| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে একজন প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের হয়ে কথা বলেন না; তাঁর কণ্ঠে কথা বলে একটি রাষ্ট্র, তার জনগণ, অভিজ্ঞতা, সংকট ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। তাই একটি ভাষণের গুরুত্ব শুধু কতগুলো বিষয় সেখানে বলা হলো, কত দীর্ঘ ছিল কিংবা কতটা কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা হলো—তা দিয়ে মাপা যায় না। বড় প্রশ্ন হলো, বিশ্বের সামনে একটি দেশ তার নিজস্ব কণ্ঠ কতটা স্পষ্ট করে তুলতে পারল।
২০২৬ সালের ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের বক্তব্যটি এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ দিয়ে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি; নেপালের দুর্যোগকে তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তা ও যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
শাহের বক্তব্যের একটি শক্তিশালী জায়গা ছিল তাঁর প্রশ্নের ধরন। তিনি দেখিয়েছেন, যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ও সরঞ্জাম বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার আন্তর্জাতিক সক্ষমতা রয়েছে, অথচ কৃষকের সার কিংবা মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে একই দক্ষতা দেখা যায় না। তাঁর ভাষায়, “We have built a world with flawless logistics for war and broken logistics for food.”
এই একটি বাক্যেই তিনি একটি ছোট পাহাড়ি দেশের অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রশ্নে পরিণত করেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একই অধিবেশনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল বাংলায়। সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, উন্নয়ন, নারী ও যুবসমাজ এবং বাংলাদেশের পুনর্গঠনের মতো বিষয় উঠে এসেছে। সংঘাতের সমাধানে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
অতএব দুই নেতার বক্তব্যে বিষয়গত মিল ছিল যথেষ্ট। দুজনই শান্তি, জলবায়ু, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা বলেছেন। পার্থক্যটি বরং বক্তব্যের কাঠামো ও উপস্থাপনের ধরনে।
শাহ নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগকে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রশ্নের প্রবেশদ্বার বানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল সরাসরি প্রশ্ন, দাবি এবং একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ। তিনি জলবায়ু সংকটকে শুধু নেপালের সমস্যা হিসেবে না দেখে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
বাংলাদেশের বক্তব্যে ছিল রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের একটি বিস্তৃত চিত্র। কোন কোন ইস্যু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কী এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী—এসব সেখানে উঠে এসেছে। বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একটি বিশ্বমঞ্চে বক্তব্যকে স্মরণীয় করে তোলার আরেকটি উপাদান হলো, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এমন একটি প্রশ্ন তৈরি করা, যা শুধু নিজের দেশের নয়—বিশ্বেরও প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সেই সুযোগ যথেষ্ট আছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ, বৈশ্বিক পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, অভিবাসন, শ্রম অধিকার ও উন্নয়ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এগুলোকে কেবল জাতীয় স্বার্থের তালিকা হিসেবে উপস্থাপন না করে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের বক্তব্য আরও স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
যেমন—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি বহন করছে, বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা কতটা? যে শ্রমিকরা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখছেন, তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও মজুরি নিশ্চিত করার দায় কার? একটি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশ যখন দীর্ঘদিন একটি বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়, তখন আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগির কাঠামো কতটা কার্যকর?
এ ধরনের প্রশ্ন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বব্যাপী আলোচনার অংশ করে তুলতে পারে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় হলের অনেক চেয়ার খালি ছিল—এমন দাবি ছড়িয়েছে। কিন্তু ভিডিওর একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত দেখে পুরো অধিবেশনে উপস্থিতি কিংবা শ্রোতাদের আগ্রহ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে লিখিত বক্তব্য দেখে শুধু ‘কার্ড দেখে পড়া’কে দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ সাধারণত প্রস্তুত করা হয়; আসল বিষয় হলো সেই লিখিত বক্তব্যে বক্তার নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, দেশের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান কতটা প্রাণ পায়।
বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত অবশ্যই আলাদা তাৎপর্য বহন করে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় বাংলায় কথা বলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও প্রকাশ। কিন্তু ভাষা একা একটি বক্তব্যকে শক্তিশালী করে না।
মূল প্রশ্ন আরও গভীরে—বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর কতটা স্পষ্ট?
একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি কেবল রাষ্ট্রীয় অবস্থানগুলো একের পর এক তুলে ধরেন, বক্তব্যে তথ্য থাকবে, দাবি থাকবে, কূটনৈতিক সৌজন্য থাকবে। কিন্তু সেই বক্তব্য শ্রোতার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন তৈরি করবে কি না, সেটি নির্ভর করে বক্তব্যের নিজস্ব বয়ান ও কেন্দ্রীয় বার্তার ওপর।
বালেন্দ্র শাহের বক্তব্যের ক্ষেত্রে নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ সেই কেন্দ্রীয় বয়ান তৈরি করেছে। একটি জাতীয় বিপর্যয় থেকে তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের প্রশ্নে পৌঁছেছেন।
বাংলাদেশেরও তেমন নিজস্ব গল্প আছে।
আমাদের গল্প শুধু উন্নয়নের নয়; জলবায়ুর সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প। শুধু অর্থনীতির নয়; বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত লাখো শ্রমজীবী মানুষের গল্প। শুধু কূটনীতির নয়; রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ বোঝা বহনের গল্প। শুধু শান্তির কথা বলার নয়; জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘ অবদানের গল্প।
এই অভিজ্ঞতাগুলোকে যদি একটি সুস্পষ্ট বৈশ্বিক প্রশ্নে রূপ দেওয়া যায়, তখন বাংলাদেশের বক্তব্য আর কেবল বাংলাদেশের বক্তব্য থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বব্যবস্থার প্রতি একটি প্রশ্ন।
তাই বিষয়টি কার্ড বনাম মুখস্থ, বাংলা বনাম ইংরেজি কিংবা তরুণ বনাম অভিজ্ঞতার সরল দ্বন্দ্ব নয়।
আসল বিষয় হলো কণ্ঠস্বর বনাম কাগজ।
কাগজ প্রয়োজন। প্রস্তুতিও প্রয়োজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে একটি দেশের পরিচয় তৈরি হয় তার বক্তব্যের নিজস্বতায়—সে কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে, নিজের স্বার্থকে বৃহত্তর মানবিক ও বৈশ্বিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সামনেও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুলতে পারে।
বাংলাদেশের সেই গল্পের অভাব নেই। প্রয়োজন শুধু সেই গল্পকে আরও সংক্ষিপ্ত, আরও স্পষ্ট এবং আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক প্রশ্নে পরিণত করার।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ অন্য কারও মতো কথা বলুক—এটি প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বাংলাদেশ যেন বাংলাদেশের মতো করেই কথা বলে।
©somewhere in net ltd.