নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিশ্বরাজনীতি চলে স্বার্থের হিসেবে, আমরা চলি অন্ধ আবেগে

০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২২


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস হলো বিশ্লেষণ। চাল, ডাল কিংবা তেলের দাম নিয়ে যতই হাহাকার থাকুক, ভূরাজনীতি নিয়ে জ্ঞানের কোনো অভাব নেই। চায়ের দোকানে বসে যিনি নিজের বাসার গ্যাস কখন আসবে সেটার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না, তিনিই অনায়াসে বলে দিতে পারেন আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করেই দেশটা শেষ হয়ে গেছে। কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করার এই অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে সত্যিই গবেষণা হওয়া উচিত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এসব বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত দোষ গিয়ে পড়ল একটাই জায়গায়, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি।

বাসায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে, রান্না করতে দেরি হচ্ছে, কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসবের পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট কিংবা যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই। কারণ বাস্তবতা যত জটিল, ষড়যন্ত্রের গল্প তত সহজ। তাই সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো, সরকার আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করেছে বলেই গ্যাস নেই।

বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন কথা বলে। বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই প্রয়োজনের কারণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনছে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ বিভিন্ন সময়ে ব্যাহত হয়েছে, যুদ্ধের কারণে পুরো জ্বালানি বাজার অস্থির। এসব সমস্যা কোনো এক দেশের সিদ্ধান্তে তৈরি হয়নি, আবার একদিনে শেষও হবে না। কিন্তু বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে সময় লাগে, আর ফেসবুকের রায় দিতে লাগে কয়েক মিনিট। তাই ক্যালকুলেটর হাতে আগামী পনেরো বছরে আমেরিকা থেকে কেনা গ্যাসের হিসাব কষে ঘোষণা দেওয়া হয়, দেশ শেষ।

এর মধ্যেই দেশের একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেটি মেরামতের জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ লাগবে, বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। এসব খবর খুব বেশি আলোচনায় আসে না। কারণ এগুলো দিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা যায় না। বরং বলা সহজ যে সরকার ইচ্ছা করেই গ্যাস দিচ্ছে না, কারণ তারা নাকি আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করেছে।

একই গল্পের নতুন সংস্করণ দেখা গেল শুল্কনীতি নিয়ে। প্রথমে বলা হলো, আমেরিকার নতুন শুল্কে বাংলাদেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। পরে দেখা গেল আগের ঘোষণার তুলনায় শুল্ক কমেছে। কিন্তু তাতেও আলোচনা থামেনি। এবার প্রশ্ন উঠল, সব শুল্ক মওকুফ করা হলো না কেন। যেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো সুপারশপের মতো , যেখানে কেনাকাটা করতে গেলেই বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি কেন নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, সেই প্রশ্নের চেয়ে সরকারকে দোষ দেওয়া অনেক সহজ।

আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশকে সমমর্যাদা দিতে হবে। কথাটা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু মুখে কেবল সমমর্যাদা দাবি করলেই হয় না , অর্জন করে নিতে হয়। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, উচ্চমূল্যের শিল্প, দক্ষ জনশক্তি এবং শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া কেউ কাউকে সমান মর্যাদা দেয় না। আমরা এখনো মূলত সস্তা শ্রমের ভিত্তিতে পোশাক রপ্তানি করি। ক্রেতারা আমাদের ব্র্যান্ডের জন্য নয়, কম খরচের জন্য আসে। তারপরও আমরা আশা করি, সবাই আমাদের জন্য আলাদা নিয়ম তৈরি করবে।

এই মানসিকতা অবশ্য নতুন নয়। আগে ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেই বলা হতো দেশ বিক্রি হয়ে গেছে। করিডোর মানেই সার্বভৌমত্ব শেষ, সীমান্ত চুক্তি মানেই দেশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু অভিযোগের ভাষা বদলায়নি। শুধু ভারতের জায়গায় এখন আমেরিকার নাম বসেছে। মনে হয়, আমাদের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী স্ক্রিপ্ট আছে। সরকার পাল্টায়, বিদেশি শক্তির নাম পাল্টায়, কিন্তু 'দেশ বিক্রি'র গল্প একই থাকে।

আমাদের আন্তর্জাতিক রাজনীতি দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বেশ অভিনব। ভারত ভালো নয়, আমেরিকা ভালো নয়, পশ্চিমা বিশ্বও ভালো নয়। কিন্তু কে ভালো, তার উত্তর প্রতিদিন বদলে যায়। যে দেশ আমেরিকার বিরোধিতা করে, অনেকের চোখে সেই দেশই ন্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই দেশের শাসনব্যবস্থা কেমন, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে কি না, সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী, সেসব প্রশ্ন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধ করছে, চীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, ইরানে ভিন্নমতের ওপর কঠোরতা আছে। এসব বিষয় নিয়ে খুব বেশি অস্বস্তি দেখা যায় না। কারণ তারা কোনো না কোনোভাবে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ নিজের দেশে একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেলে আমরা সেটিকে স্বৈরতন্ত্র বলি। বিদেশে একই ঘটনা কৌশল, দেশে সেটাই ফ্যাসিবাদ। চরিত্র বদলালেই সংজ্ঞাও বদলে যায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট গ্যাসের নয়, বিদ্যুতেরও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো বাস্তবতার বদলে নিজের পছন্দের গল্পকে বিশ্বাস করার প্রবণতা। আমরা এমন এক পৃথিবী কল্পনা করি, যেখানে বড় শক্তিগুলো শুধু আমাদের স্বার্থ দেখবে, আমাদের জন্য আলাদা নিয়ম বানাবে, আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি চলবে আমাদের আবেগের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী ভিন্ন। সেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। শুধু আমরা এখনো আশা করি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সেই নিয়মটা হয়তো একদিন বদলে যাবে।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:১৮

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সবচেয়ে বড় সংকট হলো বাস্তবতার বদলে নিজের পছন্দের গল্পকে বিশ্বাস করার প্রবণতা। আমরা এমন এক পৃথিবী কল্পনা করি, যেখানে বড় শক্তিগুলো শুধু আমাদের স্বার্থ দেখবে, আমাদের জন্য আলাদা নিয়ম বানাবে,
.................................................................................................................................
পাগলা ট্রাম্পকে কখনোই বিশ্বাস করা যায়না ।
বাইডেন ছিল শয়তানের গুরু,
আমাদের বাংলাদেশে আজ চারিদিকে হাহাকার শুধু ।
............................................................................................
আমাদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে, সেজন্য সততার সহিত শ্রম আর কৃষি
কাজে ফেরত যেতে হবে, ফাইটার বিমান কিনে , পাকীদের কথা শুনে তাদের
মতো দেউলিয়া হওয়া যাবেনা ।

০২ রা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পাকিদের হাতে হাত মিলিয়ে চলা শুরু করেছি। গন্তব্য অজানা ।

২| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৫:০২

ডঃ এম এ আলী বলেছেন:







ভাল একটি বিষয তুলে ধরেছেন । আসলে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন হতে বলা যায় দেশে সুস্থ বিনোদন, সাংস্কৃতিক চর্চা
ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সীমাবদ্ধতার কারণে রাজনীতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আলোচনা ও বিনোদনের প্রধান
বিষয় হয়ে উঠেছে। এই অতিরিক্ত রাজনৈতিক আবেগের কারণে অনেক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির
জটিল বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে মানুষ সরলীকৃত ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে
আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূলত রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কূটনীতি ও কৌশলগত বাস্তবতার ওপর
পরিচালিত হয়। ফলে গ্যাস, জ্বালানি বা বাণিজ্যসংক্রান্ত যেকোনো সংকটের পেছনে একাধিক দেশীয় ও বৈশ্বিক
কারণ থাকতে পারে। এসব বিষয়ে তথ্য, প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা বিবেচনা না করে কেবল রাজনৈতিক অবস্থান বা
আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জনমতকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

তাই গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক সচেতনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেই সচেতনতা যেন যুক্তি, তথ্য ও
সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিজ্ঞান ও গবেষণার
মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটলে সমাজে মতবিনিময়ের পরিধি বাড়বে এবং রাজনীতিকে আবেগের নয়,
বাস্তবতা ও তথ্যের আলোকে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এতে নাগরিক অংশগ্রহণ যেমন আরও পরিশিলিত
হবে, তেমনি আবেগের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল জনমত গড়ে তোলা
সহজ হবে।

০২ রা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২২

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: বাংলাদেশের মানুষ আবেগ দিয়ে বিচার করে সবকিছু ..

৩| ০২ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৪

বিষাদ সময় বলেছেন: বাংলাদেশ হলো এখন একটা আন্তার্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন। আমেরিকার সাথে করা চুক্তি আবেগ নয়, খুব সাধারণ যুক্তি দিয়ে বিচার করলেও বোঝা যাবে যে এ চুক্তিতে আমেরিকার জটিল স্বার্থের হিসাব নিকাশ জড়িত রয়েছে। তার জন্য মাত্র কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
১) একটা নির্বাচিত সরাকার ক্ষমতা গ্রহনের কয়েকদিন আগে উইনুস সাহেব এই এন,ডি,এ টি তাড়াহুড়ো করে স্বাক্ষর করেছেন। আর যে বিষয় নিয়ে অতি তাড়হুড়ো করা হবে তাতেই ??!!! এই সব যতি চিহ্ন থাকবে।
২) চুক্তি স্বাক্ষর এর পর এ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কেউ এ নিয়ে কোন শব্দ উচ্চারণ করছেন না।
৩) নির্বাচিত সরকার আসার পরই আমেরিকার বিশেষ দূত এসে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে রিমাইন্ডার দিয়ে গেছে। চুক্তিতে যদি আমেরিকার বিশেষ স্বার্থ জড়িত না থাকতো তবে নতুন সরাকার আসার সাথে সাথে সাত সমুদ্র, তের নদী পার হয়ে এসে এ ব্যাপারে রিমাইন্ডার দেয়ার তাদের কোন ঠেকা ছিল না। চুক্তিতে আমাদের স্বার্থ থাকলে আমরাই তাদের পিছনে দৌড়ে বেড়াতাম।

আমারা সাধারণ মানুষ অনেক কিছু সাধারণ ভাবেই বুঝে নিতে পারি, জটিল মারপ্যাঁচে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

০২ রা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৩

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: বাংলাদেশে যাদের কাছ থেকে বিনিয়োগ পায় কিংবা ডলার কামায় তাদের মন জুগিয়ে চলতে হবে ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.