নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পরের বাড়ির পিঠা খাইতে বড়ই মিঠা ।

কিরকুট

আমি মানুষ, আমি বাঙালি। আমার মানবিকতা, আমার সংস্কৃতির উপর আঘাত হানতে চাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাওয়া প্রাণী মাত্রই আমার কাছে পিশাচ। আমার দেশের উপর আঘাত হানতে চাওয়া প্রাণীদের পালনকারী, প্রশ্রয়দানকারী মাত্রই আমার কাছে পিশাচ, রাক্ষস। হোক সে যে কোনো সাম্প্রদায়িক কিংবা ঢেঁড়স চাষ পরামর্শক।

কিরকুট › বিস্তারিত পোস্টঃ

একজন কর্মী ও তার ন্যায্য পাওনা

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিনিয়োগ, মুনাফা, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্যোক্তার ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মীর শ্রম নিয়ে আমাদের আলোচনা খুবই কম বলতে গেলে একদম শূন্যের কোঠায়। অথচ একটি প্রতিষ্ঠান যত বড়ই হোক, তার ভবন, যন্ত্রপাতি, মূলধন কিংবা প্রযুক্তি এর কোনকিছুই একক ভাবে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না। এর পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের সময়, মেধা, ঘাম, দক্ষতা এবং জীবনের মূল্যবান বছর। একজন কর্মী প্রতিদিন তার জীবনের কয়েকটি ঘণ্টা নয়, তার জীবনের একটি অংশ প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেন। সেই শ্রমের বিনিময়ে তিনি পান একটি বেতন। কিন্তু আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানের আচরণ দেখে মনে হয়, কর্মীর শ্রম উদ্যক্তার কাছে আমানত না যেন নিত্য ব্যবহারযোগ্য একটি টুলস মাত্র।

ঠিক সমস্যার শুরুটা এখানেই। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা ব্যবস্থাপনার মধ্যে এমন একটি ধারণা কাজ করে যে, একজন কর্মী কাজ করছে মূলত তার প্রয়োজনের কারণে। তার কাছে কোন বিকল্প নেই, চাকরি হারানোর ভয় আছে, পরিবারের দায়িত্ব আছে। ফলে তাকে যত কম বেতনে, যত বেশি সময় এবং যত বেশি চাপ দিয়ে কাজ করানো যায়, প্রতিষ্ঠান তত বেশি লাভবান হবে। এটাও সত্য যে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সংকট আছে, দক্ষতার তুলনায় চাকরির সুযোগ সীমিত, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা আছে। ফলে অনেক কর্মী অন্যায্য পরিবেশ মেনে নিয়েও চাকরি ধরে রাখতে বাধ্য হন। কিন্তু কোনো মানুষের অসহায়ত্ব কখনোই তার অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণ হতে পারে না।

একজন কর্মী যদি জানেন যে প্রতিবাদ করলে চাকরি চলে যেতে পারে, তাহলে তার নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। তার নীরবতা অনেক সময় তার প্রয়োজনের কাছে পরাজয় বরন করে । আর এখানেই জন্ম নেয় সবচেয়ে ভয়ংকর সংস্কৃতির কর্মীর প্রাপ্য আমানত অর্থাৎ তার বেতন অনেক মালিক প্রতিষ্ঠানের লাভ হিসেবে দেখা। বেতন বিলম্বিত করা, ওভারটাইমের টাকা না দেওয়া, কমিশন বা ইনসেনটিভ আটকে রাখা, ছুটি না দেওয়া, বছরের পর বছর একই বেতনে কাজ করিয়ে নেয়া , বেতন বৃদ্ধি না করা, চাকরি ছাড়ার সময় পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করা এই সকল কর্মকান্ড কে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন কর্মীর অর্থ আটকে রেখে প্রতিষ্ঠান অনেক বড় মুনাফা করে ফেলেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই অর্থ কার? এটি প্রতিষ্ঠানের দয়া নয়। এটি কর্মীর অর্জিত অধিকার। একজন শ্রমিক বা কর্মচারী যখন একটি মাস কাজ শেষ করেন, তখন সেই মাসের বেতন প্রতিষ্ঠান তাকে দান করে না। তিনি তার শ্রম দিয়ে সেই অর্থ অর্জন করেন। তার সময়, দক্ষতা ও শ্রমের বিনিময়ে সেই অর্থ তার প্রাপ্য হয়ে যায়। তাই কর্মীর প্রাপ্য আটকে রেখে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানো প্রকৃয়া আসলে কোন মুনাফা নয় এটি অন্যের শ্রমের মূল্য কে নিজের সম্পদ হিসেবে গণনা করা যা অন্যায়।

আমাদের ব্যবসায়িক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো আমরা কর্মীকে প্রায়ই মানুষ হিসেবেই গন্য করি না, এদের ন্যয্য পাওনা কে খরচ হিসেবে দেখি। কর্মী যত কম বেতনে কাজ করবে, প্রতিষ্ঠানের খরচ তত কম। কর্মী যত বেশি সময় বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে, তত বেশি উৎপাদন। কর্মী যত বেশি ভয় পাবে, তত কম প্রশ্ন করবে।এই হিসাব হয়তো সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়াতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিষ্ঠানের ভিত দুর্বল করে দেয়।

কারণ একজন কর্মী যখন বুঝতে পারেন যে প্রতিষ্ঠান তার শ্রমকে সম্মান করে না, তখন তার কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। দায়িত্ববোধের জায়গায় কেবল চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সৃজনশীলতার জায়গা শূন্য থাকে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের জায়গায় জন্ম নেয় অবিশ্বাস ও বিরক্তি । অন্যদিকে যে প্রতিষ্ঠান কর্মীর শ্রমকে সম্মান করে, সেখানে কর্মী শুধু বেতনের জন্য কাজ করেন না। তিনি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে নিজের সাফল্য মনে করতে শুরু করেন।

বিশ্বের সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা শুধু মেশিন, প্রযুক্তি কিংবা মূলধনে বিনিয়োগ করে না তারা কর্মীর উপর বিনিয়োগ করে। কারণ তারা জানে একজন সন্তুষ্ট কর্মী কেবল একজন কর্মী নন তিনি প্রতিষ্ঠানের একজন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার।

আমাদেরও এই মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। কর্মীর ন্যায্য বেতন দেওয়া কোনো নোবেল পাওয়ার মত কাজ না। সময়মতো বেতন দেওয়া কোনো বিশেষ অনুগ্রহ না, এটা একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব।

একজন মালিক যেমন তার মূলধনকে নিরাপদ রাখেন, একজন বিনিয়োগকারী যেমন তার বিনিয়োগকে সম্পদ মনে করেন, ঠিক তেমনি একজন কর্মীর শ্রমকেও প্রতিষ্ঠানের কাছে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ মূলধন হারালে টাকা দিয়ে আবার মূলধন সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত কর্মীর হারানো সময়, অভিজ্ঞতা এবং আস্থা সবসময় টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

আমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিষ্ঠান কর্মীকে চাকরি দেয়, কিন্তু কর্মীও প্রতিষ্ঠানকে তার জীবনের মূল্যবান সময় দেন। সম্পর্কটি তাই একতরফা নয়, এটি একটি পারস্পরিক বিনিময় ও বিশ্বাসের সম্পর্ক। একটি সভ্য ব্যবসায়িক সংস্কৃতির পরিচয় শুধু প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মুনাফায় পাওয়া যায় না। তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় কর্মীরা সময়মতো বেতন পান কি না, তাদের প্রাপ্য সম্মান পান কি না, অসুস্থ হলে মানবিক আচরণ পান কি না, চাকরি হারানোর ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারেন কি না এবং বহু বছর কাজ করার পর প্রতিষ্ঠান তাদের অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করে সেই সকল প্রশ্নের উত্তরে।

একটি প্রতিষ্ঠান মূলত তার মানুষদের সম্মিলিত শ্রমের ফল। তাই কর্মীর শ্রমকে অবমূল্যায়ন করে কোনো প্রতিষ্ঠান কখনোই বড় হতে পারে না। হয়তো যোগ বিয়োগের খাতায় মুনাফা বাড়বে, কিন্তু সেই মুনাফার ভেতরে যদি অসংখ্য মানুষের না পাওয়া বেতন, আটকে থাকা পাওনা, অবমূল্যায়িত শ্রম এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের হিসাব লুকিয়ে থাকে তাহলে সেই সাফল্য কতটা গৌরবের, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।

কর্মী কোনো করুণা চায় না। সে চায় তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য, তার সময়ের সম্মান এবং তার প্রাপ্য অধিকার। কারণ একজন কর্মীর শ্রম কোনো সস্তা পণ্য নয় এটি তার জীবনের একটি অংশ। আর অন্যের জীবনের সেই অংশকে সম্মান করা একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মৌলিক মানবিক দায়িত্ব।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

ঠাকুরমাহমুদ বলেছেন:


ভালো লিখেছেন। দেশে সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন বোনাস বৃদ্ধি পেয়েছে। সমস্যা হচ্ছে তার সাথে বেসরকারি খাতে বেতন কেনো বৃদ্ধি হবে না? তাদের দোষ কি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করছে তাদের অন্যায় কোথায়?

আপনার লেখা ভালো হয়েছে। ধন্যবাদ।

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:২৯

কিরকুট বলেছেন: বাংলাদেশে অনেকের ধারণা, বেসরকারি খাতে শ্রমিকেরা সরকারি খাতের তুলনায় বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, বেসরকারি খাতে কর্মরত অনেক শ্রমিক ও কর্মচারী এখনও ন্যায্য পারিশ্রম্য ও সময়মতো বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কয়েক মাস পর্যন্ত বেতন অনাদায়ী থাকার ঘটনাও দেখা যায়, যা একজন শ্রমজীবী মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। সরকারি খাতে এ ধরনের অনিশ্চয়তা তুলনামূলকভাবে কম। তাই বেসরকারি খাতেও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন, ন্যায্য মজুরি এবং সময়মতো বেতন প্রদানের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

২| ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫২

অধীতি বলেছেন: যুগের পরিবর্তনের সাথে শোষণেরও রূপান্তর ঘটেছে।

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৪

কিরকুট বলেছেন: আর আমরা সেই সকল জনগোষ্ঠি যারা শোষিত হতে ভালোবাসি ।

৩| ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৯

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: যখন চাকুরির তুলনায় শ্রম বেশি সস্তা তখন এমনটি বেশি ঘটে ।

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:০৪

কিরকুট বলেছেন: এই সস্তা শ্রম বলে বলে বিদেশিদের মাথা নষ্ট করে রাখছেন ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.