somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : আমারও একটা লেজ গজিয়েছিল

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম যেদিন ব্রাশ না করা মুখের দুর্গন্ধযুক্ত বায়ুমণ্ডলের কম্বলের মধ্যেই প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বন্ধ ঘুমচোখে কোমরের নিচের অংশটাতে চুলকাতে গিয়ে গজিয়ে ওঠা লেজের মাথা উঁকি দেয়াটা টের পেলাম, চমকে উঠেছিলাম।

বাথরুমের ভেতর অনেক কসরত করতে হয়েছে। (বেসিনের আয়নার ওপাশে কেবল মুখ দেখা যায়। আয়নার সামনের রেক-এ রাখা ব্রাশ রাখার স্ট্যান্ড, শেভিংক্রিম আর শ্যাম্পুর বোতলটাকে সরিয়ে গন্ধ শোঁকার মতো করে কাছে গেলে নাভির কাছাকাছি পর্যন্ত। তারপরই ময়লা জমে লালচে হয়ে যাওয়া সাদা বেসিন। কিছুতেই কোমরের নিচের অংশটা দেখা যায় না।) ছোট প্লাস্টিকের লাল বালতিটাকে উল্টে দিয়ে ওটার উপর দাঁড়িয়ে, উল্টো করে রাখা কলসীর উপর দাঁড়িয়ে নৃত্যরত আদিবাসী নারীর মতো শরীরটাকে একটু একটু করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে ঘাড় বাঁকিয়ে আয়নাটাকে অনেক অনুরোধ টনুরোধ করে নিশ্চিত হলাম।

কীনব্রিজের নিচে সুরমার পাড়ে বাঁধানো রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বিকেলটাকে দেখলাম ঘুমিয়ে পড়তে। উত্তেজনায় অনেক ছবি আঁকলাম মনে মনে। সন্ধ্যেবেলা বাসায় ফিরেও চলতে থাকল আঁকিবুকি। মাথার ভেতর কে যেন চিৎকার করতে থাকল-- 'আমার লেজ গজাইসে! আমার লেজ গজাইসে!'

সেদিনের আগ পর্যন্ত রাস্তায় বেরোলে খুব হিনম্মন্যতায় ভুগতাম। প্রায় সবার পেছনেই কী সুন্দর লম্বা লম্বা লোমশ এক একটা লেজ! আর আমি ল্যাডিস মার্কা-- মুখটা কাচুমাচু করে ওদের সাথে একই রাস্তায় হেঁটে যাই! আমার পেছনে কিচ্ছু নেই!

পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে লেজওয়ালাদের লেজের দিকে আড়চোখে তাকাই। মুগ্ধ হই! অথচ আড়চোখে তাকাই বলে বিস্মিত হতে পারি না চোখেমুখে।

আমার তাকানো দেখে লেজওয়ালাগুলোর ভাব আরও বেড়ে যায়। একটা করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় শালাগুলো। আমি সানগ্লাস পড়া শুরু করি তারপর থেকে। সানগ্লাসের বোরকার আড়াল থেকে সব দেখি, মুগ্ধতা আর সমস্ত ঈর্ষা ওটার ভেতর পুরে আনি, আর প্রতি বিকেলে সুরমার পাড়ে দাঁড়িয়ে রেলিঙে হেলান দিয়ে সানগ্লাস খুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলি। "আমারও জে অলান একটা লেজ কুনদিন অইবো!"

সেই সকালে স্বপ্নপূরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত ওরা আমাকে বলত, 'হালা ল্যাডিস'। আমি চুপ করে থাকি। কিচ্ছু বলি না। ওরা বলে, 'মাইনশোর ল্যাঙ্গুর ফিসেদি থাকে বে হালার হালা। তোর ল্যাঙ্গুর তো দেকি সামনেদি!' ওরা হাসিতে ফেটে পড়ে। আমি চোখমুখ লাল করে বাসায় ফিরে প্যান্ট খুলে কমোডের সামনে দাঁড়াই। আমার শরীর কাঁপতে থাকে। প্রচণ্ড রাগে আমি ধারালো কিছু খুঁজতে থাকি হাতের নাগালে। তারপর কিছু না পেয়ে টেপটা ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। ফোঁসফোঁস করা পানির টেপটার সমস্ত রাগ অর্ধেক পানি ভরা ড্রামটার গায়ে শব্দ করে আছড়ে পড়ে।

এই সময়টাতে নাকি খুব যত্নে থাকতে হয়। একদম টানাটানি করা চলবে না, সময় দিতে হবে, ওকে নিজের মতো করেই বেড়ে উঠতে দিতে হবে। কিন্তু আমি পারি না। আমার ধৈর্য ছাড়িয়ে যেতে থাকে। ওদের মতো আমারও অর্ডার দিয়ে প্যান্ট বানাতে ইচ্ছে করে। পেছনের ফুঁটো দিয়ে লোমশ লেজটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে খুব ভাব নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করে। আমি টানাটানি করি না। কিন্তু সারাক্ষণ হাত বোলাতে থাকি। বালতির উপর উঠতে থাকি। ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়েই মনে মনে ভাবতে থাকি, "লম্বা অর...লম্বা অর।"

আমার ঘুম কমে যায়। সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করি। প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকাই। তর্জনিটাকে খাড়া করে দাঁড় করাই লেজের গোড়ায়। মাপ নিই। বাথরুমে ঢুকে আর কমোডে বসে থাকি না। দাঁড়িয়ে থাকি। বেড়াল ছানার মতো বোকামি করি। বোকার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে বনবন করে ঘুরতে থাকি। আমার বোকামি দেখে বাথরুমের টাইলসগুলো দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

আস্তে আস্তে আমার পেছনের লেজটা ছাড়িয়ে যেতে থাকে সামনেরটাকে। আমি আর বাথরুমে যাই না। আমি আর আয়নায় তাকাই না। রাতে আমি আর কম্বল গায়ে দিই না। আমার আর এসব কিচ্ছু লাগে না।

আমি অর্ডার দিয়ে প্যান্ট বানিয়ে ফেলি একদিন। জমিদারি ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করি রাস্তায় রাস্তায়। কীনব্রিজের ধারেকাছেও আর যাই না। পুচকে ছেলেগুলো আমার পাশে হেঁটে যেতে যেতে আড়চোখে আমার লেজের দিকে তাকায়। আমি আমার ভ্রূ, কাঁধ, চোখ আর মুখের ভঙ্গির উপর চাপিয়ে দেই কয়েক টন বিদ্রুপ আর ব্যাঙ্গ। ওরা সানগ্লাস পড়তে শুরু করে। আমি ওদের বাথরুমের পানির ড্রামে টেপ এর ফোঁসফোঁস রাগ শুনতে থাকি। বেড়ালছানার মতো ওদের বনবন করে ঘুরতে থাকা কল্পনায় দেখতে থাকি।

তারপর একদিন আমি নিজেই বাথরুমের ভেতর বেড়ালছানা হয়ে যাই। বনবন করে ঘুরতে থাকি। ধারালো কিছু খুঁজতে থাকি হাতের নাগালে। না পেয়ে পানির টেপটা ছেড়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ি। ফোঁসফোঁস করে রাগ করা টেপটার সমস্ত পানি শব্দ করে আছড়ে পড়তে থাকে ড্রামের ভেতর। টাইলসের ফাঁকের ময়লাগুলো দাঁত মেলিয়ে হাসতে থাকে আমার দিকে। "হালা ল্যাডিস..."

আমি গল্পটা এখানেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, লোকটা আমার কথা শুনে আমাকে হেসেই উড়িয়ে দিলো। আমার লেজ এর গল্প শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলো। আমি অসহায়ের মতো চুপচাপ কাঁদছিলাম। আমি লোকটাকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না। অনেক কষ্টে লোকটা হাসি থামিয়ে বলল, "তে তুমার লেজটারে তুমি একবারও আয়নাত দেকসো নি বা?"
"আশ্চর্য, আয়নাত দেখা লাগত কিতাল্লাগি!"
"বুচ্চি, দেখসো না। যাও, বাড়িত গিয়া লেফর তলে গুমাই তাখো গিয়া।"

লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম বোকার মতো। তারপর সত্যিই বাসায় গিয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকলাম। আমি আবার বাথরুমে যাওয়া শুরু করলাম। আয়না দেখতে শুরু করলাম। সত্যিই আমার প্রতিরাতে তারপর থেকে শীত লাগতে থাকল। আমাকে কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমাতেই হয় বাধ্য হয়ে।

গল্পটা আমি এখানে এসেও যে করেই হোক শেষ করে দিতাম, যদি না গতকাল বিকেলে একটা মোটা করে লোক আমাকে ওর পাগল-ছাগল মার্কা কথা শোনাত। বলে কি না ওর নাকি লেজ গজিয়েছিল! কী ফালতু কথা! মোটা লোকটা আমাকে প্যান্ট খুলে দেখালো ওর কাটা লেজের গোড়াটা। আমি উনাকে একটা ডাক্তার দেখাতে বল্লাম। নিশ্চয় কোন চর্মরোগ। বিষফোঁড়া টাইপের কিছু একটা হতে পারে। আমি ওর উদ্ভট গল্প শুনে হাসি থামাতেই পারছিলাম না। একদম গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললাম, "তে তুমার লেজটারে তুমি একবারও আয়নাত দেকসো নি বা?"।

লোকটা খুব অবাক হয়ে গিয়ে, কয়েক চিমটি রাগ মিশিয়ে দিয়ে বলল, "আশ্চর্য, আয়নাত দেখা লাগত কিতাল্লাগি!"

আমি মিটিমিটি হাসলাম। "বুচ্চি, দেখসো না। যাও, বাড়িত গিয়া লেফর তলে গুমাই তাখো গিয়া।"
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১০ রাত ১:৪১
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×