সাদা পরী, কেমন আছিস? কি করিস তুই এখন? তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে.. কেমন ঠাণ্ডা পড়েছে দেখেছিস, ঝুম বৃষ্টির মতোই ঝুম ঠাণ্ডা। কেমন একটা ঘুম-ঘুম-কার্সিয়াং এর আবহ চারিদিকে। আমি ভালো নেই রে। এমন শীতের ভোরে, দুপুরে-বিকেলে, সন্ধ্যা কিংবা রাতে অষ্টপ্রহর শুধু তোকে মনে পড়ে। এখন তুই কাছে থাকলে, ঠিক তোর বুকের মধ্যে নাকটা গুজে রাখতাম। শীতটা তখন আমাকে হিংসা করতো। কোনো নীল চাদরের নিচে তুই আর আমি একসাথে ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। শীতটা তখন মিছেমিছি চোখ রাঙাতো। শুধু তুই নেই বলে, আজ আমার আর শীতের সাথে পাল্লা দেওয়া হলো না। শুধু তুই আমার কাছে থাকলি না বলেই, আমি এখন শীতের ভয়ে দারুন জবুথবু। আমি এখন শুধূ স্বপ্নের কাথামুড়ি দিয়ে সকালকে দুপুর, দুপুরকে বিকেল, আর সন্ধ্যাটাকে টুপ করে ভোর করে দিই। এমন দারুন শীতের রাতে, তোর ভালোবাসার ওম জড়ানো চাদর গায়ে, সারা রাত রাগ ভৈরবী কিংবা ইমন কল্যানী শোনা হলো না।
দুনিয়ার কতো কতো নিয়ম প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, তাই না? আরব বিশ্বের এই যে রাজনৈতিক পরিবর্তন, তা কেউ ভেবেছিল বছর কয়েক আগেও? অথচ কেমন সব টুপ টাপ করে বদলে যাচ্ছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম এর নাম দিয়েছে আরব বসন্ত। বসন্তে যেমন পাতা ঝরে নতুন পাতা আসে, তেমনি করে নতুন কিছুর প্রত্যাশায় এই গণ জাগরণ বলেই হয়তো। এই এক বসন্তের জন্য আরব দুনিয়ার মানুষদের কম ঘাম ঝরাতে হয়নি। একই হাওয়া আফ্রিকা মহাদেশের কিছু অঞ্চলেও বয়ে চলেছে। তবে এমন বসন্তে এই সব দেশে অস্ত্রের ঝনঝনানি ভেদ করে কোকিলের ডাক শোনা যাবে কিনা তা এখনও বলা যাচ্ছে না। আবার কোথাকার কোকিল যে কা'কে দিয়ে তার ডিমে তা' দেওয়াবে, আরব কাকেরা তা জানে কিনা- তা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। না জানুক, আমি শুধু দেখছি নিয়ম বদলে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিলো যখন বিজয় দিবসে খুব আনন্দ করতাম। কাগজের পতাকা দিয়ে নিজেদের ঘরের জানালা, বারান্দা সাজাতাম। পাড়ার বন্ধুদের সাথে গলির এ প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নিজেরাই পতাকা টাঙ্গাতাম, নিজেদেরই টিফিন বাচানো টাকায়। খুব সকালে আব্বার সাথে হাটতে যেতাম, ডিআটি রোড ধরে সোজা বঙ্গভবনের পাশের পার্কে। সকাল সাতটার দিকে ওখানে তখন কামানের তোপ ধ্বনিতে বিজয় দিবসের আগমনী ঘোষণা করা হতো। তারপর স্টেডিয়ামে বিজয় মেলা। সারা দেশের সেরা স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা মার্চপাস্ট করতো, নানা ধরনের খেলা, শারীরিক কসরতের মাধ্যমে সবার মন ভরাতো। এতদিন পরও আমার ভারতেশ্বরী হোমস, আল-আমিন একাডেমীর নাম মনে আছে। রাষ্ট্রপতি নিজে উপস্থিত থাকতো সেখানে।
দিন এখন বদলে গেছে। এখন রাষ্ট্রপতি চলেন প্রধানমন্ত্রীর কথায়। মনে আছে, রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দৌজা যেই একটু ভাব দেখাতে গেল, অমনি তাকেও বদলে দেওয়া হলো। বঙ্গভবন বা রাষ্ট্রপতির সেই জৌলুস এখন আর নেই। জানিনা, এখনও সকালে বঙ্গভবনে তোপধ্বনি দেওয়া হয় কিনা। আর সেই তোপধ্বনি শোনার জন্য আমার মতো কোনো কিশোর শীতের সকালে অপেক্ষা করে কিনা। এখন আমাদের ঘরেও আর পতাকা টানানো হয়না। গলি সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছে চেনা মাস্তান, দলীয় চাঁদাবাজেরা। জাকজমকের সাথে সাথে আনন্দ কেনা বেচার ব্যবসাটা এখন ভালই জমে উঠেছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এখন হিন্দী সিরিয়ালে স্বাধীনতার স্বাদ আর বিজয় দিবসের মানে খোঁজে। কাল রাতে আব্বা বলছিল, 'আগে দেখতাম গান গায়, এখন শুধূই লাফ দেয়।' ওদের আর কি দোষ, নিয়মই তো বদলে গেছে। নিয়মই বা বদলাবে না কেনও, এখন যে দিন বদলের রাজত্ব চলছে। খবরের কাগজে 'বদলে দাও, বদলে যাও', টিভির বিজ্ঞাপনে 'দিন বদলের গান', রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে 'দিন বদলের সনদ', এমন কি আমার প্রজেক্টের নামও 'পরিবর্তন-ড্রাইভিং চেঞ্জ'।
এত সব পরিবর্তনের ভীড়ে, আমি শুধু তোর বদলে যাওয়ার সুরটা ধরতে চেষ্টা করি। নিজেকে সেই বদলের সাথে মানিয়ে নেয়ার আকাঙ্খায়, কথনও ধ্রুপদী, কখনও জ্যাজ মিউজিক বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু সবাইকে দিয়ে কি আর সব কাজ হয়? আমার আর বদলা-বদলির খেলাটা শেখা হয়ে ওঠে না। আমি সেই বদলে যাওয়ার আগের বলদই থেকে যাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



