![]()
১
“এই প্রশ্নটার উত্তর কে দিতে পারবে?” মাসুদ স্যার কথা শেষ করে পুরা ক্লাসকে তার চারচোখের মধ্যে নিয়ে আসলেন। চারপাশে হঠাৎ পিনপতন নিরবতা।আধা জাগ্রত ও অন্য দুনিয়ায় অবস্থানকারী ছাত্ররা এই নি:শব্দ এলার্মে মূহুর্তের মধ্যে খুব মনোযোগী হয়ে উঠল।ক্লাস জুড়ে নিস্তব্ধতায় সবাই শংকিত, কারণ মাসুদ স্যার এর শিকার কেউ হতে চায় না।সবার আশঙ্কার সমাপ্তি ঘটিয়ে হাসান তার হাত উপরে তুলে বলল, “স্যার”।
সেকেলে ধাঁচের শার্ট আর প্যান্ট পরিহিত সাদামাটা হাসানকে দেখে মাসুদ স্যার কিছুটা বিরক্ত ও অনেকখানি আশাহত হয়ে বলল, “ক্লাসে কি তুমি একাই পড়ে আস?”। পর মূহুর্তেই যেন নতুন কোন চিন্তার ঝলকে তার মুখে মুচকি হাসি দেখা দিল। সিনেমার ভিলেনদের মত হাসির আভাটা ধরে রেখে বলতে থাকল, “নাহ্ তুমি বস, অন্য কেউ এর উত্তর দিবে”। বলতে বলতেই যেন খুঁজে পেল তার শিকার - “ওইযে পিছনের বেঞ্চের প্রথম ছেলেটা, - হ্যাঁ তুমি..”
রাকিব সকালে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠছিল সেইটাই এখন মনে করার চেষ্টা করছে। মাসুদ স্যার এর নির্দেশে উঠে দাঁড়িয়েছে কিন্তু বলার মত কিছুই নেই। তাই ঠিক করল চুপচাপ থাকবে। বোবার কোন শত্রু নেই, এই পলিসিতে যদি পুলসিরাত পার হওয়া যায় তবে মন্দ কি? কিন্তু প্রবাদ যে সব সময় সত্যি হয় না তার প্রমাণ দিতেই মনে হয় আজ মাসুদ স্যার নেমেছেন। “চুপ কেন? পড়া পড় নি কেন?” আবারও নি:শব্দ বিরতি ভাঙ্গলেন মাসুদ স্যার, “তোমার বাবা কি তোমাকে এখানে স্টাইল করার জন্য টাকা দিয়ে পড়ায় নাকি কিছু শিখার জন্য?”। বাবা সংক্রান্ত কোন কথা উঠলে রাকিব আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আজও তার ব্যাতিক্রম হল না।
“স্যার, উইদ ডিউ রেস্পেক্ট, আপনি একথা বলতে পারেন না, ইউ হ্যাভ নো রাইট,আমি কার টাকা দিয়ে পড়িসেইটা আপনার মাথা ব্যাথার বিষয় না, আমি এখানে নিজ গুনে ঢুকেছি, আমি পড়া পারিনি তাই বলে আপনি আমাকে বলতে পারেন নাযে আমি কার টাকায় পড়ি।” এটা যদি কোন বিতর্ক প্রতিযোগীতা হত তবে নিঘার্ত দর্শকদের হাত তালি পেত, কিন্তু একজন স্যার এর সাথে এরকম আচরণ বেয়াদপির সামিল এবং তা চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত। মাসুদ স্যার সেকেন্ড খানিক নিলেন ব্যক্তব্য গুলো হজম করতে। তারপর ধীরে ধীরে হাত দরজার দিকে তাক করে বললেন, “বেড়িয়ে যাও বেয়াদপ কোথাকার, তোমার আর আমার ক্লাসে আসার দরকার নেই”। রাকিব যেন ঠিক এই আচরণ ই আশা করছিল, সে আর একটি কথাও না বাড়িয়ে সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। রাকিবের গমণ পৃষ্ঠের দিকে তাকিয়ে মাসুদ স্যার চিবিয়ে চিবিয়ে আত্ম মনে নিজেকে বললেন, “দেখে নিবনে তুমি আমার সাবজেক্ট এ কিভাবে পাশ কর”।
মাসুদ স্যার এর কথাটি কেউ গুরুত্ব না দিলেও হাসান ঠিক ই শুনতে পারল তার অমোঘ মনোযোগ এর কারণে। হাসানের মন টা যেন কেমন বিষন্নতা আর অসুস্থ বোধ এ ভরে উঠল। ক্লাসের বাকি সময় টুকুতে আর খুব বেশি মনোযোগ রাখতে পারল না।
২
ঘড়িতে দুপুর ২ টা ছুঁই ছুঁই করছে, মাসুদ স্যারের অফিসে রাকিব দাঁড়িয়ে।
মাসুদ স্যার জ্বলন্ত দৃষ্টির মধ্যে কিছুটা করুণা দেখে খুব খারাপ লাগল রাকিবের। তবুও নিজের ক্যারিয়ার খাতিরে কিছু বলল না, চুপচাপ মেঝের দিকে দৃষ্টিনামিয়ে ফেলল। মাসুদ স্যারই শুরু করল কথা – “তোমার বাবার সাথে তোমার কি সমস্যা?”। প্রথম প্রশ্নই রাকিবের মাথা পুরা তছনছ করে দিল। এক ঝলকে যেন তার মায়ের ছবিটা দেখতে পেল, তারপর আবার সবকিছু থেমে গেল। ধীরে ধীরে রাকিব মাথা উঠিয়ে বলল “বাবা আমার অমতে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।”মাসুদ স্যার ঘটনার গভীরতা সম্পর্কের একটা ধারণা করলেন। ঠিক করলেন এইবার এর মত একে মাফ করে দিবেন। “ঠিক আছে, তোমাকের আমি মাফ করব এক শর্তে। তোমাকে এখন রেগুলার আমার কাছে রিপোর্ট করতে হবে। তুমি যে কোন পার্টনার বাছতে পার যে তোমাকে সাহায্য করবে অথবা তুমি নিজেও পরতে পার, তোমার ইচ্ছা। কিন্তু তুমি আমার কাছে প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে রিপোর্ট করবে। ঠিক আছে?” এই নিয়মের সাথে অমত থাকা সত্বেও রাকিব নিজের মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করল। মাসুদ স্যার উঠে দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখতে দেখতে বললেন, “যাও,আমাকে এখন ক্লাস নিতে হবে, কাল থেকে তোমার রিপোর্টিং শুরু, ভাল করে পড়াশুনা কর।” বলেই মাসুদ স্যার রাকিবের জন্য অপেক্ষা না করে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। রাকিব আনমনে স্যারের ফাঁকা চেয়ারের দিকে তাকিয়ে কি যেন চিন্তা করতে করতে অন্যমনষ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
৩
“আচ্ছা এই থিওরিটাতে আসলে কি বুঝাতে চেয়েছে?” কাঁচু মাচু করে হাসান কে জিজ্ঞাসা করল রাকিব। হাসান বই থেকে মুখ তুলে এক দৃষ্টিতে রাকিবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। সারা মুখ এ অদৃষ্ট কি যেন খুঁজল, কিন্তু সারা মুখ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আশার আর অনুনয় এর আভা ব্যাতীত কিছু পেল না। হাসান তার সামনে বাড়িয়ে দেওয়া খাতার দিকে তাকিয়ে তাকে বুঝানো শুরু করল। কেন যেন রাকিবের প্রতি তার এক ধরনের করুণা কাজ করছে, তাই যতদূর সম্ভব তাকে সাহায্য করল হাসান তাকে।
রাকিব কে বেশ সন্তুষ্ট, আজ প্রথম থিওরিটা পরিষ্কার বুঝতে পারল। তাই মনে মনে হাসানকে অনেক গুলা ধন্যবাদ দিল। আর চিন্তা করল, হাসান তো টিচার হলেই পারে। অন্যান্য অনেক স্যারের তুলনায় খুব সহজে বুঝাতে পারে। কেন যেন নিজের অজান্তে রাকিব ঠিক করল হাসানকে তার ল্যাব পার্টনার বানাবে। এই সরল আর পরিষ্কার চিন্তা নিয়ে রাকিব খুশি মনে লাইব্রেরী থেকে বের হয়ে গেল।
আগামী পর্বে সমাপ্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


