননা তিনি এদেশের বিশুদ্ধতম কাব্য প্রতিভা ছিলেন।

২। আল মাহমুদ সরকার বিরোধী... ...বাকিটুকু পড়ুন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ (বইমেলার ১৫তম দিনে ব্লগারদের উপস্থিতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।)  

লিখেছেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:১২


ক্যামেরার সামনে আছেন ভাই কাল্পনিক_ভালবাসা, নজরবন্দির কারিগর অগ্নি সারথি, ব্লগারদের প্রিয় সঙ্গি নীল সাধু সৈয়দ তারেক ভাই



বায়স্কোপে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন কাওসার ভাই, পাশে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের বই আমাদের বইমেলা

লিখেছেন সামিয়া, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৫১

মেলায় ঢুকেই যে কথাটি মনে হলো সেটা হচ্ছে আরে আমরা আমরাই তো!!!! প্রত্যেক ব্লগারদের মেলায় অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতন, প্রায় প্রত্যেকেরই নতুন বই বের হয়েছে এবং একক বই বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×