| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশে "বৃদ্ধাশ্রম" শব্দটি এখনো অনেকের কাছে একটি নেতিবাচক ধারণার প্রতীক। মনে করা হয়, বৃদ্ধাশ্রম মানেই সন্তানদের অবহেলায় পরিত্যক্ত মা-বাবার শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সরল? সমাজ, অর্থনীতি এবং পারিবারিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তনের এই সময়ে প্রবীণদের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমকে আবেগের চশমা দিয়ে নয়, সামাজিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।
ইসলামের ইতিহাসে ফিরে তাকালেও দেখা যায়, প্রবীণদের কল্যাণ শুধুমাত্র পরিবারের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে, বিশেষ করে খলিফা হযরত ওমর (রা.) বিধবা, অসহায় ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ইসলাম সন্তানদের উপর পিতা-মাতার সম্মান ও ভরণপোষণের দায়িত্ব আরোপ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও সামাজিক দায়িত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছে।
পশ্চিমা বিশ্বেও প্রবীণ কল্যাণের ধারণা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। উনিশ শতকের শেষদিকে জার্মানির রাষ্ট্রনায়ক বিসমার্ক প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন ব্যবস্থা চালু করেন। পরবর্তী কয়েক দশকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো বুঝতে পারে যে কেবল পারিবারিক দায়িত্বের উপর নির্ভর করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র প্রবীণদের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বাংলাদেশেও বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের কারণে সন্তানরা গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। একজন প্রবাসী বা নগরজীবী সন্তান হয়তো তার আয়ের বড় অংশই গ্রামের বাড়িতে পাঠায়, কিন্তু দূরত্বের কারণে বৃদ্ধ মা-বাবার নিয়মিত চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক যত্ন নিশ্চিত করতে পারে না। অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকলেও বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা থেকে যায়।
গ্রামের বাস্তব চিত্র আরও কঠিন। সাহায্যপ্রার্থীদের একটি বড় অংশই বয়োবৃদ্ধ, যাদের অধিকাংশ নারী। স্বামীহারা, অসুস্থ কিংবা কর্মক্ষমতা হারানো এসব মানুষ অনেক সময় নীরব অবহেলার মধ্যে জীবন কাটান। অথচ একটি মানসম্মত বৃদ্ধাশ্রম তাঁদের জন্য হতে পারে নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসাসেবা এবং সামাজিক মর্যাদার কেন্দ্র।
সম্প্রতি একটি বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা এই উপলব্ধিকে আরও শক্তিশালী করেছে। সেখানে অনেক প্রবীণ নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের জীবনে কষ্ট ও অভিমান থাকলেও অধিকাংশই বর্তমান জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট নন। নির্দিষ্ট সময়ে খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা, ধর্মীয় অনুশীলন এবং মানসিক প্রশান্তি—সব মিলিয়ে তাঁরা একটি সম্মানজনক জীবনযাপন করছেন।
বিশেষ করে একাকীত্ব দূর করার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকালে, দুপুরে ও রাতে একসঙ্গে খাওয়া, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ একজন প্রবীণের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অনেকের জন্য এটি কেবল একটি আশ্রয়কেন্দ্র নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক পরিবার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একজন প্রবীণের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় অনেক সময় বিপর্যয় ডেকে আনে। একটি বড় অসুস্থতা বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচ দুই প্রজন্মের সঞ্চয় মুহূর্তেই শেষ করে দিতে পারে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শুধু নৈতিকতার ভাষণ দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন এবং প্রবীণবান্ধব আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যকর সমাধান খুঁজতে হবে।
অবশ্যই, সন্তানদের দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ সমাজের শক্ত ভিত্তি। মা-বাবার পাশে থাকা, তাঁদের সম্মান করা এবং যত্ন নেওয়া একটি নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। কিন্তু সব পরিবার একই রকম নয়, সব পরিস্থিতিও এক নয়। তাই যারা পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারছেন না বা যাদের জন্য বিশেষায়িত যত্নের প্রয়োজন, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।
আজকের বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে লজ্জা বা ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে নয়, বরং একটি আধুনিক সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে প্রবীণদের জন্য আবাসন, স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সামাজিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে বিভিন্ন আয়ের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নতিতে নয়, বরং সে তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল নাগরিকদের কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা দিতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। আর সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সম্মানজনক, নিরাপদ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি।
০৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৪৭
জুয়েল তাজিম বলেছেন: মানুষের আয়ু বাড়ছে, কিন্তু সম্পর্কের আয়ু কমে যাচ্ছে?
২|
০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ৮:১৩
এইচ এন নার্গিস বলেছেন: ভালো বলেছেন । আমাদের চিন্তার ইভুলেসান দরকার । "বৃদ্ধ বয়সে ছেলের বাড়ি থাকতে হবে" বা "ছেলের মা বাবার দায়িত্ব নিবে " এ চিন্তা থেকে বের হয়ে কি ভাবে বৃদ্ধ বৃদ্ধা "সন্মানের সাথে" "নিরাপত্তার সাথে" এবং "স্বাধীন ভাবে" থাকতে পারে তার ব্যাবস্থা যেমন সরকার করে দিতে পারে তা এখন ভাবা সময়ের দাবী । এবং তার জন্য নীতি নির্ধারণ করা যেমন চাকুরী বা উপার্জন থেকে ট্যাক্স হিসেবে টাকা কেটে নিয়ে পেনসন ,ফ্রী চিকিৎসা আর প্রচুর কেয়ার হোম গোড়ে তুলতে পারে তা ভাবা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ । কেন থাকবে সন্তানের সাথে ? এ ভাবনা থেকে বের হওয়া এবং তার ব্যাবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব । যা করে থাকে উন্নত দেশ গুলো ।
০৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৩৩
জুয়েল তাজিম বলেছেন: বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত পেনশন ব্যবস্থা, নেই রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা, নেই আধুনিক প্রবীণ নিবাসের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, নেই একাকী প্রবীণদের জন্য কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা। ফলে হাজারো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নিজেদের ঘরে থেকেও নিঃসঙ্গতার কারাগারে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মৃত্যুর চেয়েও বড় হয়ে উঠছে মৃত্যুর পরের নিঃসঙ্গতা। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর দিনের পর দিন কেউ খবর পায় না—এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা।
৩|
০৪ ঠা জুন, ২০২৬ রাত ১০:২৯
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবা। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের
জন্য একজন প্রবীণের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় অনেক সময় বিপর্যয় ডেকে আনে।
................................................................................................................
বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে একটি মানদন্ডে স্হাপন করা উচিৎ ।
সবার জন্য বৃদ্ধাশ্রম হতে পারে এমনটা ঠিক নয় । তা হবে
উভয়ের পরিস্হিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া ।
সরকার যে কাজটি করতে চাচ্ছে, তা সমর্থন করি ।
সন্তান অবশ্যই পিতা মাতার ভরণ পোষন দিবে , না হলে সরকার তার
উক্ত সন্তানের বেতন বা ব্যবসা থেকে কেটে নিয়ে সমন্নয় করবে ।
৪|
০৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৩১
জুয়েল তাজিম বলেছেন: ঢাকার মিরপুর ও পল্লবীতে দুই নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আমাদের সমাজের এক গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। একসময় পরিবার ও প্রতিবেশীরা প্রবীণদের খোঁজখবর রাখলেও নগরজীবনের ব্যস্ততা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে আজ অনেক মানুষ নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। শুধু সন্তানদের দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, কারণ কর্মসংস্থান ও বাস্তবতার কারণে অনেকেই দূরে বসবাস করেন। তাই প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি। পেনশন, স্বাস্থ্য বীমা, কমিউনিটি কেয়ার এবং আধুনিক প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থা সময়ের দাবি। এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার প্রবীণ নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, সম্মানিত ও যত্নে আছেন তার ওপর।
©somewhere in net ltd.
১|
০৪ ঠা জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩
রাজীব নুর বলেছেন: আমার মা আমাদের উপর রাগ হলেই বলে, আমি বৃদ্ধাশ্রম চলে যাবো।