সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু: মানিকগঞ্জ: অঘোষিত এক কারফিউ ঘেরা শহরে পরিণত হয়েছে রাতের মানিকগঞ্জ। রাত ১০টা বাজতেই ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে দোকানপাট, ফাঁকা হতে থাকে রাস্তা-গলিপথ। মধ্যরাত পেরুবার আগেই বন্ধ হয়ে যায় জেলা শহরে সবকটি ওষুধের দোকান। রিক্সা-ইজিবাইক শূণ্য শহরে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে হয় কাঁধে করে।
এমন অবস্থা চলছে অনেকদিন ধরে, তবে সম্প্রতি তা পৌঁছেছে আতঙ্কের স্তরে।
মানিকগঞ্জের বাইরের কেউ মধ্যরাত কিংবা তারও ঘণ্টাখানেক আগে শহরে পা দিলে কারফিউ ভেবে আঁতকে উঠতে পারেন। তার সঙ্গত কারণও আছে। রাত ১১টায় শহরের প্রধান সড়ক শহীদ রফিক সড়কের কোথাও কোনও রিক্সা নজরে পড়বে না, নজরে পড়বে না কোনও ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকও। মাঝে মধ্যে নিশাচর দু’চারটি কুকুরের চিৎকারে ভীতির আবহই বাড়ে শুধু ‘কোথাও কেউ নেই’ পরিবেশে।
দু’চারজন পথচারী অকস্মাৎ মিলবে, তারাও যেন দম বন্ধ করে গন্তব্যে ছুটছেন। রাজধানী থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরের এক জেলা শহরে এমন রাত সত্যিই বিস্ময়কর।
রাতের মানিকগঞ্জের এমন নিস্তব্ধতা এরই মধ্যে নানাবিধ বিপদ বয়ে এনেছে সাধারণের। সবচেয়ে আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন অসুস্থ লোকজন। অসুস্থ কোনও মানুষকে রাতে হাসপাতাল নিতে হলে তাকে চ্যাংদোলা করে নিতে হবে অথবা তুলে দিতে হবে সমর্থবানের কাঁধে।
এমনকি একটি রিক্সাভ্যান পর্যন্তও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। রাতের বেলায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস হাতে চাঁদ পাওয়ার চেয়েও অসম্ভব ব্যাপার যেন। মানিকগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতাল, ফায়ার ব্রিগেড এবং মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য রাতের বেলায় কল করলে উত্তর আসে হয় ‘ড্রাইভার নেই’ নয়তো ‘অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট’ বলে। তবে কেবল প্রভাবশালীদের জন্য রাতের বেলার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নড়েচড়ে বসে। তখন অ্যাম্বুলেন্স যেমন ফিটফাট থাকে তেমনি চলকও থাকেন প্রস্তুত।
সম্প্রতি রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স, রিক্সা কিংবা অটোবাইকের অভাবে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ছাত্রী নিবাসের অসুস্থ এক ছাত্রীকে চার হাতপা ধরে ঝুলিয়ে এক কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নিতে দেখা গেছে। মেয়েটি রাতের খাবার শেষে পানি পান করতে গিয়ে হঠাৎই শ্বাস নিতে পারছিল না।
গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত বৃদ্ধ বাবাকে কোলে করে হাসপাতালে ছুটছিলেন সদর উপজেলার মান্তা গ্রামের বছির সিকদার। কালীগঙ্গা নদীর বেউথা ঘাটে ট্রলার ভিড়িয়ে রিক্সা, ভ্যান, ইজিবাইক কোনও কিছুই না পেয়ে এক কিলোমিটার দূরের মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে আসেন এভাবে। এমন চিত্র এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাতের বেলার এমন পরিবহন সংকট দীর্ঘদিনের হলেও গত রোজার ঈদের পর থেকে তা চরম আকার ধারণ করেছে। আগে রাতের শহরে অটোবাইক চালাতেন পশ্চিম দাশড়ার বজলুল হক। এখন রাত ৮টার পর আর শহরে থাকেন না।
এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, রোজার সময় ভোররাতের দিকে অটোবাইকের ধাক্কায় মানিকগঞ্জ সদর থানা ওসি আবু তাহের আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনার পর থেকে পুলিশ তাদের ওপর মহা ক্ষেপে আছে। গাড়ি সংত্রান্ত বিষয়ে চুন থেকে পান খসলেই বিপদে পড়তে হচ্ছে। নির্জন রাস্তায় নানা অজুহাতে তাদের হরেক পদের ঝামেলায় ফেলা হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ শহরের শতকরা আশিভাগ রিক্সা চালকই দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা। এরা দিন হিসেবে ভাড়ায় নেওয়া রিক্সা চালান এবং ২০/২৫ জন করে একসঙ্গে মেসে থাকেন। এসব রিক্সা চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা যে সমস্ত গ্যারেজে রিক্সা রাখেন সেসব গ্যারেজ রাত ১১টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়অ হয়। গ্যারেজ বন্ধ হয়ে গেলে নিজ দায়িত্বে খোলা জায়গায় রিক্সা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে রিক্সা চুরির সম্ভাবনা থাকে। তাই যে কোনও অবস্থাতেই রাত ১১টার মধ্যে রিক্সাগুলো গ্যারেজে জমা দিয়ে দেন।
শুধু এ বিড়ম্বনাই নয়, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাতের বেলা জরুরি ওষুধ না পাওয়ার আতংক। অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাল রেখে মানিকগঞ্জ শহর এবং শহরতলীর ওষুধের দোকানগুলোও রাত ১০টার পর থেকেই বন্ধ হতে থাকে। হাতে গোনা দু’তিনটি ওষুধের বড় দোকান তাদের সারাদিনের বেচাকেনার হিসেব মেলাতে দেরি হয় বলে রাত ১১টা থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখে। তারপর সব বন্ধ। পুরো জেলা শহরে কোথাও একটি ওষুধের দোকানও খোলা মিলবে না।
বছর খানেক আগেও শহরে না হোক, সদর হাসপাতাল গেট এলাকার কিছু দোকান প্রায় সারারাত খোলা থাকতো। কিন্তু সেগুলোও এখন বন্ধ থাকছে রাত ১০টার পর থেকে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় পৌরসভার পৌলী এলাকার মিনহাজ উদ্দিন শহর চষে বেড়াচ্ছিলেন তার আট বছরের ছেলের জন্য খাবার স্যালাইনের খোঁজে। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যা- থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি দোকানে ডাকাডাকি করেও কারো কোনও সাড়াশব্দ পাননি। পরে শহরের একটি ক্লিনিকের পরিচিত নার্সের কাছ থেকে স্যালাইনের প্যাকেট জোগাড় করে বাড়ি ফিরেছেন।
জেলার ওষুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন মানিকগঞ্জ জেলা কেমিস্ট অ্যা- ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান রিপন বাংলানিউজকে জানান, তারা মূলতঃ তিনটি কারণে রাতের বেলায় দোকান বন্ধ রাখছেন। প্রথমত রাত ১০টার পর ক্রেতার সংখ্যা অনেক কমে যায়, দ্বিতীয়ত রাত জেগে কাজ করার মত কর্মচারির অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় তাদের অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভূক্ত ওষুধের দোকানের সংখ্যা ৯০টি হলেও দোকানগুলো প্রধানত বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থিত। ফলে কেউ দোকান খোলা রাখতে চাইলেও রাতের নির্জন শহরে তাকে মূলত একাই জেগে থাকতে হয়।’
তবে পুলিশী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে পালাক্রমে এক বা একাধিক দোকান সারারাত খোলা রাখতে তাদের কোনও আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
রাত ১১ টার মধ্যে রিক্সাগ্যারেজ বন্ধ করে দেওয়া প্রসঙ্গে শহরের সবচেয়ে বড় রিক্সা গ্যারেজের মালিক মহর আলী জানান, অধিকাংশ রিক্সাই রাত সাড়ে নয়টা থেকে রাত ১০ টার মধ্যে গ্যারেজে চলে আসে। বাইরে থাকে সামান্য কিছু রিক্সা। সময়সীমা বেধে না দিলে সারারাত জুড়েই অল্প কিছু রিক্সার জন্য গ্যারেজ খুলে বসে থাকতে হয়। আর সারারাত গ্যারেজ খোলা রাখতে গেলে গ্যারেজের জন্য মোটা বেতনে কেয়ারটেকার রাখতে হয়। যা গ্যারেজ মালিকদের পক্ষে বহন করা কষ্টকর। আর রাত ১১ টা পর্যন্ত দেখভাল গ্যারেজ মালিকরাই করতে পারেন বাড়তি কোনও কর্মচারী রাখতে হয়না।
মানিকগঞ্জ শহরে রাতে ওষুধের দোকান বন্ধ থাকা এবং পরিবহন (রিক্সা, ইজিবাইক, অ্যাম্বুলেন্স) শূন্যতায় জনদুর্ভোগ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘জেলা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভাল থাকার পরও মধ্যরাতের এ অবস্থা নগরবাসীর জন্য সত্যিকার অর্থেই বিড়ম্বনার। সমস্যাটি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি, এ দুটো সমস্যার সমাধানের জন্য জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন, ওষুধ ব্যবসায়ী, মানিকগঞ্জ পৌরসভা, রিক্সা ও ইজিবাইক চালকদের সংগঠনের নেতাদের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সহসাই গ্রহণ করা হবে।’
সদর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শহর এবং বাসস্ট্যা- এলাকায় আমাদের নিয়মিত পুলিশী টহলের ব্যবস্থা আছে। ওষুধ ব্যবসায়ীরা রাতে দোকান খোলা রাখতে চাইলে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি নিরাপত্তা অবশ্যই দেওয়া হবে।’
রাতের ইজিবাইক চালকদের পুলিশী হয়রানীর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, আতঙ্কের কোনও কারণই নেই। বৈধ কাগজপত্র আর বাইকের ফিটনেস ঠিক থাকলে কারও কোনও সমস্যা হবার কথা নয়। তবে শহরে একাধিক ইজিবাই দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির কারণে রাতের বেলায় হেডলাইট ছাড়া ইজিবাইক চলাচল কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেও অধিকাংশ বাইক হেডলাইট ছাড়াই রাতের বেলায় চলাচল করেছে।’
Click This Link Sep 2011 07:12:00 PM Thursday60362

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



