somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাটির চুলা

০৫ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছবি কথা বলে: আজ হাটবার আপনে দেড়ি না করে বাজারে যান গা, নাতি নাতনি ছেলে বউ শহরের বাসায় নদীর মাছ খায় কিনা আল্লাহ মাবুদ জানে! (মাটিরে চুলাতে দাদীজান পিঠা ভাজছেন, দাদাজান পিঠা খাওয়ার সাথে সাথে দাদীজানের কাছে জেনে নিচ্ছেন গঞ্জের বাজার হতে আজ কি কি বাজার করতে হবে)
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
গ্রামের বাড়িতে যেতে ট্রেন থেকে নেমেই জেলা শহর। রেল স্টেশন থেকে আমাদের গ্রামে যেতে দুরত্ব প্রায় ১৩ কিঃমিঃ। গ্রামের শুরুতেই যা চোখে পরে তা হচ্ছে আমাদের গ্রামের অতি পুরাতন একটি বাজার। বাজারে মাটির চুলাতে সারাদিন চা হচ্ছে, গ্রামের লোকজন খুব আগ্রহ করে চায়ে চুমুক দেন, আব্বাকে দেখে বাজারের সবাই আগ্রহ নিয়ে বলেন “মিয়াবাই পরিস্তিতি বালা না, খুবই চিন্তায় আছি” তাদের চেহারা দেখে মোটেও চিন্তাযুক্ত মনে হয় না, বরং মনে হয় তারা বেশ আনন্দে আছেন! মনা কাকার চায়ের দোকানে আব্বা সবাইকে চা বিস্কুট খেতে বলেন - বিস্কুট ডুবিয়ে সবাই চা খান। আব্বাও সবার সাথে খুবই চিন্তাযুক্ত কথা শুনেন - সকলে হাসেন, চায়ে চুমুক দেন। মনা কাকার ব্যস্ততা বাড়ে তিনি দোকানের কর্মচারীদের হাক দেন “তোরা আমার দুহান বন্ধ কইরা ছারবি” মনা কাকার দোকান বন্ধ হবার দোকান না, ভোর থেকে রাতঅব্দি নিরবচ্ছিন্ন চা-সিঙ্গারা-পুরি-মোগলাই-পরোটা-ভাজি বিক্রি হচ্ছে তো হচ্ছে। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মনা কাকার বাবা রহিম উদ্দিন দাদা সাথে মনা কাকা একই ভাবে এই চা স্টল চালাতেন। এখনো চলছে - জ্বলছে মাটির চুলা আর সাথে চা - কয়লার ঘ্রাণ

আমাদের গ্রামে গ্যাস নেই, যদিও আমরা গ্যাসের দেশের মানুষ। বাড়িতে এলপি গ্যাসে রান্না হয় আর মাটির চুলাতেও রান্না হয়। মাটির চুলা পাকের ঘরে আছে দুইচোখা চুলা একটি, আর একচোখা চুলা একটি। আর পাকের ঘরের বাইরে আছে চারচোখা চুলা একটি, তাতে বাড়িতে ধান সিদ্ধ করার জন্য ব্যবহার হয়, এছাড়া বাড়িতে আত্মীয় পরিজন আসলে তাতে বড় পরিসরে রান্না হয়। মাটির চুলার সাথে আমাদের ঘরের সকলের যে ভালোবাসা মিশে আছে তা দীর্ঘদিনের। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখছি বাড়িতে এই তিনটি মাটির চুলা। মেরামত করে করে চলছে - চলছে। ২০ - ৩০ বছর তো আধুনিক কোনো চুলাও থাকার কথা না। মাটির চুলা যেগুলো গ্রামের বাড়িতে দেখছি তার বয়স কম করে হলেও ৪০ বছর হবে। মাটির চুলায় রান্না করার সময়ে বাড়ির সকল মহিলারা চুলার পাশে বসে নানান জীবনমুখি গল্প করেন - সেসব গল্প বই উপন্যাসকেও হার মানাতে পারে।

রান্না শেষে মাটির চুলার আগুন নেভানো হলেও তাতে জ্বলন্ত কয়লা ও গরম ছাই থেকে যায় তাতে গোল আলু গুজে রেখে দিলে কয়লা ও ছাইয়ে আলু পুড়ে সিদ্ধ হয়ে থাকে এই পোড়া আলুর ভর্তার স্বাদ মনে রাখার মতো। তাছাড়া একই অবস্থায় চুলাতে একটি রুটি তাওয়া রেখে তাতে রুটি রেখে দিলে ধিরে ধিরে সেই রুটি মুচমুচে টোস্ট হয়ে যায়। বিকালের নাস্তাতে এই টোস্টের স্বাদ অসাধারণ। দেশ বিদেশের বিখ্যাত ব্রান্ডেড বেকারির ব্রেড রুটি খেয়েছি, কিন্তু যতো দামি রুটি হোক গ্রামের বাড়ির গনগনে আগুনের চুলা থেকে নামানো রুটির স্বাদের সাথে কখনো তুলনা করা যায় না। এই গনগনে আগুনে গরম রুটির সাথে মিশে আছে আমাদের গ্রামের বাড়ির ভালোবাসা, ৪০ বছরের পুরোনো আমার দাদীজানের হাতের ভালোবাসা। আমার মা এই চুলাকে খুব যত্ন করেন। কারণ এই বাড়িতে এই চুলাতে আমার দাদীজান রান্না করেছেন। দাদীজান এখনো বাড়িতে গেলে নিজের হাতে দুধ গরম করেন, চা তৈরি করেন। - মাটির চুলাতে তিনি রান্না করে আনন্দ পান।

মাটির চুলার ছাই সবজি চাষে কাজে লাগে। মাছ কাটতেও এই ছাইয়ের ব্যবহার অপরিসীম। তাছাড়া এক সময়ে আমাদের গ্রামে অনেকেই ছাই দিয়ে ভোর সকালে হাড়ি পাতিল ধুয়ে ঝকঝকে পরিস্কার করতেন। আজও ডেকোরেটরের বড় বড় হাড়ি পাতিলগুলো ছাই দিয়ে পরিস্কার করা হয়। আমাদের পুরোনো বাড়ির মাটির চুলার বয়ষ প্রায় ৭০ বছর। এখনো টিকে আছে খুব সুন্দর ভাবেই আছে। প্রতি তিন-চার মাস অন্তর কাদা মাটি করে চুলার ভেতরে ও বাইরে একবার লেপ দিয়ে নিতে হয়।

মাটির চুলা যুগ যুগ থেকে টিকে থাকুত শতাব্দীর পর শতাব্দী। টিকে থাকুক মাটির চুলার পাশে বসে গ্রাম বাংলার স্মৃতি বিজড়িত মা চাচীদের সুখ দুঃখের গল্প, টিকে থাকুক মাটির চুলার ভালোবাসা।

ছবি: টুইটার থেকে সংগ্রহ।





সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৯:২৬
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অম্লবচন-২

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:১৭

মানবভূষণ

লজ্জাই মানুষের শ্রেষ্ঠ ভূষণ। একজন লজ্জাশীল মানুষ
অন্যায় করেন না, যেহেতু কৃত কুকর্মের জন্য তাকে
চোখ খুলে অন্যের চোখে তাকাতে হবে, যে-চোখ
সমস্ত লজ্জার আখড়া।


সম্পদশালী

একজন নির্লোভ বা নির্মোহ মানুষই প্রকৃত সম্পদশালী,
কেননা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেলজিক গল্প ৫০৯৭

লিখেছেন নগরবালক, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:৩৬


দুই বগলে দুইটা কচি জালি লাউ নিয়ে অর্পন যাচ্ছিল বাজারে বিক্রি করতে। নিজের গাছের লাউ। নিজে রান্না করে খেলেও পারত। কিন্তু এই লাউ বিক্রি করেই তার আজকে চাল কিনতে হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি কর্তৃপক্ষের অন্যায় খাহেশ এবং মহামান্য(!) ট্রাম্পের অনৈতিক আস্ফালনঃ

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:২৫

ছবিঃ অন্তর্জাল।

সৌদি কর্তৃপক্ষের অন্যায় খাহেশ এবং মহামান্য(!) ট্রাম্পের অনৈতিক আস্ফালনঃ

সৌদি কর্তৃপক্ষের অন্যায় খাহেশঃ

সৌদি আরব কর্তৃপক্ষের হিসেবে তাদের দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা তথা মিয়ানমারের আরাকানের নাগরিকদের সংখ্যা ৫৪০০০ জন। এই বিপুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাগরী (উপন্যাস: পর্ব- পাঁচ)

লিখেছেন মিশু মিলন, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫৪

পাঁচ

অপরাহ্নে রাজকুমারী শান্তা যখন শুনলো যে রাজ্যের খরা নিবারণের নিমিত্তে ইন্দ্রদেবকে সন্তুষ্ট করে বৃষ্টি কামনায় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী রাজপুরোহিতের পরামর্শে একদল গণিকাকে পাঠানো হচ্ছে এক বনবাসী মুনিকুমারকে হরণ করে নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের মানসিক ভাবে নিজদের বদলাতে হবে

লিখেছেন সেলিনা জাহান প্রিয়া, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:১৯



ভারতের তামিলনাড়ু ছিলাম। সেখানে ১০০/২০০ গ্রাম মাছ- মাংস কেনা যায়। প্রতিবেলা টাটকা কিনে এনে নিজের রুমে রান্না করে খাইতাম। খুব ভাল সুবিধা মনে হয়েছে।

বেঙ্গালুরুতে সন্ধ্যার পর বারগুলোর সামনে ৩০ রুপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×