| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ অাবদুল্লাহ রশিদী
সৈয়দ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ রশিদী
অনুবাদ: মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ রশিদী
নবী-রাসূল আগমনের ধারা সূচিত হয় হযরত আদম (আ.) হতে। আর তা পরিসমাপ্তি ঘটে সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ট নবী ও রাসুল নবীজি হযরত মুহাম্মদ (দ.) এ ধরায় আগমনের মাধ্যমে। রাসুল (দ.) পর দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন অলংকৃত করেছেন হযরত সৈয়্যদেনা আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। এ মার্যদার কারণ হিসাবে হাদীস ও ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনায় স্পষ্টই হয়, নবীজি নুরানী সোহবত তথা সংস্পর্শ ও রাসুল প্রেমের মহা সমূদ্র থাকার ফলেই। যা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত কারো দ্বারা এ মার্যাদা হাসিল করা সম্ভব নহে। বর্তমান চলিত জমাদিউস সানি মাসটি উনার ইন্তেকালের মাস। এ মাসের ২২, মতান্তরে ২৩ তারিখে এ মহান সাহাবী ওফাত বরণ করেন। এ উপলক্ষ্য সামনে নিয়ে আমার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্ঠা । হাদীস শরীফে আছে, ‘সৎকর্মশীলদের আলোচনা স্থলে মহান আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। অন্যত্র আছে, নেককারদের আলোচনা গুনা ক্ষমার মাধ্যম। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) অনেক জিবনী গ্রন্থ আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। তন্মধ্যে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দীস আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রাহ.) এর আরবী ভাষায় রচিত “তারিখুল খুলাফা” গ্রন্থখানি আমার হৃদয়ে বেশ নাড়া দেয়। বিশুদ্ধ বর্ণনা ও হাদীসের গুরুত্বপূর্ণ উদৃতি থাকায় কিতাবখানি সহজেই সর্বমহলে প্রশংশিত।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবি কুহাফা উপাধী ছিল আতিক। আতিক শব্দের অর্থ মুক্ত যেহেতু তিনি দোযখের আগুন হতে মুক্ত ছিলেন। অন্যথায় উনার চেহারা সৌন্দর্য্য বা চারিত্রক আদর্শের কারণেই আতিক নামকরণ। হযরত মোসআব বিন যোবায়েরসহ অন্যন্য বর্ণনা মতে এবং সকলের ঐকমত্যে সিদ্দীক নামকরণের কারণ হল, সর্বক্ষেত্রে সবার আগেই তিনি নবীজিকে বিশ্বাস করতেন। যেসব কারণে তিনি অতুলনীয় তাহল, পবিত্র মেরাজ রজনীর ঘটনা, নবীজির সাথে হিজরত, রাসুলের ভালবাসায় পরিবারবর্গ দুনিয়া ত্যাগ, বদরযুদ্ধসহ প্রায় প্রত্যেকটি সংকটময় সময়ে রাসুল (দ.) এর সাথে ছায়ার মত ছিলেন। নবিজী বললেন,একজন আল্লাহর বান্দাকে আল্লাহ পাক অনুমতি দিলেন দুনিয়া ও আখিরাত যেকোন একটি পছন্দ করার। তখন ঐ বান্দাহ আখিরাতই বেছে নেন। তিনি সাথে সাথে বললেন, আখিরাত পছন্দকারী আমার নবীজি ব্যতিত আর কেহ নহেন। এ কথায় স্পষ্টতই বুঝা যায় অচিরেই আমাদের থেকে বিদায় নেবেন। নবীজির সাথে সব রকমের সম্পর্ক বিশেষত: পছন্দের কন্যা হযরত আয়শা সিদ্দীকা (রা.) কে নবিজীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করায়ে আত্মীয়তা সম্পর্কও পাকাপোক্ত করেন। রাসুল (দ.) দুনিয়া হতে পর্দা করার ঘটনায় ইসলামের ইতিহাসের বিপর্যয় তিনি স্বহস্তে মোকাবিলা করেন এবং সাহাবীদের শান্তনা দেন। সকলকে নিজের হাতে বাইয়াত করায়ে এ ঘোর অমানিসার ঘনঘটা দূর করেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) সিদ্দীক উপাধী গ্রহণের বর্ণনা:
হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, পবিত্র মিরাজ শরীফ হতে নবিজী (দ.) ফেরার পর একদন মুশরিক হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) নিকট এসে বললেন, আপনার বন্ধু সম্পর্কে আপনি কি মন্তব্য করবেন? তিনি ধারণা করেন একরাতে বায়তুল মোকাদ্দিস ভ্রমণ করেছেন। তখন তিনি বলেন, নবীজি কি এরূপ বলেছেন? তারা বলল, হ্যা । যদি বলে থাকেন নিশ্চয়ই সত্যই বলেছেন। বায়তুল মোকাদ্দিস হতে দূরে কোথাকার বর্ণনা দিলে বা আসমানের সফরের বর্ণনাও আমি বিশ্বাস করি। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ওনাকে সিদ্দীক উপাধী দেয়া হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর গোলাম হযরত আবি ওয়াহাব (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, পবিত্র মিরাজ হতে রাসুল (দ.) তশরীফ নিয়ে পাহাড়ে আরোহন করেন। তথায় হযরত জিব্রাঈল (আ.)কে নবিজী (দ.) বললেন, ওহে জিব্রাঈল আমার জাতির লোকেরা তথা মুশরিকরাতো আমার এ ঘটনা বিশ্বাস করছেনা। হযরত জিব্রাঈল (আ.) বলেন,আপনাকে আবু বকর সত্যায়ন করেছে সুতরাং তিনি হলেন সিদ্দীক। হযরত নাজ্জাল ইবনে সুবরা (রা.) বলেন, আ মরা হযরত আলী (রা.) কে বললাম, ওহে আমিরুল মোমিনীন, আমাদেরকে হযরত আবু বকর (রা.) সম্পর্কে বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন “সিদ্দীক” নামকরণ করেছেন হযরত জিব্রাঈল (আ.) এবং নবিজী (দ.) এর মাধ্যমে। যাকে স্বয়ং নবিজী নামাজের ইমামতির জন্য প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। আমরা ওনার দীন-দুনিয়া উভয় কাজে সন্তুষ্ট তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। অন্য হাদীসে আছে, একদা নবিজী উহুদ পর্বতে আরোহন করেন। ইত্যবসরে পাহাড় কাপতে লাগল। তখন নবিজী বলেন, হে ওহুদ পাহাড় তুমি কি জাননা? তোমার উপর আরোহন করেছে একজন নবী,একজন সিদ্দীক ও দুজন শহীদ। সাথে সাথে পাহাড় কম্পন বন্ধ হয়ে যায়। এখানে সিদ্দীক বলতে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) আর দুজন শহীদ হল, হযরত উমর (রা.) ও হযরত আলী (রা.) উভয়ে শাহাদাত বরণ করেন। এখানে প্রনিধানযোগ্য নবী যদি গায়েব বা অদৃশ্যের বর্ণনা নাজানেন তাহলে আগ বাড়িয়ে উভয় শহীদের ভবিষ্যত বাণী করেছেন কিভাবে? এতে বুঝা যায় নবিজী অবশ্যই গায়েব জানেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)’র জন্ম ও জীবনযাপন:
হযরত আবু বকর (রা.) রাসুলে খোদা (দ.) এর দু’বছর একমাস পর জন্মগ্রহণ করেন। যখন তিনি ইন্তেকাল করেন তখন ৬৩ বছর বয়স ছিল। হযরত ইবনে কাসির বলেন, খলিফা বিন খিয়াত হযরত ইয়াজিদ বিন আসেম (রা.) হতে বর্ণনা করেন, নবী করিম (দ.) হযরত আবু বকর (রা.) কে প্রশ্ন করেন, হে আবু বকর আপনি বয়সে আমা হতে বড় না আমি। হযরত আবু বকর (রা.) বললেন, আপনি বড় আর আমি আপনি হতে ছোট। তিনি পবিত্র মক্কাতেই বসবাস করতেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজন ছাড়া মক্কা নগরি হতে বের হতেন না। এই সময়ে তিনি অনেক সহায় সম্পতির মালিক ছিলেন। পরিপূর্ণ মানবিক গুণাবলীর অধিকারী,দয়ালু, ও মক্বা নগরীর মর্যাদাবান ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম ছিলেন। হযরত ইমাম নববী (রাহ.) বলেন, জাহেলী যুগে তিনি কুরাইশদের নেতা ছিলেন। নীতি নির্ধারণী বিষয়ে পরামর্শক ছিলেন। সকলেই এই যুগে সমানতালে ভালবাসতেন। যখন ইসলামের দাওয়াত আসল উক্ত গুনের সাথে আরো পূর্ণতা লাভ করত: ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করেন। হযরত মারূফ বিন খরবুজ (রা.) বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই হযরত আবু বকর (রা.) সমানভাবে জাহেলী যুগে ও ইসলাম গ্রহণের পরও দশজন জ্ঞানী-গুনী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন। হযরত ইবনে আসাকির বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি হযরত আয়শা (রা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, হযরত আবু বকর (রা.) জাহেলী যুগ বা ইসলাম গ্রহণ সত্বেও কোন কবিতা আবৃত্তি করেননি। উক্ত সময়ে তিনি এবং হযরত উসমান (রা.) মদ্যপান কখনো করেননি। হযরত আবিল আলীয়া আর রিয়াহি (রা.) বলেন, কেউ হযরত আবু বকর (রা.) কে সাহাবীদের সমাবেশে বললেন,আপনি কি জাহেলি যুগে কখনো শরাব পান করেছেন? তিনি বললেন, আমি আল্লাহর নিকট তা হতে আশ্রয় চাই।বলা হল, কেন নয়? উত্তরে বললেন, আমি আমার সন্মান ও মনুষ্যত্বকে সদা হেফাজত করেছি। যদি আমি মদ্যপান করতাম তাহলে আমি আমার সন্মান ও মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করতাম। এ কথাটি স্বয়ং রাসুল (দ.) পর্যন্ত পৌছলে নবীজি দু’বার বললেন, আবু বকর ঠিকই বলেছেন।
(চলবে)

©somewhere in net ltd.