ব্লগে আজ প্রথম লিখতে বসা ..... কিন্তু যেই বিষয়ে লিখতে বসা তা কিছুটা কঠিন-ই বলতে হয়। তাই শুরুতেই ক্ষমাপ্রার্থী।
বিভিন্ন কারণে ছেলেবেলা থেকেই সমাজতন্ত্রের প্রতি দূর্বার আকর্ষণ ছিল ......কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সমাজতন্ত্রের ভঙ্গুর দশা হৃদয়কে নাড়া দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কথা আনতে চাই না ...... শুধুমাত্র আমার সীমিত জ্ঞানে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের কথা বলতে চাই।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া এই দেশে সমাজতন্ত্র ছিল স্বাধীনতার চেতনার অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্ত কালক্রমে এই বিষয়টি ছিল সর্বাপেক্ষা উপেক্ষিত।
সেদিন যেই লাখো তরুণ বিপ্লবের চেতনায় সমবেত হয়েছিল তাদের আশা আকাঙ্খার বিন্দুমাত্র বাস্তবায়িত হয় নি, এই বিষয়ে দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না।
আমি হয়তো তাদের প্রতিনিধি নই... কিন্ত আশা আকাঙ্খার বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমাকে অন্য অনেকের থেকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। কিছু ব্যক্তিগত কারণে ব্যাপারটা খোলাসা করলাম না।
তবে আক্ষেপ লাগে যাদের হাত ধরে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল তাদের আপোষকামিতার চিত্র দেখে।
স্বভাবতই, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে প্রথম দ্বায়িত্ব ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, তাঁর সদিচ্ছা থাকার পরও তা বাস্তবায়িত হয় নি।
ব্যক্তিগত জীবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থক হওয়ার পরও আমি মনে করি দলটি চারিত্রিকভাবে কখনোই সমাজতান্ত্রিক ছিল না, গঠনতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের উপস্থিতি ছিল সময়ের দাবি, তবে একটি বৃহদাংশ সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে আপোষহীন ছিল ... এ ব্যাপারে আশা করি সকলেই একমত। সেই বৃহদাংশ থেকেই জন্ম নেয় “জাসদ”।
জাসদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় ... এর জন্ম হয়েছিল না পাওয়ার বেদনা এবং স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার কষ্ট থেকে। কারণ , নানা কারণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেই সময় নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারে নি। আওয়ামী লীগের সেই ব্যর্থতা অনেক তরুণকে জাসদের পতাকা তলে সমবেত করলেও , তাদের আচার অনুষ্ঠান সীমাব্ধ হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগের বিরোধীতায় ... এবং বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারাই সবচেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল ... কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পদার্পণের মধ্য দিয়ে। আর এর ফায়দা নেয় স্বাধীনতা বিরোধীচক্র।
বন্ধুমহলে অনেকেই আমাকে সমাজতন্ত্রবিরোধী মনে করলেও ...দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলতে চাই নীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রের প্রতি কখনোই আমার বিরূপ মনোভাব ছিল না, বর্তমানেও নেই। তবে আমি মনে করি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেই দৃঢ়তা থাকা আবশ্যক তার সামান্যও এই দেশের কথিত বিপ্লবীরা দেখাতে পারেন নি।
এই ক্ষেত্রে সাধারণ কর্মীদের কোনো দোষ আমার চোখে পড়ছে না ... আমি মনে করি নেতারাই এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন । সেই সময় অনেক নেতাই বিপ্লবের মোহে আকৃষ্ট হলেও তাঁদের অনেকেই আদর্শকে হৃদয় থেকে বিশ্বাস করেন নি অথবা বর্তমানে তাঁরা আদর্শকে তোয়াক্কা করছেন না।
অনেক বড় অভিযোগ করে ফেললাম, তাই কিছুটা সাফাই গাওয়া দরকার। আমি একে একে সেই সময়ের বিপ্লবীদের বর্তমান অবস্থানের চিত্রটা তুলে ধরছি।
১। সিরাজুল আলম খান --- তাঁকে সবাই “দাদা” বলেই ডাকতেন এবং “জাসদ” তাঁর “Brain Child” । তিনি বর্তমানে শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত এবং প্রায়ই আমেরিকা অবস্থান করেন। তাঁর আপোষকামিতার একটি নিদর্শন হিসেবে একটি রচনার reference দিতে চাই ...... “সিরাজুল আলম খানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সামরিক প্রশাসনের প্রলোভন ও চাপের ফল”......সূত্রঃ “অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্ণেল তাহের ও জাসদ রাজনীতি”......লেখকঃ আলতাফ পারভেজ।
২। আ স ম আব্দুর রব --- তদানীন্তন জাসদ সভাপতি ...... যেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাঁর এত সংগ্রাম সেই আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী (১৯৯৬-২০০১)
৩। শাহজাহান সিরাজ --- তদানীন্তন জাসদ সাধারণ সম্পাদক ......... তাঁর আওয়ামী বিরোধী ভূমিকা অক্ষত রাখতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং স্বাধীনতা বিরোধী জামাতকে সাথে নিয়ে আরোহণ করেন ক্ষমতায়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি মন্ত্রী ছিলেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত। তিনি এখন সেই জিয়ার কথা বলে মুখে ফেনা তোলেন। “সেই জিয়া” কেন বললাম সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসি।
৪। হাসানুল হক ইনু ---- তদানীন্তন গণবাহিনীর শীর্ষ সংগঠক............বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও এমপি। তাঁর ব্যাপারে একটি কথাই বলবো তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। যেখানে স্বাধীনতা বিরোধী ও স্বৈরাচার পর্যন্ত নিজের প্রতীকের প্রতি আস্থা হারায় নি।
৫। ওয়ারেছাত হোসেন বেলাল ---- জাসদের সুইসাইড স্কোয়াডের শীর্ষ নেতা ...... সমাজতন্ত্রের আদর্শ বাস্তবায়নে জীবনদানকারী কর্ণেল তাহের ও শহীদ বাহারের ভাই ......... অথচ আজ তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সাংসদ।
জাসদের বাইরে অন্যান্য বামপন্থী নেতাদের কথা বলতে গেলে মূলতঃ দুই জনের কথা বলতে চাই ...
১। রাশেদ খান মেনন ...... বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও এমপি এবং তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তীতে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সকল পদক্ষেপের কড়া সমালোচক। তাঁর ভাই এনায়েত উল্লাহ খানের বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী ৮ই নভেম্বর ১৯৭৫ এ “সাপ্তাহিক হলিডে”-তে লেখা জাতিকে হতবাক করে।
২। দিলীপ বড়ুয়া......বর্তমান শিল্পমন্ত্রী .........মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এমন এক দলের সদস্য ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাদের মূল্যায়ন ছিল ...... “দুই কুকুরের লড়াই”। সেই দল বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডকে স্বাগত জানায়।
বাকিটা বিচারের দ্বায়িত্ব আপনাদের...... আমি ক্ষুদ্র জ্ঞানে এই চিত্র তুলে ধরলাম।
তবে কর্ণেল তাহের এর কথা না বললে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের কথা অপূর্ণ থেকে যায়। তিনি এক মাত্র ব্যক্তি যিনি পারতেন এই দেশে বিপ্লবের বিজয় কেতন ওড়াতে। বিপ্লবের পথে তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে অগ্রসর হতে পারে নি রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, কাজেই তাঁর একার পক্ষে সম্ভব হয় নি স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেয়া। হয়তো তিনি পারতেন , কিন্তু মীর জাফরের পর এই দেশে বিশ্বাসঘাতকতার উজ্জ্বলতম নিদর্শন জিয়া তাঁকে সেই সুযোগ দেয় নি। একারণেই বলা “সেই জিয়া”...... যার উচ্চাভিলাষী ক্ষমতার স্পৃহা রুদ্ধ করে দিয়েছে এই দেশে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দ্বার।
উপরোক্ত এই সকল কারণে আজ সত্যিই ভয় হয় নতুন করে স্বপ্ন দেখতে ......... শোষণহীন সমাজের কথা শুনলে .........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


