পূর্ব প্রকাশের পর.....
প্রথম পর্বের লিংক
Click This Link
সময় এগিয়ে যেতে থাকে।নিত্যকার নিয়মে সূর্য উঠে হাউসের পিছনের রহস্যময় সুন্দর পুকুরের মাথায়।কিংবা কোমল জোছনা পরশ বুলিয়ে চলে থার্ড প্রেপ শেষ করে হাউসে ফেরা ক্যাডেটদের উপর।সেই সাথে এগিয়ে যেতে থাকি আমরা-মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ৩৪ তম ব্যাচ।সেভেন পেরিয়ে এইটে উঠতে উঠতে ক্রমশই আমি থেকে আমরা তে পরিনত হতে থাকে অবুঝ ৩৮টি প্রান।সেই দুঃসহ সেভেনের দিনগুলিকে মনে হতে থাকে
যেন সূদুর অতীতের ঘটনা।আমরা ৩৮ দেহ এক প্রান হয়ে যেতে থাকি।ক্যাডেট কলেজের সাথে ধাতস্থ হয়ে যাই ক্রমেই।সিনিয়র হয়ে যাচ্ছি আমরা।
অবশেষে একদিন আমাদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পদার্পন করল আমাদের পরের ব্যাচ।এবং অদ্ভুত ভাবেই আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়রদের সাথে আমাদের দূরত্ব কমে এল।সেই হ্যাংগার ভাঙা সেই নির্ঘুম অবসর যেন হারিয়ে যেতে থাকল।তারা হয়ে উঠতে থাকল বন্ধু প্রতিম।তাদের চাহারা আর দুগ্রহের মত প্রতিভাত হয় না। কলেজ ট্রেডিশন অনুযায়ী আমাদের পিছু নিল দুই ব্যাচ সিনিয়ররা।কিন্তু এখন খেলা আর একতরফা না।আমরাও লাগি ওরাও লাগে।নতুন যুদ্ধের জন্য যেন আমাদের প্রস্তুত করে দিয়ে গেল আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়ররা।
দুই ব্যাচ সিনিয়রদের সাথে আমাদের লড়াই আর হলো না অবশ্য।তার কারণ ঐ আলম।সে ভালো ক্রিকেট খেলত।তাই সিনিয়রদের সাথে খেলতে ওর ডাক পড়ত মাঝে মাঝে।আর দুই ব্যাচ সিনিয়রদের কাছে ও হয়ে গেল আদরের সাবু।হ্যা,শরীরের গড়নের কারণে চাচা চৌধুরীর সাবুর সাথে মিলিয়ে ওর এই নামকরণ।সেই তার নিক নামের শুরু।আমরা যখন টুয়েলভে আমরা নিকনামের জরিপ করে আলমকেই পেয়েছিলাম।শীর্ষে। তার সব মিলিয়ে মোট ১৬ টা নিক আবিষ্কৃত হয়েছিল।আর মজা হলো এ সহজ সরল ছেলেটি তার নিকগুলো এনজয় করত।তা তার সবচেয়ে জনপ্রিয় নিক ছিল সেলিম(যা আজও আমার মোবাইলে সেভ করা)।সেই গল্প বলি।
নাইনে আমরা।বায়োলজীর কোন পাক্ষিক পরীক্ষার খাতা দিতে এসেছেন নুরুল হক স্যার যিনি আমদের মাঝে হক ব্যাটারি নামে পরিচিত ছিলেন।তা একটা খাতা নিয়ে বিরক্ত ভাবে তিনি বললেন কিছু একটা যে ছবি ভালো হ্যনি বা কিছু জাতীয়।তা কার খাতা খোজ করতে গিয়ে তিনি বলে উঠলেন সেলিম কে?আমরা তো অবাক।সেলিম নামে আমাদের তো কেউ নেই।স্যার আবার মনযোগ দিয়ে নাম পড়ে আবারও বললেন সেলিম।আবার সবাই অবাক।মুখ চাওয়া চায়ি করছি।এমন সময় একজন সাহস করে স্যারের সামনে গিয়ে খাতা নিল।আর নাম না পড়েই সে বুঝে ফেলল খাতা কার।কারন আমন প্যাচানো ছোট বিদঘুটে লেখা একজনেরই আছে।সে আর কেউ নয় আলম।তা তার লেখার প্যাচে কিভাবে যে আলম সেলিম হয়ে গেছে তা সে নিজেও জানে না।
এই নামটি বিখ্যাত হতে বেশি সময় লাগল না।অল্প সময়ে আলম সেলিম নামে পরিচিত হয়ে গেল।আমাদের আড্ডায় তার আগমন ঘোষনা হতো সেলিম নামটি জোরে উচ্চারনের মাধ্যমে।মাঝে মাঝে সে নিজেও যে তাতে অংশ নিত না তা কিন্তু নয়।সেই নাইনের সময়-ক্যাডেট কলেজের মধ্যগগনে উদিত সূর্য যখন আমরা- আমার স্মৃতির ঝাপি খুলে দেয়।কারেন্ট যাওয়া অনেক আড্ডার সন্ধ্যাকে মনে পরে।মনে পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাকে নিজের মত উপভোগের গল্প।মনে পড়ে কোন অবসরে বাইরে নিজেদের একনকে পালক্রমে গার্ড রেখে ক্যাডেট কলেজ আবিষ্কৃত রুম ক্রিকেটের গল্প।মনে পরে বন্ধুদের অর্থহীন ঝগড়া।আর ঝগড়া শেষে মধুর পরিসমাপ্তি।মনে পরে স্যারদের নিক নাম দেয়া স্যারদের সাথে দুষ্টামির গল্প।আমাদের তারুন্যের উচ্ছাসকে ক্যাডেট কলেজ থামিয়ে দেয়নি বরং তাকে নিয়ন্ত্রন করেছে অদ্ভুত ভাবে।
একদিনকার কথা আমদের এক স্যার সব কথা বলেন প্রথম পুরুষে।তা আমি সেটা জানি না।সেই স্যারের ক্লাশ ।আলম দেরিতে ঢুকেই বলতে লাগল আগের দিন ডিনারের গল্প।স্যার ওকে জিজ্ঞেস করেছেন কী আলম মাছ খাই না?আমি শুনে মাথামুন্ডু কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্যার আমাকে আলমকে ডেকে বললেন।কি হল,দেরি করে আসি ক্লাশে আবার কথা বলি।এবার আমি পুরো ব্যাপার বুঝে ফেললাম।হাসি আটকাতে সেদিন বড় কষ্ট হয়েছিল।
স্যারদের নিয়ে আমরা শুধুই হাসি ঠাট্টা করতাম এটা ভাববেন না যেন। ক্যাডেটরা চঞ্চল কিংবা দুষ্টু হতে পারে তাই বলে মানবিক আবেগ নেই একথা বলা ভুল। এক দিনের ঘটনা।আমাদের এক স্যার একদিন ক্লাশে ঢুকলেন ।তার চেহারা বিষন্ন।ছাত্রদের সেলফ স্টাডি করতে বলে তিনি পিছনে বসলেন।তার চোখ টলটল তা ছেলেগুলির দৃষ্টি এড়ায় নি।তা পিছনে বসে কী যেন তিনি ছিড়ে ফেলে দিলেন বাইরে।মাথা নিচু করে বসে আছেন।এমনি সময় এক ছেলে বাইরে থেকে ছেড়া কাগজগুলি কুড়িয়ে এনে জড়ো করল।এতে বুঝা গেল।স্যার নিঃসন্তান ছিলেন।তার এক পালক পুত্র ছিল তাকে নিয়ে যাবার খবর দিয়ে ঐ ছেলের অভিভাবক চিঠি পাঠিয়েছে।সেই ছেলে চিঠির টুকরো জোড়া দিয়ে স্যারের হাতে তুলে দিয়ে বলল,স্যার কাদবেন না।আমরা কলেজে তিনশ ক্যাডেট সন্তান থাকতে আপনি কেন কাদবেন?
তারপরের কাহিনী আমারা জানা হয়নি কোনদিনও।এই কাহিনী কাহিনীবাজ( আলমের আরেকটি বিখ্যাত নিক)আলমের মুখ থেকে শুনা ।আর এ কাহিনী বলার সময় তার সদা হাস্যময় মুখে বিষাদের যে ছায়া পরে ছিল তা দেখে আমি আর জিজ্ঞেস করতে পারিনি।
........চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৩:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


