ফিনলে টি স্টেটে সুর্যাস্ত।
উল্লুক, hoolock gibbon, অথবা বন-মানুষ। প্রানীটা বিরল প্রজাতীর এবং অস্তীত্ব সঙ্কটে থাকা প্রানীকুলের মধ্যে অন্যতম। দুই দিনের কাজের ফাক পেলে সিদ্ধান্ত নিলাম উল্লুক দেখে আসি। ভারতের আসাম এবং বাংলাদেশের সিলেটের বনাঞ্চলে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে উল্লুক। বাংলাদেশে সামান্য কিছু উল্লুকের দল দেখা যায় লাউয়াছড়া রেইনফরেস্ট আর সাতছড়ি ফরেস্টে। সিলেটের টুরিস্ট স্পটের অনেকগুলোই দেখা হয়েছে। এই দুই ফরেস্ট বাকী ছিল। তাই ছুটির ফাঁকে ভাবলাম লাউয়াছড়া ফরেস্টে উল্লুক দেখে আসি। ভাগ্য ভালো হলে একটু ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফিও করা যাবে
সঙ্গি হিসাবে ট্রাইপডের বাকি দুই ঠ্যাং আমার দুই বন্ধুকে বলতেই ওরা রাজী। ব্যাগপ্যাক রেডি করতে দু মিনিট। লাউয়াছড়া শ্রীমঙ্গলে শুধু এটুকু জানি। আমার বাবা সারাটা জীবন টি গার্ডেনের কর্মকর্তা হিসাবে কাটায় শ্রীমঙ্গল সম্পর্কে ধারনা ছিল। শ্রীমঙ্গল যাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ট্রেন। সকাল সাতটায় পারাবত এক্সপ্রেস সীলেটের জন্যে ছাড়ে। লাউয়াছড়া ফরেস্ট এবং হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের মধ্য দিয়ে যায়। ট্রেনটা দুর্দান্ত। উপবন এক্সপ্রেস রাতে ছাড়ে। এই ট্রেনটা ভয়ঙ্কর রকমের ফালতু। এছাড়া গ্রীন লাইন, এবং অনেক ভালো ভালো বাস সীলেটে গেলেও শ্রীমঙ্গলের জন্যে ভালো বাস হচ্ছে শ্যামলী আর হানিফ। শ্যামলী এসি এবং নন-এসি দুটোই ছাড়ে। ভাড়া ২৫০টাকা। ইচ্ছে থাকা স্বত্তেও পারাবত এক্সপ্রেস ধরতে পারলাম না। তাই সায়দাবাদে আমি আর জ্যাজ পৌছে দেখি ঘোড়া (হাসিব) ওখানে পৌছে ইতিমধ্যে বাসের রেটিং করে শ্যামলীকে পছন্দ করে বসে আছে। সামনে দুটো আর পিছে একটা টিকেট করে বাসে উঠেই দেখি ওরা ভুল করে তিন নাম্বার সীট আরেকজনের কাছে বেচে দিছে। এটা নিয়েই বাসে মহা হাউ কাউ লাগায়া দিলাম। পরে অবশ্য চিল্লা চিল্লির ফলে সুপারভাইজার সব ঠিক করে দিল।
ঢাকা থেকে সীলেটের দুরত্ব কম। মাত্র চার সাড়ে চারঘন্টায় আমরা শ্রীমঙ্গল শহরে পৌছে গেলাম। শ্রীমঙ্গলে থাকার জন্যে সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে বিটআরআইএর রেস্ট হাউজ। কিন্তু ওখানে রেন্ট বেশ চড়া। আমাদের যেহেতু প্ল্যান প্রোগ্রাম ছাড়া হঠাত করে চলে আসা হাতে টাকা পয়সা খুব কম। তিনজন এসেছি হাতে সর্বমোট সাড়ে তিনহাজার টাকা নিয়ে। স্বস্তার মধ্যে একটা হোটেলে তিন বেডের রুম নিলাম। নর্মালী ভাড়া শ-তিনেক হবার কথা কিন্তু রুম নেবার দায়িত্ব যার ঘারে ছিল সে বেশি বড় লোকি দেখানোর জন্যে সেটাকে ৬০০টাকা দিয়ে বুক করে ফেলেছে। টি-টাউন রিসোর্টটা এমনিতে খারাপ না। রুমে এসে ফ্রেস হতে হতে দেখি বিকাল ৫টা বেজে গেছে (আমরা স্টার্ট করেছি সাড়ে এগারোতে) সুর্যের আলো তারাতারি শেষ হয়ে যায়। কোন রকমে দৌড়ে লাফিয়ে রিক্সা নিলাম। শ্রীমঙ্গলে ফিনলে টি-গার্ডেন আর টি রিসার্চ ইন্সটিটিউট আগে দেখেছি। মুল ইচ্ছা নীলকন্ঠের বিখ্যাত ছয় রঙ্গা চা খাব। রিক্সাওয়ালাকে বলতেই চিনে গেল। ৪০+৪০ ঠিক হয়েছে। রিক্সাওয়ালাই জানালো নীলকন্ঠের চা খুব বিখ্যাত। অনেক দেশি বিদেশি টুরিস্ট আসে এই চা খেতে। ইদানিং অবশ্য নীলকন্ঠের নকল করে আরো কয়েকটা দোকান হয়েছে। খুব কাছেই আরেকটা দেখলাম গ্রীন কন্ঠ তারা সাত রঙের চা অফার করছে। আমরা অবশ্য নীল কন্ঠই যাব। টি-গার্ডেনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে সুর্য ডুবে গেল। ঘুরে গ্রামের কাচা রাস্তা দিয়ে অন্ধকারে অবশেষে নীলকন্ঠ কেবিনে পৌছালাম সুর্য ডোবার বেশ পরে। নীলকন্ঠ কেবিন শুধু বিখ্যাতই নয় অনেক ব্যাবসা সফল। দেশি বিদেশী টুরিস্টদের চাপ, স্থানীয় তরুন তরুনীরা আড্ডাবাজী কিংবা ডেটিংএর জন্যে আসে, আর চায়ের দোকান রাজনীতি প্রিয় লোকেদের আড্ডার প্রধান ঘাটি বলাই বাহুল্য। ভিতরে অনেকগুলো চেয়ারের একটাতে আমরা জায়গা পেলাম। সামনে উঠোনের মত স্পেসটাতে অসংখ্য চেয়ার সবগুলোই দখল। ক্যাশ কাউন্টারের পিছে ওদের গোপন ল্যাবটেরি, দরজায় লেখা প্রবেশ নিষেধ। আমরা ৫রঙ্গা চায়ের অর্ডার দিতেই ওয়েটার ঢুকে গেল ল্যাবের ভিতরে। চা-তৈরি হতে পনেরো মিনিটের মতো সময় লাগে, এরপরে প্রসেসিং আছে। প্রায় আধাঘন্টা পরে ছোট স্বচ্ছ পানির গ্লাসের ভিতরে আরেকটা গ্লাসের ভিতরে পাচ রঙ চা হাজির। গরম চায়ের বাইরের গ্লাসের ঠান্ডা পানির স্তরটা সম্ভবত বিশেষ তাপমাত্রায় চা স্তর গুলোকে আলাদা রাখতে দেয়া হয়। চায়ে চুমুক দিয়েই মুখ বিকৃত করে ফেললাম। অনেকটা আইস টিএর মত। স্বাদ মোটেও মুখরোচক না। ধুর, পয়সা দিয়ে কিনেছি শেষ করি বলে আরো কিছু চুমুক দিলাম। পরের স্তরে গিয়ে দেখি খেতে খারাপ না। নেক্সট স্তরে গিয়ে বুঝলাম চা টা বেশ আরামদায়ক কড়া লিকারের, যতোই গভীরের স্তরে যাই ততোই টেস্ট বাড়ে। একটা প্রবাদের মতো কথা শুনেছিলাম, ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে কিংবা ডাইলের মজা তলে। একেক স্তরে একে স্বাদ, কোথাও কমলার ঘ্রান, কোথাও আদার টেস্ট, কোথাও বা কড়া লেবু চা। বেশ ভালো লাগলো।
নীলকন্ঠের চা খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। রিক্সা ওয়ালাকে লাউয়াছড়া বলতেই বললো, বাসে চলে যান তারা তারি হবে, না ভাই, বাসে যাব না। রিক্সায় যান, টেম্পুতে যান। উহু আমরা হেটে যাইতে চাই। হাইট্যা যাবেন ক্যান, ভাড়াতো বেশি না। না না ভাড়ার জন্যে না আমরা, হেটে যেতে চাই কারন আমরা কোন জায়গায় গেলে জায়গাটাকে চিনতে চাই, জায়গার মানুষগুলোর সাথে মিশতে চাই। আর এজন্যেই হাটা। জানলাম দুরত্ব মাত্র ৪ কিলো, আশা করি দেড় থেকে থেকে দু-ঘন্টার মধ্যেই আমরা লাউয়াছড়া ফরেস্টে পৌছে যাব। বনের মধ্যে দিয়ে চারঘন্টার হাটা দুর্দান্ত হবার কথা। লাউয়াছড়া যাবার ডিরেকশান জেনে নিয়ে আমরা চিকেন বিরিয়ানী দিয়ে ডিনার করে হোটেলে ঢুকে হিন্দি গান দেখায় মনোযোগী হলাম।
শেষ পর্ব কিছুক্ষনের মধ্যেই পোস্ট দিতেছি।
উল্লুক সম্পর্কে জানতে চাইলে এইখানে উইকিপিডিয়াতে ক্লিকবাজি http://en.wikipedia.org/wiki/Hoolock
বিখ্যাত নীলকন্ঠ টি কেবিন।
৫ রঙ্গা চা।
৫ রঙ চায়ের খাদক
জালালী কবুতর।
উল্লুকের মুল্লুক, লাউয়াছড়া রেইনফরেস্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

