বর্ষায় ভেজা রক্তজবা
ধ্রুব আর সামি রাহাতের খুব ঘনিষ্ট বন্ধু। পৃথিবীতে এই দুজন মানুষের সাথেই শুধু রাহাত মন খুলে কথা বলে।
রাহাত,ধ্রুব,সামি এই তিন জনের সামাজিক অবস্থা ভিন্ন, চলাফেরা ভিন্ন, জীবনধারা ভিন্ন। তবুও কোথায় জানি একটা সূক্ষè অথচ দৃঢ় মিল রয়েছে তাদের মাঝে।
২
গল্পের পটভুমি রাহাতের এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর। রাহাতের হাতে তখন অনেক সময়। রাহাত প্রোগ্রাম করল ধ্র“ব আর সামি কে নিয়ে ওর দাদা বাড়ী রাজশাহী যাবে। কথা মতো একদিন সব কিছু ঠিক করে তারা রাজশাহীর দিকে রওনা দিল। প্রথমে রাহাত ওর নতুন কেনা পাজেরো গাড়ীটা নিতে চাইলো কিন্তু সামির জোরাজুরিতে ট্রেনে যেতে বাধ্য হলো। খুব ভোরের ট্রেনে ওরা রওনা দিল।ট্রেনে উঠে সবচে বেশী খুশি হলো রাহাত ,ও অনেকদিন পর ট্রেনে উঠলো। বেশীর ভাগ সময় ওরা পার করলো ট্রেনের বুফে-কারে। আড্ডা দিতে দিতে কখন যে ট্রেন রাজশাহী ষ্টেশনে চলে আসলো ওরা টের পেল না।
রাজশাহী ষ্টেশন থেকে একটা ভ্যান নিয়ে ওরা চলে গেল রাহাতের দাদা বাড়ী কুসুমপুর। বাড়ী চিনতে বেশ কষ্ট হলো রাহাতের। দশ বছর আগে রাহাতের দাদা মারা যাবার পর রাহাতের আব্বা ঢাকায় বাড়ী কিনলো। তখন থেকে রাহাতরা ঢাকায় থাকে। রাহাতের বাবা মাঝে মাঝে আসতেন কিন্তু রাহাতের আর আসা হয়নি গ্রামে। রাহাতের দাদী মারা গেছেন রাহাতের বাবার জন্মের পর । পরে রাহাতের দাদা আরেকটি বিয়ে করেন। সে দাদীও আজ বেঁচে নেই। এ বাড়ীতে থাকেন শুধু রাহাতের বড় চাচা-চাচী । তারা দুজনই, তাদের কোন ছেলেমেয়ে নেই।
‘অনেককিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে কুসুমপুরের। বাড়ীর পাশে সেই বড় আম গাছটা এখন আর নেই ,যেটা দেখে এই বাড়ী অনেক দুর থেকেও চেনা যেত। বাড়ীর গেটটাও পরিবর্তন হয়েছে ...’ রাহাত বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে এক মনে কথাগুলো ভাবছে, ঠিক ঐ সময় ধ্র“ব চেচিয়ে উঠলো-
‘কিরে বাপ এই বাড়ী তো, নাকি এটাও না ;তুই আর কত হাঁটাবি’
‘এটাই’ রাহাত অবচেতন মনে বলল।
‘তাহলে চল ভেতরে যাই’
রাহাতরা যখন ভেতরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই রাহাতের বড়চাচী বের হলো। রাহাতের চাচী প্রথমে রাহাতকে চিনল না । রাহাত ঠিকই চিনতে পেরেছে। রাহাত যখন পরিচয় দিল তখন বড়চাচীর আনন্দ আর দেখে কে। তিনি রাহাতকে পেয়ে যেন হারানো ধন খুজে পেল। রাহাতকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন।
৩ রাহাত, ধ্র“ব, সামি’র খুব আনন্দেই দিন কাটতে লাগল কুসুমপুরে। সারাদিন এদিক ওদিক ছোটাছুটি, ছবি তোলা। গাছ পাকা আম, কাঠাল খাওয়া। ইচ্ছে হলেই পুকুরে সাতার কাটছে, সরিষা ক্ষেত দিয়ে দৌড় দিচ্ছে, তাল গাছের নিচে শিতল পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এক কথায় রাহাতরা যেন স্বর্গে আছে।
এক সন্ধ্যায় ধ্র“ব আর সামি গ্রাম্যহাটে গেল ঘুরতে। রাহাত ঘুমিয়ে ছিল বলে যায়নি। রাহাত ঘুম থেকে উঠে দেখে বড়চাচী উঠানে বসে খড়ির চুলোয় পিঠা ভাজছে। বড়চাচী রাহাতকে দেখে পিঠা খেতে ডাকলো। রাহাত হাত-মুখ ধুয়ে গরম গরম পিঠা খেতে বসল। ঘুম থেকে উঠে গরম গরম পিঠা খেতে কি যে ভাল লাগছিল রাহাতের! মনে মনে চিন্তা করছিল ধ্র“ব আর সামি জটিল জিনিস মিস্ করছে, শালাদের বললাম পরে যা, নাহ্ তা শুনলো না। রাহাত একটার পর একটা পিঠা খেতে থাকলো। হঠাৎ বড়চাচী বললো-
‘হ্যাঁরে রাহাত তোর চৈতির কথা মনে আছে।’
‘কোন চৈতি চাচী’
‘কেনোরে আমার বোনের মেয়ে।তোরা ছোটবেলায় এক সাথে কত খেলতি।’
‘কই মনে পড়ে না তো’
‘কি বলিস, তুই চৈতিকে চিতই পিঠা বলে খেপাতি তোর মনে নেই। অবশ্য ভুলে যাবারই কথা। সেই তখন তুই সাত-আট বছরের ।’
‘ওহ্! হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, চিতই !’, রাহাত এক মনে হাসতে হাসতে বলল,‘ঐ যে আমি একবার ওকে গাছ থেকে ফেলে দিয়ে হাত মচকে দিয়েছিলাম।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এইতো মনে পড়েছে।’
‘চৈতিরা কোথায় চাচী এখন, ও অনেক বড় হয়ে গেছে না’
‘হ্যা বোধহয়’, বড়চাচী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
‘বোধহয় কেন চাচী, তোমার সাথে ওদের যোগাযোগ নেই।’
‘যোগাযোগ হবে কেমন করে, ওরা তো দশ বছর হলো আমেরিকায় গেছে ওখানেই থাকে। বাংলাদেশে আর আসে না। তোর আব্বা যে বছরে ঢাকায় চাকরী পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলো। সে বছরই চৈতির বাবা আমেরিকায় ডিবি পেয়ে সবাইকে নিয়ে চলে গেল।’
‘চৈতি কোন চিঠি লেখে না তোমাকে’
‘প্রথম প্রথম লিখত এখন আর লেখে না। মাঝে মাঝে ঝর্ণা আর দবিরুল লেখে। দু’মাস আগে একটা চিঠিতে দবিরুল লিখেছিল,“আপা ঝর্ণার মাথার সমস্যাটা আবার বেরেছে, কখনও কখনও ওকে শান্ত রাখাই যায় না। তবে চিকিৎসা করছি। আসলে আপা ও একটু ইমোশনাল। যাহোক, আপা আমাদের চৈতিতো আস্ত এক মেমসাহেব হয়ে গেছে। এখন তো ঠিকমত বাংলা বলতেও পারে না...........।”বড় চাচী চিঠির কথা গুলো বলতে বলতে একসময়.কেঁদে ফেললেন। কান্না চেপে রেখে বললেন ,‘এই হাত দিয়ে তোদের দুজনকেই আমি ছোটবেলায় একসাথে খাওয়েছি, ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। আজ সেই তোরা আমাকে ভুলে গেলি’, কথাটা বলেই চাচী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
রাহাত কি করবে বুঝতে না পেরে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো,‘ওর কোন ছবি আছে চাচী, ওর চেহারাটা আমার স্পষ্ট মনে আসছে না।’
বড়চাচী জড়ানো কন্ঠে বললেন,‘তাই কি মনে পড়ে তোর। সেই কবেকার কথা। আমারও তো ঠিকমত মনে পরে না,শুধু মনে পড়ে একটা তুলতুলে গোলাপি পুতুল। আমি চিঠিতে লিখে দিয়েছি ছবি পাঠানোর জন্য।’ বড়চাচী হঠাৎ কি জানি চিন্তা করে বললেন,‘আচ্ছা রাহাত তোর কি মনে আছে তোর আর চৈতির ..............’ এই পর্যন্ত বলেই বড়চাচী কেন জানি থেমে গেলেন।
রাহাত উৎসাহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,‘কি চাচী’
বড়চাচী কথা কাটিয়ে দেবার জন্য বললেন,‘না থাক্ এসব পুরাতন কথা বলে লাভ কি, কিরে তুই আর পিঠা খাচ্ছিস না কেন ?’
‘না চাচী তুমি কথা কাটিয়ে যেও না, কোন লাভ না থাকলেও তুমি পুরাতন কথা বলো আমি শুনবো’
‘থাক্ বাদদে না’
‘না চাচী বলো এই অর্ধেক কথার পুরোটা না শুনলে আমার অসস্থি লাগবে,কোন কিছু ভাল লাগবে না’
‘না কিছু না, ঐ তোর ছোটবেলায় তোর আর চৈতির বিয়ের কথা হয়েছিল। তোর মা আর ঝর্ণা তো সই ছিল। তাই ওরা তোদের এক সাথে খেলতে দেখে সবসময় বলতো তোরা বড় হলে তোদের বিয়ে দিয়ে দিবে। একবারতো ছোটবেলাতেই তোদের বিয়ে পড়িয়ে রাখার কথা ছিল। কিন্তু কি যেন হলো তোর আব্বা চৈতির মাকে কেন যেন পচ্ছন্দ করতো না। তারপর আর তোদের বিয়ে পড়ানো হয়নি।’
রাহাত এতক্ষণ বড়চাচীর কথাগুলো একমনে শুনছিল। কোন কথা বলেনি। কিন্তু বড়চাচীর কথা শেষ হওয়াতেই মনের অজান্তেই প্রশ্ন করলো,‘চাচী ,কেন আব্বা ঝর্ণা খালাকে পছন্দ করতো না ?’
বড়চাচী বলল,‘কি জানি সেটা তোর আব্বাই জানেন’
এ কথা শুনার পর রাহাত আর কোন প্রশ্ন করলো না।
বড়চাচী বলল,‘এখন আর এসব কথা কেউ মনে রাখেনি, না মনে রেখেছে তোর মা, না মনে রেখেছে ঝর্ণা। চৈতির তো মনে থাকার কোন কথাই না। সে নাকি এখন মেম হয়েছে। হয়ত এতদিনে কোন লাটসাহেবও জোগাড় করে ফেলেছে।’
রাহাত কিছু না বলে একটু মুচকি হাসল।
বড়চাচী বলল,‘থাক ওসব কথা, আমারই ভুল হয়েছে তোকে পুরোনো কথা মনে করে দেয়া। তুই যা এখন রেষ্ট নে কিছুক্ষণ পর তোর চাচা আসলে ভাত দিবো।’
রাহাত বলল,‘না চাচী এখন আর রেষ্ট নিবো না। একটু আগে ঘুম থেকে উঠলামতো, একটু হাটাঁহাঁটি করে আসি। এর মধ্যে সামি আর ধ্র“ব হাট থেকে ঘুরে আসুক তারপর একসাথে সবাই মিলে খাব।’
বড়চাচী বলল,‘ কাল তাহলে তুই সকাল সকাল উঠিস তোর চাচার সাথে শহরে যাইস। রাজশাহী শহরটা ঘুরে আয়।’
‘না চাচী কাল ভোরের ট্রেনেই আমি ঢাকা চলে যাব। অনেকদিনতো থাকলাম।’
‘কি বলছিস, কালই যাবি।’
‘হ্যাঁ চাচী, আবার পরে আসব। সামি আর ধ্র“বের খুব পছন্দ হয়েছে আমাদের গ্রাম।’
‘হ্যাঁ আসিস, এভাবে আসা যাওয়া করলে ভাল লাগে।’
‘দেখি ধানের মৌসুমটা শেষ হলে আমরাও ঢাকা যাব। তোর চাচার কোমরের ব্যাথার চিকিৎসাটা করা দরকার। তুই একটু তোর চাচাকে বলিস, নিজের বেলায় তার খুব অবহেলা।’
‘জ্বি আচ্ছা বলল।’
রাহাত চাচীর সাথে কথা শেষ করে হাটতে বের হল। হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ে এসে বসল। বড়চাচীর নিজের কোন ছেলে মেয়ে নেই তাই রাহাতকে খুব পছন্দ করে। রাহাত পুকুর পাড়ের তাল গাছটার নিচে এসে বসল। আজ প্রচুর বাতাস দিচ্ছে। আকাশেও পূর্ণ চাঁদ। চাঁদের আলোর প্রতিফলন ঘটছে পুকুরের ঘোলা পানিতে।
আজ ১০-১২ বছর পর রাহাতের চৈতির কথা মনে পড়ছে। চৈতির চেহারাটা অস্পষ্টভাবে রাহাতের চোখে ভাসছে। ছোট্ট একটা শান্ত মুখ। আজ এত বছর পর রাহাতের চৈতির জন্য বুকের বাম পাশটা কেমন যেন করছে। আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে শৈশবে। মনে হচ্ছে চৈতি যদি এখন বাংলাদেশে থাকত। আজ যদি চৈতিও বড়চাচীর কাছ থেকে এসব কথা শুনতো। তবে ওরো কি এমন লাগত যে রকম আজ আমার লাগছে। রাহাত এসব কথা যখন ভাবতে ছিল তখন পিছন থেকে হঠাৎ ধ্র“ব আসল।
‘কিরে তোকে খুজেই পাচ্ছি না, অন্ধকারে পুকুর পাড়ে কি করছিস’
‘তোরা কখন আসলি’
‘এইতো এই মাত্র, হাঁটে চাচার সাথে দেখা হয়ে গেল তারপর একসাথে আসলাম। এখন চল চাচা ডাকছে, সবাইকে নিয়ে একসাথে খেতে বসবে’
‘চল্’
৪ ঢাকায় ফিরে এসে রাহাত আবার ব্যাস্ত হয়ে পড়ল নগর জীবনে। ভার্সিটিতে ভর্তি হবার জন্য রাহাত ধ্র“ব আর সামির সাথে ভার্সিটি ভর্তি কোচিং করতে শুরু করল। একসময় তিন বন্ধুই ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। তবে রাহাত চৈতির ব্যাপারটা ভুলতে পারেনি। যখনই একা হয় তখনই মনে হয়।
সেদিন রাহাতের চৈতির ব্যাপারটা এত বেশি মনে হচ্ছিল যে ও বাধ্য হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে চৈতির কথা। রাহাতের মা তো এতদিন পর রাহাতের মুখে চৈতির নাম শুনে বেশ অবাক হলেন। সাথে সাথে অনেকদিন আগের সেই কথা মনে পড়ে তার বেশ খারাপ লাগল। মনে মনে ভাবতে লাগলেন ঝর্ণাটা জানি কেমন আছে ? তবে রাহাতকে ওর চাচী পুরানো কথা বলায় মনে মনে রাগই হলেন একটু, কি দরকার ছিল এতদিন পর এসব কথা রাহাতকে বলার। শুধু শুধু ছেলেটার মনে চৈতি বিষয়ে একটা দাগ কেটে গেল।
রাহাত খুব জোরাজুরি করতে থাকলো ওর মার কাছে শুনবার জন্য কেন বাবা ঝর্ণা খালাকে পছন্দ করত না। রাহাতের জোরাজুরিতে রাহাতের মা বাধ্য হলো ঘটনাটা খুলে বলতে। রাহাতের মা একমনে বলতে থাকল,‘ঝর্ণার ছিল ভীষণ রাগ। ও অল্পতেই ক্ষেপে যেত। একবার রাগলে ওকে কেউ থামাতে পারতো না। তখন ও কাউকেই চিনতো না, অনেকটা হিষ্টিরিয়া রোগীদের মত। তো সেদিন ছিল চৈতির জন্মদিন। আমরা দুই সই মিলে জন্মদিনের আয়োজন করছি। ঝর্ণা দবিরুলকে বাজার থেকে কি যেন আনতে দিয়েছিল কিন্তু দবিরুল সেটা আনেনি, সেটা নিয়ে এক কথা দু কথা হতে হতে তুমুল জগড়া লাগল ওদের দুজনের মধ্যে, দবিরুল ওকে থামানোর অনেক চেষ্টা করল কিন্তু ও কিছুতেই থামে না। তোর আব্বা তখন ওখানে ছিল। তোর আব্বা ওদের ঝগড়া থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু একসময় ঝর্ণা একটি ফুলদানি ছুড়ে মারে দবিরুলের দিকে কিন্তু সেই ফুলদানি ভুলক্রমে লাগে তোর বাবার মাথায়। কিন্তু ঝর্ণা সে দিকে খেয়ালই করল না, বরং তোর আব্বাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দবিরুলকে মারতে এগিয়ে যায়। তখন তোর আব্বা রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ঐ যে বের হয় আর কোনদিন ও বাসায় যায়নি। সেই থেকেই তোর আব্বা ঝর্ণাকে একদমই দেখতে পারে না। সে রাতে পরে ঝর্ণা শেষ পর্যন্ত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, ডাক্তার বলেছিল এটা একটা মানসিক সমস্যা। ঝর্ণাকে কোন ব্যাপারে উত্তেজিত হতে দেয়া যাবে না। তোর বাবাকে এ ব্যাপারটা খুলে বলেছিলাম তবুও তোর আব্বার রাগ একফোটা কমেনি। পরে তো ওরা চলেই গেল। আমাকে মাঝে কিছুদিন চিঠি দিয়েছিল। এখন আর দেয়না। না জানি এখন কেমন আছে...........’এ কথা বলেই রাহাতের মা চোখ মুছলেন।
রাহাতের এসব কথা শুনার পর খুব খারাপ লাগল। মনে হল এসব কথা না শুনলেই বোধহয় ভাল হতো। চাচীও যে কেন চৈতির কথাটা বলতে গেল। এতদিন এসব জানত তাই ভাল ছিল।
রাহাত খুব খোজাখুজি করে পুরোনো ছবির মধ্যে চৈতির ছবি খুজে পেল। কি মিষ্টি আর কি মায়া মায়া আছে। রাহাতের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে চৈতিকে।
৫
দেখতে দেখতে রাহাত, ধ্রুব, সামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ সম্পূর্ণ করলো। রাহাত। ক্যাম্পাসে রাহাত, ধ্রুব, সামি খুবই পরিচিত মুখ হয়ে গেল। ভার্সিটির যে কোন অনুষ্ঠান ওদের ছাড়া সম্ভবই না। সিনিয়র ভাই, শিক্ষক সব মহলেই তাদের যাতায়াত। ধ্রুবের গানের গলাটা ভাল, সামি পেইন্টিং এ আর যে কোন কাজ সামাল দেয়ার জন্য রাহাত তো আছেই। সামি তো ইতিমধ্যে প্রেমও করছে। ধ্রুব এদিক দিয়ে এগিয়ে তিন তিনটা প্রেম করলো এবং ছ্যাকা খেল। চতুর্থ নাম্বারটা চলছে। শুধু রাহাতের এখনও কিছু হলো না, হবে কি করে ও যে কোন মেয়ের সাথে ঠিকভাবে কথাই বলে না। রাহাতের মনের কোনে এখনও চৈতি মাঝে মাঝে উঁকি দেয়। যে যাই করুক প্রতিদিন বিকেল বেলাটা তারা তিন জন একসাথে আড্ডা দেয় রমনাতে।
সে রকমই এক বিকেলে তিনজন বসে আছে রমনায়। হঠাৎ ধ্রুব রাহাতকে বলল, ‘দোস একটা সিগারেট দে তো।’
রাহাত ঝিমাতে ঝিমাতে বলল,‘নাইরে শেষ হয়ে গেছে, আচ্ছা দাড়া নিয়ে আসি আমারও টানতে ইচ্ছে করতে, মস্তিস্কে নিকোটিন দিয়ে ঝিমানি ভাব দুর করতে হবে।’ এ কথা বলেই রাহাত উঠলো সিগারেট কিনতে।
সিগারেট কিনতে দোকানের সামনে এসে দেখে দোকানে বেশ ভীড়। ভীড় ঠেলে সামনে এসে দেখে দোকানদার আর একটি মেয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে মেয়েটা ঝগড়া করছে ইংরেজিতে, মাঝে মাঝে চেষ্টা করছে আধো আধো বাংলা বলতে। মেয়েটি খুব সম্ভব ফরেনার অথবা প্রবাসি বাংলাদেশি। অনেকদিন হয়তো এদেশে আসে না কারণ চেহারার মধ্যে বিদেশি বিদেশি একটা ভাব। এদিকে দোকানদারতো সমানে বকেই যাচ্ছে।
রাহাত কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ব্যাপারটা বুঝার চেষ্টা করল। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছে, তখন দোকানদার প্রায় চিৎকার দিয়ে ঘটনাটা বলল যে, এই মেম সাহেব একটা কোকের ক্যান খাইয়া আমারে জাল টাকা দিতাছে। রাহাত ঘটনাটা শুনে হাসতে হাসতে বলল,‘ওটা জাল টাকা না আমেরিকান ডলার, ঐ একটা কাগজের দাম প্রায় সত্তর টাকা ।’
দোকানদার কিছুই বুঝলো না রাহাতের কথা,জাল টাকার আবার দাম আছে নাকি। রাহাত যখন দোকানদার বোঝাতে চেষ্টা করছে তখন মেয়েটি এগিয়ে এসে আধো আধো বাংলায় রাহাত কে বলল যে তার কাছে বাংলাদেশী টাকা শেষ হয়ে গেছে, এখন শুধু ডলার আছে।
রাহাত এক প্যাকেট বেনসন কিনে দোকানদারকে মেয়েটির ক্যানের দাম দিয়ে চলে আসল। আসার আগে মেয়েটিকে বলে আসল,‘ডলার গুলো তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে ফেলুন নয়ত আরও বিপদে পরতে পারেন।’ রাহাত যখন চলে আসছিল তখন ও খেয়াল করেনি যে মেয়েটি ওর পিছু পিছু আসছে। রাহাত এক মনে হেটে ধ্র“ব আর সামির কাছে চলে আসল। সামি আর ধ্র“ব ব্যাপারটা খেয়াল করল যে রাহাত কালো জিন্স আর নীল গেঞ্জি পরা এক বিদেশী মেয়ে কে নিয়ে এদিকে আসছে। ধ্র“ব বলল,‘কিরে এ আইটেম কোথা থেকে আমদানি করলি।’ ধ্র“বর কথা রাহাত প্রথমে বুঝলো না। পরে পিছনে তাকাতেই মেয়েটি বলে উঠলো,‘ pls take this Dollar’
রাহাত বলল,‘ আমি ডলার দিয়ে কি করব।’
'no, no, pls ’
‘আপনি ওটা আপনার কাছে রাখুন ডলার ভাঙ্গলে পরে ফেরত দিয়েন’
'ok than pls take me to the bank, I want to change these Dollars, pls…’
রাহাত এ কথা শুনে কিছুটা ভিমরি খেল, আরে উপকার করতে গিয়ে দেখি ভাল বিপদে পরলাম। রাহাত মেয়েটিকে ব্যাংকের লোকেসন বলে দিল। কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই রাহাতকে ছাড়বে না। রাহাত ওকে ব্যাংকে নিয়ে যাবে তারপর রাহাতকে ওর টাকা ফেরত দিবে তারপর ছাড়বে। রাহাত তখন ধ্র“ব, সামিকে ব্যাপারটা খুলে বলল বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য কিন্তু ওরা আরও মেয়েটির পক্ষ নিয়ে রাহাতকে বলল,‘বিদেশি মেয়ে পথ ঘাট কিছু চিনে না তুই তোর বাইক দিয়ে এক টান দিয়ে ভার্সিটি ব্যাংকে নিয়ে যা।’ ধ্র“ব ,সামি রাহাতকে ব্যাংকে যাবার জন্য বলায় মেয়েটি খুব খুশি হলো। মেয়েটি বারবার ওদের ধন্যবাদ দিতে লাগল। মেয়েটির আধো আধো বাংলা শুনে ধ্রুব আর সামি প্রায় হেসেই ফেলে ছিল। পরে মেয়েটি সামনে থাকায় হাসি চেক দিলো।
রাহাত ওর বাইকের পিছে মেয়েটিকে উঠিয়ে একটানে ব্যাংকে নিয়ে আসল। আধা ঘন্টার মধ্যেই ওর ডলার ভেঙ্গে দিলো। ব্যাংকের কাজ শেষ হলে মেয়েটি দেখতে দেখতে রাহাত, ধ্র“ব, সামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ সম্পূর্ণ করলো। রাহাত ওর হোটেল পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। মেয়েটি শেরাটন এ উঠেছে। রাহাতকে খুব করে বলল রাতে এক সাথে খেতে কিন্তু রাহাত কোন মতে বুঝিয়ে টুঝিয়ে এ যাত্রায় রেহাই পেল। বাইক নিয়ে সোজা চলে আসল ওর বাসায়।
৬
আজ সকাল থেকে রাহাতের মুড অফ। আজ কোন ক্লাস হবে না। এটা আগে বলে দিলেই হতো। শিক্ষকরা তাদের কি সব দাবি নিয়ে যেন আন্দোলনে গেছে। ধ্র“বটা আজ আসে নি। আর সামিতো আছে ওর প্রেম নিয়ে। রাহাত একা একা চলে আসল রমনায়।
রাহাত বসে আছে ওদের ঐ নির্দিষ্ট জায়গায়। সকালের রমনাটা বেশ অন্যরকম। রাহাত কোনদিন সকাল বেলা রমনায় আসেনি। মনে মনে ভাবছে প্রতিদিন সকালে সবারই একবার করে রমনায় আসা উচিত। এই ব্যস্ত নগরি এত সুন্দর শিতল বাতাস আর কোথায় পাবে মানুষ। রাহাত চোখ বন্ধ করে বুক ভরে নি:শ্বাস নিতে লাগল। হঠাৎ Hello ! শব্দে রাহাতের চোখ খুলল। তাকিয়ে দেখে কালকের সেই প্রবাসি মেয়েটি।
মেয়েটি একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল,‘আমি জানতাম আপনাকে এখানে পাবো’
এই সুন্দর সকালে এক সুন্দরী মেয়ের আধো আধো বাংলা শুনে রাহাতের বেশ ভালোই লাগল। মেয়েটাকে কালকে এত সুন্দর লাগে নি। আজকে মেয়েটা নিল জিন্সের সাথে হলুদ রং এর একটা গেঞ্জি পড়েছে। গেঞ্জির হলুদ রং এর আভা গালে এসে লাগছে। রাহাত মৃদু হেসে বলল,‘আপনি আমার খোজে এখানে এসেছেন’
‘হ্যা ’
‘ কিন্তু আমি তো এখানে হুট করে চলে এসেছি, আমি তো সকালে এখানে আসিনা, সকালে তো আমার ক্লাস থাকে। আজকে ক্লাস নেই দেখে এখানে এসেছি।’
‘আপনার ক্লাস নেই দেখেইতো এখানে এসেছি।’
‘আমার ক্লাস নেই আপনি জানেন কি করে।’
‘আমি আপনাদের ডিপার্টমেন্টে গিয়ে জেনেছি যে আজ আপনাদের ক্লাস হবে না, আপনাদের টিচাররা স্ট্রাইক করছে।’
‘আপনি কি করে জানেন আমি কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ি।’
‘কাল আপনার হাতে কম্পিউটার সায়েন্স এর বই দেখেছিলাম।’
‘ বাহ আপনি তো বেশ চালাক মেয়ে।’
রাহাতের এই কথায় মেয়েটা মুখ নিচু করে কিছুক্ষণ হাসল। রাহাতও হাসতে হাসতে বলল,‘যেহেতু আমার ক্লাস নেই আমি তো বাসায় চলে যেতে পারতাম আপনি কি করে বুঝলেন আমি এখানে থাকব।’
‘এমনি আমার মনে হলো আপনি এখানে থাকতে পারেন।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। তো আপনি কেন আমাকে খুজছেন।’
‘আজ আমি চলে যাব তাই দেখা করতে আসলাম।’
মেয়েটির এই কথায় রাহাতের কেন জানি হঠাৎ করে ভালো হওয়া মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। রাহাত বেঞ্চ থেকে উঠে বলল ,‘ আজই ’
‘ হ্যা আজ রাত ১১ টায় ফ্লাইট। সাড়ে নটার মধ্যে এয়ারপোর্ট যেতে হবে।’
রাহাত কিছু বলল না। মেয়েটি আবার বলল,‘শুধু আপনাকে বিদায় দেবার জন্য এখানে আসিনি, আপনাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।’
রাহাত কিছুটা অবাক হয়ে বলল,‘ কি কাজ ’
‘ আমি কিছু তাঁতের শাড়ি কিনব। আমার মায়ের জন্য আর আমার জন্য। আমার সাথে আপনার একটু যেতে হবে। আমিতো দোকান চিনি না, তাই ’
‘ও আচ্ছা তাহলে আপনি আপনার প্রয়োজনেই আমাকে খুজছেন।’
‘ না না ঠিক তা না, কালকে এতটা সময় আমরা একসাথে থাকলাম কিন্তু আমি আপনার নাম পর্যন্ত জানি না, তাই চিন্তা করলাম যাবার আগে আপনার নামটা তো জেনে যাই।’ মেয়েটি এ কথা বলেই হাত বাড়িয়ে বলল,‘ আমি সামাইয়্যা হক’
রাহাতও হাত বাড়িয়ে বলল ‘ আমি রাহাত-উল-ইসলাম’
‘আমি সি.এ পড়ছি আমেরিকায়। ওখানেই পুরো পরিবারে স্যাটেল।’
‘আমি কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছি, ঢাকা ভার্সিটি।’
‘ এবার কি আপনি আমার সাথে একটু যাবেন’
রাহাত একটু হেসে বলল,‘ ড়শ চলুন ’
রাহাত স্যামাইয়াকে নিয়ে এল মিরপুরে। ওর এক বন্ধুর তাঁতের দোকান আছে সেখানে। স্যামাইয়া অনেকগুলো তাঁতের শাড়ি কিনল। শাড়ি কেনা শেষ হলে স্যামাইয়া রাহাতকে বলল,‘ দুপুরতো হয়ে এলো চলুন কিছু খাওয়া যাক।’
রাহাত বলল,‘ হু, খিদে আমারও পেয়েছে, কিন্তু কি খাবেন?’
‘ আসে পাশে কোথাও ফাস্ট ফুডের দোকান নেই’
‘না ফাস্ট ফুড না আপনি যখন আজই চলে যাবেন তবে আপনাকে মিরপুরের বিখ্যাত বিরিয়ানি খাওয়াবো।’
‘বিরিয়ানি মানে ’
‘বিরিয়ানি মানে মজাদার কাচ্চি বিরিয়ানি খেলেই বুঝবেন।’
রাহাত আর স্যামাইয়া মিরপুর ১০ এর ‘মুসলিম হোটেলে’ গেল। রাহাত দুপ্লেট কাচ্চি অর্ডার দিল, সাথে বোরহানি। স্যামাইয়া প্রথমে অল্প করে এক চামচ মুখে দিল। পরে আর ওকে কেউ আটকাতে পারল না পুরোটা শেষ করতে। স্যামাইয়া
বোরহানি খেল পাচ গেলাস। স্যামাইয়ার খাওয়া দেখে রাহাতই ভয় পেয়ে গেল মেয়েটা না আবার বমি করে দেয়। স্যামাইয়া খাচ্ছে আর বলছে ওর মা নাকি আগে এই খাবার রান্না করত। মা অসুস্থ হবার পর আর এই জিনিস সে খাইনি। রাহাত মনে মনে ভাবল বাঙ্গালিরা যতই দেশ থেকে দুরে থাকুক মন থেকে বাঙ্গালিয়ানা কখনই মুছে যায়না। না হলে সব সময় ফাস্ট ফুড খাওয়া মেয়ে কি করে এভাবে দুপ্লেট বিরিয়ানি আর পাচ গেলাস বোরহানি খেতে পারে।
শুধু তাই না, বিরিয়ানি খেয়ে রাহাতের দেখা দেখি স্যামাইয়াও একটা পান মুখে দিল। রাহাতের সাথে সিগারেটও শেয়ার করল। খাওয়া দাওয়ার পর রাহাত বাইকে উঠে বলল,‘ চলুন বিকেল হয়ে যাচ্ছে এবার আপনাকে হোটেলে দিয়ে আসি।’
স্যামাইয়া একটু আদুরে গলায় বলল,‘ ইস্ কোথাও যদি লং ট্যুরে যাওয়া যেত, আপনার বাইকে করে আমার খুব অনেক দুরে যেতে ইচ্ছে করছে।’
স্যামাইয়া যখন কথাগুলো বলছিল তখন ওর গোলাপি ঠোট বেয়ে পানের পিক গড়িয়ে পড়ছিল। রাহাত ওর ঠোটের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর কেন জানি এই মেয়েটাকে খুব ভাল লাগছে। মেয়েটা এখন পরিস্কারভাবে বাংলা বলছে। আধো আধো ভাব একদম কেটে গেছে।
‘ কি আমাকে নিয়ে যাবেন না ’
‘ ঠিক আছে চলুন ’
রাহাত স্যামাইয়াকে নিয়ে মিরপুর বোটানিকালের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আশুলিয়া রোড দিয়ে বাইক চালিয়ে গেল। স্যামাইয়াকে খুব উৎফুল্ল দেখা গেল। ওর হাবভাব দেখে মনে হলো সদ্য স্কুল পালানো কোন মেয়ে তার প্রেমিক কে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাহাত তুরাগ নদীর পাড়ে এসে বাইক থামালো। ওরা দুজন নদীর একদম কিনারে এসে বসল। স্যামাইয়া দুরন্ত মেয়ের মত হঠাৎ বসা থেকে উঠে এক দৌড়ে নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে পড়ল। এসে বলল,‘ দেখো দেখো রাহাত পানিগুলো কী শীতল।’ এ কথা বলেই কয়েক ফোটা পানি রাহাতের মুখে ছিটিয়ে দিয়ে খিল খিল করে হাসতে হাসতে শুরু করল। রাহাত কিছুটা বিরক্ত হলো। এত সামনাসামনি একটি অপূর্ব সুন্দর মেয়ে হাসছে। তার সামনে কি কোন ছেলে বিরক্তভাব প্রকাশ করতে পারে। রাহাত দেখল কি সুন্দর করেই না বাচ্চা মেয়ের মত স্যামাইয়া হাসছে, কত নিষ্পাপ হাসি। রাহাত এই প্রথম স্যামাইয়ার চোখের দিকে তাকালো। কী অদ্ভুত সুন্দর চোখগুলো। চোখগুলোতে কত মায়া, মনে হয় কত দিনের চেনা......’
‘রাহাত চলো না নৌকায় চড়বো।’
স্যামাইয়ার কথায় রাহাত কল্পনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। বলল,‘চলো।’কথাটা বলেই রাহাত খেয়াল করলো সে স্যামাইয়াকে তুমি করে বলছে। ব্যাপারটা খেয়াল করে রাহাত বেশ অবাক হলো।
ওরা দুজন বেশ খানিকক্ষণ নৌকায় ঘুরল। নৌকায় চড়তে ঝমঝমিয়ে বর্ষার প্রথম দিনের বৃষ্টি নামল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ওরা নৗেকায় ঘুরল। তারপর সন্ধ্যের দিকে রাহাত স্যামাইয়াকে ওর হোটেলে পৌছে দিল। কিন্তু স্যামাইয়া রাহাতকে কিছুতেই ছাড়ল না, রাহাতকে ওকে এয়ারপোর্ট এ সী অফ করতে হবে।
৭
রাত ৯টা। এয়ারপোর্টে টুকটাক কিছু কাজ ছিল বলেই ওরা ২ ঘন্টা আগেই চলে আসল। কিন্তু ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে গেলো। হতে এখন প্রচুর সময়। রাহাত ও স্যামাইয়া ওয়েটিং রুমে বসে আছে। রাহাত ধ্র“ব আর সামিকেও ফোন করে দিল এয়ারপোর্টে চলে আসার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা চলে আসবে। রাহাত আর স্যামাইয়া দুজনেই চুপচাপ। কেউ কোন কথা বলছে না।
দীর্ঘ নিরবতা ভেঙ্গে স্যামাইয়া বলল,‘আরও কিছুদিন সময় পেলে রাজশাহী যেতাম।’
রাহাত বলল,‘রাজশাহী কেন ঘুরতে ’
‘না, রাজশাহীতে আমার খালা থাকেন’
‘তো এত অল্প সময় নিয়ে এলে কেন?’
‘এসেছিলাম তো অনেক সময় নিয়েই কিন্তু কাল হঠাৎ ড্যানিয়েল ফোন করল তাড়াতাড়ি আসার জন্য। ড্যানিয়েলের মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
‘ড্যানিয়েল কে?’
‘আমার হাসবেন্ড, যদিও এখনও বিয়ে হয়নি। তবে আমাদের এনগেইজমেন্ট হয়ে গেছে।’
‘লাভ মেরেজ না এরেঞ্জ’
‘দুটোই’
‘মানে’
‘ড্যানিয়েল আমার ভার্সিটিতেই ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারে তখন থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। ধিরে ধিরে ভালো লাগা তারপর প্রেমে পড়া। তারপর আমার বাবা মাও ওকে পছন্দ করল।
‘তা তোমাদের বিয়ে কবে’
‘আরও ছয় মাস পরে হবার কথা ছিল। কিন্তু ড্যানিয়েলের মা অসুস্থ হওয়ায় এখন বুঝি তাড়াতাড়িই বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে।’
‘বিয়ের পর দুজনে একবার এসো’
‘আসব অবশ্যই আসবো। জানো রাহাত ও না খুব ভালো ছেলে। বিদেশি হলে কি হবে ওর মন মানসিকতা আমার সাথে অনেক মিলে। বিয়ে পর ও বলেছে ও নাকি আমার জন্য মুসলমান হয়ে যাবে। আমাদের সন্তান খ্রিস্টান হবে না ,আমাদের সন্তান হবে মুসলমান। তবে ও যদি ধর্ম নাও পরিবর্তন করতো তাও আমি ওকে বিয়ে করতাম। ওকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি।’স্যামাইয়া কথাগুলো বলতে বলতে ওর চোখ মুছলো। ঠিক তখনই অ্যালাউন্স হলো ফ্লাইট আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রান ওয়েওত যাবে। যাত্রিদেরকে তাই পেনে উঠার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’
অ্যালাউন্স শুনে স্যামাইয়া তাড়াহুড়া করে লাগেজ থেকে দুটো প্যাকেট বের করে রাহাতকে দিয়ে বলল,‘ এই কালো প্যাকেটা আপনার জন্য। আর এই লাল প্যাকেটটা রাজশাহীতে বড়খালার কাছে ঢাকা থেকে পোস্ট করে দিয়েন। মনে করেছিলাম নিজের হাতেই দিব তা আর হলো না।’
আবার অ্যালাউন্স শুরু হলো। স্যামাইয়া রাহাতের ডান গালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,‘ যাই, আপনার বন্ধুদের সাথে দেখা হলো না ওদের জন্য আমি ওখান থেকে আপনার ঠিকানায় গিফট পাঠিয়ে দিব। আর মাঝে মাঝে আমাকে মেইল করবেন কিন্তু।’ রাহাতকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে স্যামাইয়া চলে গেল।
কি তাড়াহুড়ো অথচ কি সুন্দর করেই না মেয়েটা হেটে চলে যাচ্ছে। রাহাত এইমাত্র খেয়াল করলো স্যামাইয়া রাহাতের পছন্দ করা সকালের কেনা সেই তাঁতের শাড়িটা পড়েছে। গাঢ় সবুজের মধ্যে লাল পাড়। পরোপুরি যেন বাঙ্গালী ললনা। ধিরে ধিরে স্যামাইয়া সবুজ পরী হয়ে ইমিগ্রেশনের কাচের ঘরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাহাত ওয়েটিং রুম থেকে বের হয়ে সিগারেটের খোঁজে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই বের হয়ে এলো বিকেলে নদীর পাড়ের গাছ থেকে ছেড়া বর্ষায় ভেজা রক্তজবা ফুলটা। স্যামাইয়াকে দিবো দিবো করে আর দেয়া হলো না। রাহাত ফুলটা পকেটে রেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধ্র“ব আর সামি’র জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। একটু আগে সামি ফোন করেছে ওরা মহাখালির জামে পড়েছিল।
রাহাত সিগারেট খেতে খেতে কালো প্যাকেটটা খুলে দেখে চমৎকার একটা কালো টি-শার্ট। টি-শার্ট এ টম এন্ড জেরী কার্টুনের একটা ছবি ছাপা। ছবিতে টম জেরীকে ধরার চেষ্টা করছে। আর ছবিতে লেখা 'Can u catch me!’ছবিটা দেখে রাহাত কিছুক্ষণ হাসল। পরে রাহাত লাল প্যাকেটটা নিয়ে দেখল রাজশাহীর কোথায় এটা পোস্ট করতে হবে।
৮
ধ্র“ব আর সামি এয়ারপোর্টে পৌছানোর আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। রাহাতকে খুজে পেতে ওদের বেশ কষ্ট হলো। রাহাতের যেখানে দাড়াবার কথা সেখানেতো নাই এবং সে মোবাইলও রিসিভ করছে না। পরে ওরা রাহাত কে পেল এয়ারপোর্টের দোতালার বারান্ধার এক কোণে বসে বৃষ্টিতে ভিজতে। রাহাত এক দৃষ্টিতে ডান হাতের লাল প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে আছে। আর ওর বাঁ হাতে রক্তজবা। লাল প্যাকেটটার উপর লেখা-
“ লাহাব উদ্দিন চৌধুরী
কুসুমপুর
রাজশাহী।
(বড় খালাকে চৈতি)”
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।