বিশ্বমিডিয়ায় এ বছর সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল আরব বসন্ত যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিস্ময়করভাবে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান। এ গণঅভ্যুত্থানের কারণে মিসর তিউনিসিয়িা ও লিবিয়ার স্বৈর শাসকদের বিদায় নিতে হয়েছে। ভূঃরাজনৈতিক এ সুনামি এখন আরব বিশ্বের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়েমেন ও সিরিয়া গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসকদের বিদায় নেয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর ঢেউ লেগেছে অন্য দেশগুলোতেও। গণবিপ্লবের পর তিউনিসিয়ায় ইতিমধ্যেই পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং মিসরে প্রথম দফা ভোটগ্রহণ হয়েছে। এ দু'টি দেশের নির্বাচনের ফলাফলে একটি নতুন ব্যাপক ভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। মরক্কোর বাদশাহ জনগণের দাবি দ্রুততার সাথে মেনে নিয়ে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছেন। এই তিনটি দেশের নির্বাচনী ফলাফল প্রায় একই ধরনের হয়েছে। এই তিনটি দেশেই ইসলামপন্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিরোধীদের তুলনায় সরকার গঠনে তারাই মূল ভূমিকায়। বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকরা এতদিন ‘ইসলামী দানব' বলে আখ্যায়িত করে যাদের আবদ্ধ করে রেখেছিল আরব বসন্তের ফলে তারা আজ মুক্ত। দশকের পর দশক স্বৈরাচার শাসিত বিভিন্ন আরব দেশে ইসলামী দলগুলোর উপর ব্যাপক দমনপীড়ন চালানো হয়েছে। নেতাদের হত্যা করা হয়েছে।
হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বছরের পর বছর কারাগারে আটক রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছে। ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থানের আশংকায় ভীত পশ্চিমা সরকারগুলো আরব বিশ্বের স্বৈরশাসকদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে গণতন্ত্র প্রবর্তন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টিতে দোদুল্যমানতায় ভুগেছে। ফলে বিশ্বের অন্যত্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার থাকলেও এসব স্বৈশাসকের সঙ্গে তারা বরং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এমন আত্মসন্তুষ্টির সঙ্গে ভবিষ্যবাণী করা যায় ভোটাররা তিউনিসিয়া, মিসর ও মরক্কোতে ইসলাপন্থীদের নির্বাচিত করেছে। নির্যাতিত ইসলামপন্থীরা কখনো ক্ষমতায় আসীন হয়নি। ফলে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতাও কখনো অর্জন করতে পারেনি। এখন ভোটাররা তাদের উপরই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করেছে। অন্যদিকে বামপন্থী উদারপন্থী ও জাতীয়তাবাদীরা উৎখাতকৃত স্বৈরশাসকদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধার কারণে নির্বাচনে ভাল করতে পারেনি।
এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য নতুন যুগের যাত্রা শুরু হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চরমপন্থা তেকে অনেক দূরে। তাদের অবস্থান অনেক উদার। তিউনিসিয়ায় আন নাহদা এবং মরক্কোয় জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (জেডিপি) উভয় দলই বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কোয়ালিশন গঠন করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার শপথ নিয়েছে। এর মধ্যে বাম ও উদারপন্থীরাও রয়েছে তবে সবাই দেশকে বেসামরিক বৈশিষ্ট্যময় চরিত্র সংরক্ষণ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ। উভয় দেশেই কট্টরপন্থী দল ও গ্রুপগুলো সরাসরি শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়ার দাবি জানান। তাদের আরো দাবি মরক্কো ও তিউনিসিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ ও আধা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের অবসান ঘটাতে হবে। উভয় দেশকে নিজস্ব পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যরেখে বাস্তবভিত্তিক ফর্মূলা বের করার চেষ্টা করতে হবে। মিসরে প্রথম দফা নির্বাচনের ফলাফলে পর্যবেক্ষকরা হতবাক হয়েছেন।
উদারপন্থী ইসলামী দল মুসলিম ব্রাদারহুড ভোটের ফলাফলে সবার চাইতে এগিয়ে আছে। কট্টরপন্থী সালাফিরা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। উদার ও বামপন্থীদের জোট ইজিপশিয়ান কোয়ালিশন রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। সালাফিরা এর আগে কখনো নির্বাচন করেনি। তাদের দাবি মিসরে শরীয়াহ আইন চালু করতে হবে এবং এটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। অবশ্য অন্য ইসলামী দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম নয়। পার্লামেন্ট নিম্নকক্ষের তিনদফা নির্বাচন এখনো বাকি। উচ্চ কক্ষের নির্বাচন হবে আরো পরে। তবে ইতিমধ্যেই এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, হোসনি মোবারকের পতনের পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদেরই প্রাধান্য থাকবে এবং তারাই পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করবে।
সালাফিদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড ও তাদের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম ও জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) দ্রুত অনেক দূরে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। ক্ষমতাসীন সামরিক কাউন্সিল ও অন্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে শান্ত রাখার উদ্দেশ্যেই তারা এটি করেছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখা এবং একে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তারা মরক্কো ও তিউনিসিয়ার দৃষ্টান্ত আপাতত অনুসরণ করতে পারে।
২০১২ সালে আমরা তিনটি দেশে সমান্তরালে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে দেখবো সেখানে ইসলামপন্থী ও তাদের শরীকরা একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করবে। কয়েক বছরের প্রয়োজন নেই কয়েক মাসেই ইসলামী দলগুলোর কাজকর্মের ব্যাপাররে সুস্পষ্ট বিচার বিবেচনা ও অবদানের বিষয় মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে জর্দান ইয়েমেন, লিবিয়া, এমনকি সিরিয়ায়, একই ধরনের বিষয় বাস্তবায়নের ব্যাপারে অনুসরণ হওয়া যাবে। আরব বসন্তের আগে ও পরে আরব দেশগুলোতে ইসলামপন্থীরাই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিল এবং আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা তুরস্কের বিদ্যমান মডেল অনুসরণ করতে পারে কিংবা নিজেরাও একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দারিদ্র্য বেকারত্ব, দুর্নীতি ও অন্যান্য অনুন্নত দেশের শত সম্যার সমাধানে লড়াই করতে হবে এটা খুব সহজ কাজ নয়। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় দেখার বিষয় হচ্ছে ইসলামপন্থীরা সদুদ্দেশ্যে ও আন্তরিকতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারাকে গ্রহণ করে নাকি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এটাকে ব্যবহার করে। সবার কাছে তাদের আজ অবশ্যই প্রমাণ দিতে হবে যে, বহুদলীয় গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর, মানবাধিকার ও জবাবদিহির ব্যাপাররে তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



