তা তো আছেই। না হলে চাঁদ থই থই নিঝুম রাতে বাড়ির সবাই যখন ঘুমে বেহুঁশ, তখন দোতলার ঘরে উত্তরের জানলাটা আমি খুলি না কেন? কারণ বাইরে কয়েকশো গজ দূরে গৌরকাকাদের খোলা ছাদের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। ড্যাবড্যাব করে ও তাকায় আমার ঘরের দিকে।
ছাদটা ওদের পৈতৃক সম্পত্তি। আর নিজের বসতবাড়ির কোথাও রাতবিরেতে বসার জন্যে সরকারী লাইসেন্স লাগবে; সে দুর্দিন এখন আসেনি। আসলে মুশকিলটা হল-লালি বলে কেউ ওদের পরিবারে আর নেই। নামের মালকিন পাঁচ বাই সাড়ে ছয় ল্যামিনেটেড ছবি হয়ে গেছে এক বছর আগে।
এ অবধি ব্যাপারটা ক্লিশে। আমি এবং আমার মত অতীন্দ্রিয়পরায়ণ লোকজনের এরকম খুচরো অভিজ্ঞতা থাকেই। আত্মীয়রা এতে বদহজমের মশলা খুঁজে পায়। ফাজিল বন্ধুরা বলে নিপাট গাঁজা। ডাক্তারবাবু ঠাওরান হ্যালুসিনেশন-ইত্যাদি, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। যার যা খুশি ভাবুক। আসল গেরোটা কিন্তু আলাদা। আমি জনহীন খাঁ খাঁ দুপুরেও কয়েকবার লালিকে ওখানে বসে থাকতে দেখেছি! আচ্ছা, বলুন তো –একটা সাদামাটা কাঠের জানালার পাল্লা কি এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যকে রুখতে পারে? যদি পারে, তার ওয়ারেন্টি পিরিয়ড কত? জানি না। সত্যি জানি না।
এসব না জানা থেকেই ভয়ের দুনিয়া শুরু। দেশ বিদেশে একে ধরার হাজারো আয়োজন। উইচক্রাফট, ভুডুইজম, ব্ল্যাকম্যাজিক থেকে শুরু করে ডাকিনীবিদ্যা, প্ল্যানচেট মায় ঝাঁড়ফুক অবধি। অশরীরীর কত না নামের মিছিল। পল্টারাজিস্ট, আফ্রিৎ, ভ্যালকিরি, জোম্বি, মামদো, পিশাচ, নিশি, দানো এরকম অঢেল প্রজাতি। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, প্রেত চর্চার এত পিণ্ডি চটকেও কিচ্ছু ধরা গেল না। আজও নাইট শিফটের অফিস ডিউটিতে নির্জন টয়লেটে ঢুকতে আপনার কলজে কাঁপে। যে তেঁতুল গাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে পাড়ার রতন জিভ বার করে ঝুলেছিল- সেই ডালটার দিকে বার বার চোখ চলে যায়।
মুর্শিদাবাদে এক পোড়ো রাজবাড়িতে গেছিলাম আমরা ক’জন। জায়গাটা এমনিতে জঙ্গুলে। ওখানে নিজেদের এদিক ওদিক দাঁড় করিয়ে কয়েকটা স্ন্যাপ নেওয়া হল ক্যামেরায়। আমার শ্রীমতীও দাঁড়িয়ে পড়লেন দেয়াল ঘেরা ভাঙা চাতালে। শাটার ক্লিক করলাম যথারীতি। পরে সে ছবির প্রিন্ট আউট দেখে নিজেই শিউরে উঠেছি। এ কোন ফোটোগ্রাফ? প্রাচীন খণ্ডহরের উঠোনে পেঁয়াজরঙা শাড়ি পরে যে দাঁড়িয়ে আছে তার মুখটা আমার বউ-এর। চোখদুটো অন্য কারও। ও যেন নিছক ট্যুরিস্ট নয়। ওই গিলে খতে আসা শ্যাওলা মাখা প্রাসাদ ওর বিচরণ ভূমি। চিরপরিচিত দিনরাতের ঘর দুয়ার। এমনই সে চাউনির কনফিডেন্স। কে এসে ওর চোখের ভিতর দিয়ে অর্পাথিব ছোঁয়া দিয়ে গেল আমার পার্থিব লেন্সে! কে !
ভয় নিয়ে নার্ভের কাঁপন যার কাছে অপ্রতিরোধ্য ; সেই জানে এর আসল মেজাজ। এ নেসা ড্রাগের চেয়ে কম নয়। অবচেতনে হয়তো বা আতঙ্কিত হওয়ার বাসনা পুষে রাখে কেউ কেউ। ফিয়ার অবশেসন ব্যাপারটা সোনার পাথরবাটির মত শোনালেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার নয়। আর পাঁচটা প্যাশনের মত এও স্বাভাবিক বাসনা। না হলে হরর মুভি আর স্টোরির স্রস্টা এবং ভক্তদের ভীড়ে পাগলাগারদ উপচে পড়তো। এখানে আমার একান্ত ভাবনার কিছু টুকরো শেয়ার করা যাক। বারবার দেখি বড়দের জন্যে নির্মিত অলৌকিক স্বাদের ছবি ও কাহিনিতে রগরগে দেহ দৃশ্যায়ন। ঘুমন্ত নায়িকার নাভির আবরণ না সরালে ভূতের লালসা প্রমাণিত হয় না। এতো শুধুই গৌরচন্দ্রিকা। অতপর কামনাকুসুম বিকশিত, দলিত ও মথিত-নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক হলেও। অথচ বিপ্রতীপের থিওরি দেখুন, অশরীরীদশা মাটির পৃথিবীর সব শরীরি ভোগক্ষমতার বাউণ্ডারি লাইনের বাইরে। তবে মিছিমিছি অতৃপ্ত বাসনার বস্তাপচা ললিপপ দিয়ে ভৌতিকপ্লটের ফ্যাক্টর পালটে লাভ কোথায়?
প্রাপ্তবয়স্কদের হরর মানে কি কেবল দেহ বনাম দেহের খেলা? অতীন্দ্রিয় ভাবনা না হয় বিমূর্ত ; সুরিয়্যালিটির নাগাল পেতেও যদি কাঠ খড় পোড়ে ; তবে প্রাপ্তবয়স্ক মনটুকুর ঠিকঠাক প্রয়োগ তো করা যায়।
আমাদের সংস্কৃতির বনিয়াদে কিন্তু এপার ওপারের সেতুটা সিনেমা নভেল নাটকের ধার ধারে না। তার ভিত বিশ্বাসের ইটেঁ গাঁথা। শ্যামাপুজোর ঠিক আগের রাতে এদেশে ভূত চতুর্দশী। কৃষ্ণপক্ষের সেই ঘোর আঁধারে প্রেতের দলকে পিছুটান দেয় ধরণী। ওরা ফিরে আসে নিজের নিজের বাসার আনাচে কানাচে। ভীরু মানুষ আত্মরক্ষার আশায় সাজিয়ে রাখে জ্বলন্ত প্রদীপের পাহারা। বলবৃদ্ধি জন্য চোদ্দরকম শাকের আয়োজন করে ভাতের পাতে। শুধু এখানে নয় ; পশ্চিমের দেশেও একতিরিশে অক্টোবর তারিখটা চিহ্ণত হ্যালোইন নামে। আত্মাদের গা-ছমছমে রি-ইউনিয়ন ডে। বিকট সব মুখোশ পরে সেলিব্রেট করে কচি-বুড়ো সব মানুষের পো রা।
সব শেষে সেই অশেষ কথা। আমরা অজানাকে ভয় পাই। কিন্তু অচেনা তো চর্চার বিষয় হতে পারে। কৌতূহলের হেডলাইটে নতুন রাস্তার খোঁজ করতে বাধা কোথায়? আর সে রাস্তার টার্নিং-পয়েন্টে সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে তো পোয়াবারো!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


