*
মধ্যপ্রাচ্যে গণজাগরণ বিশ্বের জন্য যেমন ভয়ের কারণ হতে পারে, তেমনি আবার সম্ভাবনার নতুন আভাসও নিয়ে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান আন্দোলনের বিভিন্ন দিক দ্যা ইকোনমিস্টের সম্পাদকীয়তে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের কাছে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনা ছিল একটা স্বপ্ন। তারা মেনে নিয়েছিল, একজন শাসকের হাতেই তাদের ভাগ্য বাঁধা; যে শাসক জনমতকে পদদলিত করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। জনগণের একমাত্র বিকল্প ছিল, গোঁড়া ধর্মীয় মতাদর্শের ইসলামি গোষ্ঠীগুলো। এখানেও জনমত বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
তবে এ অঞ্চলের কিছু দেশে স্বৈরতন্ত্র ও ইসলামি আদর্শ একীভূত হয়ে গেছে। সৌদি আরব ও ইরান এ ব্যবস্থার আদর্শ উদাহরণ। এ ব্যবস্থায় জনগণ তাদের স্বাধীন মত প্রকাশ করতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বও নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে। তারা মনে করছে, এ অঞ্চলে চরমপন্থি মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী একনায়কের প্রয়োজন।
দুই মাস আগে তিউনিসিয়ায় মুহাম্মদ বোয়াজিজি নামের একজন ফল বিক্রেতা সরকারি কর্মকর্তাদের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং বেকারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে নিজের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন। এই প্রতিবাদ তিউনিসিয়া এবং পরবর্তী সময়ে মিসরে গণজাগরণ সৃষ্টি করে। এ ঘটনার পর থেকে হাজার হাজার জনগণ তাদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে পড়ে, যা দশকের পর দশক ক্ষমতায় থাকা শাসকদের হতবাক করে দেয়।
ছোট্ট বাহরাইনে হাজারো জনগণ রাস্তায় নেমে এলে নিরাপত্তাকর্মীরা রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেন। এরপর লিবিয়ার জনগণ তাদের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে জর্ডান থমথমে, আলজেরিয়া অস্থিতিশীল এবং ইয়েমেনে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।
গোঁড়া ইসলামপন্থিরা দীর্ঘদিন ধরে আরব বিশ্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। তবে চলমান আন্দোলন তাদের ওই চেষ্টার মধ্যে পড়ে না। নিপীড়িত, নির্যাতিত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রজন্ম যেন জেগে উঠেছে। তারা পুরাতন প্রজন্মকে সামনে রেখে যেকোনো মূল্যে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে। এর ফলে ইসলামি চরমপন্থা, স্বৈরশাসক এবং সর্বোপরি বিশ্বের জন্য কী বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
মিসরের বর্তমান অবস্থা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের গণজাগরণের ফল সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে। হতাশাবাদীরা দেখছে, জনশক্তি এখনো আগের মতোই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। কায়রোর রাজপথে আজ কোনো বিক্ষোভকারী নেই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হবে না। নৈরাশ্যবাদীরা আরও সতর্ক করছে এই বলে যে ঘুরে ফিরে পুরোনো শক্তি আবারও ক্ষমতায় আসবে। ক্ষমতায় আসতে পারে সামরিক শাসক বা কট্টরপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডস।
তবে ভালো কিছুও মিসরে হতে পারে। মিসরের গণমাধ্যমগুলো এখন নিজেদের অনেকটাই স্বাধীন মনে করছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো যেন ঘুমিয়ে আছে, ব্যক্তিগত ভিন্নমত জনগণের মধ্যে তেমন নেই বললেই চলে এবং সাম্প্রতিক সংসদীয় কার্যকলাপও চোখে পড়ে না। সমাজে পাশ্চাত্য ও ইসরায়েলের ওপর তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। আশার কথা হচ্ছে, মিসরের নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি ‘সেক্যুলার’। তাদের মাধ্যমেই আসতে পারে প্রকৃত ও গঠনমূলক পরিবর্তন।
তিউনিসিয়ার বর্তমান সমস্যা থেকে কীভাবে বের হওয়া সম্ভব, তা অন্য কেউ বলে দিতে পারে না। দেশটির মধ্য থেকেই সমাধানের পথ বের হতে পারে। কারণ, দুরবস্থাসম্পন্ন কোনো দেশ নিজের কারণেই দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। লিবিয়া ও সিরিয়ায় দমনপীড়ন মিসরের চেয়ে বেশি। ইয়েমেনের অবস্থা ব্যাখ্যা করা অনেক জটিল। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে।
সূত্র;Prothom Alo
ঢাকা, রোববার, ৬ মার্চ ২০১১, ২২ ফাল্গুন ১৪১৭, ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



