
৪
পরীক্ষায় ভাল করতে পেরে রাকিবের মন খুব ভাল। সে হাসানকে ধরে নিয়ে গেল নিজের গ্রুপে আড্ডা দিতে।হাসান কে আড্ডার জায়গায় দেখে কেউ টিটকারী ছুড়তে ভুলে না। অন্যান্য দিন হলে হাসান এই খান থেকে যত দ্রুত সম্ভব চলে যেত, কারণ এই টিটকারী গুলা বেশীক্ষন শুনলে হাসান তার পায়ের তলায় কোন মাটি অনুভব করতে পারে না, নিজেকে কেমন জানি এলিয়েন মনে হয়। কিন্তু মেঘাকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবে বলেই শত বিপত্তির মুখে হাসানের আজকের আসা। আজকেও সেই বাজে অনুভুতি কাজ করছে। টিটকারীগুলো শুনতে ভাল লাগছিল না আর হাসানের তাই হঠাৎই ঠিক করে ফেলল – ভালোয়ভালোয় কেটে পড়াইভাল।কিন্তু আজ যেন স্বয়ং একিলেস এসে হাজির হাসানের জন্য, সকল গোলা গুলো কিভাবে অতি দক্ষতার সাথে ফিরিয়ে দিল গোলা হিসেবে, তা শুধু হাসান মন্ত্র মুগ্ধের মত দেখল। মনে মনে রাকিবের দক্ষতার প্রশংসা না করে পারলো না। অন্যরাও হাল ছেড়ে দিল, হাসানও সাহস ফিরে পেল খানিকটা। মিশে যেতে লাগল গ্রুপের সাথে, গ্রুপও তাকে আস্তে আস্তে আপন করে নিতে থাকল। আর এইভাবেই গ্রুপের একজন সদস্যতে পরিণত হল হাসান।
৫
“কি বলব ...” হাসির আলোড়নের মধ্যেও রাকিবকে কথাটি শেষ করতে দিল না হতচ্ছাড়া মোবাইলটা। রাকিব হাসতে হাসতে মোবাইল বের করে আনল। হাসান রাকিবের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তাই দেখল হাস্যোজ্জ্বল মোমবাতিতে মোবাইলের কলারের নামটা একটা ঝড়ো হাওয়া বইয়্য দিল। রাকিবের মুখের কালো ভাবটা দেখে হাসানের মনের ভিতর থেকে কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। রাকিব তার হারিয়ে যাওয়া হাসি জোর করে ধরে রাখার প্রয়াস করল, “আমার একটা জরুরী কল আসছে, আমি আসতেছি” – বলেই উঠে দাড়াল। একটু দূরে গিয়ে কলটা রিসিভ করল – “তোমাকে না বলছি আমাকে না ফোন করতে – তুমি ফোন করেছো কেন?”।
“বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তা এখনও শিখনি?” প্রতিত্যুরে ছিল অবজ্ঞা আর তিরস্কারে ভরা। “আমি তোমাকে জানাতে ফোন করেছি, তোমার মা চল্লিশ দিন আগে মারা গিয়েছে। রাকিবের মনে হল, ওর কি যেন হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। বুঝতে পারছেনা কেন এ অস্বাভাবিক শূন্যতা তাকে ভর করছে? দম নিতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও অনেক কষ্টে উওর দিল, “তুমি মাকে শেষ পর্যন্ত মেরে ফেললে? কি লাভ হল তোমার? কেন মাকে মারল? আমাকেও সাথে সাথে মেরে ফেলতে”। কথা গুলা বলার সময় আর কোন আবেগই ধরে রাখতে পারল না, রাকিব কাঁদছে না, কিন্তু তার গাল বেয়ে বয়ে যাচ্ছে সূক্ষ্ম ঝর্ণা ধারা। রাকিবের আবেগ গুলো যেন মোবাইলের যান্ত্রিক কল্কব্জা পেরিয়ে তার বাবার কাছে যেতে পারল না। আগের মতই ভাবলেশ কন্ঠে ওপাশ থেকে ভেসে আসল, “তোমার মা অসুস্থতায় মারা গেছে। তোমাকে জানাতে নিষেধ করেছিল তোমার খালা, তাই তোমাকে জানাইনি। এখন যখন তুমি জেনেছ, ডিল উইথ ইট।” ওই পাশের কল কাটার ক্যাট শব্দটাও যেন রাকিবের বুকে হাতুড়ীর বাড়ি মারল।
অতি কষ্টে, ভেজা চোখে তার গ্রুপের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। গল্পে মশগুল হাস্যোজ্জ্বল সবাইকে দেখল হাসানের কাঁধের উপরে দিয়ে। ধীর পদক্ষেপে হেটে গেল হাসানের বাড়িয়ে ধরা দুই হাতের দিকে, কোন রকম নিজের ভর হাসানের উপরে দিয়ে পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যেতে চাইল রাকিব। সুনামি যেন রাকিবের ভিতরে আঘাত করেছে। সুনামির পানি চোখের বাঁধ ভেঙ্গে গড়িয়ে পড়তে থাকল। হাসানের কোলে মাথা রেখে সেই পানি গাল বেয়ে অবারিত বারিধারার মত পড়তেই থাকল।
৬
আজ হাসানদের বাড়িতে রাকিব, অনিক, সুজানা, মেঘা, ইশতিয়াক, লুবনা আর আজমলের শেষ দিন। চার দিনের ট্যুর টা অসাধারণ গেছে ওদের। হাসানরা গরীব কিন্তু সাধ্যের মধ্যে যত টুকু করা সম্ভব তার থেকেও বেশী করেছে হাসানরা। হাসান এর মা যে অসুস্থ তা হাসান কখনও ওদের কে বলেনি বা বুঝতে দেয়নি। তা ছাড়া গ্রামের মজা ওরা কখনও পায়নি। সব মিলিয়ে সবাই খুব খুশি। সবাই যখন বাস টার্মিনালের ফিরতি গাড়ীতে উঠতে ব্যস্ত, তখন হাসান রাকিবকে ডাক দিয়ে নিয়ে গেল এক অন্ধকার ঘরে। “মা – জেগে আছ?” ঘরে ঢুকেই হাসান প্রশ্ন ছুড়ে দিল অন্ধকার দেওয়ালে। “হুম কিছু বলবি হাসু?” খুব ক্ষীণ এক কন্ঠ ভেসে আসলে দেওয়াল থেকে। ঘরের ভেতরে ঢুকে রাকিব দেখল এক মহিলা শুয়ে আছে এক খাটিয়ায়, ওর দিকে অন্তর্ণিহিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে। হাসান রাকিব কে নিয়ে বসিয়ে দিল তার মার পাশে “মা, এই হচ্ছে রাকিব যার কথা তোমাকে বলেছিলাম”। রাকিবের গালে কেউ চর মারলেও এত অবাক হত না। রাকিব ঢুস করে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল “তোর মা?”। “হুম” – হাসানের সহজ স্বীকারোক্তি। “কি হয়েছে আন্টির?” প্রশ্নটা না করতে চাইলেও মনে হল গলাই কথা গুলা বলে দিল, “দুরারোগ্য ব্যাধি হয়েছিল, তখন টাকার অভাবে ঠিক মত চিকিৎসা করাতে পারিনি, ওই থেকে মা এর অবস্থা এই রকম।” – হাসানের দীর্ঘশ্বাস রাকিব স্পষ্ট শুনতে পেল। রাকিব কয়েক সেকেন্ড সময় নিল হজম করতে। ওর পেট এ কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে।হাসানের মা তার দূর্বল হাত বাড়িয়ে দিল রাকিবের মাথায়। “বাবা, তোমার সব কথা আমি হাসানের কাছে থেকে শুনেছি। দুঃখ করোনা। “ তুমি তো আমার ছেলের মতই।” কথা গুলা বলতে বলতে রাকিবের মাথায় রাখা হাতটা চুল গুলো স্পর্শ করে চলে এল। “তুমি আমারে মা বইলা ডাকতে পার”। এই কথাটা যেন রাকিবের হৃদয়ের এক শুন্যস্থানে আঘাত করল। যে হৃদয় অনুভুতি শুন্য হয়ে পড়ছিল আজ এই কথায় সেখানে জমা হচ্ছে কত কষ্ট। রাকিবের দম নিতে কষ্ট হচ্ছে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। তাই তাড়াহুড়ো করে হাসি মুখে বিদায় নিল হাসানের মায়ের কাছ থেকে।
রাকিব হাটছে আর তার দু গাল বেয়ে যাচ্ছে পানি, অনেক অভিমান নিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে অভিযোগ করল রাকিব – “আমার অনেক কিছু থেকেও কিছু নেই, আর হাসানের কিছু আছে যা সে ধরে রাখতে সব কিছু করছে – এমন কেন হল ? কেন ?”
সমাপ্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


